ঘুরতে ঘুরতে লাদাখ (দ্বিতীয় পর্ব)

নীলাঞ্জনা মাহাত

লাদাখ, স্থানীয় তিব্বতি উচ্চারণে লাদাক, হিন্দি/উর্দুতে লোকমুখে ‘ক’ উচ্চারণ ‘খ’ হয়ে গেছে, আমি ‘খ’-কেই ধরেছি। লাদাখ বর্তমানে জম্মু-কাশ্মীরের এক অংশ হলেও সব সময় তা ছিল না। আলাদা অস্তিত্ব ছিল। এখন লাদাখের পুব দিকে তিব্বত, পশ্চিমে পাকিস্তান, দক্ষিণে হিমাচলপ্রদেশ, আর উত্তরে কারাকোরাম পাস, চিন। সীমানা নিয়ে প্রচুর বিতর্ক আছে, উত্তর আর পুব দিকে। চিন আর পাকিস্তানের দখলে আছে এর বেশ কিছু অংশ। সীমানা নিয়ে এই ঝামেলা ১৯৪৭-এর সময় থেকে শুরু। এখনকার নয়। এইসব সীমান্ত সমস্যার কারণে লাদাখ মিলিটারি অধ্যুষিত অঞ্চল। মিলিটারি সদা সজাগ। লাদাখের বেশ কিছু অংশে যাওয়ার জন্য ভারতীয়দেরও পারমিট করাতে হয়। কিছু অংশে কারোর যাওয়ার অনুমতি নেই।

আরও পড়ুন: ঘুরতে ঘুরতে লাদাখ (প্রথম পর্ব)

যেদিকে তাকাই নানা রঙা পাহাড়

একসময়ে লাদাখের অবস্থান ছিল যাকে বলে স্ট্র্যাটেজিক। যে বাণিজ্যপথ ধরে আগে এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ব্যবসা হত, সেটি লাদাখের মধ্যে দিয়ে গিয়েছিল। লেহ শহর ছিল এই রেশম পথের এক গুরুত্বপূর্ণ শহর। এই অঞ্চল ভারতকে একদিকে মধ্য এশিয়া, অন্যদিকে তিব্বতের মধ্যে দিয়ে চিনের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছিল। এই কারণে লাদাখের আলাদা গুরুত্ব ছিল। ১৯৪৯ সালে চিন তিব্বতের দিকের পথটি বন্ধ করে দেয়। বাণিজ্যও বন্ধ হয়।

রুক্ষ লাদাখ মালভূমি

লাদাখের ভূপ্রকৃতি ভারতের অন্য অংশের থেকে একদম আলাদা। এখানের বেশিরভাগ অংশের উচ্চতাই ৩০০০ মিটার (৯৮০০ ফুট)-এর বেশি। সর্বোচ্চ শৃঙ্গের উচ্চতা ২৫০০০ ফুট প্রায়। সাধারণত হিমালয় পাহাড়ে গেলে দেখি সংকীর্ণ রাস্তার একপাশে খাদ, অন্যদিকে পাহাড়। কিন্তু লাদাখে অনেক জায়গাতেই রাস্তা সমান, খাদে পড়ার ভয় নেই অথচ উচ্চতা ১০ হাজার ফুট। একদম অন্যরকম। গাড়িতে সিঁটিয়ে বসার দরকার হয় না। আসলে লাদাখ ভারতের উচ্চতম মালভূমি। এই মালভূমি অঞ্চল হিমালয় থেকে কুনলুন পর্বত শ্রেণি পর্যন্ত বিস্তৃত। এখানকার পর্বত শ্রেণি তিব্বত হিমালয় বা ট্রান্স-হিমালয়ান রেঞ্জ নামে পরিচিত। এর মধ্যে কারাকোরাম রেঞ্জ লাদাখ অঞ্চলের উত্তরে। লাদাখ রেঞ্জ, জান্সকার রেঞ্জ লাদাখে। আর কৈলাস পর্বতশ্রেণি তিব্বতে। শিবের আবাসভূমি হিসেবে যে কৈলাস পর্বত বিখ্যাত। হিমালয় আড়াল করে থাকে বলে মৌসুমি বায়ু লাদাখে ঢুকতে পারে না। তাই এটি বৃষ্টিছায় অঞ্চল। বৃষ্টি নামমাত্র হয়। সেই অর্থে শীতল মরুভূমি। শীতে যে বরফপাত হয়, সেই গলা জলই এখানের জলের উৎস। চাষবাস ওতেই হয়, যা সম্ভব। লাদাখ ভারতের অন্যতম জনবিরল এলাকা। লাদাখে গাছপালা কম, অতি উচ্চতার জন্য বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ কম। তাই সমতল থেকে এক ধাক্কায় দশ হাজার ফিটের ওপর উঠলে Accute Mountain Syndrome (AMS) বা Altitude sickness হতে পারে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে এটি প্রাণঘাতী। তাই লাদাখ যাওয়ার সময় একটু সতর্ক থেকে শরীরকে সইয়ে নিতে হয়। লাদাখের বিস্তীর্ণ অঞ্চল বছরের বেশ কয়েকমাস বরফপাতের জন্য ভারতের অন্য অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে।

লাদাখের অনেকগুলো পাসের মধ্যে একটা, হামবোটিং লা। ছবি: সাগ্নিক সিংহ

লাদাখ শব্দের অর্থ হল ‘Land of High Passes’। তিব্বতি ভাষায় ‘লা’ হল ‘পাস’। এই ‘পাস’ শব্দটা শুনলেই কেমন একটা এড়িয়ে এড়িয়ে যাওয়া মনে হয়। ব্যাপারটা পর্বতশ্রেণির ক্ষেত্রেও তাই। আকাশচুম্বী পর্বত যেখানে লঙ্ঘন করা দুঃসাধ্য, প্রকৃতি কোথাও কোথাও রাস্তা রেখেছে। হতে পারে, অত্যন্ত দুর্গম। কিন্তু পথ আছে। এগুলোই দু’দিকের যোগাযোগের মাধ্যম। এইরকম ‘পাস’ লাদাখে অনেকগুলো আছে, তাই এমন নাম। ভারতবর্ষের ইতিহাস বলছে, ভারতের অতীত রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেছে উত্তর-পশ্চিম ভারতের ‘পাস’গুলিই। ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগের সঙ্গে সঙ্গে বহির্শত্রুর আক্রমণ বারে বারে হয়েছে এই পথ দিয়েই। ‘শক হুণ দল পাঠান মোগল’ এই পথে এসেই লীন হয়েছে। ‘খাইবার পাস’ এইরকম একটি পাস! উত্তরে হিমালয়, তিন দিকে সাগর ঘিরে থাকায় এই ভারত ভূখণ্ডে প্রবেশের রাস্তা খুব কমই ছিল। মনে রাখতে হবে তখনকার ভারতবর্ষের বিস্তার বর্তমানের রাজনৈতিক মানচিত্রের থেকে আলাদা। যে হিসেবে বর্তমান আফগানিস্থানও ভারতবর্ষের অংশ ছিল। যদিও ভারত ভূখণ্ড হিসেবে এখন যা বুঝি, তখন তা ছিল না। অনেক ছোট বড় রাজ্যে ভাগ ছিল। দেশ গড়ে ওঠেনি।

লাদাখের প্রাণধারা সিন্ধু

লাদাখ বেড়াতে যাওয়ার ইচ্ছে তো মনের মধ্যে ঘাঁটি গেড়ে বসে আছে। কিন্তু ব্যাপারটা ঠিক দিঘা-পুরী যাওয়ার মতন নয়। যে ইচ্ছে হল, দু’চারটে ফোন করলাম, ব্যাগ গোছালাম আর বেরিয়ে পড়লাম। লাদাখ যাওয়ার বিশেষ সময় আছে, মানে যারা সাধারণ মানুষের মতো ঘুরতে যায়। আবহাওয়া যখন সইয়ে নেওয়ার মতো অনুকূল থাকে, আমআদমি তখনই যাওয়া পছন্দ করে। বলা বাহুল্য, আমি ওই ক্যাটেগরি। বছরের সবসময় গাড়ির রাস্তা খোলা থাকে না। প্লেনে অবশ্য সারাবছরই যাতায়াত করা যায়! রাস্তা মে-জুন থেকে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর। পুরোটাই আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে। বন্ধুবান্ধবদের মাঝে মাঝেই জিগাই, ”ওরে, কবে যাবি রে?” কারোর ছুটির সমস্যা, কারোর বাচ্চা ছোট, কারোর পকেট ফাঁকা, এইসব বহুবিধ সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণে সঙ্গীর অভাবে যাওয়া ভেস্তে যাচ্ছিল। এদিকে সিজন শুরু হলেই কম্পিউটারের স্ক্রিন উপচে উপচে পড়তে থাকে লাদাখের প্যাকেজ ট্রিপের রংচঙে ছবিওয়ালা বিজ্ঞাপন।

শয়ক নদী উপত্যকা

গুগলে একবার যদি কেউ কোনও কিছুর সার্চ করে থাকে, গুগল ব্যাটা আর তাকে ভুলতে দেবে না। বিভিন্ন ওয়েবসাইটের লোভনীয় বিজ্ঞাপন ক্রমাগত আসতেই থাকবে। চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে থাকবে যতক্ষণ না সে সমাধিস্থ হবে অথবা কিনে ফেলবে। সেইসব ডিল দেখলে মুনিদেরও মতিভ্রম হয়, আমি কোন ছাড়! তাই নিরুপায় হয়ে লাদাখের দু-তিনটে স্থানীয় ট্র‍্যাভেল এজেন্টদের সঙ্গে কথা চালাচালি শুরু করলাম। লাদাখে শারীরিক সমস্যা (মূলত অতিউচ্চতা-জনিত AMS) হলে অসুবিধেয় পড়ব, স্থানীয় সাহায্য দরকার হতে পারে, এইসব ভেবে এই ট্রিপের দায়িত্ব কোন নির্ভর‍যোগ্য ট্র‍্যাভেল এজেন্সিকে দিতে চেয়েছিলাম। কতদিন লাগতে পারে, আমি যেরকমভাবে যেতে চাই, ঘুরতে চাই, কতটা খরচ হবে, সেই আন্দাজ, ভাবনাচিন্তা মাথায় আগে থেকেই ঘুরঘুর করছিল। দিল্লিবাসী বন্ধুরা যারা ঘুরে এসেছে, তাদের সঙ্গেও এ ব্যাপারে কথাবার্তা হয়। এদিকে একদম অচেনা লোকেদের সঙ্গে ঘুরতে যেতেও কিঞ্চিৎ খচখচ করছিল। বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে নিয়েই যাই কিনা!

পথের দু’প্রান্তে

এইসময় মুশকিল আসান হিসেবে হাজির হলেন আমার এক কলিগ। সাগ্নিক স্যার। ডিপার্টমেন্টের নিকনেমে এস এস। তিনিও ঘরে বসে থাকতে পারেন না! কাঁধে ক্যামেরা আর পায়ের তলায় সর্ষে। এবার তিনি সঙ্গী হলেন এই ট্রিপে। তাঁর ঘনিষ্ঠ এক বন্ধু, গৌতমদার লাদাখে পরিচিতি ছিল, সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধে হল। কিছু দরকারি পরামর্শও দিলেন গৌতমদা। ব্যস, বাকি রথ গড়গড়িয়ে চলল। গৌতমদার পরিচিতির সূত্রেই কিছু বিশেষ সুবিধা আমরা পেয়েছিলাম, এটা স্বীকার করে রাখি। বুকিং ইত্যাদি সারা হল। তার মানে লাদাখ যাচ্ছি। সত্যি সত্যি!

প্যাংগং লেক। পাহাড়ের রেঞ্জ ও প্যাংগং

চলবে…

নীলাঞ্জনার ছোটবেলাটা কেটেছে ঝাড়গ্রামে। গাছপালা আর পাহাড় জঙ্গলের প্রতি ভালোবাসার শুরু সেখান থেকেই। আর আছে ঘুরে বেড়ানোর নেশা। পেশায় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালযের অঙ্কের অধ্যাপক নীলাঞ্জনা অবসর সময়ে ভালোবাসে গান শুনতে আর বই পড়তে। স্বভাবসিদ্ধ গল্প বলার গুণে নীলাঞ্জনার বেড়ানোর গল্পগুলো নিছক ভ্রমণকাহিনির বাইরে এক অন্য মাত্রা পায়।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *