আজকের দিনে প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি বদলে দিয়েছিল ‘লিটল মাস্টারে’র ব্যক্তিগত জীবনও

ইন্দ্রজিৎ মেঘ

৩০ বছর আগে তাঁর কেরিয়ারের নবম টেস্ট খেলতে গিয়ে ১৭ বছর ১০৭ দিন বয়সি এক ক্রিকেটার ‘টেস্ট সেভিং’ সেঞ্চুরি করে বিশ্ব ক্রিকেটকে জানান দিয়েছিলেন যে, আগামী প্রজন্মের স্টার হতে চলেছেন তিনি। হ্যাঁ, কথা হচ্ছে ‘মাস্টার ব্লাস্টার’ শচীন তেন্ডুলকারের, যিনি ১৯৯০ সালে আজকের দিনে (১৪ আগস্ট) শত সেঞ্চুরির মধ্যে প্রথম সেঞ্চুরি করেছিলেন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাঞ্চেস্টার টেস্টের পঞ্চম দিনে তিনি ১১৯ রানে অপরাজিত থাকেন এবং ভারতকে পরাজয়ের হাত থেকে রক্ষা করেন।

Aug 14, 1990: Sachin Tendulkar scores the 1st of his 100 ...

৪০৮ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ভারতীয় দলের ছয় উইকেট পড়ে গিয়েছিল ১৮৩ রানে। ছয় নম্বরে ব্যাট করতে নামা শচীন ১৬০ রানের এক অবিচ্ছিন্ন জুটি গড়ে তুলেছিলেন মনোজ প্রভাকরের সঙ্গে। ভারতের স্কোর পৌঁছে দিয়েছিলেন ৩৪৩/৬ রানে। হারের হাত থেকে ভারতকে বাঁচিয়েছিল এই জুটি, বরং বলা ভালো, সময় থাকলে জিতেও যেতে পারত ভারত। শচীন ১৪ আগস্ট তাঁর জীবনের প্রথম সেঞ্চুরি করেছিলেন। পরের দিন ছিল স্বাধীনতা দিবস। সেই কারণে সেঞ্চুরিটি আরও বিশেষ হয়ে উঠেছিল।

On This Day: Sachin Tendulkar scores maiden international century ...

পাকিস্তানের মুস্তাক মহম্মদ ১৭ বছর ৭৮ দিন বয়সে আন্তর্জাতিক টেস্ট সেঞ্চুরি করেছিলেন। শচীন ছিলেন মুস্তাক মহম্মদের পর টেস্ট সেঞ্চুরি করা ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ ক্রিকেটার। নিজের ইংল্যান্ডের প্রথম সফর থেকে ফিরে শচীন এমন একটি ঘটনার মুখোমুখি হয়েছিলেন, যা তাঁর জীবনকে বদলে দেয়। আর তাঁর থেকে ছয় বছরের বড় অঞ্জলির সঙ্গে ভালোবাসার সম্পর্ক থেকে একেবারে বিয়ের পিঁড়িতে পৌঁছনোর মধ্যে ছিল দারুণ উত্তেজনাপূর্ণ চিত্রনাট্য, যা কোনও ছবির স্ক্রিপ্টের চেয়ে কম কিছু নয়।

Sachin Tendulkar, 17, Scored His Maiden International Century On ...

ইংল্যান্ড সফর শেষ করে মাথায় একঝাঁক কোঁকড়ানো চুলের শচীন প্রথমবার অঞ্জলিকে মুম্বই বিমানবন্দরে দেখলেন। অঞ্জলি তাঁর বন্ধুর সঙ্গে মাকে রিসিভ করতে বিমানবন্দরে পৌঁছেছিলেন। অঞ্জলির বন্ধু ডাঃ অপর্ণা শচীনকে চিনতে পেরেছিলেন। শচীনের দিকে ইশারা করার সময় তিনি অঞ্জলিকে বলেছিলেন যে, এই ছেলেটিই ইংল্যান্ডে সেঞ্চুরি করেছেন।

SACHIN TENDULKAR WITH WIFE AND FAMILY PICTURES - YouTube

এই কথা শুনে অটোগ্রাফ নিতে শচীনের পিছনে ছুটে যান অঞ্জলি। শচীন তাঁর পিছনে ছুটতে থাকা একটি মেয়েকে দেখে লজ্জা পেয়েছিলেন। তিনি তাঁর গাড়িতে চুপচাপ বসেছিলেন, কারণ দুই ভাই অজিত ও নীতিন বিমানবন্দরে তাঁকে নিতে এসেছিলেন। মজার বিষয় হল, শচীনের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করতে গিয়ে অঞ্জলি তাঁর মাকে রিসিভ করতে ভুলে গিয়েছিলেন। শচীনকে বিমানবন্দরে প্রথমবার দেখার পরে অঞ্জলি কোনওভাবে শচীনের সঙ্গে কথা বলতে ও দেখা করতে চেয়েছিলেন। তিনি বন্ধুদের সহায়তায় শচীনের ফোন নম্বরও জোগাড় করেছিলেন। অঞ্জলি শচীনকে ডেকে বললেন, ”আমি আপনাকে বিমানবন্দরে দেখেছি।” শচীনের উত্তর ছিল, ”হ্যাঁ, আমিও আপনাকে দেখেছি, আমার পিছনে ছুটতে।”

sachin anjali tendulkar wedding - GyanWaleBabaGyanWaleBaba

ফোনালাপের মাধ্যমে শচীন ও অঞ্জলির বন্ধুত্বের এমন একটি দৃঢ় ভিত্তি তৈরি হয়ে গিয়েছিল যে, দু’জন একে অপরের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ খুঁজতে শুরু করেন। অঞ্জলি একটি সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, শচীনের সঙ্গে দেখা করার জন্য নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে তিনি শচীনের বাড়িতে পৌঁছেছিলেন। শচীন তাঁর আত্মজীবনীতে এই ঘটনা উল্লেখ করেছেন (Sachin Tendulkar, Playing It My Way: My Autobiography), তিনি চাইলেও অঞ্জলির সঙ্গে দেখা করতে পারেননি।

On this day in cricket: Sachin Tendulkar scored his first Test ...

এরপর অনেক চেষ্টার পরে রাত সাড়ে ৮টায় দু’জনের সাক্ষাতের পরিকল্পনা হয়েছিল। শচীন যথাসময়ে পৌঁছেছিলেন বটে, কিন্তু অঞ্জলি বাড়ি থেকে বের হতে পারেননি। শেষপর্যন্ত শচীনকে ফিরতে হয়েছিল অঞ্জলির সঙ্গে দেখা না করেই। ‘মাস্টার ব্লাস্টার’ বলেছেন, তখন কোনও মোবাইল ফোন ছিল না এবং পাবলিক বুথ থেকে অঞ্জলিকে কল করতে পারেননি।

শচীনের জনপ্রিয়তা ক্রমে বাড়তে শুরু করে। শহরের কোথাও অঞ্জলির সঙ্গে দেখা করা এই অবস্থায় সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এমন পরিস্থিতিতে তিনি অঞ্জলির সঙ্গে দেখা করতে গ্রান্ট মেডিক্যাল কলেজ-জেজে হাসপাতালে যেতে শুরু করেছিলেন। সেখানে অঞ্জলি চিকিৎসক হওয়ার ট্রেনিং নিচ্ছিলেন। দু’জন দেখা করতেন লোনাওয়ালায় অঞ্জলির পৈতৃক বাংলোয়। শচীন লাজুক প্রকৃতির ছিলেন। তিনি নিজের পরিবারকে অঞ্জলির কথা বলতে পারেননি। এমন পরিস্থিতিতে অঞ্জলিই একধাপ এগিয়ে গেলেন। শচীন বলেছেন, ”অঞ্জলিকে বিয়ে করার বিষয়ে পরিবারের জিজ্ঞেস করা বিশ্বের দ্রুত বোলারদের মুখোমুখি হওয়ার চেয়ে আরও কঠিন ছিল। তখন আমি অঞ্জলিকে এই দায়িত্ব দিয়েছিলাম।” অবশেষে প্রায় পাঁচ বছরের সম্পর্কের পরে শচীন-অঞ্জলি এক হয়ে গেলেন। তাঁদের এঙ্গেজমেন্ট ১৯৯৪ সালে নিউজিল্যান্ডে হয়েছিল। তখন শচীন ভারতীয় দলের সঙ্গে নিউজিল্যান্ড সফরে ছিলেন। ২৪ এপ্রিল শচীনের ২১তম জন্মদিনে তাঁদের এঙ্গেজমেন্ট হয়েছিল। এক বছর পরে ১৯৯৫ সালের ২৪ মে শচীন-অঞ্জলির বিয়ে হয়।  

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *