Latest News

Popular Posts

লক্ষ্মীকথা

লক্ষ্মীকথা

রাহুল দাশগুপ্ত

লক্ষ্মী পৌরাণিক দেবতা। ঋগ্বেদে শ্রী ও ঐশ্বর্যের দেবী হিসাবে লক্ষ্মীর নাম পাওয়া যায়। তাঁর কৃপাতেই সম্পদ, সৌভাগ্য ও স্থায়িত্ব লাভ হয়। লক্ষ্মীর আর এক নাম শ্রী। বিশ্বকে ব্যাপ্ত করে যিনি বিরাজ করেন, সেই বিষ্ণুর তিনি প্রিয়া। দেবী সর্বত্রই পদ্মাসনা ও পদ্মহস্তা, কারণ সূর্যের প্রতীক পদ্ম। আবার পদ্ম প্রজনন ও কৃষিরও প্রতীক। আকাশও পদ্ম হিসাবে কল্পিত হয়েছে। সূর্য-বিষ্ণুর হাতেও তাই পদ্ম অপরিহার্য। সূর্যজাত বলে তিনি সাধারণত তপ্তকাঞ্চনবর্ণা। বাংলার দুর্গাপূজায় লক্ষ্মী ও সরস্বতীকে দেবীর কন্যা হিসাবে বর্ণনা করা হলেও পুরাণে কিন্তু লক্ষ্মী ও সরস্বতী দেবী দুর্গারই দুই পৃথক রূপ। পুরাণে শুধুমাত্র দেবীর দুই পুত্রেরই উল্লেখ পাওয়া যায়। পরিবার-সমন্বিতা দুর্গা বাংলাদেশেই বেশি পূজিতা হন। বাংলার লোককথা ও লোককাহিনিতে দেবী তাঁর সন্তানদের নিয়ে আসেন বাপের বাড়ি, তাঁর ডানদিকে থাকেন লক্ষ্মী ও গণেশ।

আরও পড়ুন: ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার স্থাপি সব ঘরে ঘরে’: সঞ্চয়ই লক্ষ্মী

আশ্বিন মাসে দুর্গাপূজার পর যে পূর্ণিমা, তাকেই কোজাগরী পূর্ণিমা বলা হয়, যা লক্ষ্মীপূজার দিন হিসাবে প্রসিদ্ধ। এই দিন সন্ধ্যা-রাতে বাঙালির ঘরে ঘরে লক্ষ্মী পুজো করা হয়। পূজান্তে নারকেল, বিশেষ করে নারকেলের জল ও চিপিটক ভক্ষণ করলে এবং অক্ষক্রীড়া দ্বারা রাত্রিজাগরণ করলে ধনলাভ হয়। কারণ কথিত আছে, লক্ষ্মীদেবী রাত জেগে ভ্রমণ করেন এবং বরদা হয়ে বলেন, “কে জাগরিত এবং অক্ষক্রীড়ায় নিযুক্ত আছে? তাহাকে আমি ধন দান করিব।” এই দিন রাত্রি জাগরণের রীতি বলে এই পূর্ণিমাকে বলা হয়, ‘কোজাগর’।

আবার ‘কৌমুদী’ও বলা হয় একে। রঘুনন্দন লিখেছেন, “আশ্বিনে পূর্ণিমায় রাত্রি জাগরণ করে যাপন করা কর্তব্য, এই পূর্ণিমা কৌমুদী নামে প্রসিদ্ধ, জগতের মঙ্গলের জন্য এই পূর্ণিমা পালনীয়।” কৌমুদীতে লক্ষ্মী ও ঐরাবতে স্থিত ইন্দ্রকে পূজা করবে, সুগন্ধি দ্রব্য ও উত্তম বেশ সহযোগে পাশা খেলা করে রাত্রি জাগরণ করবে। স্বামী নির্মলানন্দ ‘অক্ষ’ শব্দের অর্থ করতে গিয়ে তিনটির উল্লেখ করেছেন, পাশা, ক্রয়বিক্রয়চিন্তা এবং আত্মা বা জপমালা। এই জেগে থাকা মানে স্রেফ রাত জাগা নয়, আত্মার দিক থেকেও জেগে থাকা, কারণ যে আত্মা জেগে থাকে, সে-ই মোক্ষের মতো শ্রেষ্ঠ বর লাভ করে। এই পূজায় লক্ষ্মীর আসন পেতে দেবীর স্থাপনা করা হয়। আসনে ঘট, কড়ি, সিঁদুরের কৌটো, লক্ষ্মীর ছবি এবং লক্ষ্মীর বাহন হিসাবে জনসমাজে পরিচিত পেঁচার মূর্তি রাখা হয়। লক্ষ্মীর পাঁচালি পড়া হয়। সমৃদ্ধি ও সৌভাগ্য কামনায় লক্ষ্মীদেবী হিন্দুদের ঘরে ঘরে পূজিতা হন।

আরও পড়ুন: সুলেমানের গল্প

ব্রতকথায় আছে, এক সদাগরের লক্ষ্মীরূপিণী স্ত্রীর মৃত্যুর পর পুত্রবধূদের অলক্ষ্মীসুলভ অশোভন আচরণে উৎসাহিত হয়ে অলক্ষ্মীদেবী সদাগরের দ্বিতীয় স্ত্রী হিসাবে গৃহে প্রবেশ করার চেষ্টা করেন এবং কনিষ্ঠা পুত্রবধূর সদাচরণে তাঁর চেষ্টা ব্যর্থ হয় ও গৃহে পুনরায় লক্ষ্মীশ্রী ফিরে আসে। এই ব্রতে ‘হালের অর্জন ও জালের মাছ’ ত্যাগ করার নিয়ম আছে। সুতরাং ব্রতিনীরা খেসারির ডাল ও তালের মিছরি খেয়ে থাকেন।

তৈত্তিরীয় সংহিতায় লক্ষ্মী ও শ্রীকে আদিত্যের দুই স্ত্রী হিসাবে দেখা যায়। আদিত্য ও বিষ্ণু অভিন্ন। শতপথব্রাহ্মণে প্রজাপতি থেকে শ্রী সম্ভুত বলে বর্ণিত হয়েছে। পরবর্তী যুগে লক্ষ্মী ও শ্রী ঐশ্বর্যের দেবী, বিষ্ণুর স্ত্রী এবং কামের মাতা হিসাবে খ্যাত। স্কন্দগুপ্তের জুনাগড় শিলালিপিতে (৪৫৫-৪৫৮ খ্রি) বিষ্ণুই লক্ষ্মীর বাসস্থান। পুরাণ অনুসারে, সূর্যের যে জ্যোতি, তাই শ্ৰী বা লক্ষ্মী। রামায়ণ অনুসারে, দেবতা ও অসুরেরা যখন সমুদ্র মন্থন করেছিল, লক্ষ্মী পদ্ম হাতে করে সমুদ্র থেকে উত্থিত হন। শ্রীসুক্তে বর্ণিতা লক্ষ্মী পদ্মোপরি দণ্ডায়মানা। কেমন দেখতে দেবীকে? তাঁর রূপ অসামান্য। পূর্ণচন্দ্রের মতো। এক রাশ ঘন চুলের ঢল নেমেছে মাথা থেকে। তিনি, ‘নবযৌবনসম্পন্না। শরীরের সর্বত্র পূর্ণযৌবনের প্রকাশ। দাঁতের গড়ন খুব সুন্দর। রং-ও ধবধবে শাদা। স্তনযুগল খুব উন্নত। পীনোন্নতপয়োধরা।’ শ্রীশ্রীচণ্ডীতে দুর্গাকেই মহালক্ষ্মী হিসাবে ধ্যান করতে বলা হয়েছে।

আরও পড়ুন: দেবতার জন্ম

গজলক্ষ্মী, কলম্বিয়ায়

আচার্য যোগেশচন্দ্র রায় অবশ্য কোজাগরী পূর্ণিমায় লক্ষ্মীপূজার একটি বিশেষ তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, বৈদিক যুগে কোজাগরী পূর্ণিমায় অম্বুবাচী হত অর্থাৎ এই সময়ে ছিল বর্ষাকাল। বেদের ইলা বা ইড়া অর্থাৎ পুরাণের লক্ষ্মী অম্বুবাচীর দিন জন্মগ্রহণ করেন। এই দিন ইন্দ্র অসুরের সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। সেইজন্যই কোজাগরী লক্ষ্মীকে চার দিকহস্তী স্নান করায়। সেদিন অরন্ধন বলেই চিপিটক-নারকেল খাওয়া হয়।

পুরাণের মতানুসারে, মহর্ষি ভৃগুর ঔরসে ও তার স্ত্রী দক্ষ-কন্যা খ্যাতির গর্ভে লক্ষ্মীর জন্ম হয়। ইনি নারায়ণের স্ত্রী হিসাবে তাঁর অঙ্কশায়িনী হন। দুর্বাসার অভিশাপে ইন্দ্র ত্রিভুবন জয় থেকে বঞ্চিত ও শ্রীহীন হলে সর্বসৌভাগ্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবী লক্ষ্মী সমুদ্রে প্রবেশ করেন। তারপর সমুদ্র মন্থনের সময় মৃত থেকে লক্ষ্মী উত্থিত হয়ে দেবগণের কাছে যান। এই লক্ষ্মীকে লাভ করার জন্য দানবেরা দেবতাদের সঙ্গে কলহে মত্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু বিষ্ণু মায়া বিস্তার করে নিজের স্ত্রীকে গ্রহণ করেন। ফলে চতুর্দিকে উৎসব শুরু হয়, বেদমন্ত্র সহকারে স্বর্ণকলসে নির্মল জল নিয়ে দেবীকে স্নান করিয়ে অভিষিক্ত করা হয়।

রামায়ণে সীতাকে অরণ্যের মধ্যে দেখে রাবণের মনে হয়েছিল, পদ্মহীনা শ্রী। রামায়ণেই অন্যত্র রামচন্দ্রকে বিষ্ণু এবং সীতাকে শ্রী বা লক্ষ্মী হিসাবে বর্ণিত করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, অমরেশ্বর বিভু বিষ্ণু শ্রীলাভ করে যেমন শোভা পান, রামও তেমনই সীতাকে লাভ করে সানন্দে শোভা পেতে লাগলেন। মহাভারতে অর্জুন অস্ত্রলাভার্থে ইন্দ্রের নিকট গমনের প্রাক্কালে দ্রৌপদী অর্জুনের মঙ্গল কামনায় যেসব দেবদেবীর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে লক্ষ্মীও ছিলেন। মহাভারতের অপর এক স্থানে, লক্ষ্মীকে দক্ষের কন্যা এবং ধর্মের স্ত্রী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। দক্ষ যে বারোটি কন্যা ধর্মকে দান করেছিলেন, তাঁদের অন্যতম লক্ষ্মী।

আরও পড়ুন: উৎসবের মরশুমে শুশুনিয়া পাহাড়

বৌদ্ধ সাঁচি স্তূপে গজলক্ষ্মী, নর্থ গেটওয়ে, সাতবাহন রাজবংশের ভাস্কর্য, খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দী

রবীন্দ্রনাথের মতে, সমুদ্রমন্থনের কাহিনিটি রূপক। মহাসমুদ্র মহাকাল কি মহাকাশ বােঝা না গেলেও বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অনন্ত অখণ্ড সৌন্দর্যরূপা লক্ষ্মীকে লাভ করাই তাঁর মতে, লক্ষ্মীলাভের তাৎপর্য। মহাকাশরূপী ক্ষীরসমুদ্রে জ্যোতিরূপা লক্ষ্মীর প্রকাশ। সূর্যকিরণের স্বর্ণাভা মেখেই লক্ষ্মী হয়েছেন কাঞ্চনবর্ণা। আবার অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর দেখিয়েছেন, কোজাগরী লক্ষ্মীপূজার রীতিতে অনার্য প্রভাবও অনেকটা আছে। তিনি লিখেছেন, “শুয়োরের দাঁত যার উপরে ফলমূল মিষ্টান্নের রচনা পাতিল, কুবেরের মাথা যেটা সব উপরে রয়েছে দেখি; কিংবা সবার পিছন থেকে উঁকি দিচ্ছে একটি ঘােমটা দেওয়া মেয়ের মতো ডাব হলুদ সিঁদুর মাখানো; আর পেঁচা ও ধানছড়া-এক লক্ষ্মীর বাহন আর এক লক্ষ্মীর শস্যমূর্তি-এ কয়টিই অনার্যদের।”

লক্ষ্মীর পূজায় এই অনার্য প্রভাবের সমর্থনে অবনীন্দ্রনাথ পেরুর ছড়ামাম্মা বা সরামাম্মা পূজার সঙ্গে লক্ষ্মীপূজার সাদৃশ্য দেখিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, “শস্য সংগ্রহের কালে পেরুতে লোকেরা ভুট্টার ছড়গুলি দিয়ে তাদের মা লক্ষ্মীর মূর্তিটি গড়ে। পূজার পূর্বে তিনরাত্রি জাগরণ করে ছড়ামামা বা সরামাম্মাকে নজরে নজরে রাখার নিয়ম। বলা বাহুল্য, একে পূর্ণিমা জাগরণ বা কোজাগর বলা যেতে পারে।” কৃষিপ্রধান দেশে কৃষি ধন-ঐশ্বর্যের উৎস। তাই লক্ষ্মী কর্ষণজাত পণ্যের দেবতা। ধান্য প্রধান কৃষিসম্পদ হওয়ায় তিনি হলেন ধান্যরূপা। কড়ি বা শঙ্খ সামুদ্রিক জীব বলেই লক্ষ্মীর সঙ্গে কড়ির সম্পর্ক স্থাপিত হল। এক সময়ে কড়ি পণ্য বিনিময়ের মাধ্যম বলেও বিবেচিত হত। টাকাকড়ি শব্দটি আজও প্রচলিত। সুতরাং কড়িও লক্ষ্মীর প্রতীক হিসাবে স্বীকৃতি ও পূজা পেল। এখনও লক্ষ্মীপূজায় কড়ি দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন: উত্তরবঙ্গের বনদুর্গা

প্রায় সকল দেবতারই কোনও একটি জীব বাহনরূপে কল্পিত হয়েছে। লক্ষ্মীর বাহন আছে। তবে যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে লক্ষ্মীর বাহনেরও পরিবর্তন ঘটেছে। কুনিন্দরাজ অমোঘভূতির মুদ্রায় লক্ষ্মীর সামনে হরিণ আছে। কুমারগুপ্তের মুদ্রায় লক্ষ্মী দেবী একটি ময়ূরকে খাদ্য দিচ্ছেন। প্রথম চন্দ্রগুপ্ত ও দ্বিতীয় চন্দুগুপ্তের কোনও কোনও মুদ্রায় লক্ষ্মীদেবী সিংহবাহনা। শশাঙ্কের স্বর্ণমুদ্রায় লক্ষ্মীর প্রসারিত ডান হাতে পদ্ম, পিছনে পদ্মলতা ও পদতলে একটি হাঁস। অর্থাৎ সিংহ, ময়ূর এবং হাঁস, এই তিনটি প্রাণীই কোনও না কোনও সময়ে লক্ষ্মীর বাহন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিল। কিন্তু ড. জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, ‘সরস্বতী হাঁসকে স্থায়ীভাবে অধিকার করে রইলেন, দুর্গাদেবী সিংহটিকে কেড়ে নিলেন, ময়ূরটি দখল করলেন কার্তিক, অগত্যা লক্ষ্মী দেবী আশ্রয় করলেন পেচককে।

আধুনিককালে লক্ষ্মীর একমাত্র বাহন পেঁচা। হয়তো এই কারণেই যে, পেচক বিষ্ণুর বাহন গরুড়ের রূপান্তর হিসাবে পরিচিত। বিষ্ণুর শক্তি হিসাবে লক্ষ্মী একসময় গরুকেও বাহন করেছিলেন। কৌশাম্বীতে প্রাপ্ত তোরমানের সিলমোহরে লক্ষ্মীর পদতলে গরুড়ের ছবি আছে। ইলোরা গুহাচিত্রেও লক্ষ্মী গরুরবাহনা। লক্ষ্মীর বাহন প্রসঙ্গে আরও একটি সম্ভাবনার কথা শোনা যায়। রোমে শিল্প ও বিদ্যার দেবতা মিনার্ভা। মিনার্ভার হাতে থাকে একটি পেঁচা। পেঁচা জ্ঞানের প্রতীক হিসাবে রোমে স্বীকৃত হয়েছিল। গ্রিক ও রোমান রৌপ্য মুদ্রায় পেঁচার মূর্তি আঁকা রয়েছে, দেখা যায়। উত্তর-পশ্চিম ভারতে, বিশেষ করে পঞ্জাবে, এই ধরনের মুদ্রা পাওয়া গেছে। এই মুদ্রাগুলির সামনের দিকে রাজার মুখ, পেছন দিকে পেঁচার ছবি থাকত। তাছাড়া স্বামী নির্মলানন্দের মতে, ধান্যের শত্রু ইঁদুরকে সংহার করে ধনরক্ষায় সহায়তা করে পেঁচা। এটিই লক্ষ্মীর পেঁচাকে বাহন হিসাবে গ্রহণ করার লোকজ কারণ।

ছবি ইন্টারনেট

টাটকা খবর বাংলায় পড়তে লগইন করুন www.mysepik.com-এ। পড়ুন, আপডেটেড খবর। প্রতিমুহূর্তে খবরের আপডেট পেতে আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন। https://www.facebook.com/mysepik

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *