মুরারিপুকুরে নিজের স্কুলের সামনে যেন ভোটপ্রচার নয়, স্কুল রি-ইউনিয়নে শামিল হলেন কল্যাণ চৌবে

শুভ্রাংশু রায়

উইকি জানাচ্ছে, তিনি সন্তোষ ট্রফিতে মোট পাঁচটি রাজ্যের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, গোয়া, পঞ্জাব এবং মহারাষ্ট্র। নিজের পনেরো বছরের পেশাদার ফুটবল জীবনে ক্লাব ফুটবলে মোহনবাগান অ্যাথলেটিক ক্লাব, ইস্টবেঙ্গল ফুটবল ক্লাব, সালগাওকার, মাহিন্দ্রা ইউনাইটেড এবং মুম্বই এফসি-র দলের জার্সি চাপিয়েছেন দেশের সর্বোচ্চ টুর্নামেন্টগুলিতে। আই লিগে প্রথম গোলকিপার হিসেবে একশো ম্যাচ খেলার রেকর্ডও তাঁরই ঝুলিতে। খেলেছেন ভারতীয় জাতীয় দলেও। কল্যাণ চৌবে। তিনি লিখেছেন ‘অপরিণত’ নামে এক রহস্য থ্রিলারও।

আরও পড়ুন: স্ক্যাম চাইলে দিদিকে ভোট দিন, আর যদি স্কিম চান, তাহলে নরেন্দ্র মোদিকে ভোট দিন: অমিত শাহ

এবারের বহু চর্চিত পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে নজরকাড়া মানিকতলা কেন্দ্রের ভারতীয় জনতা পার্টির প্রার্থী তিনি। তবে রাজনীতির ময়দানে অবশ্য ‘অপরিণত’ নন একদা ভারতীয় দলে গোলরক্ষাকারী এই খেলোয়াড়। দীর্ঘদিন ধরেই ভারতীয় জনতা পার্টির সক্রিয় সদস্য তিনি। ২০১৯-এ লোকসভা নির্বাচন কৃষ্ণনগর কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী ছিলেন কল্যাণ চৌবে। যদিও তৃণমূল প্রার্থী মহুয়া মৈত্রের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন তিনি।

আরও পড়ুন: দোলের দিন বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা করে দক্ষিণ দমদমে ভোট প্রচার করলেন ব্রাত্য বসু

আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে মানিকতলা কেন্দ্রে পদ্ম প্রতীকে প্রার্থী কল্যাণ চৌবে ইতিমধ্যে নিজস্ব ভঙ্গিমায় নির্বাচনী প্রচার পর্ব জমিয়ে দিয়েছেন। কখনও তাঁকে দেখা যাচ্ছে বাজার করতে করতেই মানুষের মধ্যে মিশে যেতে। কখনও বা মন্দিরের সামনে ভজন গানের তালে ভক্তদের সঙ্গে রং মেখে পা মিলিয়েছেন। দোলের আগের দিন রাতের বেলায় তাঁকে দেখা গেল ন্যাড়া পোড়ানোর অনুষ্ঠানে অংশ নিতেও। ফেসবুক, টুইটার বা ইনস্টাগ্রামে তাঁর প্রচারের বিভিন্ন মুহূর্তের ভিডিয়ো এবং স্টিল ফোটো পোস্ট করছেন তিনি। আর এই বিশেষ ভঙ্গিমাগুলি নেটিজেনদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে দ্রুত।

আরও পড়ুন: ভোট দেওয়ার পরের দিনই লালগড় থেকে গ্রেফতার ছত্রধর মাহাতো

গত শনিবার এই রকম এক প্রচারপর্বে বেরিয়ে নিজের শৈশব এবং কৈশোরের মুখোমুখি হলেন কল্যাণ। এদিন প্রচারে গিয়েছিলেন এলআইজি স্কুল বা মুরারিপুকুর স্কুলের পাড়ায়। স্কুলের সামনে হাজির বেশকিছু মানুষজন ও কিছু দলীয় কর্মী। সকলের সঙ্গে কুশল বিনিময়ের পরে আবেগতাড়িত কণ্ঠে মাইক হাতে কল্যাণ চৌবে বলে উঠলেন, “আমার প্রাথমিক শিক্ষা এই স্কুলেই সম্পন্ন হয়েছে। এই স্কুলেই আমি পড়েছি। ঘটনাক্রমে এই মাঠে আজ আমি আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছি। ক্লাস ফাইভে পড়তাম। যেমন কোনও ক্লাস টুর্নামেন্ট হয়, তেমনই স্কুল টুর্নামেন্ট হত এখানে। সেখানে দু’টি বিভাগ ছিল। প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত একটা বিভাগ, ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত আরও একটা বিভাগ। তা স্বাভাবিকভাবে যারা ক্লাস ফাইভে পড়ত, তাদেরকেই দেখা যেত চ্যাম্পিয়ন হিসাবে। খুব সহজেই তারা ক্লাস থ্রি-ফোরের খেলোয়াড়দের সঙ্গে জিতে যেত। তাই কম্পিটিশন মূলত চলত ফাইভ এ, ফাইভ বি, ফাইভ সি-র মধ্যেই। আমি পড়তাম ফাইভ এ-তে। খুব একটা কৃতিত্ব বিশেষ নিতাম না। কারণ বড় বয়সের ছেলেরা ছোটদের সঙ্গে খেলে জিতছে। যদিও পরের বছর চিত্রটা অন্যরকম হত। আমরা তখন ক্লাস সিক্সে। খেলতে হবে উঁচু সব ক্লাসের ছেলেদের সঙ্গে। আমরা তখন সবচেয়ে ছোট। আমাদের ক্লাস সিক্স বি-র ঘরটা ছিল স্কুল বিল্ডিংয়ের দোতলার ওই কোণে। আমরা বেশ কয়েকজন খেলাধুলার ব্যাপারে খুবই সিরিয়াস ছিলাম। পড়া কম খেলা বেশি! খেলার পিরিয়ড কখন আসবে, অপেক্ষা করতাম। সে-বছর আমরা সবথেকে ছোট হওয়া সত্ত্বেও জিতেছিলাম। ক্লাস সেভেন, এইট, নাইনকে আমরা হারিয়েছিলাম। আমি গোলকিপার খেলতাম। আমাকে ডিঙিয়ে কেউ গোল করতে পারল না। গোটা স্কুলে একটা পরিচিতিও বাড়তে থাকল আমার। অনেকেই তখন বলতেন, কল্যাণ চৌবে ফুটবলটা ভালোই খেলছে। এই স্কুলের প্রধানশিক্ষক ছিলেন জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক। ক’দিন আগেই আমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল তাঁর। সহ-প্রধানশিক্ষক ছিলেন রথীন্দ্রনাথ চ্যাটার্জি বা চক্রবর্তী। মনে আছে যে, স্কুল শুরুর আগে আমরা যখন খেলাধুলার জন্য স্কুলে ঢুকতে লেট করতাম, তখন স্যার আমাদের বেত দিয়ে এক পায়ে মারতেন”… বলে চলেন কল্যাণ।

আরও পড়ুন: কাঁথিতে সৌমেন্দু অধিকারীর গাড়িতে হামলা, আহত চালক

সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করা ভিডিয়ো থেকে স্পষ্ট চোখে মুখে তখন ময়দানের রক্ষণ দুর্গের পোড়খাওয়া প্রহরীর আবেগ গ্রাস করেছে। মাইক হাতে বলে চলেন তিনি— “বহু বছর পর শৈশবের স্মৃতি হাতড়ে এই স্কুলে এসে উপস্থিত হয়েছি। ভোটের প্রচারের জন্য নয়। রাজনীতির কারণে নয়। আমার শৈশব জুড়ে রয়েছে এই স্কুল। আপনারা যে দলেরই সমর্থক হোন না কেন, নিশ্চয়ই আপনারা আপনার বিচার-বুদ্ধি দিয়েই কাউকে ভোট দেবেন। আমি এইটুকু আশ্বাস দিতে চাই, আমি যদি আপনাদের সমর্থন পাই, তাহলে আপনারা যে দৈনন্দিন অসুবিধাগুলোর মুখোমুখি হচ্ছেন, সেগুলি ভীষণ আন্তরিকভাবে দেখব। যা কোনও রাজনৈতিক লড়াইয়ের ঊর্ধ্বে থাকবে। যা রাজনৈতিক রং এবং রাজনৈতিক বিচারেরও ঊর্ধ্বে থাকবে। কারণ, বিজেপির প্রার্থীর থেকেও বড় কথা এই পাড়ার সন্তান আমি। যদি মনে করেন আমার কথার মধ্যে যুক্তি ও আবেগ রয়েছে, তাহলে আপনাদের আশীর্বাদ চাই।”

আরও পড়ুন: ভোট নিয়ে টুইট করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি

তাঁর নির্বাচনী কেন্দ্রের ভোটাররা কতখানি দু’হাত তুলে তাঁকে আশীর্বাদ করবেন, সেটা জানার জন্য আমাদের আগামী ২ মে ইভিএম মেশিন খোলার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু এদিন কল্যাণ চৌবে নিজের কৈশোরের স্কুলপাড়ায় যে প্রচারপর্বে এক দুর্লভ অভিজ্ঞতা নিজের ঝুলিতে ভরে নিলেন, তাতে কিন্তু সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই। জানা নেই এই অভিজ্ঞতা কল্যাণ চৌবের কলম থেকে আমাদের জন্য নতুন এক গল্প বা উপন্যাসের জন্ম দেবে কিনা!

লেখক সোনারপুর মহাবিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর

এই সংক্রান্ত আরও খবর:

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *