খড়দহে শ্রীরামকৃষ্ণ পার্ষদ স্বামী অখণ্ডানন্দ

ড. কল্যাণ চক্রবর্তী

প্রথম পর্বের শেষে…
অনেকানেক মত ও পথের মহামিলনস্থল খড়দহ। ‘বাঙালির হিয়া-অমিয় মথিয়া’ কায়াধারী ঈশ্বরের অধিষ্ঠান এখানে। বাঙালির পুণ্যভূমি, ভারতবর্ষের পুণ্যতীর্থ। উত্তর ২৪ পরগনার খড়দহ।

শ্রীরামকৃষ্ণ-পার্ষদ ও সন্ন্যাসী-শিষ্য স্বামী অখণ্ডানন্দজী খড়দহে এসেছিলেন। তাঁর আগমনের কথা স্মৃতিকথায় বিবৃত করে গেছেন। তিনিই ১৮৯৭ সালে স্বামীজির নির্দেশে দুর্ভিক্ষপীড়িত মুর্শিদাবাদ জেলার সারগাছিতে প্রথম রামকৃষ্ণ মিশনের সেবাকর্ম শুরু করেন। খড়দহের রহড়ায় ১৯৪৪ সালে যখন বেলুড় মঠের অধীনে রহড়া রামকৃষ্ণ মিশন বালকাশ্রম প্রতিষ্ঠা হয়, তার আগেই তাঁর জীবনাবসান ঘটে। তিনি হিমালয় ভ্রমণের পর ১৮৯৫ সালের শেষাশেষি আলমবাজার মঠে ফিরেছিলেন। তারপর শুরু হল বঙ্গের শহর-নগর-জনপদ-গ্রামগঞ্জে ভ্রমণ। বঙ্গের নানান স্থান পরিভ্রমণ করতে লাগলেন তিনি। বঙ্গের নানান ঐতিহ্য ও মনীষীর খোঁজ করলেন। এইভাবে সম্ভবত ১৮৯৬ সালের এক গ্রীষ্মের দিনে মঠ থেকে পায়ে হেঁটে এলেন খড়দহে।

আরও পড়ুন: খড়দহে নিত্যানন্দ, জাহ্নবাদেবী ও বীরভদ্রের কথা

তাঁর পরমারাধ্য গুরুদেব শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবও পদার্পণ করেছিলেন খড়দহের মাটিতে। তিনি বলতেন, “দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী, কালীঘাটের কালী আর খড়দার শ্যামসুন্দর— এরা জীবন্ত, হেঁটে চলে বেড়ান, কথা কন, ভক্তের কাছে খেতে চান।” শ্যামসুন্দরজিকে দর্শন করতে এসেছিলেন গুরুপত্নী সারদাদেবীও। তিনি বাগবাজার থেকে নৌকাযোগে স্বামী প্রেমানন্দ, স্বামী তুরীয়ানন্দ সহ কয়েকজন সন্তান-ভক্তকে সঙ্গে নিয়ে খড়দহের মন্দিরঘাটে নেমেছিলেন ১৩১১ বঙ্গাব্দে। অর্থাৎ মা সারদার আগমনের পূর্বেই স্বামী অখণ্ডানন্দজি খড়দহে আসেন।

আরও পড়ুন: একাকী নির্জন পথে সুধীর চক্রবর্তী

‘স্মৃতিকথা’ গ্রন্থে তিনি লিখছেন, “আমার খড়দার শ্যামসুন্দর ও নিত্যানন্দ মহাপ্রভুর বসতবাটি দেখিবার বড় ইচ্ছা হইল। মঠ হইতে পদব্রজে বেলা প্রায় বারটার সময় আমি খড়দহ পৌঁছিলাম। জনৈক বর্ধিষ্ণু ব্রাহ্মণের বাড়িতে গিয়া অতিথি হইলাম। সেই বাড়িতে তাহার পূর্বদিন মহাভারতের ‘কথা’ শেষ হইয়াছিল। কথকঠাকুরের নাম গোলোক শিরোমণি, বাড়ি হালিসহর। শুনিলাম— সেই দিন অপরাহ্নে শিরোমণি মহাশয় হালিসহর হইতে আসিয়া তাঁহার কথকতার দক্ষিণা গ্রহণ করিবেন।

আরও পড়ুন: ব্রিস্টল শহরবাসীদের ধন্ধে ফেলেছিলেন ‘রহস্যময়ী রাজকুমারী’ মেরি বেকার

দ্বিপ্রহরে আহারাদি করিয়া আমি সদর দরজার পাশের একটি রকে বিশ্রাম করিতেছি, এমন সময় গৈরিকবসনধারী, রুদ্রাক্ষমালা গলায় সেকেলে ক্যাম্বিসের এক ব্যাগ হাতে, ঘর্মাক্তকলেবরে এক ব্যক্তি আসিয়া সেখানে উপস্থিত হইলেন। আসিয়াই তিনি আর একটি রকে বসিয়া পড়িলেন। পরিচয়ে জানিলাম, তিনিই শিরোমণি মহাশয়। আমার পরিচয় পাইয়া করজোড়ে পুনঃপুনঃ ঠাকুরকে প্রণাম করিয়া বলিলেন, ‘‘আমার সম্পর্কে এক ভাই, কেদার চাটুয্যে পরমহংসদেবের পরম ভক্ত। তিনি খুব ঘন ঘন দক্ষিণেশ্বরে যেতেন।

বেলা প্রায় চারিটা পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে ঠাকুরেরই কথাবার্তা হয়। শুনিলাম, কেদারবাবুর সঙ্গে শিরোমণি মহাশয়েরও দক্ষিণেশ্বরে গিয়া ঠাকুরকে দর্শনলাভের সৌভাগ্য হইয়াছিল।

আমি যখন খড়দায় যাই, তখন শ্যামসুন্দরজী শয়নে ছিলেন। সেইজন্য একরাত্রি বাসের ইচ্ছা আমার তো ছিলই; শিরোমণি মহাশয়ও একরাত্রি থাকিয়া যাইতে অনুরোধ করিলেন।

বেলা পাঁচটা হইতেই পাতলা মেঘ এবং গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়িতে লাগিল। আমি ‘কথা’-র আয়োজন দেখিয়া শ্যামসুন্দর দর্শন করিতে গেলাম।

ঠাকুর দর্শন করিয়া যখন ফিরিলাম, তখন ‘কথা’-র শেষে শিরোমণি মহাশয় গান ধরিয়াছেন— ‘পঙ্কজদলগতজলমিব চঞ্চলমিহ জীবনম্…।’ কিছুক্ষণ পরেই ‘কথা’ ভাঙ্গিয়া গেল। বাহিরের দুইটি ঘরের একটিতে তিনি, আর একটিতে আমি গিয়া আশ্রয় লইলাম।”

সেই রাত্রে শিরোমণি মশাই আন্ত্রিক রোগে আক্রান্ত হলেন। নিদ্রার পূর্বে গৃহকর্তাকে তা জানানো হলে তিনি এক শিশি ক্লোরোডিন রেখে গেলেন। পরে রোগের প্রাবল্য বৃদ্ধি পেল। অখণ্ডানন্দজি সারারাত তাঁর সেবা করেছিলেন। ওষুধ দিলেন, ক্ষণে ক্ষণে জল মুখে দিতে লাগলেন। রোগীর হাতে-পায়ে খিল ধরলে হাত-পা ডলে দিলেন। রাত্রি একটা। শিরোমণি মশাইয়ের অবস্থা গুরুতর হল। অনেক ডাকাডাকি করেও তখন গৃহকর্তার সাড়া পাওয়া গেল না। রাত তিনটের সময় এক বিধবা ব্রাহ্মণ কন্যা গৃহ থেকে এসে তার শ্রুশ্রূষা আরম্ভ করলেন। শেষরাতে শিরোমণি মশাইয়ের আবেদনে বাড়িতে তাঁর চিকিৎসা করা হল। সকালে এক হোমিওপ্যাথি ডাক্তারকে ডেকে আনলেন গৃহস্বামী। তিনি বিচার করে এবং ওষুধ দিয়ে বললেন, বাঁচবার আশা নেই। সকাল আটটায় বারো ঘণ্টার মধ্যে তাঁর মৃত্যু হল। বেলা দশটা নাগাদ শিরোমণি মশাইয়ের পরিবার এসে উপস্থিত হলেন এবং মর্মন্তুদ আর্তনাদ করতে লাগলেন। খড়দহতেই দেহ সৎকার হল। অখণ্ডানন্দজি মহারাজ সঙ্গে ছিলেন। সব কাজ মিটে গেলে তিনি খড়দহের অদূরে পদব্রজে সাঁইমানা (স্বামীবন/ সাঁইবন) গ্রামে গিয়ে নন্দদুলাল মন্দিরে পৌঁছলেন এবং সেখানে একরাত্রি অতিবাহিত করে পরদিন মঠে ফিরে গেলেন।

আরও পড়ুন: বঙ্গবন্ধুর সাহিত্য ও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে সাহিত্য

জনশ্রুতি এই, খড়দহে গঙ্গার পূর্ব তীরে শ্যামসুন্দর, আকনা-য় (পরবর্তী কালে বল্লভপুর, হুগলি) গঙ্গার পশ্চিম তীরে রাধাবল্লভজি এবং খড়দহের অদূরে লাবণ্যবতী বা নাওই নদীর তীরে অবস্থিত স্বামীবন বা সাঁইবনে নন্দদুলালজির বিগ্রহ প্রতিষ্ঠিত হয় প্রায় একই সময়ে। যেহেতু বৃন্দাবন দাসের ‘চৈতন্যভাগবত’, লোচনদাস ও জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গল, কৃষ্ণদাস কবিরাজের শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত প্রভৃতি গ্রন্থে এই মন্দিরগুলি ও বিগ্রহ প্রতিষ্ঠার উল্লেখ নেই, তাই অনুমান করা যায়, এগুলি ঠিক তার পরের ঘটনা। সাধারণভাবে পুণ্যার্থীরা এই তিন মন্দির একই দিনে দর্শন করেন। বিশেষ করে মাঘী পূর্ণিমার দিন এই মন্দির-ত্রয় দর্শন খুব পুণ্য কর্ম। স্বামী অখণ্ডানন্দও শ্যামসুন্দরের শ্রীমুখ দেখে গিয়েছিলেন নন্দদুলালজির কাছে। তাঁর খড়দহ দর্শন সুসম্পাদিত হল।

লেখক অধ্যাপক ও প্রাবন্ধিক, খড়দহের ভূমিপুত্র

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *