পুরাতনী কলকাতার গণিকা সংগীত

মধ্যযুগীয় আদিরসকেই যেন নতুন করে রসনা করে নাগরিক রূপ দিয়েছিল এই বিশিষ্ট দুই সংগীত উপধারা। বাইজি সংগীতে মধ্য ও উত্তর-দক্ষিণের শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রভাব সুস্পষ্ট। এ-কথা ১. ক) বেশ্যাসংগীত ও বাইজি সংগীত বিভাগে লিখেছেন জুবিন ঘোষ

বেশ্যাসংগীত এবং বাইজিসংগীত না-শুনে থাকলে তিনি আর যাই হোক, মজলিশি রস-সংগীতপ্রিয় বাঙালি হতে পারেন না। অষ্টাদশ–ঊনবিংশ শতকে শুদ্ধি ও চেতনায় আঘাত দিলেও সংগীতে এক বিশিষ্ট ছাপ পুরাতন কলকাতাকে দিয়ে গেছে। মধ্যযুগীয় আদিরসকেই যেন নতুন করে রসনা করে নাগরিক রূপ দিয়েছিল এই বিশিষ্ট দুই সংগীত উপধারা। বাইজি সংগীতে মধ্য ও উত্তর-দক্ষিণের শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রভাব সুস্পষ্ট। প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতিতে দ্বিতীয় থেকে তৃতীয় শতকের মাঝামাঝি সময়তেই বাৎস্যায়ন প্রণীত ‘কামশাস্ত্রে’ মানুষের অবশ্য কর্ম হিসেবে নির্ধারণ করেছিলেন উদ্যান-বিহার। শুভ অর্থে বাগিচা-ভ্রমণ, আরও শুদ্ধ অর্থে বাগানবাড়ি যাওয়া। গণিকাসংস্কৃতি অবশ্য এরও আগে রামায়ণে পাই, রাম-ভরতের বাক্য বিনিময়ের সময়― ‘কচ্চিন্ন গণিকাশ্বানাং কুঞ্জরঞ্চ তৃপ্যসি।’ সাবেকি কলকাতায় অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতকে সেই সংস্কৃতি ক্রমশ প্রসারিত হল বউবাজার-সোনাগাছি-ফরাশডাঙা এবং আরও কয়েকটি অঞ্চলে। এরমধ্যে একদম ধ্রূপদি সংগীতের মাধ্যমে আনন্দদান করতে লাগল, অন্য অংশ সরাসরি রূপোপজীবিনী হয়ে শয্যাবাসর পর্যন্ত টেনে নিয়ে গেল। ছলনা, ছাপান, ছেলেমি, ছ্যাঁচড়ামি, ছেমো ও ছেনালি― নব্যবাবুয়ানিদের এই ছয়টি ‘ছ’-এ নিজেদের কবজায় আনায় পারদর্শী পণ্যাঙ্গনাদের পঞ্চশ্রেণি বিভাগ করা যায়― ক) রাজ পণ্যাঙ্গনা― যে রাজ অনুগ্রহ পেয়েছে; খ) নাগরী― নগরবাসিনী জনপদবধূ; গ) গুপ্ত পণ্যাঙ্গনা― সম্মানীয় বংশজাত কিন্তু গোপনে কামবাসনায় দেহচর্চা; ঘ) দেবদাসী― মন্দিরের দেবদাসী ঙ) তীর্থগ পণ্যাঙ্গনা― তীর্থস্থানে নিয়োজিত। ‘কলকাতা কমলালয়ে’ ‘নববাবুবিলাস’-এ ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৭৮৭-১৮৪৮) বলেছেন― “মনিয়া বুলবুল আখড়াই গান,/ খোষ পোষাকী যশমী দান,/ আড়িঘুড়ি কানন ভোজন/ এই নবধা বাবুর লক্ষণ।।”

আরও পড়ুন: গঙ্গার পলিতে পুষ্ট কলকাতার লৌকিক গান

এবার দেখা যাক বেশ কিছু রেয়ার নমুনা―

এটি প্রাক্‌-রবীন্দ্র সংস্কৃতির একটি বেশ্যা গান, দেখুন কীভাবে অনুপ্রাসের ব্যবহার সুকাব্যিক করেছে―

‘‘এস হে রতন মনেরি মতন,

তোমার কারণ বসে আছি হে―

প্রাণের রতন যততোরি ধন,

পাবে যে যতন তাহা চাও হে―’’

পরের এই বিশুদ্ধ বেশ্যা সংগীতটি লঘুচালে ছেনালি, দেখুন তার মধ্যেও একটা দুঃখ ও শ্লেষ কাজ করছে―

‘‘ওগো কেউ বলো না গো আমার ভাতার কেমন মিষ্টি!

আমার সুদু হয়েছিল ছেলেবেলায় ছেলেখেলা করে শুভদৃষ্টি।

                       ভাতার কেমন মিষ্টি।

মিষ্টি গুড়, মিষ্টি চিনি, আর মিষ্টি মধু

কিসের মতো মিষ্টি হ্যাঁগো, সাতটি পাকের বঁধু।

সে কি তেষ্টার জল, চেষ্টার ফল, না জষ্টিমাসে দুপুরবেলা বৃষ্টি!

                       ভাতার কেমন মিষ্টি।

মিষ্টি ছিল বাবার আদর, আর মায়ের কোল,

ফাল্গুন মাসে ফাগের খেলা, কচি আমের ঝোল।

তার চেয়ে মিষ্টি ভাতার, নারীর ধর্ম কর্ম ইষ্টি

কত মিষ্টি সেই বিধাতা, যার মিষ্টি ভাতার সৃষ্টি।

                       ভাতার কেমন মিষ্টি!’’

দেখুন এর পরের বেশ্যা কাব্যে কীভাবে আদিরসের সঙ্গে বাউল দেহতত্ত্ব যেন উঠে আসছে, আটকুঠুরি-নয় দরজার কনসেপ্ট―        

‘‘এল প্রেম রসের কাঁসারি

আয় সই ভাঙা ফুটো বদল করি।।

একটি নয়, সেই ছিদ্র নটা, রসবিহীনে অন্তর ফাটা,

জল থাকে না একটি ফোটা, আঠার যত সারি।’’

যোনিতে জল তো সত্যি থাকে, আবার আঠার মতো লিঙ্গকে ধরে রাখতে চায়, এই অপূর্ব কাব্যদর্শন যাদের ছিল, কষ্টের কথা সেই সব গান এখন আমরা ধরে রাখতে পারলাম না। দেখুন আরও একটি আদিরস ও ভাব কী অপূর্ব নিয়োজত হয়েছে বেশ্যা সংগীতে। একে সত্যি যত্ন না-করে উপায় কী!―

‘‘গয়লা দিদি লো, তোমার ময়লা বড় প্রাণ।

তুমি সেরেক্কে জল দু সের ঢেলে

দুধে ডাকাও বান― দুধে ডাকাও বান।

তোমার হাত পা দোলা, কোমর দোলা সার,

দোলায় নাই কিছু বাহার,

আমার কেঁড়ে থই থই জলে

ভর্তি কানে কান কানে কান।’’

আরও পড়ুন: ‘উঠে যাওয়া’ গানের কলকাতায় চলুন…

নিজেকেই সেই ‘গয়লা দিদি’ সম্ভাষণ করে ‘দু সের জল’ যে ঔরস তা বুঝতে অসুবিধা হয় না, যা স্তনকে উর্তুঙ্গ করে তোলে তাই যেন ‘দুধে ডাকাও বান’ হয়ে আসে। এই উচ্চাঙ্গের কাব্য গানের মাধ্যমে পরিবেশন করার সময় যদি সেই পুরুষ সেটির রস নিতে না-পারত তখন কি এই পণ্যাঙ্গনাদের ‘উলো বনে মুক্তো ঢালা’র মতো মনে হত না! কী জানি! দেখুন আরও কত ব্যঞ্জনা এসেছে বেশ্যা গানে―

‘‘রমণীর প্রেম-নদীতে ঝাঁপ দিও না বিপদ ঘটে।

সুশীতল হব বলে, এসেছিলাম নদীর তটে।।

এসব মায়ার তরী, এ মায়া বুঝতে নারী,

ছিনালির পানসি যেমন, দোউড়ে বেড়ায় ঘাটে।।

ছিনালির পানসি চলে, তোড়েতে জাহাজ টলে,  

ঢেউ লেগে ডুবব বলে তাই এলেম নদীর তটে।।’

এবার একটা চর্চিত খেম্‌টা শুনুন― বাবু বলছে―

‘‘এত ভালবাসাবাসি, কোথা রইল লো প্রেয়সী।

দাঁড়ায়ে প্রাণ বারান্দাতে, তাকিয়ে যে দিবানিশি।।

আমি কারু বাড়ি গেলে সদত মরিতে জ্বলে

এখনি কি সব ভুলে গেলে, দিন পেয়ে লো হরিদাসী।।’’

তৎক্ষণাৎ রক্ষিতার চাটুল জবাব―

‘‘এত ভালবাসা রে প্রাণ, ভুলেছ কি একেবারে।

বোঝা গেল রীতি তব বিশেষ প্রাকারে।।

এত যে বাসিতে ভালো, ভালোবাসা জানা গেল,

পেতেছিলে মায়া জাল অবলা বধিবারে তরে।।’’

ইংল্যান্ডের ১৮৬৮ চোদ্দ আইনের প্রভাবে যৌনরোগ আটকাতে পুলিশি হয়রানি থেকে বাঁচতে সদলে বেশ্যারা কলকাতা ছেড়ে ফরাশডাঙা চলে যায়। এ নিয়েও বেশ কিছু গান-বেশ্যাকাব্য রচিত হয়। বাইজি সংগীতে ছিল চিরাচরিত শাস্ত্রীয় সংগীতের বিবিধ রাগের ধ্রূপদি উপস্থাপনা। সেও এক অপূর্ব আনন্দময়ী মদীয় রস। কলকাতার সংগীতপ্রিয় বাঙালি পুরুষ বারবার যার টানে উদ্যানভ্রমণে ছুটে গিয়ে অশুদ্ধ কিন্তু পুরুষ্টু হয়েছে।

আগামী পর্ব পরের মঙ্গলবার...

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *