লক্ষ্মী বা অলক্ষ্মীপাড়ায়, ১৯৬৪-র একদিন

তমাল রায়

‘বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত ও গুপ্তপ্রেস পঞ্জিকার তফাতে বাঙালি সিদ্ধান্তহীনতার নাভিশ্বাসে পড়ে শেষমেশ মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল চন্দ্র সেনের শরণাপন্ন হয়। অকৃতদার আরামবাগের গান্ধির আবার সমস্যা হল, তিনি ওপার বাংলার খুলনার মানুষ হলেও দীর্ঘদিন হুগলি জেলারও মানুষ। মানে সে অর্থে তিনি একইসঙ্গে বাঙাল ও ঘটিও। তবু শাস্ত্রজ্ঞদের ডেকে পাঠিয়েছিলেন মহাকরণে। বিপত্তির কারণ দুর্গাপুজোর বিজয়া দশমী এবার দু’দিন পড়েছে। অতএব কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো তাহলে কবে? শেষমেশ উভয়পক্ষের বাক্‌বিতণ্ডায় যখন সভা প্রায় ভণ্ডুলের পথে, তিনিই জানান— প্রথম বিজয়া দশমীর দিনকে ন্যায্য মান হিসেবে ধার্য করেই কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো পালিত হবে। সেই হিসেবে আজই বাংলার ঘরে ঘরে পালিত হচ্ছে লক্ষ্মীপুজো।

আরও পড়ুন: হয়ে উঠুন আপন প্রাণের লক্ষ্মীর পূজারি

প্রভূত খাদ্যসংকটের কারণে শ্রীসেন ইতিমধ্যেই জনপ্রিয়তা হারিয়েছেন।  ইতিমধ্যে তাঁর স্বভাব সারল্যে বলে ফেলা কথা, ‘কাঁচকলা অত্যন্ত পুষ্টিকর ও সস্তার খাদ্য। কাঁচকলার চাষ করুন। এবং খান। খাদ্যসংকট মুক্ত থাকুন।’ এই কথা তো প্যারোডিতে পরিণত হয়েছে। লোকমুখে শ্রীসেন এখন কাঁচকলা সেন নামেই পরিচিত। সে কথা তাঁর কানেও পৌঁছেছে।  প্রবীণ এই স্বাধীনতা সংগ্রামী স্বাভাবিকভাবেই আহত। যদিও কিঞ্চিৎ যুক্তি পেশ করতে গিয়েছিলেন, যে ত্রৈলোক্যনাথ যখন গাজর চাষ করতে শেখান দেশের মানুষকে, কই তখন তো তিনি খারাপ হন না! আমি বললেই খারাপ? তাতে তেমন লাভ হয়নি। অতএব বিষণ্ণ মনে মুখ্যমন্ত্রী শ্রীসেন আপাতত ছুটি কাটাচ্ছেন মাসেঞ্জরে। দশ দিনের নির্ভেজাল ছুটি। অন্তত মানুষের গালিগালাজ থেকে তো দূরে থাকা যাবে।

বর্তমান প্রতিবেদক গত ক’দিন যাবৎ জ্বর সর্দিকাশিতে ভুগছিল। বার্তা সম্পাদক শ্রীসন্তোষ কুমার ঘোষ মহাশয় অদ্য বৎসরেই পদোন্নতি ঘটল। কথায় বলে অভাগা যেদিকে যায়, সাগর শুকায়ে যায়। তাঁর  অ্যাসোসিয়েট এডিটর হিসেবে বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ও হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ডের ও পদোন্নতি হবার ফল হিসেবে তাঁর প্রিয় এই অভাজনের ঘাড়েই শ্রী শ্রী লক্ষ্মীপুজোর বিশেষ সংবাদদাতা হিসেবে প্রেরণ করলেন নদে জেলার তাহেরপুরে। অগত্যা নাক টানতে টানতেই গতকাল এসে পৌঁছেছি তাহেরপুরে। তাহেরপুর কেন? সে কথায় পরে আসছি, আপাতত জানাই গ্রামবাংলার এই আশ্বিনের সবুজ শস্যক্ষেত দেখার কিঞ্চিৎ লোভ যে এই প্রতিবেদকের ছিল না তা নয়, তবে এত অসুস্থতা নিয়ে কখনওই নয়। বন্ধুবর প্রসেনজিৎ সরকারের গৃহে পদার্পণ কালেই, সে যৎপরোনাস্তি খুশি৷ চুর এবং বন্ধুর কর্তব্যকে আপন কর্তব্য ভেবে গতকাল দুপুরেই পৌঁছে দেয় তাহেরপুর পৌরসভার ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের পাল পাড়ায়৷ এখানে পুববাংলা থেকে রুজির সন্ধানে উপস্থিত মানুষরাই মূলত ঘাঁটি গেড়েছেন এক জায়গায়। জন্মভিটেতে কেউ হয়তো ছুতোর, কল মিস্ত্রি বা সোনার কারিগর হলেও, এখানে সকলেই মৃৎশিল্পী। যদিও মূর্তি এরা কেউই গড়েন না। পটের ওপর লক্ষ্মীদেবীর ছবি আঁকাই এদের পেশা। এদের কাজ স্বাভাবিকভাবেই বাংলার শিল্পপ্রেমী মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। আর তাই সারা বাংলাজুড়েই এদের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। কথা হচ্ছিল শিল্পী মঞ্জু পালের সঙ্গে। জানালেন—  জিনিসপত্র প্রবল দুর্মূল্য হওয়ায় এই সরা এঁকে তাদের আর পোষাচ্ছে না৷ তাই তাঁরা এই পেশা ছেড়ে দিতে চান।

—করবেন কী?
—যাহোক কিছু।
—মন খারাপ হবে না?
—আগে তো প্রাণে বাঁচা, তারপর মন।
—কলকাতায় মাল কারা নিয়ে যায়?
—মহাজনরা।
—ক’টাকায় বিক্রি করেন?
—আমরা পাই দেড় টাকা করে। ওরা বিক্রি করে তিন বা চার টাকায়।
—নিজেরা বেচতে যান না কেন?
—ও বাবা! রেলপুলিশ পয়সা নেয়। কইলকেতায় যেখানে বসব, পুলিশ তাড়া করে। তারাও টাকা পেলে চুপ করে বটে। তবে এত দিলে আমাদের আর কি থাকে। তারচে এখানে বেচে দেওয়াই ভালো।
—ক’জনের সংসার?
—বারো জনের।
—ক’টা করে বানান?
—দেখেন দাদা, খুব সূক্ষ্ম কাজ। সময় লাগে। আগে আমি আর আমার সোয়ামি করতাম। এখন ছেলেমেয়েদেরও লাগিয়েছি। যা হয়, যতটুকু তাতেই দু’বেলা যদি খাবার জোটে।
—খাবার জোটে?
—না তেমন আর কই। ভাতে ভাত আলুসেদ্ধও তো খেতে পয়সা লাগে। ছেলে-মেয়েগুলোকে পড়াতেও পারলাম না।
—কতজন যুক্ত আছে, এই কাজে?
—প্রায় জনা ৫০০।

কেমন যেন কাঠ কাঠ উত্তর। তেমন স্টোরি হবে না ভেবে প্রসেনজিৎকে বললাম, চল একটু জলঙ্গি দেখে আসি। বেরিয়ে পড়লাম। অফিসে বার্তা সম্পাদককে জানালাম স্টোরি ঠিক হচ্ছে না। তিনি বললেন, মাটি কামড়ে থাক্। হবে।

জলঙ্গি দেখার ফাঁকেই হাতে কাগজ এল। আজকের আনন্দবাজার।

…বিচ্ছিন্ন দু একটি হিংসার ঘটনা ঘটেছে হুগলির তেলেনিপাড়ায়, আর মুর্শিদাবাদের সূতিতে।  এছাড়া দুর্গাপুজোর বিসর্জন পর্ব শান্তিতে সমাপ্ত হওয়ায় মুখ্যমন্ত্রী সকলকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। মাছের খুব সংকট দেখা দিয়েছিল পুজোর আগেই। তারপর শ্রীসেনের উদ্যোগে ৫০ মণ মাছ আমদানি করা হয়। তাতে কিঞ্চিৎ হলেও বাঙালির রসনা তৃপ্ত হয়েছে। কলকাতা শহরে বারোয়ারি পুজোর সংখ্যা ছিল মোট ১৬০০। ২০০ বাড়ির পুজো। মোট ১৮০০ পুজো। বাবুঘাট থেকে দক্ষিণেশ্বর আটটি ঘাটে প্রতিমা নিরঞ্জন পর্ব সমাধা হয়েছে। পোর্ট কমিশনার্স ও রাজ্য সরকারের মিলিত উদ্যোগে ঘাটগুলি ছিল আলোকমালায় সজ্জিত। তবে মিষ্টির দাম অনেক।

রসগোল্লা—  কিলো পিছু ৪ টাকা
সন্দেশ— ১০ টাকা
দধি—  ৩.৪০
এবং
ক্ষীরের সন্দেশ— ১৭ টাকা।

এবার দুর্গাপুজোর শেষে লক্ষ্মীপুজোর উদ্বোধনেও মন্ত্রীরা। সামান্য পরে আছেন বিচারপতি ও কংগ্রেসের জেলা নেতারা। তবে উদ্বোধনে সব থেকে এগিয়ে আছেন, শ্রী অতুল্য ঘোষ ও প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষ। বিজয়গড় কলোনিতে লক্ষ্মী প্রতিমার মুখ শ্রীমতী সুচিত্রা সেনের আদলে গড়ায়, তাদের প্রতিমা কেন্দ্র করে জনমানসে আগ্রহ বেড়েছে। এবং পড়ে থাকা পুজো সংখ্যা নিয়ে বইয়ের দোকানিরা আবার দোকান সাজিয়ে বসলেও, তার তেমন বিক্রি নেই। বরং তার বদলে সহজে ধনী হবার আকাঙ্ক্ষায় বাঙালি তিন চার বা পাঁচটি লটারি কিনছেন।

দুপুরের মধ্যাহ্ন ভোজ সারতে গেছিলাম প্রসেনজিতের বাড়িতে। আগামীকাল এ বাড়িতেও লক্ষ্মীপুজো, তাই আজ নিরামিষ। তা হোক, তবে বহুপদের কারণে সে ভোজও অপূর্ব ও সুস্বাদু। একটু ভাত ঘুমের জন্য চোখ বুজতেই আবার বার্তা সম্পাদকের ফোন প্রসেনজিৎদের ল্যান্ডফোনে। কথা হল৷ নরমে গরমে সন্তোষদা একটু বুঝিয়ে বলায় আবার বেরিয়ে পড়ি। পথেই দেখলাম বিভিন্ন বাড়ির ছাদ থেকে ঘুড়ি উড়ছে। লক্ষ্মীপুজোয় ঘুড়ি ওড়ানো নাকি এখানকার সংস্কৃতি। ফিরে গেলাম আবার যখন মঞ্জু পালের ঘরে তখন সন্ধে নেমেছে। মঞ্জুর বয়স বেশি না। বছর আটত্রিশ। মঞ্জুর ঘরে কেরোসিন লম্ফর আলোয় আঁকা চলছে তখনও। সরায় আঁকতে আঁকতেই মঞ্জু বলছিলেন, তাঁদের ফেলে আসা কিশোরগঞ্জের গ্রামের কথা। অবস্থাপন্ন চাষি ঘরের মেয়ে তিনি। কিন্তু ওই যে খান সেনাদের দাপট, ভয়ে পালিয়ে আসা, অসম হয়ে মালদহ হয়ে এই তাহেরপুর। পূর্ণিমার আগের দিন, চাঁদের আলো মিহি জ্যোৎস্না ছড়াচ্ছে। প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গিয়েছিলাম পাশের বাঁশঝাড়ের দিকে। মঞ্জুর বড় কন্যা যার নাম বেলি, বয়স কুড়ির কোটায়। সে ইশারা করে ডাকছে। এগিয়ে গেলাম। চোখে অন্য ইশারা।

‘আমার একটাও ভালো শাড়ি নেই রিপোর্টারবাবু। আমার সাথে শোবে?’

চমকে গেছি! এ মেয়ে বলে কি! ঠিক শুনছি?

—গলা খাঁকিয়ে বলি কী বলছ তুমি?
—মাকে অনেকবার বলেছি, মার খেমতা নেই দেবার। দুগ্গা পুজোয় সবাই কত আমোদ করল, আমাদের কিছুই হয়নি। আমাদের গল্প লিখে আপনি তো কামাবেন। এই সরায় মা লক্ষ্মী এঁকে আমাদের কি হয়! আমরা তো সেই না খেয়েই থাকি।
—তোমরা তো সারাবছর ধরেই কাজ করো। মা ওসব গুল মারে। কিছুই হয় না এই সরা এঁকে। বাপটা তো ঢ্যামনা। কিছুই করে না কেবল মাকে পেটায়। মাও শোয়। নইলে খাবে কী!

চাঁদের আলো আরও জোর হচ্ছে। আগামীকাল নাকি এই অঞ্চলের গ্রামে স্বয়ং লক্ষ্মী এসে অধিষ্ঠান করেন, তাই এতদ অঞ্চলের নাম লক্ষ্মীপাড়া। কিন্তু এ যা নিজে কানে শুনছি, তা তো অন্য কথা! শিউরে উঠি। পকেট থেকে ১০ টাকা বার করে দিই বেলির হাতে। বেলি ব্লাউজের ভেতর টাকা গুঁজে সরে যায়।

কেমন ভূতগ্রস্তের মতো প্রসেনজিৎকে নিয়ে রওনা দিই ওদের বাড়ি। বার্তা সম্পাদক সন্তোষ ঘোষকে জানাই, আমার পক্ষে লেখা সম্ভব না। তিনি তখন সুরা ও রবীন্দ্রসংগীতে ব্যস্ত। দু-চারটে গালি দিলেন।  জ্বর এসেছে।

শুয়ে শুয়ে ভাবছি জতুগৃহর কথা। ক’দিন আগেই রিলিজ করেছে তপন সিংহর জতুগৃহ। উত্তম ও অরুন্ধতী রায়। প্রিমিয়ারে গিয়েছিলাম। উত্তম কুমার তখনই নেমন্তন্ন করেছিলেন তাঁর বাড়িতে লক্ষ্মীপুজোর। ঘোর কাটল ফোনে। ফিরে এসো মহানায়কের বাড়ির লক্ষ্মীপুজো, নিয়ে স্টোরি করবে৷

ছেড়ে যাচ্ছি তাহেরপুর, মঞ্জু, বেলি… লক্ষ্মী না’কি অলক্ষ্মী পাড়া…?

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *