ক্রুশ্চেভ ভার্সেস টিটো: প্রথম ইউরো কাপ ফাইনাল ছিল ‘কমিউনিস্টদের লড়াই’

শুভ্রাংশু রায়

১৯৬০। আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশেষত ইউরোপীয় রাজনীতিতে বেশ কিছু জটিল এবং দীর্ঘস্থায়ী সমীকরণের শুরুয়াত হয়েছিল এই দশকেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে পনেরো বছর। ততদিনে জাঁকিয়ে বসেছে আরেক যুদ্ধ। যার নাম ঠান্ডা বা শীতল যুদ্ধ। অস্ত্রের ঝনঝনানির থেকেও এ যুদ্ধে আরও আবশ্যিক উপকরণ হয়ে উঠেছিল কূটনৈতিক দ্বন্দ্ব। ততদিনে ফিফা তিনটি বিশ্বকাপ আয়োজন করে ফেলছে এবং ব্রাজিলের স্বপ্নের দলের প্রথম বিশ্বকাপটি জেতা হয়ে গেছে। পেলে নামের তরুণ কৃষ্ণাঙ্গ তারকার জন্ম হয়েছে ইতিমধ্যেই। অন্যদিকে, ১৯৫৪ সালে উয়েফা বা ইউরোপীয় নিয়ন্ত্রক ফুটবল সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

আরও পড়ুন: বাঙালি যেন ধন্দে: কোপা ফাইনাল নাকি মহালয়ার সকাল!

নথি ঘেঁটে জানা যায় প্রথম যিনি এরকম একটি টুর্নামেন্ট আয়োজনের পরিকল্পনা করেছিলেন, তিনি হলেন এক সময়ের ফরাসি ফুটবল ফেডারেশনের সেক্রেটারি হেনরি ডেলাউনের। পরিকল্পনাটি ছিল ১৯২৭ সালের। শেষপর্যন্ত সেটি বাস্তবায়িত হতে আরও ৩৩ বছর লেগে যায়। মাঝে অবশ্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ছিল, যা বেশ কিছু বছর প্রায় বিশ্বের অধিকাংশ ক্রীড়াবিদের জীবন থেকে বেশ কিছু বছর কেড়ে নিয়েছিল। বন্ধ হয়ে গিয়েছিল অলিম্পিক এবং ফুটবল বিশ্বকাপের আসর। কিন্তু শেষমেশ ১৯৬০ সালে ইউরোপের জন্য একটি পৃথক টুর্নামেন্ট করার ফিফার থেকে অনুমোদন আদায় করে উয়েফা। যদিও প্রথম বছর মাত্র সতেরোটি দেশ অংশগ্রহণে সম্মত হয়। ইউরোপীয় সার্কিটে শক্তিশালী ইংল্যান্ড, ইতালি, স্কটল্যান্ড এমনকী ১৯৫৪ ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ চ্যাম্পিয়ন পশ্চিম জার্মানি প্রথম বছর এই টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণে আগ্রহ দেখায়নি।

আরও পড়ুন: অমল জলে অমল পুজো

ইতিমধ্যে ১৯৫৫ সালে উয়েফা ইউরোপিয়ান কাপ নামে একটি নকআউট টুর্নামেন্টের আয়োজন করেছিল। যদিও সে টুর্নামেন্ট মাত্র এক বছর অনুষ্ঠিত হয়েই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। খুব স্বাভাবিক কারণে উদ্যোক্তাদের টুর্নামেন্টের মূল পরিকল্পনা থেকে সরে এসে এটিকে একটি নকআউট টুর্নামেন্ট হিসেবে আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কিন্তু যেহেতু টিমের সংখ্যা ছিল সতেরো, তাই প্রাথমিকভাবে একটি টিমকে ষোলো দলের নকআউট প্রতিযোগিতার বাইরে রাখতে হত। সেজন্য আয়োজকদের তরফে আইরিশ রিপাবলিকের সঙ্গে চেকোস্লোভাকিয়ার একটি যোগ্যতা অর্জনের ম্যাচ আয়োজন করা হয়, যাতে চেকোস্লোভাকিয়া জয়ী হয়। কিন্তু অদ্ভুতভাবে এটি কিন্তু ইউরোপীয় নেশনস কাপের (প্রথম দুই বছর এটাই ছিল ইউরো কাপের আদি নাম।) প্রথম ম্যাচ ছিল না। সে বছর ইউরোপীয় নেশনস কাপের প্রথম ম্যাচটি খেলা হয়েছিল ১৯৫৮-র ২৮ সেপ্টেম্বর। মস্কোয় অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে প্রতিপক্ষ ছিল হাঙ্গেরি এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন। সেন্ট্রাল লেনিন স্টেডিয়ামে সেদিন খেলা দেখতে উপস্থিত ছিলেন ১,০০,৫৭২ দর্শক। সেদিনের ম্যাচ সোভিয়েত ইউনিয়ন জয়ী হয়েছিল ৩-১ গোলে। পরের বছর ফিরতি ম্যাচেও বুদাফেস্টে হাঙ্গেরি পরাজিত হয়।

আরও পড়ুন: অন্য ২৫ জুনের গল্প: নব্বুইয়ে পা ভারতীয় ক্রিকেটের এক গৌরবোজ্জ্বল দিনের

শেষপর্যন্ত চারটি দেশ জুলাই ১৯৬০ টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালে (অনেকের মতে, সেটাই হল মূলপর্ব) খেলার ছাড়পত্র আদায় করে। এই দেশগুলি হল সোভিয়েত ইউনিয়ন, ফ্রান্স, যুগোস্লোভিয়া এবং চেকোস্লোভাকিয়া। এর মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়নের সেমিফাইনাল ওঠার সঙ্গে একটি রাজনৈতিক বিতর্ক জড়িয়ে যায়। কোয়ার্টার ফাইনালে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল স্পেন। স্পেনের রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন ফ্যাসিস্ট নেতা জেনালেন ফ্রাঙ্কো (তিনিই একমাত্র একনায়ক রাষ্ট্র প্রধান যিনি যুদ্ধে হেরেও ক্ষমতায় টিকে যান)। শত্রু কমিউনিস্ট দেশ সোভিয়েত ইউনিয়নে স্পেনের টিম যাবে না এই মর্মে ফ্রাঙ্কো নির্দেশ দেন স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনকে যা অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা ছিল না সে দেশের ফুটবল কর্তাদের। শেষমেশ সোভিয়েত ইউনিয়ন ওয়াকওভার পেয়ে সেমিফাইনালে চলে যায়। শেষ পর্যন্ত যুগোস্লাভিয়া ৫-৪ গোলে ফ্রান্সকে এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন ৩-০ গোলে চেকোস্লোভাকিয়াকে হারিয়ে ফাইনালে প্রবেশ করে।

আরও পড়ুন: লেন্সের ভিতর থেকে বিশ্বজয় দর্শন: স্মৃতির সফরে শ্রেণিক শেঠ

১০ জুলাই প্যারিসের লে পার্ক দে প্রিন্সেসে ফাইনালে মুখোমুখি হয় দু’টি দেশ। ঘটনাচক্রে ফাইনালে প্রতিদ্বন্দ্বী দু’টি দেশ যথাক্রমে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং যুগোস্লোভিয়া দু’টিই ছিল সমাজতান্ত্রিক দেশ। সেই কারণে সেই সময় ইউরোপিয়ান নেশনস কাপের ফাইনালকে অনেকেই অভিহিত করেছিলেন ‘কমিউনিস্টদের লড়াই’ হিসেবে। তবে দু’টি দেশ সমাজতন্ত্রী হলেও সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে বিশেষত স্ট্যালিনের সঙ্গে যুগোস্লাভিয়া রাষ্ট্রপ্রধান যোশিপ ব্রোজ টিটো, যিনি মার্শাল টিটো নামে বিখ্যাত ছিলেন, যথেষ্ট মতপার্থক্য ছিল। যদিও ১৯৬০ সালে সোভিয়েত রাশিয়ায় ক্রুশ্চেভ ক্ষমতায় চলে এসেছিলেন, তবু মতপার্থক্য সম্পূর্ণ মিটে যায়নি। সেই কারণে উভয় দেশের মধ্যে ফাইনাল সম্পর্কে ফুটবল মাঠের পরিসর পেরিয়ে রাজনীতি জগতের মানুষজনের যথেষ্ট আগ্রহ তৈরি হয়েছিল ইউরোপ জুড়ে। ১৭,৯৬৬ জন দর্শকের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত ফাইনালে যুগোস্লাভিয়ার প্রথমার্ধের ৪৩ মিনিটে মিলন গারলিকের গোলে এগিয়ে যায়। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই স্লাভা মেট্রেভেলি সোভিয়েতের পক্ষে গোল শোধ করেন। খেলা অতিরিক্ত সময়ে গেলে ম্যাচের ১১৩ মিনিটে সোভিয়েত স্ট্রাইকার ভিক্টর পনেডেলনিকের গোলে ম্যাচ এবং টুর্নামেন্ট জিতে যায় সোভিয়েত ইউনিয়ন। ঘটনাচক্রে এই জয়ই ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রথম এবং শেষবারের মতো ইউরোপ সেরার খেতাব জয়। এদিনের ফাইনাল ম্যাচটি প্রথমবারের জন্য ইউরোপের কয়েকটি দেশে টেলিভিশনে লাইভ দেখানো হয়। পুরনো রেকর্ডিং দেখলে বোঝা যায়, সোভিয়েত ইউনিয়নের খেতাব জয়ে আরেক জন খেলোয়াড়ের বিশেষ কৃতিত্ব ছিল, যিনি হলেন সোভিয়েত ইউনিয়নের কিংবদন্তি গোলরক্ষক লেভ ইয়াসিন। ফাইনালে অন্তত চার বার নিজের দেশকে অব্যর্থ পতনের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন তিনি।

আরও পড়ুন: দেশ, সীমান্ত এবং মিলখা সিংয়ের রূপকথা

আজ ষাট বছর পেরিয়ে প্রথম ইউরো কাপের পরিসংখ্যান ঘাটলে একটি অদ্ভুত বিষয় নজরে পড়ে। প্রথম ইউরোর পুরস্কার প্রাপক প্রথম তিনটি দেশ চ্যাম্পিয়ন সোভিয়েত ইউনিয়ন, রানার্স যুগোস্লাভিয়া এবং তৃতীয় স্থানাধিকারী চেকস্লোভাকিয়া কোনটিকেই আজ ইউরোপের রাজনৈতিক মানচিত্রে খুঁজে পাওয়া যাবে না। কে বলে, ফুটবলের ইতিহাস কেবলমাত্র খেলার ইতিহাস? ফুটবল মাঠ বা টুর্নামেন্ট ঘিরে অনেক কিছুই নির্মিত হয়, যা নিছক ক্রীড়া ইতিহাসের অন্তর্ভুক্ত নয়।

লেখক সোনারপুর মহাবিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর

Facebook Twitter Email Whatsapp

4 comments

  • Debashis Majumder

    Absolutely. Darun article.

  • খুব ভালো লেগেছে স্যার পড়ে

  • Amrita Basu Roy Chowdhury

    Never knew these facts. A praise worthy piece of writing.

  • Debraj Howlader

    ইতিহাস এবং ফুটবল মিলেমিশে এক দারুণ রসায়ন। এগিয়ে চলো গুরু। তোমার কাছ থেকে আরো অনেক কিছু পেতে চাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *