কুমায়ুন কাহিনী পর্ব ৯ (শেষ পর্ব)

কৌশানির পথে…

ডাঃ অরিন্দম পাত্র

আজ ভোর ভোর ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। কারণ অনেকটা রাস্তা পেরোতে হবে আজ। প্রায় প্রতিদিনই লং জার্নির ধকল শরীর আর নিতে পারছে না। মুন্সিয়ারির দু’দিন ফুরিয়ে গেল চোখের পলকেই! ব্যাগপত্র গোছগাছ মোটামুটি সারা আছে গত রাতেই। সকাল ৮টার দিকে বেরোনোর কথা আছে।

সেই জানালাটা খুলে শেষবারের মতো মুন্সিয়ারির ভোরবেলার দৃশ্য দেখতে ইচ্ছে হল। এই দু’দিনে ওই জানালাটা আমার কাছে খুব খুব প্রিয় হয়ে উঠেছিল। আস্তে আস্তে দিনের আলো ফুটছে। আজ পঞ্চচুল্লি একদম পরিষ্কারভাবে দৃশ্যমান। ধীরে ধীরে সূর্যকিরণ পঞ্চচুল্লির পাঁচ পাহাড় মাথায় পড়ল এবং কি অদ্ভুত সুন্দর এক দৃশ্যপটের সূচনা করল! ক্ষণিকের জন্য মনে হল, পাঁচ পাহাড় মাথা যেন চুল্লির মতো গনগনে আগুনে প্রজ্বলিত হয়ে উঠল। এই দৃশ্যপট স্থায়ী হল হয়তো ১ মিনিট বা ৩০-৪০ সেকেন্ড। ঘড়ির হিসাব রাখিনি। কারণ চোখ তখন ক্যামেরার ভেতর দিয়ে সেই অভূতপূর্ব দৃশ্য লেন্সবন্দি করতে ব্যাস্ত। কিছুক্ষণের জন্য যেন মনে হল পাঞ্চালী তাঁর পঞ্চস্বামীর জন্য সত্যিই গনগনে আঁচে রান্না চাপিয়েছেন পঞ্চচুল্লিতে।

তারপর ধীরে ধীরে সোনা রোদ খেলে গেল আর পঞ্চচুল্লি ঝকমক করে উঠল দিনের আলোয়। মনে মনে ভাবলাম— “সব ভালো তার, শেষ ভালো যার”… মুন্সিয়ারি ছেড়ে যাওয়ার আগে পঞ্চচুল্লির দুর্ধর্ষ রূপ দর্শন করতে পারলাম। সত্যিই এমন ভাগ্য ক’জনের হয়? মনে কোনও অপূর্ণতার ছিটেফোঁটাও রাখল না আমার সাধের মুন্সিয়ারি।

হোটেল থেকে চেকআউট করে মালপত্র গাড়িতে তুলে বেরিয়ে পড়লাম এবার কৌশানির উদ্দেশ্যে। সুদীর্ঘ রাস্তা। তবে আমাদের সারথি রাজকুমার বললেন, একটু অপ্রচলিত বা স্বল্প পরিচিত রাস্তা ধরে ও নিয়ে যাবে। যার ফলে প্রায় ৫০ কিমি রাস্তা বাঁচানো সম্ভব হবে।

তা এরকম চোখজুড়োনো রাস্তা বড় একটা দেখা যায় না। মুন্সিয়ারি থেকে কৌশানি যাবার পথের কথা বলছি। থল যাওয়ার রাস্তা দিয়ে না গিয়ে রাজকুমার চললেন ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে অন্য রাস্তা দিয়ে। এই রাস্তায় গাড়িঘোড়া বেশ কম। নেই বললেই চলে। কিন্তু রয়েছে অপরিসীম সৌন্দর্য। চলতে চলতে রাস্তায় পড়ল হঠাৎ একটা বাঁক, যার দু’দিকেই খাদ। সাধারণত পাহাড়ি রাস্তায় একদিকে পাহাড় আর একদিকে খাদ পেতেই অভ্যস্ত আমরা। তাই এই একটু অন্যরকম দৃশ্যের স্বাদ আহরণে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়া গেল আর তারিয়ে তারিয়ে দূরের হিমালয়ান রেঞ্জের দৃশ্যসুখ উপভোগ করা গেল। তারপর ক্ষণিকের বিশ্রাম শেষে ফের পথ চলা শুরু…

এইভাবে কতক্ষণ যে চলেছি খেয়াল নেই। কারণ তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলাম। রাজকুমারের ডাকে ঘুম ভাঙল আমার। দূরে দেখা যাচ্ছে বৈজনাথ মন্দির। তার মানে কৌশানি আর বেশি দূরে নেই। মাত্র ১৯ কিমি। কিন্তু গোটা শরীরে ক্লান্তি এতটাই থাবা বসিয়েছে যে আর বৈজনাথ মন্দির দর্শন করতে যেতে পারলাম না কেউ। দূর থেকে প্রণাম জানিয়ে এবং পাখির চোখে বৈজনাথ মন্দিরের ছবি তুলে ফিরে চললাম কৌশানির উদ্দেশ্যে।

কৌশানিতে আমাদের গন্তব্য হোটেল কৃষ্ণা মাউন্টভিউ রিসর্ট। বেশ অনেকটা চড়াই উঠে তারপর এই রিসর্টটি। প্রথমে বুঝতে পারিনি, পরে বুঝলাম গান্ধি আশ্রম বা অনাসক্তি আশ্রমের ঠিক পাশেই আমাদের আস্তানা। গাড়ি পার্ক করে, রাজকুমারের খাওয়ার বন্দোবস্ত করে ঘরে চেকইন করলাম। সত্যিই মাউন্ট ভিউ। সার্থকনামা আমাদের রিসর্টটি। ঘরের বারান্দা থেকেই পরিষ্কারভাবে দৃশ্যমান হিমালয়ান রেঞ্জ। সামনে বিস্তৃত সুন্দর সাজানো বাগান আর বসার ব্যবস্থা। আর সেখানে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন প্রচুর হনুমানের দল। রুম সার্ভিসে ফোন করে লাঞ্চ আনানো হল। সার্ভিস ম্যান বলে গেলেন যে খাওয়া হয়ে গেলে বাসনকোসন যেন বাইরে না বের করি আর রুমের দরজা যেন খোলা না রাখি। কারণ হঠাৎ তেনারা ঘরে ঢুকে পড়তে পারেন।

কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়া গেল দ্বিপ্রাহরিক আহারাদি সেরে। এপাশ ওপাশ খানিকক্ষণ বিছানায়। তারপর ফের উসখুশ করতে লাগল মন। দরজাটা টেনে বন্ধ করে চললাম পাশেই গান্ধি আশ্রমের উদ্দেশ্যে।

হোটেল থেকে বেরিয়ে বাঁ-দিকে টার্ন নিয়েই পঞ্চায়েত সমিতির রেস্ট হাউজের পাশ দিয়ে কয়েক পা গেলেই গান্ধি আশ্রম। কালো পাথরের তৈরি জাতির জনকের মূর্তি দণ্ডায়মান। আশ্রম চত্বরে এখনও অতটা ভিড় জমেনি। পাশেই উঁচু একটা জায়গা, যেখানে সুন্দরভাবে সব হিমালয়ান শৃঙ্গের ছবি আঁকা রয়েছে পর পর। পাশে লেখা ‘হিম দর্শন’। বেলা প্রায় চারটে বাজে। ত্রিশূল পর্বতে তখন সোনা রঙের রোদ পড়ে পুরো সোনার পাহাড়ের মতো লাগছে। ক্যামেরার লেন্সের জুম বাড়িয়ে পর পর অনেক শৃঙ্গই দেখা গেল। অত নাম জানিও না। কয়েকটা জানি। যেমন— নন্দাদেবী, নন্দাঘুন্টি, চৌখাম্বা, কেদারডোম ইত্যাদি আর অবশ্যই আমার সবচেয়ে প্রিয় পঞ্চচুল্লি। তবে কোনটা কি পিক বলা খুব মুশকিল। একমাত্র পঞ্চচুল্লিকে একবার দেখেই চিনতে পারব। আর চিনেছি ত্রিশূল! শুনেইছিলাম যে কৌশানি থেকে ত্রিশূল সবচাইতে স্পষ্টভাবে দেখা যায়।

ইতিমধ্যে আশ্রম চত্বরে ভিড় বাড়ছে আস্তে আস্তে। একপাল হনুমান আর একদল কুকুরের ঝগড়া জমে ওঠার মুখে প্রায়। আমি ফোন করে মিসেস আর ছেলেকেও ডেকে নিলাম। সবাই এখন উন্মুখ এক সুন্দর সূর্যাস্তের সাক্ষী হবার জন্য। ত্রিশূল ধীরে ধীরে সোনা রং থেকে কমলা ও লাল রঙের হয়ে উঠল। ক্যামেরার শাটার চলছে ক্রমাগত খচাখচ। হঠাৎ ডানদিকে ক্যামেরা ঘুরিয়ে অবাক হয়ে গেলাম। সেই পঞ্চ পান্ডবের প্রিয় পঞ্চচুল্লি রক্তিম বর্ণ ধারণ করে যেন আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। যেন ঈশ্বরপ্রাপ্তি হল আমার। মনে মনে ভাবলাম, মুন্সিয়ারি ছেড়ে এলেও আবার একবার পঞ্চচুল্লির দেখা যে পেলাম, এ আমার পরম সৌভাগ্য।

এরপর ফিরে যাওয়ার পালা। সূর্যাস্তের মনোরম দৃশ্যের নাট্যাভিনয় পর্ব আজকের মতো শেষ। এরপর রাজকুমারের গাড়ি চেপে একটু নীচের দিকে নেমে কৌশানির বিখ্যাত শাল সম্ভারের সাক্ষী হবার পালা। অবশ্যই গ্যাঁট হালকা হবার পালা এবার। তবে আমি আজ কল্পতরু। স্বর্গীয় দৃশ্য লেন্সবন্দি করতে পেরে শালের দোকানে একটু-আধটু খরচ করতে আমার আর আপত্তি ছিল না।

হোটেলে ফিরে রাতের কৌশানির নিস্তব্ধতা উপভোগ করলাম। ঘরেই ডিনার সারা হল। বাইরে বেরোনোর কোনও প্রশ্নই নেই। পাশেই ঘন জঙ্গল। শুনলাম, অনেক সময় এক আধটা চিতাবাঘও ছিটকে এদিকে চলে আসতে পারে। রাতের ঘুমটা ভারী কম্বল জড়িয়ে মন্দ হল না।

পরের দিন ভারাক্রান্ত মনে বিছানা ত্যাগ করতে হল। কুমায়ুন ভ্রমণ শেষ। ফিরে যেতে হবে আজ রাজধানী দিল্লি। অনেকটা পথ… কিন্তু এতদিনে দীর্ঘ পথযাত্রা অভ্যাসের পর্যায়ে পড়ে গিয়েছিল।

মনে মনে ভাবলাম, সত্যিই আমাদের দেশ কত শত প্রাকৃতিক মণিমুক্তায় সজ্জিত! কুর্নিশ জানিয়ে বলতে ইচ্ছে হল—

“এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি,
সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি।”

আমার ‘কুমায়ুন কাহিনী’ ফুরোল আর নটে গাছটিও মুড়োল।


Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *