খড়দহে নিত্যানন্দ, জাহ্নবাদেবী ও বীরভদ্রের কথা

বর্তমান খড়দহ বিধানসভা ক্ষেত্রের অন্তর্ভুক্ত শ্রীশ্রীরাধাশ্যামসুন্দর মন্দিরকে কেন্দ্র করে একদা গৌড়বঙ্গ কৃষ্ণপ্রেমে মাতোয়ারা হয়েছিল। শ্রীচৈতন্য পার্ষদ নিত্যানন্দ,তাঁর সহধর্মিণী জাহ্নবাদেবী ও তাঁদের পুত্র বীরভদ্র খড়দহের মাটিকে পূত-পবিত্র করেছেন। খড়দহের ভূমিপুত্র ড. কল্যাণ চক্রবর্তী সেই পুরনো ইতিহাস থেকে মণিমাণিক্য খুঁজে সেই স্থানের মাহাত্ম্য পুনরায় খড়দহের প্রবুদ্ধজন তথা বঙ্গবাসীর কাছে তুলে ধরেছেন। এটি তার প্রথম পর্ব।

খড়দহের ভার কে নেবেন, তা শ্রীচৈতন্যদেব নিজেই ঠিক করে দিয়েছিলেন। গৌড়ীয় বৈষ্ণব আন্দোলন সংগঠিত করার দায়িত্ব নিয়ে নিত্যানন্দ মহাপ্রভু এলেন খড়দহে। “আমার নবদ্বীপ আচার্য গোসাঞি শান্তিপুর।/ খড়দহ নিত্যানন্দ ফুলিয়া হরিদাস ঠাকুর।”

খড়দহের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে পতিতপাবনী গঙ্গা; শ্রীময়ী উদ্ভিদ বৈচিত্র্যের সম্ভারে ও সৌকর্যে সমৃদ্ধ জনপদ; সমৃদ্ধ প্রাচীন সংস্কৃতির আলোয় খড়দহের গহন গৌরব। নিত্যানন্দ এলেন খড়দহের মাটিতে। দুই পত্নী বসুধা ও জাহ্নবাদেবীকে নিয়ে বসবাস করতে লাগলেন। বসুধার পুত্র বীরভদ্র খড়দারই ভূমিপুত্র, অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান। তাঁর মাতৃবিয়োগ হলে জাহ্নবাদেবীই আপন পুত্রের মতো তাকে লালন-পালন করতে লাগলেন। বীরভদ্রের যেমন রম্যরূপ, তেমনই দৈহিক তেজ; আর তেমনই ভক্তি, নিষ্ঠা, পাণ্ডিত্য ও দিব্যজ্ঞান। বৈষ্ণব সমাজ মনে করতেন তিনিই আসলে শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য, পুনর্বার ফিরে এসেছেন নিত্যানন্দের মন্দিরে। “পুন পুন আসিব আমি তোমার মন্দিরে।/ তোমার গৃহেতে হবে আমার অবতার।” জাহ্নবা দেবী বীরভদ্রকে আপন শক্তিরূপ দেখালেন এবং তারপর দীক্ষাও দিলেন। শ্রীমতী ও নারায়ণী নাম্নী দুই ভগিনীর সঙ্গে বীরভদ্রের বিবাহ সম্পন্ন হল। এই দুই পুত্রবধূকেও তিনি দীক্ষাদান করেছিলেন।

আরও পড়ুন: প্রাচীনতমের বিচারে কাঁথি মহকুমায় তৃতীয় ও পটাশপুর থানায় সর্বপ্রাচীন কিশোররায় মন্দির

নিত্যানন্দ

নিত্যানন্দ যখন অপ্রকট হলেন, জাহ্নবাদেবী বৈষ্ণব মত প্রচারের প্রভূত দায়িত্ব সামলেছিলেন। সমকালীন সময়ে এ-এক অসাধারণ, অভূতপূর্ব ঘটনা। জাহ্নবা দেবীর বোধনে একটি নতুন যুগের সূচনা হল, যার সাক্ষী ছিল খড়দহের তৎকালীন সমাজ ও সংস্কৃতি। এক মাতৃশক্তি যার বসতি খড়দহে, তিনিই প্রেমভক্তি বিতরণের উৎস মুখ হলেন। এক বিধবা মহিলার আঁচলে বাঁধা পড়ল সমগ্র বাংলার, সমগ্র ভারতের এক অপূর্ব আধ্যাত্মিক আলয়ের চাবিরতোড়া। সেটা ১৫৮০ খ্রিস্টাব্দ। আজ থেকে প্রায় সাড়ে চারশো বছর আগে।

খেতুরীর ধর্ম সম্মেলন থেকে সর্বোচ্চ সম্মান নিয়ে খড়দহে ফিরলেন জাহ্নবা দেবী। বৈষ্ণব আচার্যানী বা ঈশ্বরী পদে অধিষ্ঠিত হলেন। পাশেই একটি সম্প্রদায় যখন ক্রমাগত বোরকায় ঢেকে যেতে শুরু করছে, তারই বিপ্রতীপে নারীর ক্ষমতায়ন শুরু হচ্ছে, নির্মাণ হচ্ছে এক নতুন ইতিহাস। গৌরাঙ্গ-নিত্যানন্দের উত্তরাধিকার জাহ্নবা দেবী হয়ে বর্তাল বীরভদ্রে। ভক্তিভাব আন্দোলনে পরিণত হল। জনমুখী সেই আন্দোলন। শ্রী হরির নামে যে বাতাস লুঠের প্রচলন হল, তাতে আলাদা আলাদা বর্ণের মানুষ মিলেমিশে এক হয়ে বাতাস কুড়িয়ে নিলেন। শ্রীহরিকে সকলের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দিয়েছিলেন নিত্যানন্দ। সংকীর্তনের চরিত্র গেল বদলে। নাম যিনিই শুনবেন, তিনিই উদ্ধার পাবেন।

খড়দহের ভূমিতে অবস্থান করে যাঁরা অফুরান দৈবশক্তি দিয়ে খড়দহকে নির্মাণ করেছিলেন, তার কতটুকু ইতিহাস আজ মনে রেখেছি! খড়দহে নিত্যানন্দের কুঞ্জবাড়িকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছিল এক অমোচ্য তীর্থস্থান। নিত্যানন্দ এসবই করেছিলেন গৌরাঙ্গচন্দ্রের আজ্ঞায়। “মন হৈল খড়দহ করিব শ্রীপাঠ/ প্রভু আজ্ঞা পালিবার বসাইবো হাট।”

আরও পড়ুন: প্লাজমা-পোয়েম-প্রেয়ার একসূত্রে গেঁথেছে জগদীশ-রবি ঠাকুর-স্বামীজিকে

চৈতন্য পরিকর তো বটেই, খড়দহের শ্যামসুন্দরের শ্রীমুখ দর্শন করতে পরবর্তীকালে কত বিখ্যাত মানুষ খড়দহে এসেছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণ, মা সারদা, স্বামী অখণ্ডানন্দ, স্বামী প্রেমানন্দ, স্বামী তুরীয়ানন্দ প্রমুখ দিব্যজনেরা। নিত্যানন্দ, তাঁর স্বজন ও পরিকরবৃন্দের স্মৃতি বিজড়িত স্থানটিকে সার্বিক ও নান্দনিক করে তোলার যাবতীয় দায়িত্ব-ভিক্ষা যদি কোনওদিন দেন গৌড়সুন্দর, তা আমাতে সচ্চিদানন্দের জোয়ার বইয়ে দেবে। ২০১৯ সালে যিনি আমায় ডাক দিয়েছিলেন কামারপুকুরের মানিকরাজার আমবাগান নতুন করে রচনা করে দিতে, তিনি কি আবার ডাক দিতে পারেন না আমায়? তার চেয়ে ঐশীকাজ খড়দহের বুকে আর হতে পারে না। শিক্ষা-সংস্কৃতি-পরিবেশের পুণ্যাঙ্গনের পাশাপাশি খড়দহ তীর্থ পর্যটনে অন্যতম সেরা নাম হয়ে উঠুক। অনেকানেক মত ও পথের মহামিলনস্থল খড়দহ। ‘বাঙালির হিয়া-অমিয় মথিয়া’ কায়াধারী ঈশ্বরের অধিষ্ঠান এখানে। বাঙালির পুণ্যভূমি, ভারতবর্ষের পুণ্যতীর্থ। উত্তর ২৪ পরগনার খড়দহ।

লেখক অধ্যাপক ও প্রাবন্ধিক, খড়দহের ভূমিপুত্র

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *