বঙ্গবন্ধুর সাহিত্য ও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে সাহিত্য

সায়মন স্বপন (বাংলাদেশ)

জাগতিক জলবায়ুর হিসেব যেমন একটি গাণিতিক সমীকরণের উপর গড়ে ওঠে, তেমনি করে সাহিত্যের বোধ এবং সূক্ষ্মতা দেশ, মাটি ও মানুষের মনোজাগতিক সমীকরণের ওপর হয়তো-বা গড়ে উঠতে পারে। কেন-না, সাহিত্যের অতল গভীরে বসবাস করলে সাহিত্যের বোধ ও মননের  সখ্যতা হবে নিবিড় ও নিরবচ্ছিন্ন। আমাদের বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে উঠলে আমরা যতটা পুলকিত ও আহ্লাদিত হই, যতটা ঐকান্তিক হই, যতটা জীবনবোধের কাছাকাছি পৌঁছতে পারি; ঠিক ততটা কঠিন অন্য ভাষার সাহিত্যে বোধ বা অনুভূতির কাছাকাছি পৌঁছনো। কারণ আমাদের মাতৃভাষার সঙ্গে আমাদের দিনরাত বসবাস। অনুভূতি বা বোধের কাছাকাছি বসবাস। প্রিয় মানুষটাকে ‘ভালোবাসি’ বললে যতটা অনুভূতি বোধ করি, অন্য ভাষায় বললে ততটা বোধ না-ও হতে পারে। এজন্য মাতৃভাষার সঙ্গে সাহিত্যচর্চা সব সময়ই ইতিবাচক। আর এই মাতৃভাষায় সাহিত্যচর্চা করার জন্য, বাংলাভাষাকে নিজের করে পাওয়ার জন্য; মাতৃভাষার জন্য মুক্তিযুদ্ধের প্রয়োজন হল। প্রয়োজন হল আরও একটি ইতিহাস— যে ইতিহাসের অন্যতম নায়ক ছিলেন ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’। স্বাধীন বাংলা, স্বাধীন মানুষ এবং বাংলার বাঙালি— সব কিছুই বাংলা ও বাঙালি সংস্কৃতির। আমাদের বঙ্গবন্ধু, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার শিকড়।

আরও পড়ুন: একাকী নির্জন পথে সুধীর চক্রবর্তী

একটি খণ্ড খণ্ড সময়, ইতিহাস, ঐতিহ্য, অচেনা শহরের চেনা গল্প, চেনা মানুষের অচেনা গল্প, দেশমাতৃকার জন্য পরবাসী গল্প, জীবনবোধ, মাটি ও মানুষের স্পর্শে আসার অনুভূতি ইত্যাদি নিটোলভাবে ‘বঙ্গবন্ধুকেন্দ্রিক সাহিত্য’-এ চিত্রায়িত হয়েছে। বরেণ্য সাহিত্যিকগণ এই অনুভূতিগুলোকে ছুঁয়ে দিয়েছেন আমাদের অনুভূতিতে। পলাশি থেকে শুরু করে ১৯৪৭-র দেশভাগ, দেশভাগ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত আমাদের এক একটি ইতিহাস। আর এই ইতিহাসের ভাঁজে ভাঁজে মিশে আছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নিটোল কথামালা। যে কথামালা শুনতে, বলতে বা লিখতে গেলে একটি নাম আমাদের সাহিত্যের ঠোঁটে উঠে আসে, তা হল— বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এই সময়টাতে সাহিত্যে দেখা যায় মা, মাটি ও মানুষের এক নিবিড় ছন্দ। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন একটি গান বেশ আলোড়ন তোলে—

‘শোনো একটি মুজিবুরের থেকে

লক্ষ মুজিবুরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি, প্রতিধ্বনি

আকাশে বাতাসে উঠে রণি।

বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ’।

যা একটি কবিতা থেকেই সূত্রপাত। অন্যদিকে, মুক্তিযুদ্ধের একবারে শেষ পর্যায়ে খ্যাতিমান লেখক অন্নদাশঙ্কর রায় বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে একটি কবিতা লিখলেন—

‘যতকাল রবে পদ্মা যমুনা গৌরী মেঘনা বহমান

ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।

দিকে দিকে আজ অশ্রুমালা রক্তগঙ্গা বহমান

তবু নাই ভয় হবে হবে জয়, জয় মুজিবুর রহমান।’

আরও পড়ুন: ব্রিস্টল শহরবাসীদের ধন্ধে ফেলেছিলেন ‘রহস্যময়ী রাজকুমারী’ মেরি বেকার

কবিতাটি অন্নদাশঙ্ককর রায় লিখেছিলেন ১৯৭১-র ৬ ডিসেম্বরের কিছুদিন আগে কি পরে। (অন্নদাশঙ্ককর রায়: কাঁদো প্রিয় দেশ, প্রথম বাংলাদেশ সংস্করণ, অন্বেষা, ঢাকা, ২০১০, পৃষ্ঠা ৫৮-৬০)। সুতরাং, কবিতায় ও গানে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বেশ সরব উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। মা, মাটি আর মানুষের কাছে যে মানুষটি নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন, সে-ই মানুষটিকে বাংলা সাহিত্য-সহ নানা সাহিত্যে চিত্রায়ন করা হয়েছে। একটি মানুষকে প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে। যতদিন থাকবে প্রকৃতির এই নৈসর্গিক সংযোজনা, ততদিন আমাদের সাহিত্যে বঙ্গবন্ধুও থাকেবন অমলিন। বাঁচবেন, আমরণ। তাঁকে নিয়ে অংসখ্য কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, চলচ্চিত্র কিংবা গান রচিত হয়েছে। ছড়া এবং শিশুতোষ সাহিত্যে বঙ্গবন্ধুকে খুব সাবলীলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ঠিক যেমনটি সাবলীল ছিলেন আমাদের বঙ্গবন্ধু। এ-সময়ের সমকালীন সাহিত্যিক তাঁর সংস্পর্শ না পেলেও তাঁকে নিয়ে চর্চা করছেন, নিয়মিত অধ্যয়ন করছেন। সমকালীনদের হাত থেকে বেরিয়ে আসছে— অজানা অধ্যায়। নতুন প্রজন্ম চর্চা করতে পারছে নবীন-প্রবীণদের সাহিত্যকর্ম। তবে উল্লেখ থাকে যে, সমকালীন কিংবা নবীনদের হাত থেকে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচনা উঠে আসা ভালো; কিন্তু তথ্য, তত্ত¡, উপাত্ত¡ সঠিক হওয়া জরুরি। নইলে, বিকৃত তথ্যের জন্য আমাদের চর্চাকারী নতুন প্রজন্মের তথ্যভাণ্ডার ভুলে ভরা হতে পারে। সুতরাং, এ-সকল বিষয়ে বেশ সতর্ক ও সাবধানতা অবলম্বন করা জরুরি বলে মনে করি। সাহিত্যিকের একটি শব্দও যেন ভুলে ভরা না হয়, সেটি আমাদের সকলেরই কাম্য।

আরও পড়ুন: যদুনাথ সরকার: ইতিহাস চর্চার কলম্বাস

বিশ্বসাহিত্যেও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা হয়েছে অনবদ্য রচনা। কবি শঙ্খ ঘোষ লিখলেন— ‘আজকের দিন যদি ব্যর্থ হয় তাহলে আছে কাল, একশ মুজিব যদি মিথ্যে হয় তবুও থাকে সত্য।’ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলিয়ান সাহিত্যিক আবিদ খানের বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস ‘সিজন্যাল অ্যাডজাস্টমেন্ট’ বেশ আলোচিত। এই উপন্যাসে তরতর করে উঠে এসেছে বঙ্গবন্ধুর চেনা-অচেনা, জানা-অজানা নানান বিষয়। ১৯৭১-এর ৭ মার্চের অনবদ্য ভাষণে নিউ ইয়র্কের ‘নিউজ উইক’ ম্যাগাজিনের মূল্যায়নে বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠেন পৃথিবীর প্রথম ‘পোয়েট অফ পলিটিক্স’। বাঙালির ইতিহাসে তিনিই একমাত্র রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, যাঁকে নিয়ে বাংলা সাহিত্য ও বিশ্বসাহিত্যে সাহিত্যকর্ম সৃষ্টি হয়েছে এবং হচ্ছে। বিশ্বসাহিত্যে বঙ্গবন্ধুকে উপস্থাপন করা হয়েছে খুব নান্দনিকভাবে। আমেরিকা, বসনিয়া, জাপান, জার্মান, ব্রিটিশ ইত্যাদি দেশের কবিগণ বঙ্গবন্ধুকে তাঁদের কবিতায় তুলে ধরেছেন। তাঁদের কবিতায় বাংলা ও বাঙালির ঝংকার আছড়ে পড়েছে। তৎকালীন একটি মানুষের দেশপ্রেম, উৎসর্গীকৃত জীবন এবং মানুষের ভালবাসার চিত্র স্থান করে নিয়েছিল বিশ্বসাহিত্যের খাতায় খাতায়। বিশ্ব অবাক হয়ে দেখেছে— কীভাবে একটি মানুষ, মানুষের কাছাকাছি পৌঁছতে পারে! কীভাবে একটি মানুষ দেশের জন্য জীবন বাজি ধরতে পারে! এই বার্তা দেশ-বিদেশের সাহিত্যিকরা বিশ্ববাসীর দরজা থেকে দরজায় পৌঁছে দিয়েছেন তাঁদের লেখনী দিয়ে। বহির্বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক অভ্যুদয় সম্পূরক। ১৯৬৩ সালের ২৮ আগস্ট বর্ণবাদী আন্দোলনের নেতা মার্টিন লুথার কিংয়ের মহাকাব্য আমাদের সবার জানা, ‘আই হ্যাভ আ ড্রিম’। এই মহাকাব্যের পর আমাদের ইতিহাসে আরও একটি মহাকাব্যের জন্ম হয়। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্সের ঐতিহাসিক ভাষণ। বঙ্গবন্ধুর এই ৭ মার্চকে নিয়ে এ-দেশের অনেক সাহিত্যিক সাহিত্য রচনা করেছেন। তার মধ্যে অন্যতম, নির্মলেন্দু গুণের ‘স্বাধীনতা এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’ কবিতাটি। নির্মলেন্দু গুণ এই কবিতায় লিখলেন—

‘‘অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন।

তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল,

হৃদয়ে লাগিল দোলা, জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার

সকল দুয়ার খোলা। কে রোধে তাহার বজ্রকন্ঠ বাণী?

গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তার অমর-কবিতাখানি:

‘এবারের সংগ্রাম আমদের মুক্তির সংগ্রাম,

এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’।”

আরও পড়ুন: জন্মদিনে রমেশচন্দ্র মজুমদার: দেবী ক্লিওর বরপুত্র

উপরের কবিতায় কবি বঙ্গবন্ধুকে একজন ‘কবি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, যে কবি রচনা করে গেছেন ‘বাংলাদেশ’ নামক এক মহাকাব্য। কেন-না, বঙ্গবন্ধুর ভাষণে প্রতিটি উচ্চারণই এক মহাকাব্যের ঝংকার, এক একটি অনবদ্য অধ্যায়ের সূচনা, সংযোজনা এবং সম্ভাবনা। যেন বিদ্রোহী কবিতার মতো ছিল তাঁর ভাষণের সবটুকু। বিশেষ করে তাঁর কথামালার ‘এবারের সংগ্রাম আমদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ কবিতার মতো আমাদের ঠোঁটে ও মুখে। এই উচ্চারণই সাহিত্যের উপাদেয় হিসেবে ধরে নিতে পারি। এ-কারণে তৎকালীন কিংবা সমকালীন কবিদের স্বাধীনতার সাহিত্য, মুক্তির সাহিত্য লেখার মূল প্রেরণা— বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বহু কবিতা-গল্প-উপন্যাস-নাটক রচিত হয়েছে এই মূলভিত্তির উপর নির্ভর করে। বঙ্গবন্ধুর কথামালায় বারবার ঘুরে-ফিরে মানুষের মুক্তির কথা উঠে এসেছে। মুক্তিকামী মানুষের ব্যক্তিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক মুক্তির কথা তাঁর বক্তব্যে প্রতীয়মান।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের নির্মম হত্যার উচ্চারণ আমাদের সাহিত্যে তুলে আনা হয়েছে শৈল্পিকভাবে। বঙ্গবন্ধুকে শারীরিকভাবে হত্যা করা হলেও বাঙালির মন থেকে হত্যা করা সম্ভব হয়নি। বাঙালি কখনও তাঁকে ভুলতে পারবে না। বাঙালির অস্তিত্বে মিশে আছেন তিনি। কেবল মানুষের মনে নয়, এ-দেশের গ্রাম-বাংলার প্রকৃতি, মেঠোপথ, নাগরিক-নগরের সঙ্গে মিশে আছেন আমাদের মহাকাব্যের মহানায়ক। এজন্য হয়তো-বা লেখক লিখলেন— ‘তোমার প্রাণ মিশে আছে এই মাটির সাথে। তোমার প্রাণ মিশে আছে এই জলের সাথে। তোমার প্রাণ মিশে আছে এই বায়ুর সাথে। তুমি আছ বাঙালির অন্তরে।’ (আমার বঙ্গবন্ধু, ২০১৬, কথাপ্রকাশ, ঢাকা, স.ম. শামসুল আলম)। পনেরো আগস্টের স্মৃতি আমাদের কালো অধ্যায়। অন্ধকারে হারিয়ে ফেলা একটি সূর্য। রাত পোহাবার আগেই পাখির দুঃসহ কলতান। ভোরের প্রার্থনার সঙ্গে ভেসে এলো মহাকাব্যের সেই গান, ‘যদি রাত পোহালে শোনা যেত বঙ্গবন্ধু মরে নাই, যদি রাজপথে আবার মিছিল হত, বঙ্গবন্ধুর মুক্তি চাই, তবে বিশ্ব পেত এক মহান নেতা, আমরা পেতাম ফিরে জাতির পিতা।’ (কথা: হাসান মতিউর রহমান, সুর: মলয় কুমার গাঙ্গুলী)।  অন্যদিকে, সৈয়দ শামসুল হক ‘পনের আগস্ট’ কবিতায় রেখে গেলেন এক শ্রদ্ধাঞ্জলির পদাবলি—

‘তোমার শোকে আজও কাঁদছে সারা বাঙ্গালী

অদ্যাবধি দেশের মানুষ তোমার কাঙ্গালী।

হে মহানায়ক তোমাকে জানাই শ্রদ্ধাঞ্জলি

অঙ্গ জুড়ে মাখি তোমার অমূল্য পদধূলি।’

সমকালীন লেখক নওশাদ জামিল তার ‘বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ হয়েছিল শিল্প-সাহিত্যে’ প্রবন্ধে বলেছেন, ‘পচাত্তরের পর হাতে গোনা কয়েকজন কবি, লেখক, সাহিত্যিক, শিল্পী জীবন বাজি রেখে বঙ্গবন্ধুকে তুলে ধরেছিলেন তাঁদের সৃষ্টিকর্মে। প্রকাশ করেছিলেন শিল্প-সাহিত্যের নানা রচনা-কর্ম। সাহসিকতার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রকাশ করেছিলেন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সংকলনও।’ (দৈনিক কালের কণ্ঠ, ১৬.০৮.২০১৯)। আবার, মহাদেব সাহা তাঁর ‘কফিনকাহিনি’ কবিতায় বঙ্গবন্ধুর রক্তাক্ত অধ্যায়ের দাগগুলি তুলে ধরেছেন এভাবে—

‘চারজন দেবদূত এসে ঘিরে আছে একটি কফিন

একজন বললো দেখো ভিতরে নবীন

হাতের আঙুলগুলি আরক্ত করবী

রক্তমাখা বুক জুড়ে স্বদেশের ছবি।’

পচাত্তরের পরে হাতে গোনা কয়েকজন হলেও, নব্বই দশক-শূন্য দশক কিংবা সমকালীন সাহিত্যিকের হাত ধরে উঠে এসেছে বঙ্গবন্ধুকেন্দ্রিক নানা অনুষঙ্গ ও প্রসঙ্গ। পাঠক খুঁজে পেয়েছে হারানো দিনের চেনা দিনগুলোকে, বার বার ফিরে গেছে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের পাতায়। আনন্দে যেমন চোখ ছলছল করেছে, তেমনি ছলছল চোখে জল নেমে গেছে অজান্তেই। বুকের বামে যতনে রেখেছে একটি নাম— বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এমন নানা বাস্তবিক বিষয় আমাদের সামনে হাজির হয়েছে কেবল সাহিত্যের অবদানে। গবেষক আবুল কাশেম হৃদয় দেশ ও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রকাশ করেছেন গবেষণাগ্রন্থ— ‘মুক্তিসংগ্রামে কুমিল্লা’ (২০০০), ‘অপারেশন কিল অ্যান্ড বার্ন’ (২০১৫), ‘কুমিল্লায় বঙ্গবন্ধু’ (২০১৮)। এসব গবেষণায় উঠে এসেছে আমাদের রাজনৈতিক আখ্যান, দেশ, মাটি এবং নাগরিক চেতনা ও যাতনা। তিনি বঙ্গবন্ধুকে আরও একবার ভিন্নরূপে পাঠ করার জন্য আমাদের হৃদয়কে ছুঁয়ে দিয়েছেন।

সমকালীন কবি ও প্রাবন্ধিক পিয়াস মজিদ তাঁর ‘বঙ্গবন্ধুর বয়ানে সাহিত্য ও অন্যান্য’ (ফেব্রুয়ারি ২০১৯) গ্রন্থে ‘বঙ্গবন্ধুর বয়ানে সাহিত্য ও সাহিত্যিক’ প্রবন্ধে বলেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের এমন অনেক কবিতা যে বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে ও হৃদয়ে ছিল, তা তাঁর উত্তরকালের নানা রাজনৈতিক ভাষণ-বক্তৃতায়ও স্পষ্ট হয়।’ (পৃ. ১৩)। কবি আরও উল্লেখ করেছেন, ‘বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিকথা বাংলা সাহিত্যের কবি-লেখকদের প্রসঙ্গ-অনুষঙ্গে যেমন ভাস্বর তেমনি এসেছে নানা দেশের, নানা ভাষার সাহিত্য ও সাহিত্যিক প্রসঙ্গ।’ (পৃ. ১৪)। সাহিত্যের প্রতি ছিল বঙ্গবন্ধুর অপরিমেয় ভালোবাসা। ‘রাশিয়ার চিঠি’ পড়তে পড়তে ডুবে যেতেন রবীন্দ্রনাথে। মূলত: রবীন্দ্রনাথ ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ভিতর-বাহির জুড়ে। ‘কারাগারের রোজনামচা’য় প্রসঙ্গক্রমে শরৎচন্দ্রের ‘আঁধারের রূপ’ প্রবন্ধের বিষয়টি টেনে এনেছেন বিনা সংকোচে। কারাগারে বসেই পড়েছেন শহীদুল্লা কায়সারের ‘সংশপ্তক’; লিখেছেন ফরাসি লেখক এমিল জোলার উপন্যাস ‘তেরেসা র‍্যেকুইন’-এর সংক্ষিপ্ত পাঠপ্রতিক্রিয়া। কেবল প্রবন্ধ বা কবিতা নয় বরং আব্বাসউদ্দিনের ভাটিয়ালি গান তাঁকে বিমোহিত করতো, আন্দোলিত করতো। সে কারণে বহু শিল্পী-সাহিত্যিকের সঙ্গে দেশে ও বিদেশে পরিচয় হয়েছে, সখ্যতা গড়ে উঠেছে। শিল্প-সাহিত্যের সুতোর সঙ্গে নিজেকে বেঁধেছিলেন ব্যস্ত জীবনের অলি-গলিতে। বঙ্গবন্ধুর কারাজীবন নিয়ে আত্মজৈবনিক কারাভাষ্য ‘কারাগারের রোজনামচা’ (শেখ মুজিবুর রহমান, ১৭ মার্চ ২০১৭, বাংলা একাডেমি, ঢাকা) কিংবা অসমাপ্ত অধ্যায়ের অবতারণা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ (শেখ মুজিবুর রহমান, প্রথম প্রকাশ: জুন ২০১২, পুনর্মুদ্রণ: ফেব্রুয়ারি ২০১৫, দ্য ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ঢাকা) আমাদেরকে ভাবিয়ে তোলে বারবার। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে বঙ্গবন্ধুর সাহসিক উচ্চারণ ‘যদি ১৫ই ফেব্রুয়ারির মধ্যে আমাদের মুক্তি দেওয়া না হয় তাহা হলে ১৬ই ফেব্রুয়ারি থেকে অনশন ধর্মঘট করতে শুরু করব। দুইখানা দরখাস্ত দিলাম। আমাকে যখন জেল কর্তৃপক্ষ অনুরোধ করল অনশন ধর্মঘট না করতে তখন আমি বলেছিলাম, ছাব্বিশ-সাতাশ মাস বিনা বিচারে বন্দি রেখেছেন। কোনো অন্যায়ও করি নাই। ঠিক করেছি জেলের বাইরে যাব, হয় আমি জ্যান্ত অবস্থায় না হয় মৃত অবস্থায় যাব। ‘Either I will go out of the jail or my deadbody will go out.’ (পৃ. ১৯৭)। এমন উচ্চারণ আমাদেরকে শিহরিত করে তোলে। দ্রোহে-বিদ্রোহে কেঁপে ওঠে ভিতরের আমিত্ব। জেগে ওঠে আমার আমি।

বঙ্গবন্ধু হল বহতা নদীর মতো। প্রতিদিন তাঁকে নিয়ে গবেষণা হচ্ছে, চর্চা হচ্ছে। দেশ-সহ বিদেশের বিভিন্ন ভাষায় বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রবন্ধ-নিবন্ধ প্রকাশিত হচ্ছে নিয়মিতভাবে। মূলত বাংলাভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি ছিল বঙ্গবন্ধুর এক একটি নিশ্বাস। তিনি ছিলেন জনমানুষের কবি, রাজনৈতিক কবি। নির্যাতিত, নিপীড়িত, বঞ্চিত মানুষের মুক্তির দিশারি। বঙ্গবন্ধু আমাদেরকে জাগিয়ে তুলেছেন, জাগিয়ে রেখেছেন এবং রাখবেন। বঙ্গবন্ধু বেঁচে আছেন জনতার ভালোবাসায়, বেঁচে থাকবেন।

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *