‘কোন আলোতে প্রাণের প্রদীপ’

গৌতম চট্টোপাধ্যায়

এখনও গা ঘামিয়ে দেওয়া ক্যাশ্মিলনের পোশাক পরার সময় আসেনি। এখনও বিকেলের আকাশটা কমলা-লালে মেশা, সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার সময় মনে পড়ে যায়:

“শূন্য এখন ফুলের বাগান,
দোয়েল কোকিল গাহে না গান,
কাশ ঝরে যায় নদীর তীরে।
যাক অবসাদ বিষাদ কালো, দীপালিকায় জ্বালাও আলো—”

আর মনে গুঞ্জরণ ওঠে “হিমের রাতে ওই গগনের দীপগুলিরে/ হেমন্তিকা করল গোপন আঁচল ঘিরে ঘিরে ঘিরে”। (জর্জদার গাওয়া রবীন্দ্রসংগীত ভেসে আসুক কানে)

আরও পড়ুন: মেদিনীপুরের আলুই-রায়পাড়ার শ্রীধর মন্দির

ধর্ম নিয়ে আমার পড়ার বৃত্তটা বড্ড ছোট। তাই আমি আমার অবলোকনের, অনুভবের গণ্ডি থেকেই নিজস্ব কিছু কথা বলে যেতে চাই।

নিতান্তই নাস্তিকতার বৃত্তে চূড়ান্তভাবে থাকার অভিলাষে আমি এই অমানিশায় ওই করাল মূর্তির অনুষ্ঠান বিষয়ে কিছুই জানার সুযোগ নিইনি। শুধু জানি আর এক আরম্ভের জন্য আর এক পূর্ণচন্দ্রের জন্য প্রয়োজন এই ঘোরা অমানিশা। কচি বয়সে আধা মফঃস্বলের ইটের রাস্তার খাঁজে লুকিয়ে থাকবে যে সকল সাপসাপিনী তাদের ভয় আর গা ছমছম এক অন্ধকারের ভয়কে জয় করতে নারকেল মালার (মালা ফুটো করে সেখানে কঞ্চি ঢুকিয়ে হ্যান্ডেল বানাতাম) কুপিতে ছোট মোমবাতি জ্বালিয়ে পথ চলতাম।

আরও পড়ুন: লক্ষ্মী বা অলক্ষ্মীপাড়ায়, ১৯৬৪-র একদিন

নব্য আকাশপ্রদীপ। সংগ্রহ: লেখক

সে-ই কচি বয়সে শুনতাম আমার ছোট পিসির কণ্ঠে ‘ওই আকাশপ্রদীপ তারা জ্বেলো না’… কি সুন্দর সুর আর যেহেতু পিসির কণ্ঠে শোনা, তাই ধারণা কোনও গায়িকার গাওয়া! অনেক পরে জেনেছি এ গান সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের আর এ গান মনখারাপের, অপ্রাপ্তির এবং আকাশপ্রদীপের!

আরও পড়ুন: হয়ে উঠুন আপন প্রাণের লক্ষ্মীর পূজারি

আমার শৈশবে যাদের ঘরে প্যারাফিন কেনার সামর্থ্য ছিল না, যাদের কাছে সরষের তেল অপব্যবহার করে দীপ জ্বালানো ছিল নবাবি করা, তাদেরও কিন্তু ছিল মাটির/ পেতলের/ টিনের কুপিতে ক্রাচিন/ কেরাচিন/ কেরোসিন তেল ভরে জ্বালানোর রেওয়াজ।

এমনই এক সময়ে ভাব সম্প্রসারণ শিখতে হয়েছিল “কেরোসিন শিখা বলে মাটির প্রদীপে/ ভাই বলে ডাকো যদি দেব গলা টিপে/ হেন কালে গগনেতে উঠিলেন চাঁদা/ কেরোসিন শিখা বলে এসো মোর দাদা”। অনুপ্রাণিত হয়ে আমিও তাই সাজিয়ে দিলাম টিনের কুপি আর বিহার ও বাঁকুড়া থেকে বছর পঁয়ত্রিশেক আগে সংগৃহীত মাটির কুপি। মুখোমুখি বসিয়ে দিলাম ছোট্ট মাটির প্রদীপটাকে।

আরও পড়ুন: সুন্দরবনের বিবর্ণ গ্রামের ফিনিক্সদের সঙ্গে কিছুক্ষণ

সংগ্রহ লেখক

দীপাবলি মানে তো অবন ঠাকুরের দেখানো রাজপুতানায় আলোর উৎসব। অথবা কলাগাছ পুঁতে তার গায়ে নানা দৈর্ঘ্যের বাঁশের চটা গেঁথে তাতে মোম লাগিয়ে আলোর গাছ বানানো!

মানুষ আলোর অভিসারে নিরন্তর অভিযাত্রী, কিন্তু একেক গোষ্ঠীর লোক একেকভাবে আলোকে আনতে চায় ঘরে। যেমন এই কচ্ছপটাকে দেখুন, মুখ দিয়ে বেরিয়ে থাকবে তেল জবজবে সলতে, আগুন জ্বালালেই হল! কিন্তু অপরদিকে তেল ঢালার কোনও জায়গা পাবেন না! কচ্ছপ ওল্টালে পেটে দেখবেন  ফুটো, সেখান দিয়েই তেল ভরতে হবে, উল্টিয়ে বসালেও তেল পড়ে যাবে না। এই আর্টিজানকে এবার খুঁজে নিন, তার পরিবারে অন্ন জোগানোর কাজটুকু করুন। তারা বাঁচলে শিল্প বাঁচে।

কূর্মাকৃতির প্রদীপ। সংগ্রহ: লেখক

আমি স্থির করেছিলাম, এই লেখাতে শুধুই ব্যক্তিগত অনুষঙ্গ থাকবে আর থাকবে অসংখ্য দীপ আর মোমবাতির চিত্র। সেই লক্ষ্যেই দেখাই শতাধিক বছরের প্রাচীন এই পাথরের প্রদীপটি, যা আমার পারিবারিক সংগ্রহের অন্যতম।

প্রাচীন পাথরের প্রদীপ। সংগ্রহ: লেখক

পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে কিছু পাথরের প্রদীপ, যেগুলো এখন গয়া সহ অনেক জায়গাতেই পাথরের গুঁড়ো রং মিশিয়ে ছাঁচে ঢেলে বানানো হয়। এরই সঙ্গে কয়েকটা চিনেমাটির প্রদীপও সাজানো থাকল।

পাথরের ও চিনামাটির প্রদীপ। সংগ্রহ: লেখক

এবার দেখাই পিতলের প্রদীপখানি— তামিলনাডুর নিজস্ব শৈলী। বাইশ বছর আগে এক দীপাবলিতে ভেলোর থেকে কেনা। পিতলের মোমদানিটা সেই সত্তর দশকে উপহার পাওয়া। আর রয়েছে ছোট্ট হালকা পিতলের চারমুখী প্রদীপ।

পিতলের প্রদীপ। সংগ্রহ: লেখক

আবার ফিরি মাটির প্রদীপে। পোড়া মাটির প্রদীপে উজ্জ্বলতম সংযোজন এক ওয়াল হ্যাঙ্গিং জোড়া প্রদীপ যেটা ১৬/১৭ বছর আগে মহারাষ্ট্রের আওরঙ্গাবাদ থেকে সংগ্রহ করেছিলাম। গাছ প্রদীপেরা বাংলার। কিন্তু অলংকৃত প্রদীপগুলো উত্তরপ্রদেশের বালিয়ার দীপাবলির মেলা থেকে সংগৃহীত। ছোট প্রদীপগুলো বাংলার।

মাটির প্রদীপ। সংগ্রহ: লেখক

সবে তখন রঙিন মাটির প্রদীপ বাজারে আসছে, ১৩/১৪ বছর আগে শঙ্খপ্রদীপ, গণেশপ্রদীপগুলো সংগ্রহ করা। আমার মনে হয়, এমন ধবল পূর্ণিমা আর অতি ঘনঘোর অমানিশা একমাত্র এই হিম সময়েই ঘটে থাকে। এমন আঁধারে দীপ জ্বালাতে চাইবেই আলোর অভিসারী মন। দীপাবলি আসলে কি আগুন আনার ছল! বাড়ির ছাদে, উঠোন জুড়ে, সদর দরজায় শুধুই মোমবাতি আর প্রদীপের বাহুল্য।

রঙিন প্রদীপ। সংগ্রহ: লেখক

অথচ, এসব দেখে কোনও কড়া মাস্টার মশাইও সতর্কবাণী শোনাবেন না:

“যে জন দিবসে মনের হরষে
জ্বালায় মোমের বাতি
আশু গৃহে তার দেখিবে না আর
নিশীথে প্রদীপ ভাতি।”

মনে হল, আমার সামান্য সংগ্রহ থেকে মোমবাতিগুলোও পাঠকদের দেখাই। এই ছবির পিছনের সারিতে বাঁ-দিকের বড়টা Amway কোম্পানির, ডানদিকেরটা  বুদ্ধগয়ার মূল মন্দিরে জ্বালানো বাতি। সামনের সবক’টি পন্ডিচেরি (পুদুচেরি)-র অরবিন্দ আশ্রমের সুবিখ্যাত ভেষজ ও সুগন্ধি গুণসম্পন্ন মোমবাতির সংগ্রহ।

মোমবাতি। সংগ্রহ: লেখক

“আমার নয়ন দুটি শুধুই তোমারে চাহে/ ব্যথার বাদলে যায় ছেয়ে” ও আমার আদরিণী কন্যা তুই আজ আকাশপ্রদীপ, তোর দিকে চেয়ে থাকি আর ভাবি এই অকৃতী অধম পিতা তোর, সে তোর জন্য কোনও আলো জ্বালাবে না, তার পিতা-মাতা কারওর জন্যই নয়।

শুধু লতা মঙ্গেশকরের গাওয়া গানটা সেদিনও বাজবে বাজতেই থাকবে, বাজতেই থাকবে তোর পিতার জন্মবর্ষের গান তার মৃত্যু পর্যন্ত…

Facebook Twitter Email Whatsapp

2 comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *