‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার স্থাপি সব ঘরে ঘরে’: সঞ্চয়ই লক্ষ্মী

laxmi

সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায়

আজ লক্ষ্মীপুজো। ছোটবেলা থেকে ‘লক্ষ্মী হয়ে থেকো’ জাতীয় কথা শুনতে শুনতে আমরা বড় হই। এর মানে হয়তো আমরা ভাবি শান্ত হয়ে থাকা। কিন্তু যদি লক্ষ্মীর সংসার, লক্ষ্মীর ঝাঁপি কথাগুলো মাথায় রাখি তাহলে কোথায় যেন লক্ষ্মীর সঙ্গে সঞ্চয় জড়িয়ে যায়। লক্ষ্মী কি আমাদের সঞ্চয়ী হতে শেখায়?

আরও পড়ুন: সুলেমানের গল্প

আগেকার দিনে সঞ্চয়ের হাতেখড়ি হত মাটির ভাঁড়ের ফুটো দিয়ে খুচরো পয়সা ঢোকানোর মধ্যে দিয়ে। তাকে বলা হত লক্ষ্মীর ভাঁড়। বিন্দু থেকে সিন্ধুর কথা বলে ব্যাঙ্কের বিজ্ঞাপনে লক্ষ্মীর ভাঁড়ের ছবি দেখেছি, মনে পড়ে। ব্যাঙ্ক ছোট সঞ্চয়কে ব্যাঙ্কে জমা করার কথা আর ছোটদের সঞ্চয়কে ব্যাঙ্কে জমা দেওয়ার কথা একইসঙ্গে বলেছে।

১৯৭১ সালে শারদীয় আনন্দমেলায় একটা বিজ্ঞাপন বেরিয়েছিল, যাতে একটা বাচ্চা বলছে, “একে ছোট আকাউন্ট কেন বলা হয়? আমার কাছে এটা খুবই বড়”। পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্কের সেই বিজ্ঞাপনে বলা ছিল: “১৪ বছরের বেশি বয়সের ছেলেমেয়েরা এই আকাউন্ট রাখতে পারে। এতে ছোটদের মধ্যে ব্যক্তিত্বের সৃষ্টি হয় এবং অল্প বয়সেই সঞ্চয়ের ইচ্ছা জাগে— ভবিষ্যৎ জীবনে এই শিক্ষা একটি বিরাট সম্বল।”

১৯৭৭-এ ইউনাইটেড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ব্যাঙ্কের বিজ্ঞাপনে মানুষের সঞ্চয়স্পৃহাকে উসকে দিতে বলা হল, “নিজেকে বারবার জিজ্ঞাসা করুন ‘ছেলেমেয়ের ভবিষ্যতের জন্য যতটা দরকার সব কিছু কি আমি করেছি?’…” পাশেই রয়েছে এক লক্ষ্মীছানা মেয়ের ছবি, পাশে লেখা, “ও তো আপনারই মুখ চেয়ে আছে”।

আরও পড়ুন: দেবতার জন্ম

আবার ওই বছরই ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার বিজ্ঞাপনে সাক্ষাৎ লক্ষ্মীর আবির্ভাব।
“লক্ষ্মীর ভাণ্ডার স্থাপি সব ঘরে ঘরে ।
রাখিবে তণ্ডুল তাহে এক মুষ্টি করে।।
সঞ্চয়ের পন্থা ইহা জানিবে সকলে।
অসময়ে উপকার পাবে এর ফলে।।”

লক্ষ্মীর ভাণ্ডার স্থাপন করার কথাই বলে গেছে নানান ব্যাঙ্ক। আর এটাও লক্ষণীয় যে, এরা সবাই ছোট সঞ্চয়কে উৎসাহিত করেছে। আজকালকার ব্যাঙ্কের বিজ্ঞাপন বদলে গেছে। সঞ্চয় করতে নয়, ব্যাঙ্ক বিজ্ঞাপন দেয় ধার দিতে চেয়ে— বাড়ির জন্য ধার, গাড়ির জন্য ধার!

ছোট সঞ্চয়কে স্বীকৃতি শুধু নয়, ছোট ধার পেতেও ছুটতে হত এই সব সরকারি ব্যাঙ্কের কাছে। কৃষক, রিকশাচালক বা অটোচালককে কে ধার দেবে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক ছাড়া? এমনকী ভেবে দেখুন, সাধারণ যেসব বাসে যাতায়াত করেন সেগুলোতেও ধার দেওয়ার জন্য কৃতজ্ঞতা জানানো থাকে এরকম রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ককে।

সেই সব ব্যাঙ্কই আজ সংকটে। নীরব আর সরবরা টাকা ধার নিয়ে দেশ থেকে ভাগলবা! রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের বিপুল অনাদায়ী ধার সামাল দিতে সরকারের নিদান: ব্যাঙ্ক সংযুক্তিকরণ। ছোট ব্যাঙ্ক জুড়ে দিয়ে বড় ব্যাঙ্ক, আরও বড় ব্যাঙ্ক। মূলধনী ধনতন্ত্রের এ গল্পটা আমেরিকায় একশো বছর আগের। বৃহৎ ব্যবসার বিকাশ সেখানকার অর্থনীতিকে বাঁচাতে পারেনি। ক’বছরের মধ্যেই দেখা দিয়েছিল মহামন্দা!

এখানে অর্থনীতির মন্দার কথা মানছেন না কর্তাব্যকর্তাব্যক্তিরা। ‘সব ঠিক হ্যায়’! আমজনতা দেখছেন জিনিসের দাম বাড়ছে। ব্যাঙ্কে সঞ্চয়ের ওপর সুদের হার কমছে। কর্পোরেট কর কমিয়ে দিয়ে ব্যবসায়ী মহলকে খুশি করার চেষ্টা আর তার সঙ্গে ব্যাঙ্ক জোড়া! এরই মাঝে লক্ষ্মীপুজো।

এখন আর কে বিজ্ঞাপনে বলবে— “ইউবিআই-তে ব্যাঙ্ক বোঝায়/ ঈশানবাবু টাকা জমায়” বা “দ্যাট ব্যাঙ্ক বিগিনস উইথ ইউ”। যুগটাই কী ‘ইউ’-এর নয়, ‘আই’-এর! ইউনাইটেড ব্যাঙ্কই তো আজ অবলুপ্ত।

বাজার আগুন। লক্ষ্মীর আরাধনা করাই কঠিন মধ্যবিত্ত বাঙালির। সঞ্চয় দূরঅস্ত।

এরই মধ্যে ‘এসো মা লক্ষ্মী বোসো ঘরে…’ ! কার ঘরে বসবেন মা লক্ষ্মী?

লেখক কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস পড়ান। আগ্রহের বিষয় সমকালীন সামাজিক সাংস্কৃতিক ইতিহাস।

Facebook Twitter Email Whatsapp

2 comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *