কপিল দেব ১৭৫:৩৮, ইতিহাস থেকে ক্রিকেট রূপকথা

শুভ্রাংশু রায়

ক্রিকেট মানে ঝিঁঝিঁ। ক্রিকেট মানেই রূপকথা। আর সেটি যদি সাদা-কালো ক্রিকেট হয়, তাহলে তো কথাই নেই। ক্রিকেট বিশ্বে এরকম হাজারো রূপকথা আছে। শুধু রূপকথা আছে বললে বোধহয় সম্পূর্ণ বলা হয় না। এক সময় যেগুলি ঘটনা, তা ইতিহাসের রূপ পায়। তারপর পেরোনো সময়ের সঙ্গে সেই ইতিহাসে আরও কিছু রঙিন উপাদান মিশে তা রূপকথায় রূপান্তরিত হয়। এরকমই একটি রূপকথা ১৯৮৩ ক্রিকেট বিশ্বকাপে কপিল দেবের জিম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে করা অপরাজিত ১৭৫ রানের ইনিংস, যা একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইনিংস হিসেবে আজ আটত্রিশ বছর পরেও বিবেচিত এবং আলোচিত।

আরও পড়ুন: লিয়েন্ডার পেজ ৪৮: এক ইতিহাসের মুখোমুখি

ব্রডকাস্টিং টেকনলজির দিক থেকে ১৯৮৩ সাল খুব পুরনো আমলের ঘটনা নয়, বিশেষত যখন খেলাটি হচ্ছিল ইংল্যান্ডের মাটিতে। কেন্ট কাউন্টির মধ্যে লন্ডন শহর থেকে ঘণ্টাখানেক যাত্রাপথের দূরত্বে অবস্থিত টার্নব্রিজ ওয়েলস ক্রিকেট মাঠে (নেভিল গ্রাউন্ড) ১৮ জুন, ১৯৮৩, ভারত বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্যায়ে রিটার্ন লেগের দ্বিতীয় ম্যাচে খেলতে নেমেছিল জিম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে। সেদিন বিবিসির স্থানীয় স্তরে ধর্মঘটের কারণে কোনও রেকর্ডিংয়ের ব্যবস্থা ছিল না। তাই ইউটিউব খুঁজলে বা বিবিসির আর্কাইভেও এই ম্যাচের কোনও রেকর্ডিং মেলে না। ঠিক সেই জন্যই কপিল দেবের এই অতিমানবীয় এই ইনিংসটি রূপকথায় পর্যবসিত হয়ে যাওয়ার প্রথম এবং প্রধান অক্রিকেটীয় কারণ। এই ধর্মঘট, যা কপিলের এই অপরাজিত ১৭৫ ইনিংসকে ঘিরে কল্পনা এবং নানা ধরনের গল্পগাথাকে বুনতে প্রশয় দিয়েছে।

আরও পড়ুন: জ্যাঙ্গো, র‍্যাম্বো আর ক্রিকেট

শুরুতেই বলেছি, ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে রঙিন উপাদেয় নানা মশলার মিশেলে রূপকথার জন্ম হয়। এই আটত্রিশ বছর অর্থাৎ প্রায় চার দশক পরে মোটামুটি ক্রিকেটের খোঁজখবর রাখা যে কাউকে কপিলের ১৭৫ ইনিংসের কথা জানতে চান, দেখবেন রেকর্ড সম্পর্কে খুব সচেতন কেউ না হলে প্রথমেই আপনাকে বলে দেবে কপিলের এই ইনিংসটি খেলা জিম্বাবোয়ের রান তাড়া করার সময়ে। অর্থাৎ প্রথম ব্যাট জিম্বাবোয়ে করেছিল। তা কত রান করেছিল জিম্বাবোয়ে? অর্থাৎ ভারতের সামনে টার্গেট কত ছিল? কফি হাউস এক ক্রিকেট বোদ্ধার সটান উত্তর ছিল ‘কেন ২৬৬’। বাস্তব হল, সেদিন টসে জিতে কপিল দেব প্রথম ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেন। ভারতের হয়ে ওপেনার হিসেবে ব্যাট করতে নামেন সুনীল গাভাস্কর এবং কৃষ্ণমাচারি শ্রীকান্ত। দু’জনেই শূন্য রানে প্যাভিলিয়নের পথ ধরেন। দলের রান তখন ২/৬। দলের একই রানে আউট হন মহিন্দর অমরনাথ। পরের ব্যর্থ ব্যাটসম্যানের নাম সন্দীপ পাতিল। দলের স্কোর ৪/৯। আর এখানেই আরেক রূপকথা আর ইতিহাসের ফারাক। কারণ কপিল সেদিন যখন ব্যাট করতে নামেন তখন স্কোর ছিল ৪ উইকেটে ৯ রান। কিন্তু এটা বহুল প্রচলিত কপিল যখন ব্যাট করতে নামেন তখন রান ছিল ৫/১৭। প্রকৃতপক্ষে ১৭ রানের মাথায় কপিলের সঙ্গে ৮ রান যোগ করে আউট হন যশপাল শর্মা।

আরও পড়ুন: ৪৭ বছর পরেও গাভাস্করের মনে অম্লান মাঠের মধ্যে চুল কাটার স্মৃতি

এরপর শুরু হয় কপিলের ঝোড়ো ইনিংস। কপিলের ঠিক আগে আউট হয়ে প্যাভিলিয়নে ফেরা সন্দীপ পাতিল বেশ কয়েক বছর আগে একটি পত্রিকায় সেদিনের এই মুহূর্তের এক অনবদ্য স্মৃতিচারণ করেছেন এই বলে, “আমরা আউট হয়ে বিমূঢ় হয়ে ড্রেসিংরুমে বসেছিলাম। নেভিল স্টেডিয়ামের ড্রেসিংরুম ছিল মাঠের লেভেলের তুলনায় কিছুটা নিচে। বেশ কয়েকবার দর্শকদের থেকে করতালির আওয়াজ শুনছিলাম। আমাদের আশঙ্কা হচ্ছিল, আবার কেউ না কেউ বোধহয় আউট হচ্ছেন। অথচ কাউকেই আমরা ড্রেসিংরুমে ফিরতে দেখছিলাম না। বেশ কয়েকবার খুব জোরে করতালির আওয়াজ শোনার পর আমাদের মধ্যে শ্রীকান্তই প্রথম ওপরে যায় এবং কিছুক্ষণ পরে এসে জানায়, প্রত্যেকটিই হাততালি আদতে কপিলের নেওয়া ব্যাটের মাঝখান দিয়ে শটগুলির জন্য।” কপিল যখন দ্রুত রান তুলছিলেন, তখন অন্যদিকে আরও দু’টি উইকেট পড়ে যায়। ৭৭ রানের মাথায় রজার বিনি এবং এক রান বাদে রবি শাস্ত্রী। মদনলালের আউট হওয়ার পর ব্যাট করতে নামেন উইকেটরক্ষক সৈয়দ কিরমানি। ক্লাস এইটে পড়া অশোক দে-র স্মৃতিচারণ, “আমি ছাদে বসে ম্যাচটির রেডিয়োতে কমেন্ট্রি শুনছিলাম। এমনিতে আমি সেই সময় গাভাস্করের প্রবল ভক্ত ছিলাম এবং প্রথমেই গাভাস্করের আউট হয়ে যাওয়া, তারপর আরও দ্রুত উইকেটের পতন আমার মনকে বিষণ্ণ করে দেয়। আমি রেডিয়ো অফ করে দিই। পরে অনেক রাতে আমি বাবার মুখে কপিলের ইনিংস আর ভারতের জয়ের খবর পাই। তবে সেদিন কিরমানির ইনিংসের কথাও আলোচনায় আসা উচিত। কারণ সৈয়দ কিরমানি দশম উইকেটে সাথ না দিলে কপিলের পক্ষে এতদূর টেনে নিয়ে যাওয়া সম্ভবপর ছিল না।”

আরও পড়ুন: মনোহর আইচ: পান্তা ভাতের জল, তিন জোয়ানের বল

সকালে একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে দেখছিলাম বন্ধুবর ত্রিদীপ শিট লিখেছেন, “অনেকে আবার বলে দেয় ১৭ রানে ৫ উইকেট পড়ে যাওয়ার পর কপিল কিরমানি জুটি বাঁধেন, এটাও ভুল। কিরমানি আরও পরে নামে। ৮ উইকেট পরে যাওয়ার পর।” এটাও কিন্তু সেই ঘটনা এবং রূপকথার মধ্যেকার ফারাক। আদতে কপিলের এই ইনিংসের রূপকথার মধ্যে কিরমানির প্রবেশের আসল কারণ দশম উইকেটে কপিল-কিরমানি জুটির অপরাজিত ১২৪ রান। কিরমানির ৫৬ বলে ২৪ রান যে দুর্মূল্য, তা সত্যিই আলাদা করে বলার প্রয়োজন নেই। কপিল ১০০ ছুঁয়েছিলেন ৭২ বলে। ভারতের ইনিংস যখন ৬০ ওভারে ২৬৬ রানে শেষ হয়, কপিল তখন ১৩৮ বল খেলে ১৬টি বাউন্ডারি আর ৬টি ওভার বাউন্ডারির সাহায্যে ১৭৫ রানে অপরাজিত। রূপকথা এখানেই থেমে যায়। ইতিহাস বলে এরপর জিম্বাবোয়ে ব্যাট করতে নেমে ৫৭ ওভারে ২৩৫ রানে গুটিয়ে যায়। ভারত ম্যাচটি জিতে যায় ৩১ রানে। মদনলাল এবং রজার বিনি তিনটি এবং দু’টি উইকেট পেয়েছিলেন। এমনকী কপিল দেব কিন্তু পুরো এগারো ওভার বল করে একটি মেডেন সহ বত্রিশ রান দিয়ে একটি উইকেট পেয়েছিলেন। কিন্তু রূপকথা বড়ই বিষম বস্তু। সবকিছু দূরে ফেলে সেখানে ক্যানভাসে শুধুই ‘হরিয়ানার হ্যারিকেনে’র অপরাজিত ১৭৫। আজও আটত্রিশ বছর পার করেও।

লেখক সোনারপুর মহাবিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর

Facebook Twitter Email Whatsapp

এই সংক্রান্ত আরও খবর:

5 comments

  • নবনীতা বসু

    স্মৃতি উশকে দিল।

  • Debashis Majumder

    Absolutely true. Sotyi Rupkotha. BBC strike er Dorun Kapil Dev er ei ekmatra one day international century and an absolutely brilliant innings er kono footage nei. Purotai Rupkotha hisabe theke gechhe. A true dream of cricket folklore. Ekmatra Turmbridge Wells er math I er sakkhi.

  • চমৎকার, সে এক রূপকথা ! খুব ভালো লেখা পড়লাম

  • অসাধারণ লেখা ।

  • Snehasish Bhadra

    ইতিহাস ও রূপকথার মিশেল থেকে আসল ইতিহাস বেরিয়ে এলে তার মাধুর্য সত্যি আলাদা। ঠিক যেমন অশোকের শিলালিপি পাঠোদ্ধারের আগে পুরান অনুযায়ী অশোক ছিল অত্যাচারী রাজা। অথচ শিলালিপি তার উল্টো সাক্ষ দেয়। সেদিনের জয়টা ও ইতিহাস ও রূপকথার এক অপূর্ব মিশেল যা লেখাটিতে অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *