জীবননামা

সরোজ মেহেদী (বাংলাদেশ)

এক.

বয়স হলে মানুষ বোকা হয়ে যায়। বোকা মানুষ সরল হয়। সরল হতে হলে বিশাল হতে হয়! সরলদের হৃদয় যেন এক একটা মায়ার সাগর। তারা গাছ থেকে বটগাছ হয়ে যায়। সে-গাছে পরগাছা যেমন বাঁচে, আবার ছায়ার নিচে মনুষ্য শান্তি খুঁজে পাওয়া যায়। গরম মানুষ বয়স হলে নরম বনে যায়। চ্যাটাং চ্যাটাং কথা বলা মেয়েটা হ্রদের মতো শান্ত আর বাঁদর ছেলেটা নিপাট নীরব। যৌবনের রসখেলা-জীবনের রসায়ন! ভবলীলা সাঙ্গ হলে হয় অবসান। সে আমি, আমি সে সবাই সমান। হায় মানব জীবন! সে কোনও দিনও পারে না যা, তার তার কল্পনা থেকে কখনও বাদ যায় না।  

দুই.

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নিজেকে দেখেন সাবিনা! মিসেস সাবিনা হাসান। সাদার ভিড়ে মাথার কোথাও কি কোনও কালো চুল অবশিষ্ট আছে! চোখের নিচে কালি পড়েছে, সে বহুবছর। নিজেকে নিজের কাছে কেমন যেন ঘুমকাতুরে মনে হয়। মাথাটা মস্ত এক শিমুল বাগান। মাঝখান থেকে বহু চুল নেই হয়ে গেছে। পুরুষ হলে এতদিনে টাক পড়ে যেত। তিনি চুলে বিলি কাটেন। বড্ড মায়া হয়। মায়া মায়া চোখে চেহারায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। সময়ের সঙ্গে হাসি দিলে টোল পড়া গালও হারিয়ে গেছে। চুল নেই, বেণী নেই। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে এপারের সাবিনার কাছে ওপারের সাবিনা সুধায়।

আরও পড়ুন: ছেঁড়াতার

—মিসেস সাবিনা এ কি হল তোমার!

—কিছু না।

—কী অবস্থা তোমার বলো তো সাবু! দেখে তো চেনার উপায় রাখনি!

—সময় মানুষকে নিয়ে যায় এমন জীবনের কাছে যে জীবনে সব তার অচেনা ঠেকে। আমার নিজের তো আমাকে অচেনা লাগে। আর তুমি? 

মানুষের মৃত্যুর আগে এক এক করে তার সব অঙ্গপ্র্যতঙ্গ মারা যায়! তারপর মরে মানুষটা। তার মানে একজন মানুষ মরার আগে ভেতরে ভেতরে বহুবার মরে! ভেবে আঁতকে উঠেন সাবিনা। কবে তার দরজায় এসে কড়া নাড়বে মৃত্যুপুরের গাড়ি! তারপর অনন্ত যাত্রা।

তিন.

আয়নার সামনে আবার দাঁড়ান। সাবিনার সত্যি সত্যিই আজকের সাবিনাকে অচেনা লাগছে। মনে হয় আয়নায় ওপাশে অন্য কেউ দাঁড়িয়ে। লম্বা চুলের জন্য খ্যাতি ও ভালো খাতির ছিল তার। খোপা ছেড়ে দিলে মাটি ছুত চুলের বেণী। কেবল বন্ধুরা না, বান্ধবীরাও হিংসে করত এমন ঘন কালো চুলের। একটা ছিল সোনার কন্যা মেঘ বরণ কেশ/ভাটি অঞ্চলে ছিল সেই কন্যার দেশ/দুই চোখে তার আহারে কি মায়া/নদীর জলে পড়ল কন্যার ছায়া। সেই চুল নিয়েই একদিন দু’কথা শোনাতে এসেছিল হাসান। বলতে এসেছিল, এই বয়সে এসব আদিখ্যেতা দেখানো তার ভালো লাগে না। সে সাবিনার মতো মেয়ের কাছ থেকে এমন ন্যাকামি আশা করে না।

—কি করেছিল সাবিনা?

—বিশেষ কিছু না।

বিশ্ববিদ্যালয়ে চুল ছেড়ে দিয়ে, চুলে বেণী করে ক্লাস করত আসত। ছেলের দল দেখবে বলে পিছু নিত। সাবিনা বান্ধবীদের নিয়ে সেসব দেখত আর হাসত।

—চুল দেখিয়ে ছেলেদের মন ভরাতে খুব আনন্দ, না?

—আপনাকে ডেকে এনে কেউ দেখায়নি তো। এরপর থেকে কাউকে কিছু বলার আগে কী করে কথা বলতে হয় শিখে আসবেন।

—আর আপনি কীভাবে চুল দেখিয়ে শুধু ছাত্র না শিক্ষকদেরও পাগল করতে হয়, সে কৌশল আরও ভালো করে রপ্ত করবেন।

সাবিনা এবার ফিক করে হেসে ফেলে। তারপর এ কথা ও কথা ধরে কত কথা হয়ে গেল। হাসানের রাগ পড়ে যায়। সেও গপ শুরু করে দেয়। কথার পিঠে কথা, দুনিয়ার কাহিনী গাথা।

চার.

মুখ থেকে বুকে নেমে আসে তাদের টান। বুক লেগে যায় বুকে। হাতে হাত চেপে ধরে শপথ নেয় একসঙ্গে থাকার। তারপর কতটা লম্বা সময় তারা পথ চলে। সাবিনা বেগম হয়ে যান সাবিনা হাসান। এতটা এতটা বছর। এত এত স্মৃতি। একদিন হাসানই শুরু করেছিল। সেই শুরুর শেষটাও আবার হাসানের হাত ধরেই। মৃত্যু এসে সব এলোমেলো করে দিয়ে গেল। একদিন ভোরে হাসান কাউকে না জানিয়ে বাড়ি ছেড়েছিল কুমিল্লা যাবে বলে। সেই যাওয়া যে শবযাত্রা হবে কে জানত! সাবিনার চোখে পানি। মানুষটা এভাবে তাকে একা রেখে চলে গেল। চলে যেতে পারল হাসান? এটাই কি জীবন? শেষপর্যন্ত মানুষ একা। মানুষ তার চিবুকের কাছেও ভীষণ অচেনা ও একা! দৃশ্যের বিপরীত সে পারে না একাত্ম হতে এই পৃথিবীর সঙ্গে কোনওদিন। মানুষ পারে না। হায় মানুষ! তারপর থেকে আর সংসার বলে কিছু নেই সাবিনার কাছে। সকালে তাড়াতাড়ি নাস্তা করার তাড়া নেই, নেই দুপুরের রান্নাবান্নার তোড়জোড়। পিঠা-পুলি পায়েসের রং নেই। এখন কেবল রুটিন বেঁচে থাকা। হাসান ঠান্ডা ভাত খেতে পারত না। সকালে গরম ভাতের সঙ্গে একটা ডিম ভাজা না হলে তার পেট ভরত না। সাবিনার তাই সাত সকালে আরেকজনকে শান্ত করার তাড়া ছিল, মনে আনন্দও ছিল। আর এখন একটা মানুষের মৃত্যুতে সাক্ষী হয়ে আরেকটা মৃত্যু যাত্রার অপেক্ষায় দিন গোনা। এক অনিশ্চিত ও অদ্ভুত যাত্রা। যে যাত্রা মানুষের সঙ্গী কোনও মানুষ হয় না। সে নিজেও যাত্রী হতে চায় না। পথ তাকে টেনে নিয়ে যায়। নিয়ে চলে অচিন পথে, অচিন ও আজব এক দেশে।

আরও পড়ুন: নিউজিল্যান্ডের কিছু সাহিত্য সাময়িকী ও লিটল ম্যাগাজিন

পাঁচ.

হাসান ছিল বোকা টাইপের মানুষ। চেমনের বোকা বাবা। সাবিনা-হাসান দম্পতির একমাত্র সন্তান চেমন। আদরে আদরে পেকে যাওয়া মেয়ে। সাবিনার কানে যেন এখনও বাজে। মেয়েটা সকাল-বিকাল বলত, বাবা তুমি একটা আস্ত বোকা। মা তুমিও বোকা। দুই বোকার ঘরে এক বুদ্ধিমান মেয়ে। একদিন একমাত্র সন্তানের বিয়ে হয়ে গেল। বছর ঘুরতে মেয়ের ঘর আলো করে এলো আরেক মেয়ে। হাসান শখ করে নাতনীর নাম রাখল সোহানী। সোহানী কথা বলতে শিখল, মাকে বলা শুরু করল মা তুমি বোকা। সাবিনাকে ডেকে এনে বলল, নানি মাকে বলো মা একটা বোকা। সাবিনা হাসে, পৃথিবীর সব মা-বাবাই কি তার সন্তানের কাছে বোকা! তাহলে কি এটাই একমাত্র সত্য মানুষ বড় হলে বোকা হয়ে যায়! খুব স্মার্ট মানুষটাও সময়ের ব্যবধানে আরেক প্রজন্মের কাছে হয়ে যায় ব্যাকডেটেড!

ছয়.

হাসানের মৃত্যুর পরের বছর মেয়েও চলে গেল। তারপর থেকে সাবিনা নাতনীকে নিয়ে একা। বছর তিনেক ধরে পথ চেয়ে অপেক্ষায় থাকেন কবে নাতনীর ভার্সিটি ছুটি হবে। কবে সে বাড়ি আসবে, নানি এটা কর, ওটা কর বলে জ্বালাতন শুরু করবে। এ-পাড়ায় ও-পাড়ায় ঘুরতে যাবে বলে বায়না ধরবে। নাতনীটা বাড়ি ফিরলে যেন শূন্য হৃদয় খানিকটা প্রাণ ফিরে পায়। নাতনী বাড়ি ফিরলে মনে হয়, এখনও বেঁচে থাকাটা জরুরি। জীবন এখনও সুন্দর। এখনও সকালে পাখি ডাকে। রোদ ঝলমলে দিন এখনো আসে সন্ধ্যার পেটে হারিয়ে যাবে বলে। নাতনীটাও খুব মায়াবী। নানি নানি করে বাড়ি মাথায় তুলে। মনে হয় যেন এখনও গেদাই রয়ে গেছে। মাথার নিচে দুই হাত দিয়ে এখনও শিশুর মতো ঘুমায়। সকালে টেনে তুলে খাওয়াতে হয়। ওর ভার্সিটি বেশি দূরত্বে না ভেবে স্বস্তি হয় সাবিনার। চাইলে যখন তখন চলে আসতে পারে।

সাত.

সাবিনা বোকা বোকা চোখে আবার আয়নার দিকে তাকান। আয়নায় এই মুখ দেখবে যখন। হাসান প্রায়ই বাজাত গানটা। সকাল বিকাল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মুখ দেখে সাবিনা। হাসান গান বাজায়। চলে যাওয়া দিনগুলো সাবিনার চোখে পানি নিয়ে আসে। আজ সাবিনার ইচ্ছে করছে সেই গানটা শুনে, চুলে তেল আর চোখে কাজল মাখে। তারপর সাজুগুজু করে বাইরে ঘুরতে বেরোয়। তার ইচ্ছে করে সোহানীকে ফোন করে। কেন আসছে না জানতে চায়। মেয়ের কবরের পাশে যায়। কতদিন হাসানকে দেখা হয় না। একটু বাপের বাড়ি গিয়ে বাবা-মায়ের কবরটা জিয়ারত করে। একমাত্র ভাইটা মারা গেল ক’বছর। সে কি এখনও বুবু বুবু বলে ডাকে। সাবিনার ইচ্ছে করে কতোকিছু করে। মন বলে কর কর, শরীর বলে না। সাবিনা শরীরটার সঙ্গে আর পারে না। সোহানীকে ভালো একটা ছেলের হাতে তুলে দিতে পারলে হয়। তার আর মৃত্যু নিয়ে কোনও ভয় থাকে না। লাল শাড়িতে সোহানীর লাজে রাঙা মুখটা কল্পনা করতে করতে তিনি আবার আয়নার সামনে দাঁড়ান। নাতনীটা বড় লক্ষ্মী তার। পড়াশোনায়ও মন্দ না। দেখতে হয়েছে মাশাল্লাহ।

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২৫)

আট.

একা বাড়িতে আর সময় কাটে না মিসেস সাবিনার। কাজকাম সেরে মরিয়ম বিবি সন্ধ্যায় চলে গেলে বাড়িজুড়ে যেন গভীর রাতের নিস্তব্ধতা নেমে আসে। মরিয়ম সকালে এসে নাস্তা বানায়। তারপর সারাদিন থাকে। সন্ধ্যায় তার ছুটি। আবার সকালে আসে। কখনও-সখনও সাবিনা বেগম বললে রাতেও থাকে। মরিয়ম বিবি না পারলে তার মেয়ে আছিয়াকে পাঠিয়ে দেয়। আসিয়া এসে টিভি দেখা শুরু করে। ভোর রাতে টিভি দেখা শেষ করে মোড়ামুড়ি করে। এরপর হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি চলে যায়। সপ্তাহখানেক পর গ্রীষ্মের ছুটি। নাতনী বাড়ি আসবে। তার জন্য সাবিনা বেগম এই আয়োজন সেই আয়োজন করবে বলে ঠিক করেন। কোনও কিছুই করা হয় না। সে আজকাল বোঝার চেষ্টা করে, মানুষ আসলে চলতি পথের এক অচেনা যাত্রী। তার জীবনে কোনও কিছুই ফিক্সড করা হয় না। কেবল আসা-যাওয়ার মধ্যে থাকে। মানুষ সেটা বুঝতে চায় না। মানুষ মানতে পারে না, এই পৃথিবীতে কোনও কিছুই তার না। সাবিনা ভাবে। ভাবতে ভাবতে অতীতে হারায়। বর্তমান হারানো মানুষদের আসলে অতীত ছাড়া আর কিছু থাকে না। ভবিষ্যৎও তাদের কাছে অতীতের মতো হয়ে যায়। সাবিনা অতীতকে আঁকড়ে ধরে নাতনীর ভবিষ্যতের জন্য আরও ক’টা বছর বেঁচে থাকতে চায়।

নয়.

রাত ১১টার কম না। শরীরটা টেনে নিয়ে আর ঘড়ি দেখতে সায় দেয় না। ক্লান্তি আর অবসাদ নিয়ে ঘুমাতে যান সাবিনা। তারপর ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে যান। সে রাজ্যে আনন্দযজ্ঞ চলছে রীতিমতো। অতি আদরের নাতনী সোহানীর বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। ছেলেটার কি মায়া মায়া চেহারা। বিদেশ ফেরত কেতাদুরস্থ ভদ্রলোক। সোহানীকে যেন তার পাশে আরও বেশি মায়াবী লাগছে। সোহানীর মুখের হাসি বলে দেয় পাত্র তার ভীষণ মনে ধরেছে। নাতনীর খুশি মুখ দেখে সাবিনার খুশি যেন আর ধরে না।

বাড়িজুড়ে বাদ্যবাজনা বাজছে। সোহানীর দাদা বাড়ি থেকেও মানুষজন এসেছে। তিনি সবাইকে আপ্যায়ন করছেন। হইচই, হইহই, রইরই রব চারদিকে। এখনই ছেলে-মেয়েকে কবুল বলানো হবে। কাজী সাহেব মেয়ের কাছে এসেছেন। চারদিকে সবাই ভিড় করছে। সোহানী নানি বলে জোরে হাঁক ছাড়ে। ঠিক তখনই সাবিনার ঘুমটা ভেঙে যায়। শরীরটা টেনে তোলার শক্তি তার নেই। গায়ে হালকা জ্বর বোধহয়। ফযরের আযান কি হয়ে গেছে? বাহির থেকে আবছা আলো ঘরে প্রবেশ করছে। তার মানে সকাল হতে বাকি নেই। তিনি ওঠার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছেন। মনে হচ্ছে, খাটটা তাকে নিয়ে ভাসছে। কোনোভাবেই আর ওঠা সম্ভব না।

আরও পড়ুন: বাঙালি মননে সংগীতশিল্পী দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়: একটি আলোকপাত

দশ.

খানিক পর সাবিনা ঘরের দরজায় টোকার আওয়াজ পায়। মরিয়ম বিবি চেঁচায়, আম্মা উডেন, নামায পড়তেন না আউজকা। বেয়াইন বেলা পার অইয়া গেল। উডেন, উডেন। সাবিনা বেগম জোরে জোরে জবাব দেয়, পড়মু, পড়মু। পানি আন মরিয়ম। তাড়াতাড়ি ততা পানি দে। মরিয়ম সজোরে দরজা ধাক্কায়— ও আম্মা উডেন, উডেন না। সাবিনা আরও জোরে চিল্লায়। মরিয়ম আরও জোরে দরজা ধাক্কায়। দেখতে দেখতে সারা গায়ের মানুষ জমে যায়। কয়েকজন মিলে ঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। কি আশ্চর্য! তিনি চিল্লাইয়া চিল্লাইয়া সবাইকে চলে যেতে বলছেন। কিন্তু কেউ তার কথা শুনছে বলে মনে হয় না। মানুষগুলো তার চারপাশে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করছে। তিনি কান খাড়া করে সব শুনছেন আর রাগে ফুঁসছেন। অথচ তার দিকে কারো কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই।

মরিয়ম বিবি হাত পা ছেড়ে আম্মা আম্মা বলে বিলাপ শুরু করেছে। সোহানীর কথা ভেবে বড্ড মন খারাপ হয় সাবিনার।

মিসেস সাবিনা এখনও বুঝতে পারছেন না তার কি হয়েছে! তিনি অসহায়ের মতো চারপাশে তাকান। এইমাত্র উঠানে সোহিনীর গগনবিদারী কান্নার আওয়াজ শোনা গেল…

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *