কুমারীপূজা: বাংলাদেশের দিনাজপুরের রামকৃষ্ণ মিশন ও আশ্রম

তুষার শুভ্র বসাক (বাংলাদেশ)

বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড়ো ধর্মীয় উৎসব হলো― শারদীয় দুর্গোৎসব। শরৎ ঋতুতে দেবী মা দুর্গার পুজোকে কেন্দ্র করে এই উৎসব উদ্‌যাপিত হয়। দশভুজা দেবী দুর্গা, মা পার্বতীর আরেক রূপ। বৈষ্ণবী, চণ্ডিকা, অম্বিকা, যোগমায়া, মহামায়া, মহিষাসুরমর্দিনী, মহিষাসুরসংহারিণী, নারায়ণী, কাত্যায়নী-সহ বিভিন্ন নামে ভক্তের হৃদয়ে তিনি পূজিত। দেবী মা দুর্গার একটি অতি প্রাচীন নাম হল― ‘কুমারী’। তৈত্তিরীয় আরণ্যকে এই নামের উল্লেখ আছে। সেখানে লেখা রয়েছে:
“কাত্যায়নায় বিদ্মহে কন্যাকুমারী ধীমহি তন্নো দুর্গিঃ প্রচোদয়াৎ।”
অর্থাৎ, হে দুর্গা তুমি কন্যা ও কুমারী। আমরা কাত্যায়নকে জানব। সেইজন্য তোমাকে ধ্যান করি।

আরও পড়ুন: উলা বীরনগরের প্রাচীন বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোর ইতিহাস

“কৌমারীরূপসংস্থানে নারায়ণী নমোহস্তুতে।”
উদ্ধৃত বাক্যটির মাধ্যমে শ্রীশ্রী চণ্ডীতে দেবীকে কুমারীরূপে প্রণাম জানানো হয়েছে। আবার― তিনি রূপে কুমারী, কুমার (কার্তিক)-এর জননী; কুমারীরূপেই রিপুনাশিনী বলে তাকে কুমারী হিসেবে স্মরণ করা হয়। পুরাণে এই কথাই বলা আছে “কুমারী-রূপধারী চ কুমার-জননী তথা।
কুমারীরিপুহন্ত্রী চ কৌমারী তেন সা স্মৃতা।”

শ্বেতাশ্বতর উপনিষদেও দেবী মা দুর্গার কুমারী নামের উদ্ধৃতি পাই। দেবীর কুমারী নাম যেমন অতি প্রাচীন, তার পুজোর রীতি-নীতিও তেমনই প্রাচীন এবং ব্যাপক। আমরা অনেকেই জানি এবং প্রত্যক্ষ করি, কুমারীরূপে দেবী মা দুর্গার পুজো করা হয়ে থাকে। কিন্তু দেবী মা কালী, দেবী মা জগদ্ধাত্রী এবং দেবী মা অন্নপূর্ণা’র পুজোতেও কুমারীপূজার প্রচলন আছে। পৌরাণিক তথ্যমতে, মা পার্বতী মহাদেবের স্ত্রী হলেও তিনি কোনও গর্ভজাত সন্তানের মাতৃসুখ লাভ করেননি। তাঁর দুর্গা-স্বরূপও দেবতাদের তেজঃসম্ভূতা। সুতরাং তিনি স্বয়ংসিদ্ধা, স্বয়ংসম্পূর্ণা। বৃহদ্ধর্মপুরাণ মতে, মহামায়া এক কুমারী কন্যারূপে দেবতাদের সামনে আবিভূর্ত হয়েছিলেন।
“কন্যারূপেণ দেবানামগ্রতো দর্শনং দদৌ।”
পণ্ডিত যোগেশচন্দ্র বিদ্যানিধি বলেছেন, “দুর্গা কুমারী। তার কোনও পুত্র-কন্যা নাই। তাই দুর্গাপুজোয় কুমারীপূজা বিহিত হয়েছে।”

ভারতের দক্ষিণের কন্যাকুমারীতে দেবী কুমারীস্বরূপে পূজিত হন। এই কুমারীপূজার রীতিনীতি থেকেই একসময় গৌরীদান প্রথা চালু হয়েছে বলে অনেকে অভিমত ব্যক্ত করে। আদিবাসী সমাজে কুমারীপূজা বা গৌরীদান প্রথা প্রচলিত আছে। কতিপয় আদিবাসী সমাজের কুমারী মেয়েরা আশ্বিন মাসের সতেরো দিন উপবাস করে এক বিশেষ তিথিতে ‘কুমারী ওষা’ ব্রত পালন করে। সুতরাং বলা যায়, শুধু আর্য সংস্কৃতিতে নয়, অনার্য সংস্কৃতিতেও কুমারীপূজার প্রচলন আছে।

আরও পড়ুন: পুজোর গান এবং ‘বাজনা গান’

একসময় শক্তিপীঠ-সমূহে কুমারীপূজার রীতি প্রচলিত ছিল। অসমের কামাখ্যা মন্দিরে এখনও কুমারীপূজা করা হয়ে থাকে। ভারত ও বাংলাদেশের পাশাপাশি নেপালেও দুর্গাপুজোর সময় কুমারীপূজা অনুষ্ঠিত হয়। ‘পুরোহিত দর্পণ’-এ কুমারীপূজার বিধি বিস্তারিতভাবে বর্ণিত আছে। মূলত দুর্গাপুজোয় কুমারীপূজার সংযুক্তি ঘটে তান্ত্রিক সাধনা থেকে। কুমারীপূজার মাহাত্ম্য ‘যোগিনীতন্ত্র’-তে পাওয়া যায়। তা হল:
“পূজিতৈকা কুমারী চেদদ্বিতীয়ং পূজনং ভবেৎ।
কুমারী পূজনফলং ময়া বক্তুংন শক্যতে।।
কুমার্য্যশ্চ শক্তয়শ্চ সর্বমেতচ্চরাচরং।
এক চেদযুবতী দেবী পূজিতা স্বাত্মলোকিতা।
সর্বা এব পরাদব্যে পূজিতা স্যুর্ণ সংশয়।”
অর্থাৎ, মাত্র একবার কুমারীপূজা করলে মহৎ ফল লাভ হয়ে থাকে। কুমারীপূজার ফল আমি বর্ণনা করতে সমর্থ নই। হে অম্বিকে! কুমারীগণ ও শক্তিগণ তাই অখিল চরাচরস্বরূপ। যদি একটি যুবতীর অর্চনা করা যায়, তাহলে তার দ্বারাই সমস্ত দেবীগণ পূজিতা হয়ে থাকেন সন্দেহ নেই।

যোগিনীতন্ত্রে কুমারীপূজার উদ্ভব সম্পর্কে একটি কাহিনি প্রচলিত আছে। তা হল: ব্রহ্মশাপে বিষ্ণুর দেহে পাপ সঞ্চার হয়েছিল। পাপ-পীড়া থেকে মুক্তির জন্য বিষ্ণু, হিমাচলে গমন করে ১০ হাজার বছর ধরে মহাকালী অষ্টাক্ষরী মহাবিদ্যার জপ করেছিলেন। মহাকালীর সন্তোষ মাত্রই বিষ্ণু পীড়ামুক্ত হোন এবং তার হৃদ্‌পদ্ম হতে ‘কোলা’ নামক এক অসুরের আবির্ভাব হয়। কোলাসুর অচিরেই দেবগণকে পরাজিত করে ত্রিলোকাধিপতি বনে যায়। অতঃপর দেবগণ নিজ-উদ্ধার ও ধর্মরক্ষার নিমিত্তে বিনম্র ভক্তিচিত্তে মহামায়ার স্তব করতে প্রবৃত্ত হোন। স্তব ও প্রার্থনায় সন্তুষ্ট হয়ে দেবী দেবগণকে বললেন, ‘‘হে বৎস, ধর্মরক্ষার নিমিত্তে আমি কুমারীরূপে অসুরকূলবর্বর কোলাসুরকে সবান্ধব বধ করব”। এই কথা বলেই দেবী কুমারীস্বরূপে কোলাসুরের সম্মুখে উপস্থিত হয়ে খাদ্য প্রার্থনা করেন।
“মাতৃতাতবিহীনাহং সহায় পরিবজ্জির্তা,
ক্ষুধিতাহং মহারাজ ভোজ্যং মহ্যং প্রদীয়তাম্।”
অর্থাৎ, হে মহারাজ! আমি জনক-জননীবিহীনা ও নিঃসহায়া; আমাকে কিঞ্চিৎ খাদদ্রব্য প্রদান করুন।

দেবীর কথায় মুগ্ধ হয়ে কোলাসুর কুমারীস্বরূপা দেবীকে নিজ অন্তঃপুরে নিয়ে যায়। এরপর মণিমুক্তারঞ্জিত আসনে বসিয়ে নানাপ্রকারের ভোজ্যদ্রব্যাদি প্রদান করেন। ক্ষণিকের মধ্যে সব আহার শেষ করে কুমারীস্বরূপা দেবী তাঁর অতৃপ্তির কথা ব্যক্ত করেন। কোলাসুর তখন বললেন,
“যথা তৃপ্তির্ভবেত্বালে তাবচ্চ তত্তথা কুরু।”
অর্থাৎ, হে বালিকা! যাহাতে তোমার তৃপ্তি হয়, তুমি তাই করো।

আরও পড়ুন: পাকিস্তান থেকে শরণার্থী হয়ে আসা বান্নু সমাজের হাতে শুরু হওয়া রাবণ দহন আজ রাঁচির ঐতিহ্য

বালিকাস্বরূপা দেবী, কোলাসুরের এই কথা শুনে তার কোষ, অশ্ব, হস্তি, রথ, সৈন্য, বন্ধু-বান্ধব সব খেয়ে-দেয়ে শেষত কোলাসুরকেও মুখে পুরে নেয়। দেবীর এমন অদ্ভুত লীলা দেখে দেব-গন্ধব-কিন্নর সকলে সমবেত হয়ে কুসুম-চন্দন-ভারে সেই কুমারীর অচর্না করলেন। এরপর থেকে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ এবং পৃথ্বীনিবাসী সর্বজন নিজ নিজ গৃহে কুমারীপূজায় প্রবৃত্ত হলেন। পুরাণের ভাষায়:
“জগুঃ সুললিতং গীতাং দেবগন্ধর্বকিন্নরাঃ
বিদ্যাধরী দেব পত্নিকিন্নরীভিঃ সমস্ততঃ।
সর্ব্বলোকৈঃ পূজিতা চ কুমারী সা গৃহে গৃহে।”


রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন দুর্গাপুজোয় কুমারীপূজার আয়োজন করে থাকে। তথ্যমতে, সুদূর অতীতে দুর্গাপুজোয় কুমারীপূজার বিধান বহাল থাকলেও একসময় এই পূজার প্রচলন একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে স্বামী বিবেকানন্দ কুমারীপূজার পুনঃপ্রচলন করেন। এই কুমারীপূজা সম্পর্কে রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব বলেছেন, “কুমারীপূজা করে কেন? সব স্ত্রীলোক ভগবতীর এক-একটি রূপ, শুদ্ধাত্মা কুমারীতে ভগবতীর বেশি প্রকাশ। ইনি আমাদের মা।” তিনি নিজ-পত্নী মা সারদা দেবীকে ষোড়শী-রূপে পূজা করতেন। শাস্ত্রীয়ভাবে শ্রীশ্রী চণ্ডীতে নারী বা কুমারীপূজা স্বীকৃত। চণ্ডীর ভাষ্যমতে,
“সমস্তাস্তব দেবী ভেদাঃ স্ত্রিয়ঃ সমস্তাঃ সকলা জগৎসু।”

২২ সেপ্টেম্বর ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে ‘দেশ’ পত্রিকা-তে প্রকাশিত স্বামী দেবেন্দ্রানন্দ রচিত ‘বেলুড় মঠের দুর্গাপূজা’ শীর্ষক প্রবন্ধের মাধ্যমে— স্বামী বিবেকানন্দের কুমারীপূজা করা নিয়ে বেশকিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য জানা যায়। স্বামী বিবেকানন্দ ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসে কাশ্মীরের এক অতি প্রাচীন দেবীপীঠ ক্ষীরভবানী-তে কুমারীপূজা করেন। সেখানে একটি কুম্ভ আছে। নিয়ম বা প্রথা অনুযায়ী স্বামীজি প্রতিদিন সেই কুম্ভের জলে ক্ষীর বা পায়েস নিবেদন করতেন। পাশাপাশি প্রতিবারই একজন ব্রাহ্মণ শিশুকন্যাকে কুমারীজ্ঞানে পুজো করতেন। স্বামীজির এই কাশ্মীর ভ্রমণে তাঁর সহযাত্রীদের মধ্যে মানসকন্যা নিবেদিতা, শিষ্যা মিস ম্যাকলউড এবং ২ জন গুরুভাই সঙ্গে ছিলেন। সেই কাশ্মীর ভ্রমণেই একবার স্বামীজি এক মুসলমান মাঝির শিশুকন্যাকে কুমারীপূজা করেছিলেন। যা দেখে নিবেদিতা-সহ অন্যান্যরা বিস্মিত হোন। উত্তরপ্রদেশের গাজিপুরের বিখ্যাত রায়বাহাদুর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর ঘনিষ্ঠ বন্ধু— গগনচন্দ্র রায়ের শিশুকন্যা মনিকা রায়কে স্বামীজি কুমারীরূপে পুজো করেছেন। মনিকা রায় পরবর্তীতে লখনউ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভাইস চ্যান্সেলার ড. জ্ঞানেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীকে বিয়ে করেন এবং মনিকা চক্রবর্তী নামে পরিচিত হোন। ভারতের অন্যতম শক্তিপীঠ কামাখ্যাতেও স্বামীজি কুমারীপূজা করেছেন এবং সেখানকার প্রথা অনুসারে— কুমারীভোজনও করিয়েছেন। শক্তিপীঠের পাণ্ডাদের পুরাতন খাতা থেকে এই তথ্য জানা যায়।

আরও পড়ুন: এবার পুজোয় লেনিন বিরিয়ানি

১৩০৮ বঙ্গাব্দ মোতাবেক ১৯০১ খ্রিষ্টাব্দে— বেলুড়ের রামকৃষ্ণ মঠে প্রথমবারের মতো শারদীয় দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হয়। স্বামী বিবেকানন্দের ডাকে সাড়া দিয়ে মা সারদা দেবী সেই ঐতিহাসিক দুর্গাপুজোয় অংশ নিতে বেলুড়ে উপস্থিত হয়েছিলেন। তার নির্দেশে সেই বছর পশুবলি বন্ধ ছিল এবং আজও তা বলবৎ আছে। সেই বছর  দুর্গাপুজোয় প্রথমবারের মতো কুমারীপূজা অনুষ্ঠিত হয়, যা পুনঃপ্রচলনের মূল উৎস। স্বামী বিবেকানন্দ ৯ জন কুমারীকে মা দুর্গার জীবন্ত বিগ্রহ জ্ঞান করে পূজা করেছিলেন। এদের মধ্যে একজন এত অল্পবয়স্ক কুমারী ছিল যে, তার কপালে রক্তচন্দন পরিয়ে দেওয়ার সময় স্বামীজি শিহরিত হয়ে উঠেন এবং ভাবাবিষ্ট কণ্ঠে বলেন, “আহা! দেবীর তৃতীয় নয়নে আঘাত লাগেনি তো।” এই কুমারীপূজাকে উত্তর ভারতে ‘কন্যাপূজন’ বলে। এই কন্যাপূজন বা কুমারীপূজা সচরাচর অষ্টমী তিথিতেই অনুষ্ঠিত হয়, তবে নবমী তিথিতে হোমের পর কুমারীপূজার বিধান আছে। শাস্ত্রীয় ভাষ্যে:  
“মহানবম্যাৎ দেবেশি কুমারীং চ প্রপূজয়েৎ।” 

প্রায় শতবছর পূর্বে ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে— বর্তমান বাংলাদেশের দিনাজপুর জেলাশহরে ‘রামকৃষ্ণ মিশন’ প্রতিষ্ঠিত হয়। রামকৃষ্ণ মিশন সম্পর্কে নতুন করে বলার কিছু নেই। পাঠক জানে সমাজে রামকৃষ্ণ মিশনের ভূমিকা কীরূপ। তবুও এরমাঝেই একটি বিষয় আলোকপাত হতেই পারে। বেলুড়ের রামকৃষ্ণ মঠের মতো দিনাজপুর রামকৃষ্ণ মিশন ও আশ্রমের একটি সমৃদ্ধ ঐতিহ্য হল— শারদীয় দুর্গোৎসবের অষ্টমী তিথিতে কুমারীপূজার বিধান। ঠিক কবে থেকে এই মিশনে কুমারীপূজা শুরু হয় তা সুনিশ্চিত বলা না গেলেও মিশনের সদস্য দেবাশিষ মহারাজ-এর ভাষ্য ও তথ্যমতে, “শ্রীমদ স্বামী অমৃতত্ত্বানন্দজি মহারাজ-এর হাত ধরেই দিনাজপুর রামকৃষ্ণ মিশনে কুমারীপূজার প্রচলন হয়।” এই মিশন ও আশ্রমের পরিচালনা কমিটির সভাপতি সত্য নারায়ণ আগারওয়ালা’র মতে, “বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর, বিগত ২৫ বছর ধরে এখানে কুমারীপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর পূর্বের ইতিহাস অজ্ঞাত।” এই মিশনের বর্তমান অধ্যক্ষ— শ্রীমদ স্বামী বিভাত্মানন্দজি মহারাজ।

আরও পড়ুন: ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ সমস্ত ধর্মের মানুষকে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে

বাংলাদেশের ভূখণ্ডে কুমারীপূজার প্রচলন অনেক আগে থেকেই ছিল। তার প্রমাণ পাওয়া যায় ‘কুমারীপূজাপ্রয়োগ’ শীর্ষক গ্রন্থের পুঁথি (বাংলা একাডেমি সংগ্রহ— ১৫৯, লিপিকাল ১৮৫০) থেকে। বাংলাদেশের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের ১৬টি জেলার মধ্যে প্রাচীনতম জেলা দিনাজপুরেই কুমারীপূজা অনুষ্ঠিত হয়। তাই এটি দিনাজপুর জেলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় অধ্যায়। দিনাজপুরে—  একমাত্র রামকৃষ্ণ মিশনেই কুমারীপূজা অনুষ্ঠিত হয়। বর্তমানে দিনাজপুরের পাশাপাশি বাংলাদেশের মধ্যে ঢাকা (মিশন স্থাপিত: ১৮৯৯), বরিশাল (মিশন স্থাপিত: ১৯০৪) নারায়নগঞ্জ (মিশন স্থাপিত: ১৯০৯), মানিকগঞ্জ (মিশন স্থাপিত: ১৯১০), সিলেট (মিশন স্থাপিত: ১৯১৬), চট্টগ্রাম (মিশন স্থাপিত: ১৯২১), ফরিদপুর (মিশন স্থাপিত: ১৯২১), হবিগঞ্জ (মিশন স্থাপিত: ১৯২১), বাগেরহাট (মিশন স্থাপিত: ১৯২৬) ও কুমিল্লা (মিশন স্থাপিত: ১৯৩৬) জেলায় প্রতিষ্ঠিত রামকৃষ্ণ মিশন ও আশ্রমে কুমারীপূজা অনুষ্ঠিত হয়।

দিনাজপুর রামকৃষ্ণ মিশনের দুর্গাপূজা জেলার অন্যান্য দুর্গাপূজার থেকে একেবারে ভিন্ন-ধাঁচের। আশ্রমে অবস্থানরত মহারাজ এবং আশ্রম পরিচালনা কমিটির সদস্যরা এই পূজা আয়োজন করে থাকে। পূজা উপলক্ষ্যে চাঁদাও তোলা হয়। রথযাত্রার শুভলগ্নে কাঠামোপূজার মাধ্যমে শুরু হয় দেবী মা দুর্গার প্রতিমা তৈরির কাজ। আশ্রমের যে মন্দিরে দেবী দুর্গার পুজোবিধি সম্পাদিত হয়, তার উচ্চতা প্রায় দুইতলার সমান। দৈর্ঘ্য-প্রস্থেও সুবিস্তৃত। দুই ধাপে দশ-পদ সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে মন্দিরগর্ভে প্রবেশ করতে হয়। এই মন্দিরের নির্মাণশিল্প তথা কারুকাজ মনোমুগ্ধকর ও চিত্তাকর্ষক। মন্দিরের বেদি উত্তরমুখী এবং প্রতিমা নির্মিত হয় এক কাঠামোতে। যেখানে—  গণেশ, লক্ষ্মী, সিংহের পিঠে দুর্গা, মহিষাসুর, সরস্বতী ও কার্তিকের অবস্থান। মূলত দুর্গাপূজার প্রতিটি বিধি, এখানে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পালন করা হয়। পুষ্পাঞ্জলি, ধুনুচি নাচ, কুমারীপূজা, সন্ধিপূজা, বিসর্জন যাত্রা, প্রতিমা বিসর্জন সবকিছুতেই রয়েছে সনাতনী সংস্কৃতির সর্বোত্তম ব্যবহার।

আরও পড়ুন: ‘গুলিনদা’র জন্ম শতবর্ষ

দুর্গাপুজোর অষ্টমী তিথিতে দিনাজপুর রামকৃষ্ণ মিশন-প্রাঙ্গণে বিপুল ভক্ত ও পুণ্যার্থীর সমাগম ঘটে। এদিন অন্যান্য ধর্মের অনুসারীরাও কুমারীপূজা দেখতে আসেন। সর্বসাকুল্যে সংখ্যাটা ১০ হাজারের ঊর্ধ্বে হবে। এদের মধ্যে অধিকাংশের ঠিকানা আশপাশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায়। সনাতন ধর্মের বিশ্বাস অনুসারে জগতের সকল নারীর মধ্যে মাতৃরূপ উপলব্ধি করতেই এই পূজার আয়োজন করা হয়। প্রতিবছর ১৬ বছরের কম বয়সি কন্যাশিশুদের মধ্যে ‘দেবীত্বের লক্ষণ’ বিচার করে মিশনের পুরোহিতরা কুমারী মনোনিত ও নির্বাচিত করেন। উল্লেখ্য, নির্বাচিত কুমারী ঋতুমতী হওয়া চলবে না। শাস্ত্র অনুসারে কুমারীকে একটি শাস্ত্রীয়-নাম দেয়া হয়। ১ থেকে ১৬ বছর বয়সি কুমারীদের জন্য বয়সভিত্তিক শাস্ত্রীয়-নাম নির্ধারিত আছে। নামগুলো হল: সন্ধ্যা, সরস্বতী, ত্রিধামূর্তি, কালিক, সুভগা, উমা, মালিনী, কুব্জিকা, কালসন্দর্ভা, অপরাজিতা, রুদ্রাণী, ভৈরবী, মহালক্ষ্মী, পীঠনায়িকা, ক্ষেত্রজ্ঞা ও অম্বিকা। সাধারণত একজন কন্যাকে একাধিকবার কুমারীপূজার জন্য মনোনীত করা হয় না। কুমারী হিসেবে মাতৃরূপে পূজিত কন্যাশিশুরা পরবর্তীতে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে।

২০১৪ খ্রিস্টাব্দে— গার্গী চক্রবর্তী, ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে— বড়গুড়গোলা-নিবাসী নারায়ণ ব্যানার্জি ও সাথী ব্যানার্জির ৭ বছর বয়সি শিশুকন্যা নিরুপমা ব্যানার্জি, ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে— বড়বন্দর-নিবাসী মিলন চক্রবর্তী ও মালা চক্রবর্তীর কন্যা ভূমিকা চক্রবর্তী মিলি, ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে— বড়গুড়গোলা-নিবাসী উৎপল ব্যানার্জি ও ববি ব্যানার্জির ৭ বছর বয়সি শিশুকন্যা উজ্জয়ী ব্যানার্জি; দিনাজপুর রামকৃষ্ণ মিশনে দুর্গাপুজোয় কুমারী হিসেবে মনোনীত ও নির্বাচিত হয়েছিল বলে জানা যায়।

আরও পড়ুন: হতভাগ্য স্বামীর বিলাপ

মহাঅষ্টমীতে সকালবেলা কুমারীপূজার পুণ্যলগ্ন শুরু হওয়ার পূর্বেই— সর্বপ্রথমে কুমারী কন্যাশিশুকে স্নান করানো হয়। এরপর নতুন শাড়ি ও অলংকার পরিয়ে, দেবীরূপে সুসজ্জিত করে কুমারীকে দুর্গাপ্রতিমার পাশে পূর্ব-অভিমুখে পুজোর নির্দিষ্ট আসনে বসানো হয়। এইসময় ‘দুর্গা মাই কী! জয়’ ধ্বনিতে ভক্ত-পুণ্যার্থীরা কুমারীদেবীকে অভিবাদন জানায়। ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি আর কাঁসর-ঘণ্টায় মুখরিত হয়ে ওঠে আশ্রমের সবুজ-শ্যামল প্রাঙ্গণ। একজন ‘তন্ত্রধারক’-কে সঙ্গে নিয়ে পুরোহিত পুজো শুরু করেন। প্রথমেই গঙ্গাজল ছিটিয়ে কুমারীদেবীকে পরিপূর্ণ শুদ্ধতা প্রদান করা হয়। এরপর পা ধুয়ে নিবেদন করা হয় অর্ঘ্য। অর্ঘ্য নিবেদনের পর দেবীর গলায় পরানো হয় সুগন্ধ কুসুমের মালা, ললাটে দান করা হয় সিঁদুরতিলক। পাশাপাশি দেবীর চরণে পুষ্পাঞ্জলি দিয়ে প্রাণীকূলের মঙ্গল ও কল্যাণ কামনা করা হয়। মূলত ১৬টি উপকরণ দিয়ে শুরু হয় পুজোর আচার। অগ্নি, জল, পুষ্প, বস্ত্র, বাতাস এই ৫ উপকরণে কুমারীদেবীর পুজো করা হয়। কুমারীপূজার ধ্যানমন্ত্রে আছে:
“বালরূপাঞ্চ ত্রৈলোক্য সুন্দরীং বরবর্ণিনীম।
নানা লঙ্কার নম্রঙ্গীং ভদ্রবিদ্যাপ্রকাশিনম।।
চারুহাস্যং মহানন্দহৃদয়াং শুভদাং শুভাম।
ধ্যায়েৎ কুমারীং জননীং পরমানন্দরূপিণীম।।”
অর্থাৎ, ত্রিলোকশ্রেষ্ঠা সুন্দরী, উৎকৃষ্ট বর্ণধারিণী যে বালিকামূর্তি— যার অঙ্গ নানাবিধ অলংকারের ভারে আবনত, যিনি কল্যাণকর বিদ্যার প্রকাশকারিণী, মনোহরহাস্য-যুক্তা, মহানন্দময়ী, মঙ্গলদায়িনী, মঙ্গলময়ী, পরমানন্দস্বরূপিণী— সেই কুমারীরূপী জননীকে ধ্যান করবে।

কুমারীপূজা শেষে পুরোহিত আরতি দেন এবং কুমারীস্বরূপা মায়ের জীবন্ত বিগ্রহকে প্রণাম করেন। শেষত পুষ্পাঞ্জলির মন্ত্রপাঠের মাধ্যমে পুজো সুসম্পন্ন হলে ভক্তদের মাঝে প্রসাদ বিতরণ করা হয়। এদিন ভক্ত ও পুণ্যার্থীদের জন্য মধ্যাহ্নভোজ হিসেবে আশ্রমে খিচুরির আয়োজন করা হয়ে থাকে। গরম গরম খিচুরির স্বাদ পুজোর আনন্দে অনন্যমাত্রা যোগ করে। পরিশেষে একটি কথাই উল্লেখ করব, প্রতিমায় দেবীর পুজোতে আংশিক ফল পাওয়া যায় কিন্তু কুমারীতে দেবীর প্রকাশ উপলব্ধি করে তার পুজোয় পরিপূর্ণ ফল পাওয়া যায়। শাস্ত্রের ভাষায়:
“বার্ষিক শরৎকালীন দুর্গামহাপূজাদি কম্মর্ণঃ
পরিপূর্ণ ফল প্রাপ্তি কামঃ কুমারী পূজন কম্মর্হং করিষ্যে।।”

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *