গঙ্গার পলিতে পুষ্ট কলকাতার লৌকিক গান

জুবিন ঘোষ

গতপর্ব থেকে...
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেরেস্তার পুরনো নথিতে জানা যায়, ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দের ৩১ জুলাই কলকাতার নিমাইচরণ দাস, ব্রজবাসী ফকিরকে ভিক্ষে করার লাইসেন্স দেওয়া হয়। নিমাইচরণ গাইত রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক গান, পুরনো কলকাতায় ভিক্ষুকরা গাইত আগমনী গান, বিজয়ার গান, মাখনচোরার গান, রামায়ণের গান, বেশিরভাগই ভক্তিমূলক গান। বেশ কিছু গান তাদেরই রচনা। বেশিরভাগই ছিল বৈষ্ণব…

কলকাতা নগরী গঙ্গার পলিতে পুষ্ট। গঙ্গার কথা তো তাই আসবেই। কলকাতার গানে গঙ্গা এসেছে চারভাবে― গঙ্গাবন্দনায়, অন্তর্জলি যাত্রার গানে, গঙ্গায় স্নানযাত্রায় এবং বাজ খেলায়। এগুলো সবক’টাই কলকাতার নিজস্ব সম্পদ।

৫.২. ক) বন্দমাতার গান

পুরাতন কলকাতার পাঠশালাতে প্রতিদিন প্রার্থনা সংগীত গাওয়া হত গঙ্গার বন্দনা করে। মকর সংক্রান্তির দিনে পড়ুয়ারা গঙ্গার বন্দনা করতে করতে সারাগ্রাম প্রদক্ষিণ করত। প্রদক্ষিণ শেষে গঙ্গায় বা অন্য পুকুরে স্নান। এদের বলা হত বন্দমাতার দল। পাঠশালার পড়াশোনা শেষ হবার পরও অনেকে নিজেরা মিলে বন্দমাতার দল করে নিয়েছিলেন, এই দলে গঙ্গাকে উৎসর্গ করে নানান উৎকৃষ্ট গান রচনা হত। উনিশ শতকে নগর কলকাতাতেও বিভিন্ন বন্দমাতার দল ছিল। তারা বেলা বারোটার পর নিজ নিজ দলের রচিত গান গাইতে গাইতে কলকাতার রাস্তায় বের হত। কেউ কেউ সঙ সেজে থাকত। মুখোমুখি অন্য দল পড়ে গেলে দুই দলে মারামারি পর্যন্ত লেগে যেত। একটা উদাহরণ―

“বন্দমাতা সুরধুনী, পুরাণে মহিমা শুনি

পতিত পাবনী পুরাতনী”

বন্দমাতা দলগুলির রচনা ও সুর ছিল অত্যন্ত উৎকৃষ্ট ও উচ্চ-শিল্পরুচিবোধ সম্পন্ন।

আরও পড়ুন: হেমসাগর লেন: একজন বৈরাগ্যমালার স্মৃতিচিহ্ন

আদিগঙ্গার ছবি, ১৮৬০

৫.২. খ) স্নানযাত্রার গান

নব্য বাবুদের কলকাতা থেকে মাহেশ যাওয়ার প্রথাই ছিল এই গানের উৎস। কিছুটা গঙ্গাকেন্দ্রিক, কিছুটা পার্বণকেন্দ্রিক। স্নানযাত্রার আগের দিন পরিবার-পরিজন মিলে সুসজ্জিত বড় নৌকায় বাবুরা উঠতেন। সেখানে বিছানা ও আসন-গদি পেতে বসত বাজনাদার, তবলিয়া, গায়কেরা। স্নানযাত্রা উপলক্ষে গান রচিত হত। হুতোম প্যাঁচার নকশা থেকে বাবুদের স্নানযাত্রা উপলক্ষে গান সম্পর্কে সাম্যক ধারণা পাওয়া যায়। এ যেন সমস্ত পরবের টেক্কা। এলাহি আয়োজন, ভাগীরথীর উপর নৌকায় নৌকায় গানের আসর। কে কার গানকে টেক্কা দিতে পারে। এমনই একটি গান―

‘‘হেসে খেলে নাওরে যাদু মনের সুখে।

কে কবে যাবে শিঙ্গে ফুঁকে।

তখন কোথা রবে বাড়ী, কোথা রবে জুড়ি,

তোমার কোথায় রবে ঘড়ি, কে দেয় ট্যাঁকে। তখন নুড়ো জ্বেলে দিবে ও চাঁদ মুখে।।’’

আরও পড়ুন: পুলিপিঠের রূপকথা

৫.২. খ) বাচ খেলার গান

গঙ্গার বুকে প্রায়সই নানান অজুহাতে ও অনুষ্ঠানে বাচ খেলা হত। মানে নৌকা প্রতিযোগিতা। সেই উপলক্ষ্যে মাঝিরাও দাঁড় জলে ফেলবার তালে তালে এক ধরনের গান করতেন। বাবুরা বজরার উপরে কখনও কবিকে বা গায়ককে নিয়ে বসতেন। মাঝিরাও গাইতেন, তাঁরাও গাইতেন। ঢোল নিয়ে বাজাতেও দেখা যেত। আমি কিন্তু বাজ খেলা দু’বার দেখেছি। আমার ছোটবেলায় আটের দশকের শেষদিকে মুর্শিদাবাদ থেকে রানাঘাট চূর্ণি নদীতে পরপর কয়েক বছর দেখেছি বাইচ খেলা, আর একবার দেখেছিলাম, সেটা কোথায় মনে নেই। কলকাতাতেই হবে হয়তো। বেশ পতাকা রঙিন কাপড়ের নিশান প্রভৃতি ব্যবহার করা হয়, তবে আমি গান শুনিনি। সেকালে পুরনো কলকাতায় এই উপলক্ষ্যেই গান রচনা হত বলে হুতোম প্যাঁচার নকশা এবং মহেন্দ্রলালের লেখাতে পাচ্ছি। এই গান কিন্তু মোটেই ভাটিয়ালি নয়। স্নানযাত্রাতেও অনেক সময় বাচ খেলা হত। তখনও দুই রকম গান মিলেমিশে যেত। দু’টো কলি উদাহরণ দিলাম―

১) “নতুন কাণ্ডারী হরি, ঢেউ দিও না গায়”

২) “সব গোপীকে পার করতে নেব আনা আনা

শ্রীরাধাকে পার করতে নেব কানের সোনা…”

আরও পড়ুন: ‘উঠে যাওয়া’ গানের কলকাতায় চলুন…

এবার গঙ্গাকেন্দ্রিক এবং যুগপৎ মৃত্যুকেন্দ্রিক দু’টি উপধারা আছে। ক) অন্তর্জলি যাত্রার গান, এবং খ) অন্তর্জলি সংকীর্তন। গঙ্গার পথ ধরে স্বর্গের নদী মন্দাকিনী হয়ে স্বর্গলাভ। এইভাবেই মৃত্যুর গঙ্গাপ্রাপ্তি।

৫.১. ক) অন্তর্জলি যাত্রা

কবিরাজ নির্দেশ দিলে মৃত্যপথযাত্রীকে সুসজ্জিত শোভাযাত্রা করে গঙ্গায় নিয়ে যাওয়া হত জীবিত অবস্থাতেই। সেইখানে ত্রিরাত্রি ‘গঙ্গানারায়ণ-ব্রহ্ম’ জপ করতে করতে মত্যুর প্রতীক্ষা করতেন মৃত্যপথযাত্রী। এই শোভাযাত্রাকে বলা হয় অন্তর্জলি যাত্রা। অন্তর্জলি যাত্রা আসন্ন জেনে কলকাতার নব্যবাবু সম্প্রদায়রা আগে থেকেই বিশিষ্ট কবি, গীতিকারদের বা সভাকবিদের দিয়ে অন্তর্জলি যাত্রার গান লিখিয়ে নিতেন। গানের কথায় কখনও সখনও সেন ব্যক্তির গুণগান ও বংশমর্যাদাও লিপিবদ্ধ থাকত। তবে সেটা সব ক্ষেত্রে না। অন্তর্জলি যাত্রা নিয়েও উচ্চ বাবু সম্প্রদায়ের মধ্যে রেষারেষি ছিল। হরিনাম ও গঙ্গাস্তব দিয়ে রচিত এই অন্তর্জলি যাত্রার ‘যম জিনিতে’ রচনা যথেষ্ট উচ্চমান সম্পন্ন ছিল। সেইরকমই একটি ‘যম জিনিতে’ রচনা লিখলেন প্রখ্যাত কবিয়াল হরেকৃষ্ণ দিঘাড়ী ওরফে হরু ঠাকুর (১৭৪৯–১৮২৪) মহারাজ নবকৃষ্ণ দেববাহাদুরের অন্তর্জলি যাত্রার জন্য। তাঁতঘর একুশ শতক থেকে এখানে সেটি তুলে দিলাম,

‘‘হরিবোল বলিয়ে প্রাণো যাবে।

আমার এমন দিন কি হবে।।

অন্তিম সময়ে বন্ধুগণে, আমার শ্রবণে হরিনাম শুনাবে।

পুরাণে শুনেছি করণাময়ো, হরি আমায় কি করুণা করিবে।।

হরি নাম লইতে অলসো করো না,

রসনা, যা হবার তাই হবে।

ভবেরো তরঙ্গ বেড়েছে বোলে কি

ঢেউ দেখে লা ডুবাবে।।’’

আরও পড়ুন: একসময় কলকাতায় নানান ধরনের উপধারার গান নিজস্ব সম্পদ হয়ে উঠেছিল

এবার রেষারেষিটা দেখুন। ১৭৯৭ খ্রি. মহারাজ ঘুমন্ত অবস্থায় মারা গেলেন। ফলে অন্তর্জলি যাত্রা আর হল না। কিন্তু মহারাজের প্রতিবেশী শত্রু এ সুযোগ ছাড়বে কেন? মহারাজের উত্তরাধিকারীদের দেখিয়ে গেলেন অন্তর্জলি যাত্রা কাকে বলে। রুপোর পালকিতে বসলেন চূড়ামণি দত্ত। অসংখ্য নগর সংকীর্তনের দল, কীর্তন গায়ক, আর ঢুলি নিয়ে চূড়ামণির অন্তর্জলি যাত্রা শোভাযাত্রা কঠোর বিদ্রূপে শোভাবাজার রাজবাড়ি অতিক্রম করছে। গানের কথাগুলো দেখুন, চূড়ামণির জন্য আলাদাভাবে রচিত―

‘‘আয়রে আয় নগরবাসী! দেখবি যদি আয়রে আয় নগরবাসী! দেখবি যদি আয়।

জগৎ জিনিয়া চূড়া― যম জিনিতে যায়।

যম জিনিতে যায়রে চূড়া― যম জিনিতে যায়।

জপ-তপ কর, কিন্তু মরতে জানিতে হয়।’’ এই শেষ পঙ্‌ক্তি ‘জপ-তপ কর, কিন্তু মরতে জানিতে হয়’-টাই মহারাজ নবকৃষ্ণের প্রতি বিদ্রূপ। যেহেতু নবকৃষ্ণ অন্তর্জলি যাত্রা করার সুযোগ পাননি, তাই বলা হয়েছে মরাটাও মরার মতো যেতে হয়।

আরও পড়ুন: সূর্যাস্তের সূর্য সেন

৫.১. ক) অন্তর্জলি সংকীর্তন

অন্তর্জলি যাত্রায় গেলেও অনেক সময় মৃত্যুর মহেন্দ্রক্ষণ আসতে দেরি হত। কখনও কখনও ১০ দিন, ২০ দিন এমনকী একমাসও গঙ্গাতীরে আত্মীয়-পরিজনেরা অপেক্ষা করেছেন মৃত্যুপথযাত্রীকে নিয়ে। মৃত্যুর মুহূর্তে তাঁকে নাভি পর্যন্ত জলে ডুবিয়ে রাখা হত। অপেক্ষাকালীন গঙ্গাপাড়ে শোক কীর্তন হত। এই শোককীর্তনও অনেক সময় বিশিষ্টজনদের দিয়ে লেখানো হত। একেই অন্তর্জলি সংকীর্তন বলে। সমাচার দর্পণ, গিরিশচন্দ্র বিদ্যারত্ন, দেবেন ঠাকুরের আত্মকথায় অন্তর্জলি সংকীর্তনের কথা পাই।

৫.১. ক) শ্রাদ্ধ বাসরের কীর্তন

এটা সর্বত্র চালু ছিল, আলাদা করে কলকাতা বলা যাবে না, তবে কলকাতায় এর জমকটা বেশি হত। কীর্তনীয়ারাও কলকাতারই হতো। তারা কীর্তনের বন্দিশ রচনা করত। হিন্দুধর্মে শ্রাদ্ধবাসরে কীর্তন ছিল অবশ্য একটি অঙ্গ। দ্বারকানাথ ঠাকুরের মৃত্যু বাসরে কীর্তন হয়নি বলে দেবেন ঠাকুরের পরদিবস ভোজের নিমন্ত্রণে জ্ঞাতি-কুটুম্বরা অনুপস্থিত ছিল। এতটাই ছিল ধর্মের বাঁধুনি।

আগামী পর্ব পরের মঙ্গলবার...

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *