জলের ঘর

তুষ্টি ভট্টাচার্য

ভালোবাসা প্রথমেই প্রয়োজনের শিক্ষা দেয় আমাদের। হাত কেটে গেছে বলে ব্যান্ডেজ বেঁধে দেবার কেউ যদি না থাকে, রক্ত গড়িয়ে পড়তে দাও। জলের মতো তরল ও রংহীন হয়ে আসবে সে একসময়। যারা কবিতার খাতাকে রদ্দি কাগজের দরে বেচে দিয়েছিল, তারা তখন বুঝবে— কবিতার মতো প্রয়োজনীয় জিনিস আর নেই। বরিস পাস্তারনেক, শুনছেন আপনি? আপনার কণ্ঠস্বর আমাদের জানিয়েছে, হাসপাতালের বিছানায় বসে গার্গল করার থেকে এই ঘরে বসে ঈষদুষ্ণ জল পান করা ঢের ভালো।

আরও পড়ুন: যে জীবন হরবোলা

কাকের ডাকে তন্দ্রা কেটে গেলে দেখি, ভ্যান গগের ছবির ফ্রেমের ভেতরে আটকে পড়েছি। আমার মাথার ওপর দিয়ে একঝাঁক কাক ডেকে চলেছে। ফ্রেমের বাইরে, দূরে দিগন্তরেখায় মিশেছে সবুজ-হলুদ ক্ষেত আর রাঙামাটির পথ। যে করেই হোক, ওই বর্ণময় পথে আমাকে যেতে হবে। এই সাদা-কালো-ধূসর ছবির ভেতর থেকে লাল দাড়ি-গোঁফ নিয়ে পাগল হেঁকে চলেছে— সব ঝুট হ্যায় মেহের আলি! তফাত যাও! ক্ষেতের পাম্প উগরে দিচ্ছে জল আর কালো ধোঁয়া। কাচ ভাঙার শব্দ শুনতে পেলে? ফ্রেম থেকে আছড়ে বেরিয়ে পড়বে এবার ওরা। আলপথ দিয়ে শীর্ণ জলরেখা তখনও কুলকুল বইবে।

আরও পড়ুন: মেধাকাল

যুদ্ধ শেষ করে ফিরে চলেছে সৈনিক। কুরোসাওয়া সুড়ঙ্গ থেকে ধীর গতিতে বেরিয়ে এলেন তাঁর সিনেম্যাটিক শটের মতো। মৃত সৈনিকের দল কুরোসাওয়ার পিছনে মার্চ পাস্ট করে চলেছে। প্রশ্ন কী? কেন তারা একে একে ধেয়ে আসে জয়ী ও একমাত্র জীবিত সেনার ওপর? যাদের বাড়ি ফেরা হল না, অপেক্ষারত প্রিয়জন এখনও কাঁদছে হয়তো… রুকস্যাকে রাখা জলের বোতল খালি পড়ে আছে ওদের। তৃষ্ণা হার মেনেছে। ক্ষুধা মৃত ওদেরই মতো। জীবিত সৈনিকের তেষ্টায় শুকিয়ে গেছে গলা, শব্দহীন সে। কুরোসাওয়ার নিঃশব্দ মুখ আর মৃত সেনাদের পাণ্ডুর চেহারা আপাতত তাকে ফিরিয়ে দিচ্ছে এক গর্জনরত হিংস্র কুকুরের সামনে। জলভর্তি বোতল ঝুলছে তার পিঠে। জ্যান্ত মানুষের তৃষ্ণা লেগে আছে ওখানে।

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

  • ভজন দত্ত

    ভালো লাগলো, তুষ্টি ভট্টাচার্য-র লেখা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *