পুরনো মন্দিরের বর্ধিষ্ণু জনপদ খড়দহ

শুভদীপ সিনহা

৭ মার্চ, ২০২০। শনিবার। ছুটি ছিল আমার। ঘরে কী করব ভাবতে গিয়ে আমার অনুজপ্রতিম অভিষেকের একটা কথা মনে পড়ল। ঘরের কাছেই তো শ্রীপাট খড়দহ। আর পুরাতন মন্দির দর্শন তো আমার অন্যতম কাজের মধ্যে পড়ে। বেরিয়ে পড়লাম। সকাল ১০টায় আমরা খড়দহ স্টেশনে নামলাম। খড়দহ স্টেশনের আপ প্ল্যাটফর্মের দিকে লাইন ক্রস করে এসে একটা টোটো ভাড়া করলাম। টোটো বি টি রোডে উঠে প্রায় ফাঁকা রাস্তা ধরে ছুটে চলল। গতকাল রাত্রে প্রবল বৃষ্টি হয়ে গেছে। আজ মেঘলা আবহাওয়া, টিপটিপ বৃষ্টিও পড়ছে। আবহাওয়া গরম তো নয়ই, বরং একটু ঠান্ডা ঠান্ডাই। যাই হোক টোটো গলিঘুঁজি পার করে এসে পৌঁছল শ্যামসুন্দরতলার মোড়ে।

আরও পড়ুন: মালঞ্চের ৩০০ বছরের দক্ষিণা কালীর টেরাকোটার মন্দির এখন বয়সের ভারে জীর্ণ

এবার একটু খড়দহের আর শ্যামসুন্দরের ইতিহাসটা আলোচনা করে নিই। উত্তর ২৪ পরগনায় শিয়ালদহ মেইন লাইনের উপর অবস্থিত ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের অন্তর্গত খড়দহ একটি বর্ধিষ্ণু জনপদ। এই স্থানের খ্যাতি নিত্যানন্দ প্রভুর বাসস্থান হিসাবে। গৌড়ীয় বৈষ্ণবদের অন্যতম প্রধান তীর্থস্থান খড়দহের সমৃদ্ধির ইতিহাসের কথা বলতে গেলে প্রথমেই আসবে নিত্যানন্দ প্রভুর কথা। ষোড়শ শতকের শেষদিকে নিত্যানন্দ প্রভু এখানে এসে তাঁর দুই স্ত্রী বসুধা ও জাহ্নবার সঙ্গে বসবাস শুরু করেন। কিংবদন্তি, এই স্থানে বাসস্থানের জন্য স্থানীয় ভূস্বামীর কাছে তিনি একখণ্ড জমি প্রার্থনা করলে সেই ভূস্বামী বিদ্রূপ করে গঙ্গায় একটি খড় ফেলে সেখানে নিত্যানন্দ প্রভুকে বাসস্থান নির্মাণ করতে বলেন। নিত্যানন্দের প্রভাবে  সত্যিই গঙ্গাগর্ভে একটি চরের সৃষ্টি হল এবং সেখানেই তিনি গৃহ নির্মাণ করে বাস করতে লাগলেন। বসুধার গর্ভে বীরভদ্র ও গঙ্গাদেবী নামে এক পুত্র ও এক কন্যা জন্মান। ১৫৪৫ সালে ৬৮ বছর বয়সে প্রভু নিত্যানন্দ বৈকুণ্ঠলোকে যাত্রা করেন। নিত্যানন্দের বংশধরই খড়দহের গোস্বামী বংশ নামে পরিচিত। এই খড়দহের প্রখ্যাত মন্দিরগুলির বিবরণ হল—

শ্রীশ্যামসুন্দর জিউর মন্দির

নিত্যানন্দের তিরোধানের পর বীরভদ্র খড়দহের প্রখ্যাত শ্যামসুন্দর বিগ্রহ স্থাপন করেন। নিত্যানন্দ প্রভু তাঁর জন্মস্থান একচক্রা থেকে আনিত তাঁদের কুলবিগ্রহ বঙ্কিমদেব, ত্রিপুরাসুন্দরী ও অনন্তদেব শিলার নিত্যপূজা করতেন। এখনও শ্যামসুন্দর মন্দিরে ত্রিপুরাসুন্দরী ও অনন্তদেব পূজিত হন। বঙ্কিমদেব নোতাগ্রামে অধিষ্ঠিত। এই শ্যামসুন্দর বিগ্রহ নির্মাণের কিংবদন্তি সংক্ষেপে হল—

রুদ্ররাম গৌড়ের বাদশাহের কাছ থেকে একটি পাথর এনে শ্যামসুন্দর, রাধাবল্লভ ও নন্দদুলাল নামে তিনটি বিগ্রহ নির্মাণ করান। শ্যামসুন্দর বিগ্রহ বীরভদ্র রুদ্ররামের কাছে চেয়েছিলেন কিন্তু তিনি রাজি হননি। একদিন রুদ্ররাম যখন তাঁর পিতৃশ্রাদ্ধ করছিলেন, তখন অকস্মাৎ প্রবল বর্ষণে শ্রাদ্ধ পণ্ড হওয়ার উপক্রম হল। নিমন্ত্রিত বীরভদ্র অলৌকিক শক্তির প্রভাবে শ্রাদ্ধকাণ্ড রক্ষা করেন। এতে খুশি হয়ে রুদ্ররাম বীরভদ্রকে এই বিগ্রহ দান করেন। মতান্তরে, স্বয়ং গৌড়ের বাদশাহের কাছে বীরভদ্র উপস্থিত হয়ে তাঁর অলৌকিক শক্তির প্রভাবে বাদশাহকে মুগ্ধ করে শ্যামসুন্দর বিগ্রহ নির্মাণের জন্য শিলা নিয়ে আসেন। বীরভদ্র এই বিগ্রহ এনে খড়দহে নিজের বাসস্থান কুঞ্জবাটীতে স্থাপন করেন এবং পরে একটি সাধারণ মন্দির নির্মাণ করে পূজাপাঠ আরম্ভ করেন। কিন্তু কালান্তরে এই মন্দির জীর্ণ হয়ে পড়লে বর্তমান মন্দির নির্মাণ করা হয়। মন্দিরটি খড়দহের কিশোর পরিবারের কূলবধূ পট্টেশ্বরী মাতা ঠাকুরানি দ্বারা নির্মিত বলে শোনা যায়। ১৯৬৭ সালে বিড়লা জনকল্যাণ ট্রাস্ট দ্বারা এই মন্দির পুনর্সংস্কার করা হয়৷

আরও পড়ুন: নৃসিংহবন্দিতা দেবী বংশবাটী-বিলাসিনী

পূর্বমুখী সুবৃহৎ আটচালার মন্দিরের ভেতরে বেদির উপরে রুপো নির্মিত মঞ্চে শ্যামসুন্দর নামে খ্যাত রাধাকৃষ্ণ বিগ্রহ প্রতিষ্ঠিত। শ্রীকৃষ্ণ কষ্টিপাথর এবং শ্রীরাধা অষ্টধাতু নির্মিত। বিগ্রহ দু’টি অনন্য সুন্দর। মন্দির ঘরের মেঝে সিমেন্টের এবং বাইরের সামনের দরদালানের মেঝে শ্বেতপাথর নির্মিত। মন্দিরের সামনে শ্বেতপাথর নির্মিত প্রশস্ত পাকা নাটমন্দির আছে৷ প্রতিদিন সকালে শ্যামসুন্দর জিউর মঙ্গলারতি, স্নানভিষেক, বেশ পরিবর্তন,  বাল্যভোগ ও মধ্যাহ্নে অন্নভোগের পর বেলা ১২.৩০টায় মন্দিরের দ্বার বন্ধ হয়ে যায় এবং আবার বিকেল ৪.৩০-এ মন্দিরের দ্বার খুলে গাত্রোত্থান, সেবা, সন্ধ্যারতি ও শীতল ভোগের পর রাত্রি ৯.৩০-এ মন্দিরের দ্বার বন্ধ করা হয়৷ প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় মন্দিরে কীর্তন হয়। বর্তমানে একটি ট্রাস্টি দ্বারা মন্দিরের আয়-ব্যয় নির্বাহিত হয়। মন্দিরে নিত্যানন্দ সেবিত অনন্তদেব শিলা, ত্রিপুরাসুন্দরী, নীলকণ্ঠ মহাদেব ছাড়াও নীলাচলে দণ্ডভঙ্গের একটি খণ্ড, শ্রীনিত্যানন্দের নিজের হাতে রচিত ভাগবত পুঁথি রক্ষিত আছে। এগুলির ছবি তোলা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আমরা বহু অনুনয় করার পর শ্রীশ্যামসুন্দরের একটি ফোটো তুলতে পেরেছি যা আপনাদের দর্শনের জন্য দিলাম।

খড়দহের অন্যান্য মন্দির

১. কুঞ্জবাটী  এটি নিত্যানন্দ প্রভুর বসতবাটী বলে কথিত। এই স্থানে পূর্বমূখী একটি ঘরে শ্রীনিত্যানন্দের মৃন্ময় মূর্তি এবং গৃহপ্রাঙ্গণে তাঁর পত্নী বসুধা ও জাহ্নবার সমাধি স্থান আছে। এই কুঞ্জবাটীতেই বীরভদ্র জন্মলাভ করেন। প্রতি বছর মাঘ মাসের শুক্লা ত্রয়োদশী তিথিতে কুঞ্জবাটীতে নিত্যানন্দ প্রভুর আবির্ভাব উপলক্ষে নামযজ্ঞ মহোৎসব হয়। এই কুঞ্জবাটীর প্রবেশদ্বারের দেওয়ালে স্থাপিত একটি প্রস্তর ফলক থেকে জানা যায়, ১৯৪২ সালে খড়দহ কোম্পানির এ. রাইট ও জে স্কট দ্বারা এই কুঞ্জবাটী পুনর্গঠিত হয়।

আরও পড়ুন: প্রসঙ্গ খড়গপুরের ছটপুজো

২. গোপীনাথ জিউর মন্দির  কুঞ্জবাটির উল্টোদিকেই দালানযুক্ত সমতল ছাদবিশিষ্ট পশ্চিমমুখী একটি দালানঘরে গোপীনাথ জিউ নামে খ্যাত রাধাকৃষ্ণের বিগ্রহ এবং একটি শীতলা মায়ের ঘট প্রতিষ্ঠিত আছে। কৃষ্ণমূর্তি কষ্টিপাথরের এবং রাধা ধাতুর তৈরি। মন্দিরের মেঝে সিমেন্ট এবং বাইরের রক ও দালান শ্বেতপাথর দিয়ে মোড়া। মন্দিরের সামনে পাকা নাটমন্দির এবং বায়ুকোণে চারিদিকে বারান্দা-বেষ্টিত আটকোণা সুউচ্চ দোলমঞ্চ আছে। মন্দির প্রাঙ্গণের চারিদিকে প্রাচীর-বেষ্টিত। গোপীনাথ জিউর নিত্যপূজা ছাড়াও প্রতি বছর রাসযাত্রা ও দোলযাত্রা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। মন্দিরটি ১৯৬৮ সালে বিড়লা জনকল্যাণ ট্রাস্ট দ্বারা সংস্কার করা হয়৷

আরও পড়ুন: নবানে কার্তিক ও কার্তিকের কৃষি সম্পৃক্ততা

৩. মদনমোহন মন্দির  শ্যামসুন্দর মন্দির যাওয়ার রাস্তাতেই মদনমোহন জিউর মন্দির অবস্থিত। পশ্চিমমুখী আটচালা মন্দিরে মদনমোহন জিউ নামে খ্যাত রাধাকৃষ্ণের বিগ্রহ প্রতিষ্ঠিত। পদ্মাসনের উপর দণ্ডায়মান শ্রীকৃষ্ণ মূর্তি কষ্টিপাথরের এবং শ্রীরাধিকা মূর্তি অষ্টধাতুর তৈরি। এছাড়া মন্দিরের ভিতরে একটি পিতল নির্মিত ছোট গোপাল মূর্তি এবং শালগ্রাম শিলা আছে। মন্দিরে নিত্যপূজা ছাড়া বৈশাখী পূর্ণিমায় ফুলদোল, ঝুলনযাত্রা, জন্মাষ্টমী, রাধাষ্টমী, রাসযাত্রা, দোল, কার্তিক অমাবস্যায় শ্রীকৃষ্ণের কালীরূপ ধারণ পূর্বক পূজা ও অন্নকূট মহোৎসব অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় রাধিকাচরণ গোস্বামীর স্ত্রী প্রসন্নময়ী দেবী এই মদনমোহন জিউ মন্দির নির্মাণ করান।

আরও পড়ুন: মেদিনীপুরের আলুই-রায়পাড়ার শ্রীধর মন্দির

৪. মহাপ্রভুর মন্দির  শ্যামসুন্দর মন্দির থেকে বেরিয়ে কিছুদূরে, উত্তরমুখী হেঁটে আমরা এসে পৌঁছলাম সুবৃহৎ ইট নির্মিত নবরত্ন মহাপ্রভু মন্দির। এখানে শ্রীচৈতন্যদেব, শ্রীনিত্যানন্দ, রাধাকৃষ্ণ ও জগন্নাথদেবের মূর্তি প্রতিষ্ঠিত আছে। এই মন্দিরটিও কালের প্রভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত। মন্দিরে মহাপ্রভুর নিত্যপূজা ছাড়াও, রথযাত্রা, নিত্যানন্দ ত্রয়োদশী, দোল ইত্যাদি উৎসব হয়। জানা গেল, ১৮৩৮ সালে নন্দমোহন গোস্বামী ও ললিতমোহন গোস্বামী এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন।

৫. রাধাবৃন্দাবনচন্দ্র মন্দির  এই মন্দিরগুলির কাছেই গোস্বামীপাড়ায় দক্ষিণমুখী সমতল ছাদবিশিষ্ট ঘরে রাধাবৃন্দাবনচন্দ্র জিউ নামে খ্যাত রাধাকৃষ্ণ বিগ্রহ এবং ষড়ভুজ গৌরাঙ্গ মূর্তি প্রতিষ্ঠিত। মন্দিরের সামনে একটি ছোট প্রাঙ্গণ এবং পাশে ভোগরান্নার কয়েকটি ঘর আছে। শ্রীমোহিনীমোহন গোস্বামীর স্ত্রী শুভঙ্করী দেবী এই মন্দির বাংলা ১৩০৮ সনে প্রতিষ্ঠা করেন। এই বিগ্রহগুলির নিত্যপূজা ছাড়াও ফুলদোল, রাসযাত্রা, মাঘী পূর্ণিমার উৎসব, দোলযাত্রা ইত্যাদি উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। ফুলদোল ও রাসযাত্রা উপলক্ষে রাধাকৃষ্ণ বিগ্রহকে মন্দিরের সামনে রাসখোলা রোডের উপর আটকোনা রাসমঞ্চে স্থাপন করে উৎসব পালন করা হয়। এই মন্দির ও রাসমঞ্চটি বিড়লা জনকল্যাণ ট্রাস্ট দ্বারা ১৯৬৮ সালে সংস্কার করা হয়।

ছবি সংগৃহীত

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *