লিয়েন্ডার পেজ ৪৮: এক ইতিহাসের মুখোমুখি

শুভ্রাংশু রায়

বয়স নেহাতই সংখ্যা মাত্র। ক্যালেন্ডার জানাচ্ছে, লিয়েন্ডারের বয়স আর এক বছর বাড়ল। কারণ আজ তাঁর জন্মদিন। ১৭ জুন, ১৯৭৩ জন্ম তাঁর। পারিবারিক সূত্রে স্পোর্টসকে যেন উত্তরাধিকার হিসেবেই পেয়েছিলেন তিনি। বাবা ভেস পেজ ভারত-খ্যাত আন্তর্জাতিক হকি খেলোয়াড়। মা জেনিভার পেজ বাস্কেটবল খেলোয়াড়। মা বাবা উভয়ে ভারতের হয়ে অলিম্পিকে তাঁদের খেলায় প্রতিনিধিত্ব করেছেন। মিডফিল্ডার ভেজ পেজ আবার অলিম্পিক পদক জয়ী বটে। কারণ ১৯৭২-এর মিউনিখ অলিম্পিকে ব্রোঞ্জ পদক জয়ী ভারতীয় হকি দলের সদস্য ছিলেন ভেজ পেজ। তাই পেজ পরিবারে লিয়েন্ডার আদ্রিয়ান পেজ তৃতীয় অলিম্পিয়ান এবং দ্বিতীয় পদকপ্রাপ্ত সদস্য।

আরও পড়ুন: জ্যাঙ্গো, র‍্যাম্বো আর ক্রিকেট

কিন্তু ভেজ পেজের পদক ছিল দলগত খেলায়। কিন্তু লিয়েন্ডার যখন ১৯৯৬-এ আটলান্টায় টেনিসে ব্যক্তিগত ইভেন্টে ব্রোঞ্জ পদক জেতেন, তা ছিল পৃথিবীর মেগা ইভেন্টে দ্বিতীয় ব্যক্তিগত পদক জয়। ১৯৫২-তে হেলসিনকিতে কে ডি যাদবের কুস্তিতে পদকপ্রাপ্তির চুয়াল্লিশ বছর পরে দ্বিতীয় ভারতীয় হিসেবে ভারতকে এই সম্মান এনে দিয়েছিলেন কলকাতার বেকবাগানের লি। মোহনবাগান মাঠে সেই ক্লাবের হয়ে নিয়মিত হকি খেলা ভেজ পেজের সঙ্গে মাঠে আসা খুদে লিয়েন্ডারকে অনেক প্রবীণ মোহন সমর্থক আজও মনে করতে পারেন যে, খুদে লিয়েন্ডারকে প্রায় দেখা যেত একটি ছোট হকি স্টিক নিয়ে একমনে বল নিয়ে মাঠের ধারে দৌড়াদৌড়ি করতে।

আরও পড়ুন: ৪৭ বছর পরেও গাভাস্করের মনে অম্লান মাঠের মধ্যে চুল কাটার স্মৃতি

এই একাগ্রতাই আদপে লিয়েন্ডারকে আজ আন্তজার্তিক ক্রীড়ায় এই মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠা করেছে বলে ওয়াকিবহাল মহল মনে করেছে। সে কারণেই আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব লিয়েন্ডারের ট্রফি রুমে সাজিয়ে রাখার মতো পুরস্কার আর সম্মানের অভাব নেই। নেট সার্চ করলে খুব সহজেই আন্তর্জাতিক টেনিস মঞ্চে লিয়েন্ডারের সেই কৃতিত্বের পরিসংখ্যান সহজেই খুঁজে পাওয়া যায়। সেই নব্বইয়ের শুরু থেকে আজ দুই হাজার একুশেও তিনি টেনিস সার্কিটে বিদ্যমান। তাঁর সঙ্গে খেলা শুরু করা অনেকেই অবসর নিয়ে কোচ হয়েছেন। কেউবা খুলে ফেলেছেন নিজস্ব ব্যবস্যা। কাউকে মাঝেমধ্যে দেখা যাচ্ছে টেলিভিশনের পর্দায় ভাষ্যকার হিসেবে বা প্রিন্ট মিডিয়ায় কলামিস্ট হিসেবে। আর ৪৮ বছর বয়সি তরুণ এখনও অনুশীলন করে চলেছেন টোকিওতে তাঁর টানা অষ্টম অলিম্পিকের লক্ষ্যে।

আরও পড়ুন: জ্যাঙ্গো, র‍্যাম্বো আর ফুটবল

দুই অলিম্পিক পদকজয়ী: বাবা ভেস পেজের সঙ্গে পুত্র লিয়েন্ডার

সেই নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময় লিয়েন্ডার পেজকে বাংলায় বোরোপ্লাস ক্রিমের একটি বিজ্ঞাপনে দেখা যেত, যাতে তিনি ঘামসিক্ত অবস্থায় একটি র‍্যালি শেষে পর্দায় বলে উঠতেন ‘জিতেছি কেন? লড়েছি তাই’― এই লড়াই লিয়েন্ডারের মূল জীবনীশক্তি। তাই ব্যক্তিগত জীবনে নানা ঝড়ঝাপটা, দেশের সহ খেলোয়াড়দের ঈর্ষা সবকিছুকেই লিয়েন্ডার ফুৎকারে উড়িয়ে আজও টিকে রয়েছেন ময়দানে। শিল্পী খেলোয়াড় রমেশ কৃষ্ণানের পরে ভারতীয় টেনিসে পাওয়ার টেনিসের সফল প্রয়োগ লিয়েন্ডার হাত ধরেই।

আরও পড়ুন: ‘পকেট হারকিউলিস’ হার মেনেছিলেন

প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে পঞ্চাশের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে ভারতীয় টেনিস লিয়েন্ডার পেজের যোগ্য উত্তরসূরি খুঁজতে ব্যস্ত। শুভ জন্মদিন বলার ফাঁকে আজকের দিনে আমাদের তাই লিয়েন্ডার পেজ নামক ভারতের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অ্যাথলেটের জন্য আমরা এটাই প্রার্থনা করি যে, খেলার জীবন শেষে তিনি যেন ভারতীয় টেনিসের সঙ্গেই জুড়ে থাকেন। এই বিশাল অভিজ্ঞতাকে আমরা নিছক রাজনীতির ফন্দি-ফিকিরের চোরাগলিতে নষ্ট হতে না দিই।

লেখক সোনারপুর মহাবিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর

Facebook Twitter Email Whatsapp

7 comments

  • Malyaban Chattopadhyay

    সুন্দর আলোকপাত

  • Snehasish Bhadra

    আবার একটা অসাধারণ লেখা যাতে তথ্যের পাশাপাশি ক্রীড়া জগতের অনেক না বলা কথা বলা আছে।

  • Debashis Majumder

    Excellent Article

  • Paramita Ghosh

    পড়ে বেশ ভালো লাগলো ….. খুব সুন্দর

  • নবনীতা বসু

    লিয়েন্ডার ভারতীয় থাকুন।
    সহমত।
    লেখকের সঙ্গে।

  • লেখক চমৎকার আলোকপাত করেছেন লিয়েন্ডার এর খেলার ধারাবাহিক সাফল্য , যেখানে বয়স প্রকৃতই একটা সংখ্যা মাত্র , এমনকি আধুনিক ক্রীড়া জগতেও !

  • Rudra Dev Bagchi

    অনবদ্য একটা প্রতিবেদন ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *