‘খেলা হবে’ রাজনৈতিক রেষারেষির মাঝে একটুকরো মিষ্টি

শুভ্রাংশু রায়

“প্লিজ দাদা এই মিষ্টিটা ফেরত নিন। আমি মুখে দিইনি। আমায় ওইটা মানে ‘খেলা হবে’ মিষ্টিটা দিন।” বেশ কিছুদিন প্রায় দুই সপ্তাহ আগে, সপ্তাহের প্রথমদিন সোমবার সন্ধ্যায় যাদবপুর ৮বি বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন হিন্দুস্তান সুইটসের আদি শাখায় এই কাতর অনুরোধ এক মাঝবয়সি ভদ্রলোকের। ভোট শুরুর এক-দু’দিন আগে। আড়চোখে তাকিয়ে দেখলাম, পাশে ভদ্রলোকের স্ত্রীর কৌতূহল মেশানো সম্মতিসূচক হাসি উপহার দিলেন। বোঝা গেল, হিন্দুস্তান সুইটসের ‘খেলা হবে’ নামক মিষ্টান্নটি করোনা পরবর্তী সময়ে আবার বাজার মাত করতে চলেছে। অবশ্য সমসাময়িক ঘটনা বা ব্যক্তির নামানুসারে মিষ্টির নামকরণের ইতিহাস শহর কলকাতায় নতুন নয়। পুরনো স্মৃতির ঝাঁপি খুললে এরকম অনেক উদাহরণ মেলে। শুধু কলকাতা কেন সেই সুদূর অতীতে ঔপনিবেশিক আমল থেকেই লেডিকেনি বা চিত্তরঞ্জনের মতো অনেক মিষ্টির নামই উঠে আসবে, যার সঙ্গে অবিভক্ত বাংলা প্রদেশের বিভিন্ন মফস্‌সল শহরের নাম জড়িয়ে ছিল।

আরও পড়ুন: পঞ্চাশ পূর্ণ ‘বাবু মশাইইই…’

তবে স্বাধীনতার পরে সংসদীয় ব্যবস্থা এদেশে পঞ্চাশ পেরোনোর আগে থেকেই ভোটবাদ্য বেজে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন দলীয় প্রতীকের ছাঁচে মূলত কড়া বা নরম পাকের সন্দেশ বানিয়ে বিক্রি ট্র্যাডিশন কলকাতা শহরের কিন্তু আছে। নিজের ছেলেবেলার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, ইন্দিরা গান্ধির আততায়ীর হাতে মৃত্যুর পরে ১৯৮৪-র লোকসভা নির্বাচনের সময় ‘হাত’ চিহ্নের সঙ্গে ইন্দিরার মুখের আদল মিলিয়ে কোনও একটি কলকাতা শহরের মিষ্টির দোকানের সন্দেশ বিক্রির ছোট্ট খবর আর ছবি একটি দৈনিক পত্রিকায় ছেপেছিল। আর হুগলি জেলার এক গ্রামীণ প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক সেই ছবি আর খবর গল্পচ্ছলে ক্লাসে আমাদের দেখিয়েছিলেন। মনে পড়ে, সেই জানকারি আমার এবং ক্লাস টু বা থ্রিতে পড়া আমার সতীর্থদের মনে কি অনাবিল আনন্দ এনে দিয়েছিল। পাড়ার মিষ্টির দোকানে তারপর কয়েকদিন “কাকু ইন্দিরা সন্দেশ বা হাত সন্দেশ আছে?” কিনতে চেয়ে ব্যর্থ মনোরথ হয়ে ফিরে আসাটাও এই লেখার অবসরে মনে করিয়ে দিল।

আরও পড়ুন: কাসুন্দি-তৃতীয়া

মনে আছে, শেষপর্যন্ত অবশ্য মুশকিল আসন করলেন সেই স্যারই। না তিনিও ওই সন্দেশ কিনে আনেননি। কিন্তু এই ধরনের ছাপওয়ালা ক্ষীরের সন্দেশ তৈরির যে গ্রামাঞ্চলে চল ছিল না, সেটা বুঝিয়ে দিলেন। শুধু মনে পড়ে, আমার এক সতীর্থ যার বাবা একজন স্থানীয় বামপন্থী নেতা ছিল। সে অনুযোগ করেছিল, কেন জ্যোতি বসুর নামে বা ছাঁচে কোনও সন্দেশ বানানো হয় না! ক্লাসে অবশ্য সেই কথা শুনে আমার এক সহপাঠিনী হেসে বলেছিল, ‘‘দূর পাগল জীবিত মানুষের নামে সন্দেশ হয় নাকি?” আর এই কথা শুনে আমরা সবাই টিফিনে হাসিতে ফেটে পড়েছিলাম। আর আমার সেই জ্যোতি বসুপ্রেমী বন্ধুটি লাজে মরে গিয়েছিল। এখন অবশ্য জীবিত এবং দিব্য বিরাজমান রাজনেতাদের নামে সন্দেশ তো বাদ দিন মূর্তি বসছে এমনকী আস্ত স্টেডিয়ামের নামকরণ হচ্ছে। এখন যেন মায়াই হয় সেই সতীর্থের জন্য। বেচারা সে মনে হয় সময় তুলনায় অনেক আগেই জন্মেছিল।

আরও পড়ুন: বনের দোল, মনের দোল

যাই হোক, জাম্প কাট মেরে আবার চলে আসি সাম্প্রতিক অতীতে। এবারের আট দফায় অনুষ্ঠিত পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে প্রথম তিনটি দফা ইতিমধ্যে সাঙ্গ হয়েছে। নির্বাচনের শুরুর আগে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের তরফে নির্বাচনী ক্যাচলাইন স্লোগান তোলা হয়েছে ‘খেলা হবে’। এমনিতে তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নির্বাচনের সময় প্রতিবার নিজস্ব স্লোগান ভাসিয়ে দেন। ২০০৫ ‘হয় এবার নয় নেভার’ বা ২০১১-তে ‘এবার পরিবর্তন’ এমনই দু’টি স্লোগান ছিল। তবে এবারের ‘খেলা হবে’ স্লোগানটি কিন্তু প্রথমবার শোনা গিয়েছিল প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশে। স্লোগানটি জনপ্রিয়তা পেয়েছিল শাসক দল আওয়ামি লিগের সাংসদ শামিম ওসমানের গলায়। আর এই বঙ্গে ‘খেলা হবে’ এই নির্বাচনী স্লোগানটি কতখানি সফল হবে, তার উত্তর পেতে আমাদের ২ মে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু যে ঘটনার উল্লেখ করে আমাদের এই লেখার শুরু সেই মিষ্টির দোকানে আবার আমরা ফিরে যেতেই পারি। সেই গত আর্থিক বছরে শুরু হওয়া বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কলকাতা এবং জেলা শহরগুলি বেশ সেজে উঠেছে। আর বেশ কিছু মিষ্টির দোকান তাদের বিপণন শো-কেসে ক্রেতাদের জন্য সাজিয়ে দিয়েছেন ‘ভোট মিষ্টি’। হ্যাঁ, এই দলীয় প্রতীক বা স্লোগানকে ছাঁচে ফেলে বানানো মিষ্টিগুলিকে একত্রে ‘ভোট মিষ্টি’ বলা যেতেই পারে।

আরও পড়ুন: তামিলনাড়ুর আসন্ন বিধানসভা নির্বাচন: পিরামালাই জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা এবং ফরওয়ার্ড ব্লক

আমাদের দেশে রাজনৈতিক স্লোগান বা বিশেষত ভোটের স্লোগানের পেটেন্ট চাইবার কোনও চল নেই। দলীয় প্রতীক ব্যবহারের ক্ষেত্রেও একই কথা বলা যায়। বরং দেশের অথবা রাজ্য রাজনৈতিক নেতৃত্ব তাঁদের স্লোগান ও প্রতীক বিভিন্নভাবে ব্যবহার হলে খুশিই হন। কারণ তাতে প্রচার বাড়ে। মনে পড়ে, আশির দশকে স্কুলজীবনে উত্তর কলকাতায় আত্মীয় বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে প্রথমবার হাত চিহ্ন সহ দেশলাই, পাঞ্জাবি, বেলুন, টিপ এই সব নজরে এসেছিল। উদ্যোক্তা ছিলেন তৎকালীন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শ্রী অজিত পাঁজা। হাত চিহ্ন বিশিষ্ট দেশলাই এবং বেলুন সংগ্রহ করে গ্রামে ফিরে স্কুলে সেগুলি নিয়ে যাওয়ায় বন্ধুদের মধ্যে তীব্র সাড়া পড়েছিল। সেই দিনগুলির কথা আজও মনে ভাসে। এবারের পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনের আজ চতুর্থ দফার ভোট। আরও বাকি চার দফা। ২ মে নিবাচনের ফলাফল। আজই কলকাতাবাসীর নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগের দিন। আজকের বিজ্ঞাপনে মুখ ঢেকে যাওয়া দিনগুলির মধ্যে দলীয় প্রতীক বা ‘খেলা হবে’ মতো সন্দেশের জনপ্রিয়তা কোথায় যেন এই শহরের সেই পুরনো নির্বাচনী ধারার মধ্যে একটা যোগসূত্র নির্মাণ করে। রাজনীতির তেতো রেষারেষি, কটু কথার মাঝে একটুকরো মিষ্টি স্বাদ বদলের সুযোগ করে দেয়।

লেখক সোনারপুর মহাবিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর

Facebook Twitter Email Whatsapp

এই সংক্রান্ত আরও খবর:

6 comments

  • Debashis Majumder

    Besh Besh. Kuch Mitha ho jaye.

  • Paramita Ghosh

    জানা কথা…. তবে এই সমস্ত ছোটছোট কার্যকলাপ মানুষের রাজনৈতিক মনোভাবকে উস্কানি দেয় …. মিষ্টির গায়ে দলের নাম না লিখে দেশের পতাকা বা এমন কোনো মানুষদের ছবি থাকুক যেগুলো মানুষ কে অনুপ্রাণিত করবে …. কোনো দলের না হয়ে নাগরিক হিসাবে দেশ কে ভালো বাসতে শেখাবে …

  • মলয় দাস

    লেখাটি পড়ে ভালো লাগলো

  • সুশান্ত চট্টোপাধ্যায়

    চমৎকার লেখা। রাজনৈতিক স‍্যাটায়ারের নতুন ধরন।

  • Shankhamala Ray

    Chomotkar lekha ..as usual

  • Shankhamala Ray

    Aro beshi bhalo laglo ebang moja laglo lekhata pore karan kodin agei oi mishtir dokane ekjonke dekhlam, jini sob rokom chinhowala mishtii kinte chaichhen…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *