ঘুরতে ঘুরতে লাদাখ (প্রথম পর্ব)

নীলাঞ্জনা মাহাত

যে কথা আগে বলব

পুরনো ছবি স্মৃতির দ্বার খুলে দেয়। মৃদু আলতো টোকায় নয়, দমকা হাওয়ার মতো এক ধাক্কায়। আলো পড়ে এখানে ওখানে। স্মৃতির অবয়ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কখনও বা শুধু আদলটুকুই।

এ গল্প ২০১৮-র। বেড়িয়ে এসে ভেবেছিলাম কিছু ছবি পোস্ট করব, স্বপ্নের দেশে গিয়েছিলাম, স্বপ্নপূরণের কথা কোথাও লিখে রাখব। নিজের জন্যই। খুঁটিনাটি ভুলে যাব। তা আলসেমিরই জয় হয়েছিল। কিছুই করিনি। গত কয়েকদিন ধরে পুরনো ছবি ঠিকঠাক করে হার্ড ডিস্কে ফোল্ডারবন্দি করতে গিয়ে টাইমমেশিনে চড়ে ধাঁ করে পেছনে চলে গেলাম। প্যান্ডোরার বক্স খুলে গেল। অনেক নাম-ধাম তথ্য ভুলে গেছি, কিন্তু ওই যে বললাম, অবয়ব রয়ে যায়। কখনও বা দেখছি একটু ভাবলেই পর পর অনেককিছু মনে পড়ছে। ক্যামেরার লেন্স জুম করার মতো। প্রথমে আবছা-আবছা, তারপর স্পষ্ট আকার নিচ্ছে। তাই এই চেষ্টা। আর এক্ষেত্রে ভেবেছি, যেমন যেমন ভাবনারা আসবে, তেমন তেমনই লিখব। Association of thoughts. মানে ধান ভানার থেকে শিবের গীত বেশি গাইব। মিনহাজদা-জয়তী, আমার দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধু, কলেজ-জীবনের সময় থেকে, প্রায়ই আমাকে যা খুশি হাবিজাবি লেখার কুপরামর্শ দিয়ে থাকে, তাই গালাগালি এদের প্রাপ্য।

লাদাখের ডিস্কিট মনাস্টেরি। ছবি লেখক

ক্যামেরায় আমি স্বচ্ছন্দ নই। ভালো ছবি তুলতে পারি না। আমি অনেক জায়গাতেই নিজে চোখে দেখছি, এই ব্যাপারটিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছি। তাই আগে বেড়াতে গিয়ে অনেকবারই হয়েছে, আমি অল্প কয়েকটা ছবি তুলেছি, ভেবেছি সঙ্গীরা ভাল ক্যামেরায় ভালো ছবি তুলছে, ওই ক’টা নিয়ে নেব, যথেষ্ট। এইবার প্রথম মনে হয়েছিল— “ইসস, আমি যদি একটু ভালো ছবি তুলতে পারতাম!” চোখ দিয়েই মন প্রাণ ভরেছি। কিন্তু সঙ্গে রাখতেও ইচ্ছে হয়েছিল ছবির মাধ্যমে। শুধু এই কারণেই আরও অন্তত একবার ক্যামেরা নিয়ে ফেরত যাবার ইচ্ছে আছে এখানে। লাদাখে। খানিক ক্যামেরার কসরত বুঝে। স্বপ্নের দেশও এত সুন্দর হয় না। স্বর্গ দেখিনি, মানে এখনও সুযোগ ঘটেনি, সেও হার মেনে যাবে, নিশ্চিত।

লাদাখ দু’হাত বাড়িয়ে ডাকে। ছবি লেখক

আমি অবসর সময়ে ম্যাপ দেখতে, কোনও জায়গা সম্বন্ধে পড়তে ভালোবাসি। কত কত জায়গা, অচেনা পথ মনের মধ্যে ভিড় করতে থাকে। কোন জায়গা কোন ঋতুতে গেলে ভাল, কী কী করলে ভালো, কী কী খেতে ভালো, কোন বিশেষ জিনিস যা ওখানে ছাড়া দেখা যায় না, পাওয়া যায় না এই সব কিছুই। যে জায়গা জীবনেও যেতে পারব না, সে জায়গা সম্বন্ধেও পড়ি। আমার ভ্রমণসঙ্গীরা লম্বা ট্যুর প্ল্যান করার সময় বেশিটাই আমার ওপর ছেড়ে দেয়। ব্যাপারটা এরকম দাঁড়ায়, “শোন, এই জায়গাটায় রাতে থাকব ভাবছি। এই এই কারণে।” উত্তর আসে, আচ্ছা, ওখানেই থাকব তা’লে। এই হচ্ছে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আলোচনা। তার একটা বিশেষ কারণ অবশ্য, আমার হাতে কিঞ্চিৎ সময় বেশি থাকে অন্যদের থেকে। ফলে এই বিষয়ক পড়াশোনার সুযোগ বেশি। জ্ঞান দেওয়ারও। ওরাও নিশ্চিন্ত থাকে যে জিনিসগুলো জানার দরকার, সে আমি জেনে ফেলেছি। বেড়ানোর এমনি গপ্প অবশ্য প্রচুর হয়, হ্যান করেঙ্গে, ত্যান করেঙ্গে। এই প্ল্যান করার সময় থেকেই আসলে বেড়ানো শুরু হয়ে যায়! মনে মনে। রোজকার দিনযাপনে একটু একটু করে। এটা ঠিক, ইন্টারনেট সহজলভ্য হওয়ার পর জরুরি তথ্য জানা সহজ হয়েছে। সবকিছু বুকিং অনলাইন সম্ভব হচ্ছে। আমাদের অনেক সুবিধে হয়েছে।

সিন্ধু সভ্যতা যার নামে সেই সিন্ধু নদ। ছবি লেখক

আবার এমনও হয়েছে, কিছু জানতাম না আগে থেকে, স্রেফ মনে হল, সেখানে চলে গেলাম। একবার যেমন আমরা পুরী থেকে কোণারক যাচ্ছি, গাড়ি করে যাচ্ছি। মিনহাজ-জয়তীরা ছিল সঙ্গে। রাস্তায় জানালা দিয়ে একসময় দেখি, বাঁ-দিকে অনেকগুলো নৌকো বাঁধা আছে। কুশভদ্রা নদীতে। যেখানে কাছাকাছি ওই রামচণ্ডী দেবীর মন্দির আছে। আমি শুধু একবার বললাম, “আচ্ছা, একটু নৌকোয় চাপলে হয় না?” মিনহাজদা বাঁ-দিকে একবার দেখল, তারপর বলল, “চল, ঘুরে আসি”। গাড়ির চালক তাজ্জব। তার আমাদের শুধু ড্রপ করার কথা। পুরী স্টেশন থেকে কোণারক হোটেল। তাকে এক্সট্রা টাকা দিয়ে বসিয়ে রাখা হল, আমরা ঘণ্টাখানেক ধরে বাচ্চা বুড়ো সবাই মিলে নৌকা করে ঘুরে এলাম। কুশভদ্রা নদীর মোহনায়। সেই ট্রিপে সেই জায়গাটাই সবার খুব পছন্দ হয়েছিল।

কুশভদ্রা… ছবি সৈয়দ মিনহাজ হোসেন

উলটোটাও ঘটে। ওই ট্রিপেই কোণারকে ওড়িশা ট্যুরিজমের হোটেলের রিশেপশনে দেখলাম, বিভিন্ন দ্রষ্টব্য জায়গার হদিশ দিয়ে একটা বোর্ড। বাকিগুলো চেনা, সিলেবাসের কমন, একমাত্র অচেনা হল একটি বৌদ্ধস্তূপের ভগ্নাবশেষ। ঐতিহাসিক স্থানেও আমাদের সবিশেষ উৎসাহ থাকে। অবশ্য কোথায় না থাকে! আমরা মোটামুটি ওড়িশায় বৌদ্ধস্তূপ মানেই অশোক, কলিঙ্গ যুদ্ধ ইত্যাদির কথা মনে রেখে শিহরিত হলাম। একটাই খচখচানি, এতদিন নাম শুনিনি কেন! দুপুরবেলা খাওয়া-দাওয়া সেরে বেরোলাম। হোটেল থেকে ৮-১০ কিমি হবে। একেবারেই নাম ভুলে গেছি। এর আগে সারনাথ গেছি, নদিয়ার বল্লালঢিপিও দেখেছি। অল্প অল্প ধারণা আছে কীরকম দেখতে হতে পারে। তা অনেক লোককে জিজ্ঞেস করে যখন পৌঁছলাম, হতাশই হলাম। গ্রামের বাচ্চারা আশেপাশে খেলছে। খুব পুরনো কিছু সেটাও দেখে বোঝা যাচ্ছে না। চওড়া পাঁচিলের মতো অংশ। কিছুটা জায়গা ঘিরে আছে। এরকম হতাশ আর কোনও জায়গায় কখনও হয়েছি বলে মনে পড়ে না। কোনও সাইনবোর্ড ইত্যাদি কিস্যু ছিল না। তবে হ্যাঁ, রাস্তাটা খুব সুন্দর ছিল। পড়ন্ত বিকেলে দু’পাশে মাঠ, ঘাট, জঙ্গল পেরিয়ে। ওটাই পাওনা। এই গাড়ির ড্রাইভারও মনে মনে আমাদের পাগল ঠাউরেছিল নিশ্চয়। গ্যাঁটের পয়সা খরচা করে পাঁচিল দেখতে কেউ আসে! বাচ্চাদের নিয়ে! বাচ্চা তিনটে, যাদের বয়স ৪, ৭, ১০। এই যাহ, অনেকটা ট্র‍্যাকের বাইরে চলে গেছি। ফেরত আসি। কাট টু লাদাখ ট্রিপ।

সেই বৌদ্ধস্তূপ… ছবি সৈয়দ মিনহাজ হোসেন

লাদাখ যাওয়ার স্বপ্ন আমার বহুদিনের। স্বপ্নই বলব, কারণ ২০০৩ থেকে চাকরি করতে শুরু করলেও শারীরিক কিছু সমস্যার কারণে যেকোনও যাতায়াতই অসুবিধেজনক ছিল। বেড়াতে যাওয়া ব্যাপারটা সম্ভবপর ছিল না। পরবর্তীকালে অর্থোপেডিক সার্জারির পরে সেই সমস্যা অনেকটাই কমে যায়। আর আমি মুক্ত বিহঙ্গের মতো ঘুরে বেড়াই। All credit goes to Dr. V. C. Bose.

শমিতাদির উপহার দেওয়া সেই ইয়াক

আমি তখন সিউড়িতে চাকরি করি, শমিতাদি আমার কলিগ। শমিতাদি-অরণিদা সেবার পুজোর ছুটির ঠিক আগে আগে, সম্ভবত ২০০৫ সাল, লাদাখ গেলেন। শমিতাদি-অরণিদাকে নিয়ে আলাদা প্রবন্ধ, বড় গল্প, মায় উপন্যাস পর্যন্ত লিখে ফেলতে পারি। কিন্তু আমার ঠেঙ্গানির ভয় যথেষ্ট। তাই কিছু না বলাই সমীচীন। আমি দু’জনেরই খুব স্নেহের পাত্রী। শমিতাদি আমার বন্ধুও হন। প্রচুর আড্ডা মারতাম তখন। বেড়াতে যাওয়ার আগে তাদের কাছে বায়না ধরেছিলুম, আমাকে একটা ইয়াক ছানা লাদাখ থেকে এনে দিতে হবে। দিদি পড়ল খুব মুশকিলে। দিদি পার্থিব বস্তু, উপহার এসব আদানপ্রদানে একেবারেই বিশ্বাসী নন। সামাজিক উপহার দেওয়ার চল যেখানে আছে, বিয়েবাড়ি ইত্যাদি, সেখানে বই দেন। আমাকে একবার এমনিই হাঁসের পালক দিয়েছিলেন। তখন হাঁস পুষতেন বাড়ির পুকুরে। কিন্তু এবার কি করবেন! জ্যান্ত ইয়াক ছানা আনা সম্ভবপর হলে তাই করতেন। শেষপর্যন্ত আমার জন্য লেহ মার্কেট থেকে পাথরের একটা ইয়াক নিয়ে এলেন। আর অনেক অনেক গল্প। An another world of different geographical terrain. আর সেই খান থেকেই আমার স্বপ্নের শুরু। স্বপ্নের সফরেরও…

চলবে…

নীলাঞ্জনার ছোটবেলাটা কেটেছে ঝাড়গ্রামে। গাছপালা আর পাহাড় জঙ্গলের প্রতি ভালোবাসার শুরু সেখান থেকেই। আর আছে ঘুরে বেড়ানোর নেশা । পেশায় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালযের অঙ্কের অধ্যাপক নীলাঞ্জনা অবসর সময়ে ভালোবাসে গান শুনতে আর বই পড়তে। স্বভাবসিদ্ধ গল্প বলার গুণে নীলাঞ্জনার বেড়ানোর গল্পগুলো নিছক ভ্রমণকাহিনির বাইরে এক অন্য মাত্রা পায়।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *