কুমায়ুন কাহিনী পর্ব ৮

মুন্সিয়ারির ডায়েরি (পর্ব ২)

ডাঃ অরিন্দম পাত্র

ঘড়িতে এখন রাত বারোটা পেরিয়ে গেছে। তারিখ ক্যালেন্ডারে ২৬ পেরিয়ে ২৭ এ অক্টোবরে পা রেখেছে।আর সবাই ঘুমে অচেতন।কিন্তু আমি সারাদিনের ক্লান্তি আর পরিশ্রম ভুলে ঠায় দাঁড়িয়ে আছি হোটেলের ঘরের জানালার এক পাল্লা খুলে ক্যামেরা নিয়ে।উদ্দেশ্য চাঁদের আলোয় পঞ্চচুল্লীর ছবি তোলা!
দিন দুয়েক আগেই কোজাগরী পূর্ণিমা গেছে,,সেদিন ছিলাম বিনসরে।আজ মুন্সিয়ারি এসে পৌঁছেছি চকৌরি হয়ে।সন্ধ্যা পর্যন্ত কাটিয়েছি নন্দাদেবী মন্দির প্রাঙ্গণে।রাতে এখন চেষ্টা চালাচ্ছি জ্যোৎস্নালোকিত পঞ্চচুল্লীকে ক্যামেরাবন্দী করার!

এই ধরনের ছবি তুলতে একটি ট্রাইপডের ব্যাবহার অত্যাবশ্যক।কিন্তু এই হোটেলের ছোট্ট ঘরে তা অসম্ভব।অগত্যা দুরু দুরু বক্ষে সাধের ক্যামেরাটিকে দোতলা’র জানালার একচিলতে সরু চৌকাঠে বসিয়ে চেষ্টা করলাম ছবি তোলার।অবশ্য ছবিটা সেরকম ভাল আসেনি।তবু সাধ্যমতো চেষ্টা চালিয়ে যা পাওয়া যায় তাই নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হবে!এছাড়া কিছু করার ও নেই!
শুধু ভাবছিলাম বাই চান্স হাত ফসকে আমার ক্যামেরা নীচে পড়ে গেলে যে কি হত,,,,!থাক,,,,এসব অলুক্ষুণে চিন্তাভাবনা আর করব না!!এবারে শুতেই হবে,,,,চোখ ঘুমে জড়িয়ে আসছে।বিছানায় ফ্ল্যাট হতে না হতেই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়লাম।
ভোর ছ’টার একটু আগে ঘুম ভেঙ্গে গেল মোবাইল ফোনের রিংটোনের আওয়াজে!!রাজকুমার ঠিক রেডি হয়ে ফোন করছে আমায়।ওর কাছ থেকে ১০ মিনিট চেয়ে নিয়ে দ্রুত রেডি হয়ে গরম জামা চাপিয়ে আর ক্যামেরা নিয়ে দে দৌড়!!আবার যাব নন্দাদেবী মন্দিরে।

ভোরে মন্দির প্রাঙ্গণ একদম ফাঁকা,,,,১-২ জন এসেছেন ভোর ভোর দেবী দর্শন করতে।ভোরের টাটকা বাতাস বুক ভরে টেনে নিলাম ভেতরে,,,,সে এক গভীর প্রশান্তির আশ্বাস এনে দিল যেন!পঞ্চচুল্লী আজ ঝকমক করছে,,,,ধীরে ধীরে ভোরের আলো পড়ছে পঞ্চচুল্লীর পাঁচ মাথায়!!স্বর্গীয় পরিবেশ!দু’রকম পরিবেশের সাক্ষী হওয়া গেল,,,,গতকাল সাঁঝবেলার নন্দাদেবী মন্দির প্রাঙ্গণ আর আজ স্নিগ্ধ ভোরবেলার মনোরম মন্দির প্রাঙ্গণ।দুইই সমান প্রিয় আমার কাছে!!
তবে আজ আর কেয়ারটেকার দাদা’র দেখা পেলাম না।ঘন্টাখানেক কাটিয়ে আর অনেক অনেক ছবি তুলে রাজকুমার কে নিয়ে ফিরে এলাম হোটেলে।কথা হল যে আবার বেরোব সকাল ১০ টা নাগাদ।গন্তব্য দারকোট গ্রাম।
অনেক আগেই শুনেছিলাম দারকোট গ্রামের কথা,,,,শুনেছিলাম বলতে পড়েছিলাম বিভিন্ন ট্র‍্যাভেল ম্যাগাজিনে।মুন্সিয়ারিতে অবস্থিত এই গ্রাম প্রসিদ্ধ ঘরে ঘরে হাতে ও মেশিনে বোনা শীতবস্ত্রের জন্য।তাও আবার ভেড়া ও বিশেষ করে খরগোসের লোম দিয়ে!
মুন্সিয়ারিতে দ্বিতীয় দিন সকালে তাই ঠিক করেছিলাম দারকোট গ্রাম দর্শনে যাব।সেইমত সকালে প্রাতঃরাশ সেরে বেরিয়ে পড়লাম।আমাদের ৭-৮ কিমি উৎরাই নামতে হবে।রাস্তা প্রচন্ড খারাপ,,,জায়গায় জায়গায় রাস্তা সারাইয়ের কাজ চলছে,,,ধ্বসের পাথর সরিয়ে..।সঠিক লোকেশন আমরা জানিনা,তাই ড্রাইভার দাদা মানুষজনকে জিজ্ঞেস করতে করতে চল্লেন।


প্রায় আধ ঘন্টাটাক পরে এসে পৌঁছলাম দারকোট গ্রাম।বড় রাস্তা থেকে প্রায় ৫০-৬০ ধাপ সিঁড়ি নেমে গেছে নীচে গ্রামের দিকে।রয়েছে দুর্গা মন্দির।কিছুটা নেমে একটি বাড়িতে প্রবেশ করলাম।গৃহকর্ত্রী বারান্দায় উপস্থিত ছিলেন।আমাদের জিজ্ঞাসু দৃষ্টি দেখে বুঝতে পারলেন আমরা পর্যটক।আপ্যায়ন করে ভিতরে বসালেন।
বারান্দায় সেলাই মেশিন টিকে দেখতে পেলাম।কথা বলে জানলাম এখানে প্রায় প্রতি ঘরেই এই কাজ হয়।বিভিন্ন দূরবর্তী স্থানেও এসব শীতবস্ত্র রপ্তানি হয়।এটিই এনাদের অন্যতম জীবিকা।

বারান্দায় তেল মেখে স্নানের প্রস্তুতি নিচ্ছিল ওনার ছোট্ট নাতি।তার বেশ কিছু ছবি তুল্লাম।ভিতরের ঘরে বসে এরপর উনি দেখালেন নানারকম শীত পোষাক….শাল,চাদর,টুপি ইত্যাদি।বেশিরভাগই খরগোস ও ভেড়ার লোম দিয়ে তৈরি।ছেলের জন্য খুব শখ করে একটি খরগোসের লোমের টুপি কিনলাম,,,,অবশ্যই দামে পোষাল তাই!আর বাদবাকি জিনিসের দাম প্রচুর!
কেনাকাটা সেরে ওনাকে ধন্যবাদ জানিয়ে আর একটু নীচে নেমে দারকোট গ্রামের দুর্গা মন্দির দেখে ফিরে চল্লাম।মুন্সিয়ারি এলে আপনারা ও একবার ঘুরে যেতে পারেন এই গ্রাম।আশাকরি খুব ভাল লাগবে।এরপর ট্রাইবাল মিউজিয়াম দেখে হোটেলে ফেরা ও দ্বিপ্রাহরিক লাঞ্চ সারা।

আজ বিকেলে পুরোপুরি বিশ্রাম!!আমাদের মুন্সিয়ারি সফর শেষের পথে।এতদিন স্বপ্ন দেখে এসেছি যে দুটো সোনালী দিনের আজ সেই দিন দুটো শেষ হতে চলেছে!!অনেক ছোটাছুটি হল এই দুদিন।আজ বিকেলে বালা প্যারাডাইজ হোটেলের ছাদে বসব মুখোমুখি শুধু আমি আর মুন্সিয়ারি।আর কেউ না!ছেলে আর ছেলের মা এখন ভাতঘুমে ব্যাস্ত।ভালই হয়েছে,,,কেউ আর আমাদের বিরক্ত করবেনা।মুন্সিয়ারির রূপ,রস,স্বাদ,গন্ধ আহরণ করব আজ প্রাণ ভরে।অদ্ভুত ছিল সেই বিকেলটা!প্রকৃতি সেদিন যেন সোনালী আলোর স্পর্শ দিয়ে মুন্সিয়ারিকে সোনা দিয়ে বাঁধিয়ে দিয়েছিল!মুন্সিয়ারি যেন হয়ে উঠেছিল  সোনার শহর এল ডোরাডো!!সোনাঝরা সেই বিকেলবেলার কথা চিরকাল মনে থাকবে আমার!তবে বিকেলে আর দেখা পেলাম না পঞ্চচুল্লীর।মেঘের আড়ালেই রইল সে!
আগামীকালের গন্তব্য কৌশানী,,,,মনকে বোঝালাম সকাল টা তো রয়েইছে বেরোনোর আগে অবধি!পঞ্চচুল্লীর সাথে এবারের মত শেষ দেখাটা হয়েই যাবে!!


Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *