‘উঠে যাওয়া’ গানের কলকাতায় চলুন…

জুবিন ঘোষ

গতপর্ব থেকে...
বিভিন্ন অঞ্চলকে ঘিরে তার নিজস্ব সংগীতধারা তৈরি হয়। সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে কলকাতা বলতে একটা বিরাট সাংস্কৃতিক চর্চাকেন্দ্র বুঝি। সেখানে মঞ্চ ও প্রচারমাধ্যমের উপস্থিতির জন্য শিল্পীরাও চেষ্টা করেন কলকাতামুখীন হবার। কিন্তু আঞ্চলিক গানের জগতে কলকাতার গান বলে তেমন কিছু প্রচার নেই, বেশ কিছুদিন ধরে লোকসংগীত চর্চা অন্যতম আগ্রহের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পল্লিগীতির মতো সেভাবে নগরগীতি নিয়ে আমাদের চর্চা কমই। কিন্তু উনিশ শতকে কলকাতা-কেন্দ্রিক বিভিন্ন উপধারার নতুন গানের জন্ম হয়ে উঠেছিল আঞ্চলিক গানের অন্যতম সম্পদ।

৬.১) ভিখারির গান

ভিক্ষের গান আজও চালু আছে। এই ভিক্ষের গানের শুরুটা হয়তো অনেক আগে থেকেই। গানের বিনিময়ে মাধুকরী সংগ্রহ করাটাই পেশা ছিল। এখনও শিয়ালদহ-হাওড়ার ট্রেনগুলিতে এই ভিক্ষার গান শোনা যায়। কেউ কেউ রীতিমতো ভালো গায়। তাঁতঘরে জানলাম, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেরেস্তার পুরনো নথিতে জানা যায়, ১৭৬৫ খিস্টাব্দের ৩১ জুলাই কলকাতার নিমাইচরণ দাস, ব্রজবাসী ফকিরকে ভিক্ষে করার লাইসেন্স দেওয়া হয়। নিমাইচরণ গাইত রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক গান, পুরনো কলকাতায় ভিক্ষুকরা গাইত আগমনী গান, বিজয়ার গান, মাখনচোরার গান, রামায়ণের গান, বেশিরভাগই ভক্তিমূলক গান। বেশ কিছু গান তাদেরই রচনা। বেশিরভাগই ছিল বৈষ্ণব। অন্যরা সাধারণ ভিক্ষুক, অন্ধ ভিক্ষুক। সকালবেলা হরিনাম শোনানোর জন্য কোনও কোনও ভিক্ষুক মাসকাবারি বেতন পেতেন বাবুদের থেকে।

আরও পড়ুন: একসময় কলকাতায় নানান ধরনের উপধারার গান নিজস্ব সম্পদ হয়ে উঠেছিল

ভিক্ষার গান করতে করতে কীভাবে একজন বিখ্যাত শিল্পী হয়ে গেল, সেই নিয়ে সকলের অজানা একটা ছোট গল্প বলে নিই এই ফাঁকে। কালাচাঁদ দরবেশের নাম আমরা সবাই জানি। দরবেশদের মধ্যে তিনিই শেষতম। আরও দরবেশ গোষ্ঠীর মানুষ বেঁচে থাকলেও কালাচাঁদই একমাত্র ঐতিহ্য বহন করে চলেছেন। এই দরবেশ সম্পর্কিত তথ্যটি আমাকে গল্পচ্ছলে শুনিয়েছেন কবি পুণ্যশ্লোক দাশগুপ্ত। কালাচাঁদ সে সময় ধূপগুড়িতে থাকতেন। ট্রেনে মাঝেমাঝে গান করে দক্ষিণা চাইতেন যাত্রীদের থেকে। একবার যাত্রীদের মধ্যে রয়েছেন বিখ্যাত কবি কালীকৃষ্ণ গুহ। তিনি কালাচাঁদের গান শুনে জানতে চাইলেন কোথায় থাকে। কালাচাঁদ বলল ধূপগুড়িতে। শুনে কালীকৃষ্ণবাবু বললেন পুণ্যশ্লোককে চেনো? অনেক গল্পের পর কালীকৃষ্ণ বললেন তুমি পুণ্যশ্লোকের কাছ থেকে একটা রেকমেন্ডেশন নিয়ে আমার সঙ্গে কলকাতা এসে দেখা কোরো। তখন সরকারি উচ্চপদে চাকরি করতেন কালীকৃষ্ণবাবু। রেকমেন্ডেশন নিয়ে কলকাতা গেলে কালাচাঁদকে তিনি বিভিন্ন উপায় ব্যবস্থা করে দিলেন সরকারি অনুষ্ঠানে গাইতে এবং আমেরিকায় অনুষ্ঠান করতে। অজানা শোনা কথা খোদ পুণ্যশ্লোক দাশগুপ্তের মুখ থেকে। আমি শুধু উল্লেখ করলাম। 

৬.৪) ফিরিওয়ালার গান

পাঠকেরা ১৯৭৩ সালের শ্রীমান পৃথ্বীরাজ চলচ্চিত্রের হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরে আর তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠে গানটা নিশ্চয়ই শুনেছেন―  

“হরিদাসের বুলবুল ভাজা

টাটকা তাজা খেতে মজা

এ ভাজা খেলে পড়ে

রুচবে না আর খাজা-গজা

মহারানি ভিক্টোরিয়া

এ ভাজা খায় রোজ কিনিয়া

ভাজা খেয়ে বোঝে না সে

কে বা রাজা- কে-বা প্রজা

রাজা এই ভাজা খেয়েই

দরবারে তা ওঠেন গেয়ে

আ… আ…

সেই গানের দাপটে ভাই

ঘুমিয়ে পড়ে…’’  

ছবি সৌজন্য: Oil pastel

এই গানটা একটা সার্থক উদাহরণ হতে পারে। যদিও সিনেমার গান। তবে এইভাবেই পুরনো কলকাতায় ফেরিওলারা নানান জিনিস নিয়ে অন্তরঙ্গ ডাক দিয়ে যেত। কখনও নিজেদের জিনিসের গুণগান গাইত এইভাবে। সেইসব সুর, কথা ছিল একেবারে নিজস্ব। এখন ফেরিওলার ডাক থাকলেও গান শোনা আর যায় না। আমার ঠাকুমার বয়স ৮৪-৮৫ হবে। তিনিও বিয়ের আগে দমদমে থাকাকালীন ফেরিওলার গান শুনেছেন। ঠাকুমার বিয়ে ১৯৪৭ সালে। তাহলে ধরা যেতে পারে অন্তত ৬৮ বছর আগেও কলকাতার বুকে ফেরিওলার গান বহাল তবিয়তে টিকে ছিল। তবে আমি একবার ট্রেনে শুনেছিলাম।

৬.৩) ভিস্তির গান

কলকাতায় এই গান একেবারেই উঠে গেছে। একে নিখাদ কলকাতার গান বলা যেতে পারে। এই গান কলকাতা ছাড়া আর কোথাও কোনও রূপেই পাওয়া যায় না। এখন যেমন চারদিকে হাইওয়ে, পিচ-পাকা রাস্তা। পুরনো কলকাতায় কাঁচা রাস্তার সময় এই গান চালু হয়েছিল কলকাতা পুরসভার দৌলতে। তখন ঘোড়ার গাড়ি গেলেই প্রচুল ধুলো উড়ত। কলকাতা পুরসভা এরপর কিছু লোককে দিয়ে রাস্তায় রাস্তায় মশক দিয়ে জল ছেটানো আরম্ভ করে। এর মশকধারী জলবাহীদের ভিস্তি বলা হয়। এরা জল দেবার সময় একসারে দাঁড়িয়ে ছন্দবদ্ধভাবে জল ছেটাতে ছেটাতে গান ধরত। মহেন্দ্রলাল দত্তের কলকাতার পুরাতন কাহিনী ও প্রথা বইতে ভিস্তিদের গানের কথা পাওয়া যায়। আঠারো শতকের অন্নদামঙ্গল কাব্যের একটি আখ্যান বিদ্যাসুন্দর নিয়ে রচিত হয় উনিশ শতকে গোপাল উড়ে (১৮১৯-১৮৫৯) বিদ্যাসুন্দর’ পালায় ভিস্তির গানের উল্লেখ পাওয়া যায় –

”বড়ে মজাদার দরিয়াকা মিঠা পানি লিয়া

হায় আসল খাঁটি উজান ভাটি, মিঠা গাঙ্গের পানি

যো খায়া পস্তায়া, যো নেই খায়া, পস্তানে গিয়া।”

কাঁসারিপাড়ার সঙ, সঙেদের মিছিলেও ভিস্তিওয়ালা সেজে এসে গান করত। মহেন্দ্রলাল কলকাতার পুরাতন কাহিনী ও প্রথা বইতে বলছেন, “আরবাস নামে মাণিকতলার এক মুসলমান, যে ভিস্তি সাজিয়া নাচিত, গাহিত, তাহা বড় সুন্দর হইত। মখ্‌মলে জরি দিয়া মশক করত এবং পেঁজা তুলো মশকের মুখে দিত যেন জল বার হচ্ছে। নিজেও মখ্‌মলের জামা টুপি পরত এবং পায়ে ঝুমুর দিয়া নিজের দলবল লইয়া নাচগান করিত। অনেক গান তার নিজের বাঁধা ছিল। ভিস্তির গান অতি সনুদর হইত।” ক্রমে গাড়ি করে নল দিয়ে জল দেবার প্রথা এলে ভিস্তির গানও হারিয়ে গেল কলকাতার বুক থেকে।

 এবার আসা যাক শুভানুষ্ঠানকেন্দ্রিক কলকাতার গানে। প্রথমে জন্মকেন্দ্রিক―

৪.১. ক) তেল-মাষকলাই প্রদান

পুরাতন কলকাতার সংস্কার ছিল বাড়িতে পুত্রসন্তান জন্মালে পাড়া-প্রতিবেশীদের ঘরে ঘরে ঢাকের বাজনার সঙ্গে গান গাইতে গাইতে বোক্‌না করে পাঠানো হত তেল-মাষকলাই। সঙ্গে কোথাও সাতবার, কোথাও একুশবার উলুধ্বনি দেওয়া হত। ঢুলী বিদায় পর্বেও মিষ্টি করে পুত্রবন্দনা বা মাতৃবন্দনা করা হত।

“রাণী তোর ভাগ্য ভাল পেয়েছিস গো নীলরতনে।

আর নন্দরাণীর কোলে সো-না”  

৪.১. খ) হিজড়ার গান

হিজড়ার গান তো এখনও সর্বত্র আছে। কিছু কিছু সময় অশ্লীল কিছু অনুষঙ্গ এসে যায়, সন্তান জন্মের কথা শুনলেই তারা হাজির হয়ে যায়। ৫০০০ থেকে ১০০০০ টাকা দাবি করে। তারপর নবজাতক বা নবজাতিকাকে কোলে নাচিয়ে নাচিয়ে গান গায়। হিজড়েদের মূল পেশা এটাই। গানের সুর খুব মধুর হয় না।  

৪.২. ক.খ) বিয়ে ও বাসরের গান

উনিশ শতকে কলকাতায় বিয়ের গান এবং বসরের গান বাঁধা হত। বাসরের গান বেশিরভাগই ছিল অশ্লীল সংগীত। এমনকী বাসরে জমাবার জন্য ছোটবড় অনেকেই অশ্লীল গানের চর্চা ও শিক্ষাপর্যন্ত নিত। এই বিষয়ে ১৫ অগ্রহায়ণ ১২৭০ সালের সোমপ্রকাশ পত্রিকা এডিটরিয়ালে সমালোচনা লেখে, “বাসরঘরে গান ও শ্লোক পাঠ করিতে হইবে বলিয়া  অনেকে বাল্যাবস্থায় অশ্লীল গানাদি করে।” বাসরে দাদাঠাকুরের প্যারোডি, ঠুংরি, নিধুবাবুর টপ্পা একসময় খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। কিছু গান তো শুধু বাসরের জন্যই অশ্লীল ভঙ্গিতে লেখা হত।

৪.৩. ক.) ভাট বা ভট্টের গান

ভাট বা ভট্টরা হল নিম্নশ্রেণির ব্রাহ্মণ। এরা বিভিন্ন শুভানুষ্ঠানে গৃহকর্তার বংশমর্যাদার কথা সুর করে আমন্ত্রিতদের গেয়ে শোনাত। প্রত্যেকটা গান রচনাই ছিল আলাদা আলাদা পরিবারের জন্য। ভাটরা ছিল অর্থপিপাশু। আশানুরূপ অর্থ না পেলে না গুণকীর্তনের জায়গায় দোষকীর্তন করতে শুরু করত। বংশের কলঙ্কের কথা প্রচার করত। সেখান থেকেই এসেছে ‘ভাটের কথা’ শব্দটা।

৪.৩. খ) ঝুমুর গান

প্রথমেই বলি এটা সেই অসমের ঝুমুর না, মানে লোকসংগীত ঝুমুর না। আদ্যোপান্ত কলকাত্তাইয়া গান। পুরনো কলকাতায় পায়ে ঝুমুর বেঁধে একদম মহিলা শিল্পী গান গাইত। এদের ঝুমুরওয়ালি বলা হত। পেছনে একটা লোক কাঁসা-ঢোল বাজাত। ঝুমুরের তালে তালে গান হত গ্রাম্য ভাষায়। গানের কথা বা সুর খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। কিন্তু বিনোদন দিতে সম্পন্ন হত বলে এদের বেশ কদর ছিল বিয়ে বাড়ির আসরে বা জমিদারের আসরে। মতভেদে পার্থক্য আছে আছে যে, পুরনো কালীয়দমন যাত্রাপালার কৃষ্ণলীলা সম্বন্ধীয় গানগুলিকে ঝুমুর বলা হয়। যাই হোক, মোদ্দা ব্যাপারটা হল ঝুমুর বেঁধে একসঙ্গে অনেক ক’টা নারী শিল্পীর গাম্য নিজস্ব নিম্নশ্রেণীয় সস্তা সংগীত উপস্থাপনা। বিনোদনটাই আসল। আসর জমানো নাচ। গানের কথার মধ্যে গাড়ল অন্ত্যজ ভাষাপ্রয়োগ। যেহেতু আমি দেখিনি, আমার ধারণা এটা অনেকটা হিন্দুস্থানিদের মুজরার মতো হবে হয়তো। ঝুমুরের একটা গান উদাহরণ হিসেবে দেওয়া যাক―

‘মাগী মিনসেকে চিৎ করে ফেলে দিয়ে বুকে দিয়েছে পা

আর চোখটা করে জুলুর জুলুর মুখে নেইকো রা’

পরবর্তী পর্ব আগামী মঙ্গলবার...

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *