খতরে মে হ্যায়…

গৌতম দে

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন হয়ে গেল। কোনও নির্বাচন এই বাংলায় সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয় না। অতীতেও দেখেছি। এখনও দেখছি। বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা জনগণকে অনুকূলে আনার জন্য বিভিন্ন তাস আস্তিন থেকে বের করেন। এ-কথা বলতে কোনও দ্বিধা নেই, ধূসর হয়ে যাওয়া সেই তাস নতুন মোড়কে প্রকাশ্যে কেউ কেউ জনসভায় বলছেন। ভাবাচ্ছেন। খতরে মে হ্যায় হিন্দু। খতরে মে হ্যায় মুসলমান।

আরও পড়ুন: পোস্টমর্টেম: ২০২১ বাংলা বিধানসভা নির্বাচনের অন্তর্স্বর

এই ধর্মের মেরুকরণে আজ ‘বাঙালি সত্তা’ সুপ্ত আগ্নেয়গিরির ওপর বসে আছে। যেকোনো সময় এর বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। বড় আশঙ্কার বিষয়। অতীতেও দেখেছি এই কলঙ্কিত পরিণাম। এর দায় কোনও নেতা-নেত্রীরা নেবেন না। তাঁরা একে অপরকে দোষ দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলবেন। শুধু কিছু মানুষ অকালে মারা যাবে। জনপথ রক্তে লাল হবে। ঘরবাড়ি জ্বলবে। ঘরছাড়া হবে। খবর হবে। রুটিন তদন্ত হবে। তারপর সব ধামা পড়ে যাবে। হয়তো ইতিহাসে ঠাঁইও পেয়ে যাবে।

এইটুকু আমরা জানব। এর বেশি কিছু নয়। এই বিষাক্ত প্রতিহিংসার ফল আমরা হৃদয়ে লালন করে চলেছি বহু বছর আগে। ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগ হয়েছিল। আমরা সবাই জানি। কিন্তু যে চারাগাছটি রোপণ করে দিয়েছিল আমাদের পূর্ব পুরুষরা তা আজ মহিরুহ হয়ে জানান দিচ্ছে, আমরা অনেক বড় হয়ে উঠেছি। আমাদের মজ্জায় মজ্জায় প্রতি মুহূর্তে মাথাচাড়া দিচ্ছে। উসকাচ্ছে। ভাঙো। মারো। জ্বালিয়ে দাও।

আরও পড়ুন: এটাই পশ্চিমবাংলার ঐতিহ্য

২০২১ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে আমরা কী দেখলাম। দেখলাম তার প্রকাশ। দেখলাম তার খুল্লামখুল্লা উল্লাস। এই উল্লাস কি থেমে গেছে নির্বাচন পর্ব মিটে যাওয়ার পর? একটুও না। বরং দাঁত নখ বের করে আঁচড়াচ্ছে। কামড়াচ্ছে। এমনিতে দেশজুড়ে অতিমারি করোনার কারণে ভয়ের বাতাবরণ তৈরি হয়েছে। আমরা সবাই জানু পেতে বসে আছি মৃত্যুর করাল গ্রাসের কাছে। তার ওপর বিষফোঁড়ার মতো জুটেছে এই ‘খতরে মে হ্যায়’-এর নির্বাচনী হুংকার।

প্রতিদিন কোথাও না কোথাও খুন হচ্ছে। ঘর বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কত শত মানুষকে ঘরছাড়া করা হয়েছে। হয়তো আমরা জানি না। খবরে দেখতে পাচ্ছি। শুনতে পাচ্ছি। প্রতিটি নির্বাচনের প্রাক্কালে এবং পর্ব মিটলে জল্লাদের উল্লাস আমরা দেখতে পাই কেবল এই ঐতিহ্যমণ্ডিত পশ্চিমবাংলায়। যে প্রগতিশীল বাংলা অন্যকে পথ দেখায়। অন্যকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়।

আরও পড়ুন: বাংলা নিজের মেয়েকেই চাইল, কিন্তু বাংলার মানুষও এখনও অনেক কিছু চায়

একপক্ষ হিন্দু। আরেক পক্ষ মুসলমান। হিন্দুরা ভাবছেন তাঁরা ‘খতরে মে হ্যায়’। মুসলমানরা ভাবছেন তাঁরাও ‘খতরে মে হ্যায়’। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এই ভাবনাটা সুচতুর ভাবে চাড়িয়ে দিয়েছে জনমানসে ভাষণের মাধ্যমে। তার ফল ভোগ করছেন সাধারণ ছা-পোষা মানুষ। যাঁরা ‘দিন আনি দিনে খাই’, তাঁরা আজ প্রাণের ভয়ে ঘরছাড়া। স্বজন ছাড়া।

তো এই ‘খতরে মে হ্যায়’-এর ওপর ভিত্তি করে দুই দক্ষিণপন্থী দলের মহোদয় এবং মহোদয়ারা ২০২১ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার আসন আলো করে থাকবেন। সেখানে অন্যান্য রাজনোইতিক দলের অবস্থান শূন্য। এটা ‘ভালো’ না ‘মন্দ’ তা সময় বলবে। এই তোষণ এবং তুষ্টিকরণের রাজনীতি আজ নতুন নয়। যা অন্তঃসলিলার মতো বহমান দেশজুড়ে। ক্ষান্ত হয়নি। দেশের কোথাও না কোথাও আমরা দেখতে পাচ্ছি তার প্রকাশ। ‘জাতপাত’ আর ‘ধর্ম’ এই দু’টি শব্দবন্ধনীর ওপর ভিত্তি করে দেশের কোনো না কোনো অঞ্চলে মারদাঙ্গা চলছে। এখনও। প্রতিবেশীকে মারতে হাতও কাঁপছে না। এরপর শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষজনরা মিছিল করবেন। প্রতিবাদ করবেন। মোমবাতি জ্বালাবেন। প্রশাসক নেতৃবৃন্দরা তাঁদের নিজেদের মতো করে বক্তব্য রাখবেন। বলবেন তদন্ত হবে। ওই পর্যন্ত।

আরও পড়ুন: গণতন্ত্র ও আমরা

West Bengal Assembly Elections 2021: Selective Commission of India lets  Sitalkuchi down - Telegraph India

স্বাধীনতার পরবর্তী অনেক বছর কেটে গেছে। সেই ধারা অব্যাহত রয়েছে এখনও দেশজুড়ে। সেই ধারা পশ্চিমবাংলার শান্তির সহাবস্থানকে কলঙ্কিত ও কলুষিত করে তুলেছে এই ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনোত্তর পরবর্তী সময়কে আরও বেশি বেশি করে। কোনও নেতা বা নেত্রীর গলা কাঁপছে না ‘খতরে মে হ্যায়’ এই শব্দবন্ধনীটি উচ্চারণ করতে। ফলে যা হবার তাই হয়েছে। করোনার ছোবল যেমন বাড়ছে, তেমন ‘খতরে মে হ্যায়’ ছোবলের আশঙ্কা উত্তরোত্তর বাড়ছে। আরও ভয়াবহ দিনের দ্বার প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি পশ্চিমবাংলার শান্তিকামী মানুষজন।

এর দায় কোনও নেতানেত্রীরা নেবেন না। শুধু শহিদের মর্যাদা মাথায় নিয়ে কোনো মা হয়তো নিভৃতে বুকফাটা আর্তনাদ করবেন। তাতে ইন্ধন জোগাবে কিছু ফেক নিউজ। ফেক ভিডিয়ো। তবুও আশা রাখি সকল নেতৃবৃন্দের কাছে, আপনারা নিজেদের পুঁজি ঘরে তুলেছেন ঠিকই। কিন্তু এই ঐতিহ্যপূর্ণ পশ্চিমবাংলার সম্মান আপনাদের হাতে। ভূলুণ্ঠিত হলে এই বাংলার মানুষ আপনাদের কিছুতেই ক্ষমা করবে না।

Facebook Twitter Email Whatsapp

এই সংক্রান্ত আরও খবর:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *