কবি কলম কথা

অত্রি ভট্টাচার্য্য


কবি-কলমের অভিযোজিত যাপন,
দুইজনে রোঁদে যায়, ছত্র ধরে মন।
কুয়োতলা, স্নান-রব, কবি ফেরে ভিজে
তক্তপোশে ঘাড় গোঁজা, কলম লিখিছে।
যেইদিন বৃষ্টি পড়ে, সমুদ্র-উঠান
কলম বিহার করে, কবি রয়ে যান।
বসে বসে বিরহের শালকাঠে ঘষে
রত্নাকর পা রাখেন দয়াপরবশে;
কলমের বুকে তিনি শব্দ তুলে দ্যান
নিমেষে উবিয়া যায় সব অনুধ্যান;
গলে দ্যান শতনরী, পালে দ্যান হাওয়া
যৌবনের বেগ দ্যান ক্রোশ ক্রোশ বাওয়া
কবি ও কলম তারা লুঠে স্বর্গসুখ
ওঁর বুকে ঠেকে এর নোয়ানো চিবুক
সারারাত ডুব দেয় সারারাত উঠে
কিসমিস খায় পরমান্ন খুঁটে খুঁটে।
এইদিকে ব্রহ্মকাল, শ্রাবণের মাস,
প্রভাতকিরণ নিত্য তিক্ত অনভ্যাস,
মেঘের পিছনে রয়, ঘোর অন্ধকারে।
রতিক্লান্ত প্রাণী দু’টি; গর্ভচক্রাধারে
কলম পোয়াতি হল, ছন্দ উঠে আসে
নাভিকুণ্ড চেপে ধরে অভিষ্টবিলাসে।
চেতনা মলিন তার, মলিন এষণা
অতঃপর কালসাপ করে আনাগোনা,
কবি জাগে, তার আগে জাগে সূর্যদেব
অরণ্য বুলিয়ে যায় স্নেহের প্রলেপ।
বন্যপ্রাণী ছুটে আসে, আসে পক্ষীকুল
আকাশে হেলান দিয়া অথর্ব শিমুল
সারাদিন নিদ্রাহীন; প্রদোষে সে দ্যাখে
হতাশ ফিরিয়া গেছে সব একে একে
আরও বাড়ে রাত্রি, আরও ভেককণ্ঠ জাগে,
তৃতীয় প্রহরধ্বনী বেতাল-বেহাগে,
সজোরে জানান দেয় শৃগালের ঝাঁক
ধৈর্যহীনা মোমদণ্ড পুড়ে পুড়ে খাক;
ধীরে ধীরে চেতনায় ফিরিছে কলম,
দিন যায়, হপ্তা যায়, সোম-রবি-সোম;
অবশেষে উঠি বসে অঘ্রাণের রাতে,
দ্যাখে, কবি ভগ্নপ্রায় হাত রেখে হাতে
খায় নাই, নায় নাই, প্রহরায় পাশে,
রূপদর্শী চাঁদ উঠে গহন-আকাশে।
চোখে নিয়ে মগ্নঘুম, চুম অপেক্ষা ঠোঁটে
কলমের শব্দবুক মত্ত হয়ে ওঠে।
কবি ও কলম দোহে একথালে খায়,
বীর্য-রতি লেগে থাকে কাব্য সুষমায়।।

আরও পড়ুন: গামছার গান


কবি তার কলমের ভ্রূণজ অসুখ
দু’হাতে গোপন করে প্রব্রজ্যার মুখ
মুখে তার স্রোতধারা বলিরেখা পায়
বলিরেখা মোহনায় সন্তর্পে গড়ায়
কবির চোখের জল ইস্পাত, ধারালো
বলেছে আমায় তুমি নিরুদ্দেশে ঢালো
পূজায় অলক্ষ্য দাও, বিরহে কপোল
অক্ষরে ফুটিয়ে তোলো অনন্তকমল
দিগন্তে গড় করো, সুখান্তে আপন
আমার পরিখা হোক বিপর্যস্ত মন
যখন তোমার মুখ শাশ্বতে মিলাবে
লেখার প্রজন্মগাছ মহাকালে খাবে
সপ্রংশ সারসের জোড়া জোড়া ডানা
যখন উড়াল দেবে, প্রক্ষিপ্ত বাহানা
আড়াআড়ি ফেটে যাবে, তখন শুধিও
জীবন কি বামাচারী? বীর্য কি প্রিয়?
প্রশ্নের শিকড়ে যদি মাংস লেগে থাকে,
প্রতিটি উঠানে স্বপ্ন অর্ধচন্দ্র আঁকে
অপ্রাপ্তির সংকেতদুষ্ট অপুষ্ট সে চাঁদ
কবির শ্মশানকল্পে অব্যর্থ প্রমাদ
যদি তাকে ভয় পায়, কবি তাকে চেনে
গল্পের লাগাম হাতে সে কুৎসিত বেনে
বেচে দিয়ে চলে গেছে কলম বাজারে
ধারের কড়িরা তাকে ধরে আর ছাড়ে
এ ওঁর শিরায় খোঁজে অসুস্থ চুমুক
কলম সে, কবি যার বিশ্রামের বুক।

আরও পড়ুন: বর্ষা সিরিজ


তারপর বৃষ্টি হয়, বজ্রপাত মাঠে
বিছানা দোয়াত হয় ইষ্টমন্ত্রপাঠে
একটি সুতার স্পর্শে আলো মুক্তি পায়
লেখা তার অন্ধকার অযত্নে হারায়
কবিও চেয়েছে এই মিলনান্তকথা
বিরহের দিব্যি কাটা এ প্রেম অযথা
কবে তার নিত্য হল― সেও তো জানে না
কাঠের খেলনাভাগ্য, মেলা থেকে কেনা
কেন তাকে নিয়ে এলো সমুদ্রের কাছে
এমন ধাতব মর্ম যে বিছিয়ে আছে
ধর্মের বদলে, তাকে ধিক শত ধিক
সপ্তডিঙাধারী এই-ই সে চন্দ্রবণিক
নিরীহ নারীকে চিরছিনিমিনি খেলে
অস্তের সমস্তটুকু দরিদ্র বিকেলে
চেঁছেপুছে নিয়ে যায় কলম দেউলে
একটি কনিষ্ঠ ফুল কবি তার চুলে
গুঁজিবার দুর্নিবার সাধে মূর্তিমান
পক্ষীনাদে ঝালাপালা বাতাসের কান
সকলে সমান প্রশ্ন, প্রসন্ন কোথায়?
সে যেখানে গেছে সেথা হতে ফেরা যায়?
কবির অলভ্য সে জ্ঞান। কবি ঋণী
আঁচলের শব্দ, কঙ্কণের রিনিরিনি
ঘরের আত্মার কাছে আত্মাহুতি দিয়ে
কলম সচল, কবজি পড়েছে পিছিয়ে
কবি বৃদ্ধ হল, তার নামে নিন্দা রটে
বৃষ্টি তার চিতাভস্ম লেপছে মলাটে।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *