সূর্যে নাকি লকডাউন

ড. সৌমিত্র চৌধুরী

তেমনই শোনা যাচ্ছে। প্রচার মাধ্যম জানাচ্ছে, সূর্যে নাকি শুরু হয়ে গেছে ‘লকডাউন’! ক্রমশ কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলছেন অর্ক দেব। ফলত, শীতলতার অন্ধকারে নিমজ্জমান ধরিত্রী। বড়ই বিপদ! হিমযুগ আসন্ন। তৎসহ পর্যুদস্ত পৃথিবীর মহা উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। টেলিফোন মোবাইল ইন্টারনেট— উপগ্রহ-কেন্দ্রিক তাবৎ যোগাযোগ ব্যবস্থার ধ্বংস অনিবার্য।

সত্যি নাকি গুজব! নাকি কতিপয় মানুষের অমুলক ভাবনা। প্রচার মাধ্যমের অতিরঞ্জন (মিডিয়া হাইপ) এসব? উত্তর খুঁজতে হবে সূর্যরহস্য আর তথাকথিত লকডাউনের ইতিবৃত্তের গভীরে গিয়ে।

সূর্যের কাছে আমাদের যাবতীয় প্রত্যশা। ‘হে সূর্য তুমি আমাদের উত্তাপ দাও…।’ এটুকুই শুধু নয়। জীবন সচল রাখতে আরও বহু আকুল প্রার্থনা ‘হোমো স্যাপিয়েন’ নামের প্রাণীটির। সামগ্রিকভাবে তাবৎ প্রাণীকুলেরই সূর্যনির্ভর বেঁচে থাকা। বিশ্বজুড়ে বারো মাসের উপাখ্যান রবি গ্রহটির দাক্ষিণ্যে। টিকে থাকা চাষবাস ফসল সমৃদ্ধি পূজা-পার্বণ সবই। সূর্য সম্পর্কে কৌতূহলের শুরু সেই গুহাবাস কাল থেকেই। দু’লক্ষ বছর পেরিয়ে এসেও আজকের মহাকাশজয়ী মহা উন্নত মানব সম্প্রদায় সূর্য রহস্য বুঝে উঠতে পারেনি।

আরও পড়ুন: মুর্শিদাবাদ জেলার সংবাদ-সাময়িক পত্রের দু’শো বছর

আকাশের একদিকে উঠে আরেক দিকে মিলিয়ে যাবার রহস্য আদিম মানুষ জানত না। তাম্রযুগ লৌহযুগেও রহস্য অধরা। উন্নততর সভ্যতার মানুষ দীর্ঘকাল ধর্মগ্রন্থের আপ্ত বাক্যে বিশ্বাস রেখে সত্যের সন্ধান পায়নি। ধর্মের ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে এসে শুরু করল প্রমাণ নির্ভর অনুসন্ধান। এর ইতিহাস খুব প্রাচীন নয়। মাত্র পাঁচ-ছ’শো বছর আগে শুরু হয়েছিল অন্বেষণ কর্মকাণ্ড।

পোল্যান্ডের জ্যোতির্বিজ্ঞানী নিকোলাস কোপার্নিকাস (১৪৭৩-১৫৪৩), ইতালির গ্যালিলিও গ্যালিলাই (১৫৬৪-১৬৪২) জানালেন, সূর্য আদতে নক্ষত্র। বিশাল তার আকার। পৃথিবীর ব্যাসের ১০৯ গুণ। তার চারদিকে নিরন্তর পাক খেয়ে চলেছে পৃথিবী আর ডজনখানেক গ্রহ। আঙ্কিক নিয়মে মহাকর্ষ বলের ক্রিয়ায় টিকে আছে সোলার সিস্টেম। এর কেন্দ্রে বিশালাকায় সূর্য আগুনের এক তপ্ত গোলক। পৃথিবী থেকে বহু দূরে (৯৩০ লক্ষ মাইল) তার অবস্থান।

‘সূর্যের সমস্তটাই গ্যাস। পৃথিবীর যেসব উপাদান মাটি ধাতু শক্ত পাথর, তাদের সমস্তই সূর্যের মধ্যে মজুত। প্রচণ্ড উত্তাপে গ্যাসের অবস্থায়। বর্ণলিপি যন্ত্রের রেখাপাত থেকে তার প্রমাণ হয়ে গেছে।’ …গ্যাস আবরণের ‘স্তর পেরিয়ে যত ভেতরে যাওয়া যাবে ততই দেখা দেবে ঘনতর গ্যাস এবং উষ্ণতর তাপ। সূর্যের উপরিতলের তাপমাত্রা দশ হাজার ফারেনহাইট ডিগ্রির মাপে, অবশেষে নীচে নামতে নামতে এমন স্তরে পৌঁছাবে যেখানে ঠাসা গ্যাসের আর স্বচ্ছতা নেই। এই জায়গায় তাপমাত্রা এক কোটি পঞ্চাশ লক্ষ ডিগ্রির চেয়ে বেশি। অবশেষে কেন্দ্রে গিয়ে পাওয়া যাবে সাত কোটি বিশ লক্ষের তাপ। সেখানে সূর্যের দেহ বস্তু কঠিন লোহা-পাথরের চেয়ে অনেক বেশি ঘন অথচ গ্যাস ধর্মী’ (বিশ্বপরিচয়, রবীন্দ্র রচনাবলী, ত্রয়োদশ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫২৭)।   

উত্তাপে যাবতীয় বস্তু কণার, হাইড্রোজেন কার্বন হিলিয়াম আয়রন, গ্যাসীয় অবস্থা (প্লাজমা)। গ্যাসের ঘনত্ব, গ্যাসের তাপমাত্রা উপরতলে কম। গভীরে বা কেন্দ্রে প্রচণ্ড বেশি। সেখানেই পারমাণবিক বিক্রিয়া চলতে থাকে। চারটে হাইড্রোজেন পরমাণু জোড়া লেগে তৈরি হয় হিলিয়াম আর প্রচণ্ড  তাপ শক্তি (ফিউশন)। প্রতি সেকেন্ডে ৪-৫ কোটি টন হাইড্রোজেন নিঃশেষিত হয়ে যায়। হিলিয়াম তৈরির পারমাণবিক বিক্রিয়া তৈরি করে ভয়ংকর তাপমাত্রা। প্রায় দেড় কোটি ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড।

বহু দূরের উত্তপ্ত নক্ষত্রের রহস্য জানতে গ্যালিলিও টেলিস্কোপ যন্ত্র বানিয়ে ফেলেছিলেন। যন্ত্রের কাচে চোখ রেখে আকাশের পটে দেখতে পেলেন অগুনতি গ্রহ-তারা-নক্ষত্র। আর দেখলেন, তেজোদীপ্ত সূর্যের গায়ে ফুটে আছে অসংখ্য ছোপ ছোপ কালো দাগ। মানে স্পট। অর্থাৎ কলঙ্ক।

সৌরকলঙ্ক-কেন্দ্রিক বর্তমানের আলোচনা। এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে সূর্যের অনেক অনেক রহস্য। এমনকী লকডাউনের গল্পও।

আরও পড়ুন: অন্যধারার লিটল ম্যাগাজিন চিন্তায় এগিয়ে ‘চিন্তা’

সূর্যের গায়ে ছোপ ছোপ দাগ আছে। শুধু তাই নয়। দাগগুলো প্রত্যেক দিন একটু একটু করে সরে যায়। কী কারণ! রবি নক্ষত্র নিজের অক্ষরেখার চারদিকে ঘুরছে নাকি? দীর্ঘকাল অনুসন্ধান করে গ্যালিলিও তাঁর গবেষণালব্ধ জ্ঞান প্রকাশ করলেন। জানালেন, সূর্যও ঘুরছে আর সাতাশ দিন লাগে নিজ অক্ষের চারদিকে একটা পাক সম্পূর্ণ করতে।

এর পর অদ্ভুত কথা বললেন জার্মানির এক শখের জ্যোতির্বিদ তিনি। ডিপ্লোমাধারী ডাক্তার। নাম হেনরিখ স্যামুয়েল সোয়াব (Heinrich Samuel Schwabe, 1789-1875)। সতের বছর ধরে প্রতিটি দিন সূর্যের গতিবিধির উপর নজর রেখে ছবি এঁকেছেন। ছবিতে অসীম যত্নে ফুটিয়ে তুলেছেন সূর্যের গায়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কালো দাগগুলোর অবস্থান। নিখুঁত তাঁর পর্যবেক্ষণ। বললেন (১৮২৫), দাগগুলো বিশাল আকারের, অন্তত হাজার মাইল। আর প্রতিদিন বাড়ছে দাগগুলোর সংখ্যা। বাড়তেই থাকছে। বাড়তে বাড়তে সর্বোচ্চ সংখ্যায় পৌঁছে আবার কমে যাচ্ছে। অর্থাৎ একসময় মিলিয়ে গিয়ে আবার বাড়তে আরম্ভ করে, আবার কমে যায়। এভাবেই চলে একেকটা চক্র (Cycle)। চক্রের স্থায়িত্বকাল দশ বছর সাত মাস।

শখের জ্যোতির্বিদের কথায় আমল দেয়নি কেউ তখন। কিন্তু কয়েক দশক পর বিখ্যাত বিজ্ঞানী হামবোল্ট (Friedrich Wilhelm von Humboldt, ১৭৬৯-১৮৫৯) জানালেন, ডাক্তার শোয়েবের পর্যবেক্ষণ একদম সঠিক। সূর্যের গায়ে লেগে থাকা কালো দাগগুলো ফুটে ওঠে, আবার মিলিয়ে যায়। সূর্য অস্ত যাবার কালে, যখন উজ্জ্বলতা কম, এই দাগ খালি চোখেও নজরে আসে।

আরও একটি তথ্য হাতে এলো। সূর্যের চৌম্বক ক্ষেত্র, সান স্পটের ক্রিয়ায় বদলে যায়। সূর্য তো আসলে খুবই বড় এক গ‍্যাসীয় চুম্বক। বহু গ্যাস আর তড়িৎ কণা (চার্জ, Charge) ঘুরে বেড়াচ্ছে। চার্জ যুক্ত জিনিস ঘোরাঘুরি করলে চুম্বকক্ষেত্র তৈরি হয়। গোটা সূর্যটাই তাই একটা মহাক্ষমতাশালী চুম্বক। চুম্বকের উত্তর মেরু আছে, দক্ষিণ মেরু আছে (পৃথিবীর মতোই)। দুই মেরু আবার স্থির নয়। ধীরে ধীরে জায়গা বদল করে নিজেদের মধ‍্যে। চৌম্বক বলরেখাগুলোর সজ্জা (Arrangement) বদলাতে থাকে। নিয়মমাফিক প্রক্রিয়া। এর সঙ্গে তাল রেখে সূর্যের বিভিন্ন জায়গার চৌম্বকক্ষেত্র বাড়ে কিংবা কমে। বর্ধিত চৌম্বকক্ষেত্র অঞ্চলে দেখা যায় অধিকতর সংখ্যার সৌরকলঙ্ক। এদের সংখ্যা গুনে নেওয়া যায়। জোড়ায় জোড়ায় থাকে সৌরকলঙ্ক। প্রত‍্যেক এগারো বছর অন্তর সৌরকলঙ্ক আস্তে আস্তে বেড়ে সর্বোচ্চ সংখ্যায় পৌঁছয়। আবার ধীরে ধীরে কমে আসে। এগারো বছরের এক একটা চক্র।

আরও পড়ুন: বাড়ছে তাপমাত্রা, জ্বলছে ইউরোপ

বিজ্ঞানী মহলে আরেকটা প্রশ্ন উঠল। সৌরকলঙ্কের সঙ্গে পৃথিবীর চৌম্বকশক্তির কি কোনও সম্পর্ক আছে? পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রও তো স্থির নয়। বাড়ে, কমে।

প্রশ্নের উত্তর জানান দিলেন ব্রিটিশ পদার্থবিদ এডওয়ার্ড স্যাবাইন (Edward Sabine, 1788-1883)। দীর্ঘ গবেষণার পর এডওয়ার্ড বললেন (১৮৫২), পৃথিবীর চৌম্বক বল বা চুম্বক শক্তির  (Intensity) সঙ্গে সূর্য কলঙ্কের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। সূর্যের গায়ে ছোপ ছোপ দাগ যখন বেশি, পৃথিবীর চৌম্বকশক্তি তখন বেশি। আশ্চর্য তো! কেন এমন হয়?

আশ্চর্য হলেও বিষয়টি নিয়ে কেউ তেমন মাথা ঘামাত না। তবে কয়েকজন জ্যোতির্বিদ দিনরাত ভাবতেন। দেখতেন মানুষের জীবনে এর প্রভাব যথেষ্টই। সমুদ্র যাত্রায় নাবিকের হাতে থাকত কম্পাস। কম্পাসের কাঁটা সর্বদাই পৃথিবীর উত্তর আর দক্ষিণ মেরু বরাবর সোজা হয়ে থাকে। কেন থাকে? কারণ পৃথিবী গ্রহটার নিজের একটা চুম্বক ধর্ম আছে। আছে তার বিস্তৃত চুম্বক বলরেখা।

সূর্যের চুম্বক বলের প্রভাব কি পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের উপর পড়ে? ভাবনাচিন্তা চলছিল। কিন্তু প্রমাণ নির্ভর ব্যাখ্যা খুঁজে পেতে অপেক্ষা করতে হল বহু বছর। যত দিন না সূর্যের আলো বিশ্লেষণ করবার এক যন্ত্র আবিষ্কার হল। যন্ত্রের নাম স্পেক্ট্রোমিটার। এর সাহায্য নিয়ে সূর্য থেকে বেরিয়ে আসা আলোর বর্ণালি  (স্পেকট্রাম) বিশ্লেষণ করে অনেক কিছু জেনে নেওয়া সম্ভব হল। কী এই স্পেকট্রাম?

রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘বর্ণলিপি’ (বিশ্বপরিচয়)। ‘‘তিনপিঠওয়ালা কাঁচের ভিতর দিয়ে সূর্যের সাদা আলো পার করলে তার সাতটা রঙের পরিচয় পরে পরে বেরিয়ে পড়ে। লোহা প্রভৃতি শক্ত জিনিস যথেষ্ট তেতে জ্বলে উঠলে তার আলো যখন ক্রমে সাদা হয়ে ওঠে তখন এই সাদা আলো ভাগ করলে সাত রঙের ছটা পাশাপাশি দেখা যায়। তাদের মাঝে মাঝে কোনো ফাঁক থাকে না কিন্তু লোহাকে গরম করতে করতে যখন তা গ্যাস হয়ে যায় তখন ঐ কাঁচের ভিতর দিয়ে তার আলো ভাঙলে বর্ণচ্ছটায় একটানা পাই নে। দেখা যায় আলাদা আলাদা উজ্জ্বল রেখা, তাদের মধ্যে মধ্যে থাকে আলোহীন ফাঁকা জায়গা। এই বর্ণালোকচিহ্নপাতের নাম দেওয়া যাক বর্ণলিপি’’ (বিশ্বপরিচয়)।

বর্ণলিপি, মানে স্পেকট্রোগ্রাম বিশ্লেষণ করে সূর্য থেকে বিকিরিত আলোর শক্তি এবং সূর্যের তাপমাত্রা নির্ণয় সম্ভব হল। জানা গেল, সূর্যের গায়ে লেগে থাকা কালো দাগ অর্থাৎ স্পটের তাপমাত্রা ৪০০০ ডিগ্রি। আর স্পট বিহীন অঞ্চলের ৬০০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। অর্থাৎ কালো দাগ যে অঞ্চলে তার তাপমাত্রা অপেক্ষাকৃত কম।  

আরও পড়ুন: ‘অবন ও রবি’ স্বয়ং

কেন এমন হয়? আবার রবীন্দ্রনাথের দেওয়া ব্যাখ্যা শুনি (বিশ্বপরিচয়)। ‘‘এই লিপিতে দেখা গেছে দীপ্ত গ্যাসীয় অবস্থায় প্রত্যেক জিনিসের আলোর বর্ণচ্ছটা স্বতন্ত্র। নুনের মধ্যে সোডিয়ম নামক এক মৌলিক পদার্থ পাওয়া যায়। তাপ দিয়ে দিয়ে তাকে গ্যাস করে ফেললে বর্ণলিপিতে তার আলোর মধ্যে খুব কাছাকাছি দেখা যায় দুটি হলদে রেখা। আর কোনো রঙ পাই নে। সোডিয়ম ছাড়া অন্য কোনো জিনিসেরই বর্ণচ্ছটায় ঠিক ঐ জায়গাতেই ঐ দুটি রেখা মেলে না। ঐ দুটি রেখা যেখানকারই গ্যাসের বর্ণলিপিতে দেখা যাবে বুঝব সোডিয়ম আছেই।” … ‘‘কিন্তু দেখা যায় সূর্যের আলোর বর্ণচ্ছটায় সোডিয়ম গ্যাসের ঐ দুটি উজ্জ্বল হলদে রেখা চুরি গেছে, তার জায়গায় রয়েছে দুটো কালো দাগ। বিজ্ঞানী বলেন উত্তপ্ত কোনো গ্যাসীয় জিনিসের আলো সেই গ্যাসেরই অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা স্তরের ভিতর দিয়ে আসার সময় সম্পূর্ণ শোষিত হয়। এ ক্ষেত্রে আলোর অভাবেই যে কালো দাগের সৃষ্টি তা নয়। বস্তুত সূর্যের বর্ণমণ্ডলে যে সোডিয়ম গ্যাস সূর্যের আলো আটক করে সেও আপন উত্তাপ অনুযায়ী আলো ছড়িয়ে দেয়, আলোকমণ্ডলের তুলনায় উত্তাপ কম ব’লে এর আলো হয় অনেকটা ম্লান। এই ম্লান আলো বর্ণচ্ছটায় উজ্জ্বল আলোর পাশে কালোর বিভ্রম জন্মায়।”

সৌরকলঙ্ক সম্পর্কিত আধুনিক ধারণা খানিক ভিন্ন। সংক্ষিপ্ত বর্ণনায়, সূর্যের সুবিশাল অবয়বে আছে মূলত চারটে স্তর। একদম গভীরে কোর (Core) অঞ্চল। এখানেই, বলা হয়েছে আগে, পারমাণবিক ক্রিয়ায় চারটে হাইড্রোজেন পরমাণু জোড়া লেগে (Fusion) তৈরি হয় হিলিয়াম পরমাণু আর প্রচণ্ড তাপশক্তি। কোর অঞ্চলের বাইরে বিকিরণ জোন (Radiative zone)। তার বাইরে থাকে তাপ পরিচলন অঞ্চল (Convection zone)। এর বাইরে অতি উজ্জ্বল সূর্যের উপরিতল (Photo sphere)

পরিবহণ (conduction), পরিচলন (convection) আর বিকিরণ (Radiation)। পাঠ্যপুস্তকে লিখিত তাপের স্থানান্তর গমনের তিন উপায়। গরম খুন্তির ছেঁকা, তাপের পরিবহন। জল ফোটালে নিচের ঠান্ডা জল গরম হয়ে উপরে উঠে আসে। পরিচলন প্রক্রিয়া (convection)। আর সূর্যের তাপ পৃথিবীতে নেমে আসে যে প্রক্রিয়ায় তার নাম বিকিরণ।

সূর্যের গভীরতম অঞ্চলের তাপ বেরিয়ে আসে বিকিরণ জোনে (Radiative zone) আর সেখান থেকে পৌঁছয় পরিচলন অঞ্চলে (Convection zone)। বেলা শেষে সূর্যের গায়ে কনভেকটিভ জোনের উপস্থিতি বুঝতে পারা যায়। অসংখ্য ছোট ছোট কণা (Granules and super granules) নজরে আসে।

আরও পড়ুন: সিসিফাস ও স্বচ্ছতার পাঠান্তর

কনভেকশন অঞ্চলেই তৈরি হয় সৌর দাগ। বড় অস্থির (unstable) এই অঞ্চল আর অস্থিরতার কারণেই সূর্যের গায়ে কালো দাগের সৃষ্টি। অস্থিরতা কেন? সূর্যের গভীর অঞ্চল থেকে অতিরিক্ত পরিমাণ প্লাসমা (Plasma material) বেরিয়ে আসে। এমন হবার কারণ, ম্যাগনেটিক বয়েনসি (Magnetic Boyuncy)। অর্থাৎ চুম্বকের ক্রিয়ায় গ্যাসের ঘনত্ব কোন কোন অঞ্চলে কমে যায়। অভিকর্ষ বলে উপরে ভাসতে থাকে। ফলত কিছু অঞ্চল রয়ে যায় অপেক্ষাকৃত অনুজ্জ্বল অবস্থায়। এগুলোই কালো রঙের। আমরা বলি সৌর দাগ। 

সৌর দাগ, কালোর বিভ্রম, সৌর কলঙ্ক বা সান স্পট বুঝে উঠবার পরে আরেকটি ব্যাপার নজরে এলো (১৮৫৯)। ইংল্যান্ডের জ্যোতির্বিদ ক্যারিংটন (Richard Christopher Carrington) দেখতে পেলেন, সূর্যের কোন কোন জায়গায় তারার মতো জ্বলতে থাকা উজ্জ্বল আলো (Solar flare) ফেটে পড়ল (Burst)। মিনিট পাঁচেক জ্বলবার পরই নিভে গেল আলো। যেখানে কালো দাগ, সেখানেই আলোর বিস্ফোরণ বা সোলার ফ্লেয়ার ঘটছে বেশি। অর্থাৎ দাগ যুক্ত সূর্যই বেশি ক্রিয়াশীল।

ক্রিয়াশীল অ্যাকটিভ সূর্যই পৃথিবীতে মানুষের বুকে ভয় ধরিয়ে দিয়েছিল (১৯৭৯)। মহাকাশে আমেরিকান গবেষণা কেন্দ্র ‘স্কাইল্যাব’ ভেঙে পড়ল। ন’তলা বাড়ির সমান উঁচু কৃত্রিম উপগ্রহ স্কাইল্যাব দশ বছর পৃথিবীর চারদিকে প্রদক্ষিণ করবে, তেমনই ছিল নিখুঁত পরিকল্পনা। কিন্তু ‘ত্রুটিহীন’ পরিকল্পনাকে ভেস্তে দিয়ে আগেই ভেঙে পড়ল মহাকাশযান। কেন, কেন এমন ঘটল?

কারণ হিসবে অনেকে বললেন, সৌর কলঙ্ক বা সান স্পটের ক্রিয়া। সান স্পটের চক্র এগারো বছর স্থায়ী। চক্রের প্রথম চার বছরের প্রচণ্ড ক্রিয়াশীলতা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের উপর ভাগে ভয়ানক প্রসারণ ঘটিয়ে যেন সূর্যের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। পরের বছরগুলোতে সংকোচন শুরু হল। ফলে ঘটল বিপর্যয়। পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরতে থাকা স্কাই ল্যাব দ্রুত নেমে আসতে লাগল। শেষমেশ ভেঙেই পড়ল।

অনেকে ভিন্ন মত পোষণ করে বললেন, জ্যোতির্বিদরা সানস্পট দেখে দেখে তাদের সংখ্যা গুনে রাখতেন, ঠিক কথা। কিন্তু দীর্ঘ সত্তর বছরে কোনও সান স্পটের হিসাব লেখেননি তাঁরা। অতএব সৌরকলঙ্কের তত্ত্ব বেঠিক। এর বিপক্ষের মত, ওই সময় জুড়ে (দীর্ঘ সাত দশক) পৃথিবীতে হিম যুগ (Maunder minimum, Little Ice Age) এসেছিল। এক সময় হিম যুগ পার করে পৃথিবী তার স্বাভাবিক ছন্দ ফিরে পেয়েছিল।   

বিবাদ বিতর্ক, ব্যাপক অনুসন্ধান, পর্যবেক্ষণ অন্তে বিজ্ঞানীকুল মেনে নিলেন যে, সানস্পটের ক্রিয়াই স্কাইল্যাব ভেঙে পড়াবার জন্য দায়ী।

আমেরিকার এক জ‍্যোতির্বিজ্ঞানী জর্জ হেল (Georges Ellery Hale) স্পেকট্রোহেলিয়োগ্রাফ যন্ত্র কাজে লাগিয়ে সৌরকলঙ্ক বিষয়ে নতুন তথ্য জানালেন (১৯০৮)। বললেন, সৌরকলঙ্কগুলোর চৌম্বকধর্ম আছে। কেন বললেন? উনি দেখেছিলেন, সৌরকলঙ্ক থেকে বের হওয়া আলোর বর্ণালি আরও সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম রেখায় ভেঙে যাচ্ছে। এমনটাই ঘটবার কথা বলেছিলেন ডাচ পদার্থবিদ জিম্যান ( Pieter Zeeman)। নোবেল জয়ী জিম্যানের তথ্য, চুম্বকের প্রভাবে বর্ণালির আলোর রেখা আরও সূক্ষ্ম দাগে ভেঙে যায় (splitting of a spectral line into several components in the presence of a static magnetic field)। কালো দাগ অঞ্চলগুলোয় সৌরচুম্বকের শক্তি খুব বেশি। এতটাই যে, কোনও তাপ তরঙ্গ বেরিয়ে আসতে পারে না সেখান থেকে।

প্রচণ্ড শক্তিশালী সৌরচুম্বক। সূর্যের চৌম্বক ক্ষেত্রের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর চুম্বক ধর্মও বদলে যায়। কারণ সূর্যের চুম্বক বলরেখাগুলো মহাকাশের গ্রহ নক্ষত্র ভেদ করে বিশ্ব নিখিলে ছড়িয়ে পড়ে। এর অন্তর্গত আমাদের পৃথিবী আর পৃথিবী নামের গ্রহটি আবার নিজেই একটি চুম্বক। চুম্বকটির উত্তর মেরু আর দক্ষিণ মেরু, খুব ধীরে হলেও স্থান বদল করে।

পৃথিবীর চুম্বক ধর্ম আবার সৌরচুম্বক তথা সান স্পটের সঙ্গে সম্পর্কিত। সান স্পট যে অঞ্চলে সবচাইতে বেশি তার নাম সোলার ম্যাক্সিমাম। আর যেখানে সর্বনিম্ন, তার নাম সোলার মিনিমাম। মন্ডার মিনিমাম ( Maunder Minimum) নামের আরেকটি শব্দ ব্যবহার করেছিলেন (১৯৭৬) জন এডি নামের এক আমেরিকান জ্যোতির্বিদ। সুদীর্ঘ কাল ধরে চলা সান স্পট মিনিমাম বোঝাতে ব্যবহার করেছিলেন শব্দটি। সাত দশক কাল ধরে (1645 to 1715) চলেছিল এই সোলার মিনিমাম। ‘মিনি আইস এজ’ নামেও পরিচিত সেই সময়কাল।

আইস এজ বা মন্ডার মিনিমাম (Maunder Minimum) কেন হয়? আবার নাকি আসতে চলেছে আইস এজ, মন্ডার মিনিমাম? সূর্যের নাকি লকডাউন পর্ব শুরু হয়ে গেছে? প্রশ্ন ঘুরছে করোনা ভাইরাস কণ্টকিত একুশ শতকের আতঙ্ক জর্জর মানুষের মনে।

প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আবার ঢুকতে হবে সৌর কলঙ্কের গভীরে। সৌর কলঙ্কের বা সান স্পটের সংখ্যা যখন বেশি, সূর্য তখন অশান্ত। অত্যন্ত ক্রিয়াশীল। সৌর কলঙ্কের মুখগুলো দিয়ে ভিতরের অগ্নি ঝলক বেরিয়ে আসে। অসংখ্য ক্ষতিকর পারমাণবিক কণিকায় ভর্তি সেই ভয়ংকর দারুণ আগ্নিবান। অগ্নিকণিকাগুলো প্রচণ্ড বেগে (350.5 km/sec) মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে। পৃথিবীর দিকেও ধেয়ে আসে। পৃথিবীর চৌম্বক মেরু এই সব কণিকাকে আটকে দেয়।

কিন্তু সৌরঝড় খুব তীব্র হলে? পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র সৌর দাপট থামাতে পারবে না। ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়বে। তখন পৃথিবী ব্যাপী নেমে আসতে পারে মন্ডার মিনিমাম। অর্থাৎ ‘মিনি আইস এজ’, হিমযুগ।

পৃথিবীর জল স্থল আকাশ ব্যাপী অতি উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিপর্যয় নেমে আসবে। মোবাইল ইন্টারনেট টেলি যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংস। আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার মূলে কাজ করে উন্নত স্যাটেলাইট প্রযুক্তি। পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রে বড়সড় পরিবর্তন ঘটলে উপগ্রহ, রেডিয়ো, বিদ্যুৎ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সম্ভবত, সাময়িক সময়ের জন্য।

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৩)

অতীতের অভিজ্ঞতা জানিয়েছে, আগেও (১৬৫০ সাল থেকে ১৭১৫) পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধে ‘গ্রান্ড সোলার মিনিমাম’-এর প্রভাব দেখা গেছিল। উত্তর গোলার্ধ অঞ্চলের আবহাওয়া এমনিতেই অতি শীতল। তার সঙ্গে যুক্ত হল সূর্যের নিষ্ক্রিয়তা বা লকডাউনের প্রভাব। ফলে শীতলতা আরও বেড়ে গিয়েছিল। সে সময়কাল মানব ইতিহাসে “Little Ice Age” নামে চিহ্নিত।

অন্য সময়েও ঘটেছিল ‘সোলার মিনিমাম’। এর প্রভাবে ইন্দোনেশিয়ার মাউন্ট টাম্বোরাতে ভয়ংকর অগ্ন্যুৎপাত ঘটেছিল (১৮১৫)। প্রাণহানি ঘটেছিল বহু (৭১ হাজার মানুষ)। এক বছর পরেই (১৮১৬) ‘গ্রীষ্ম বিহীন এক সাল’ দেখেছিল পৃথিবী। জুলাই মাসের গরমকালে বিশ্বের বহু জায়গায় বরফ পাত শুরু হয়েছিল। এই ঘটনা ‘ডালটন মিনিমাম’ বলে উল্লিখিত।

‘ডালটন মিনিমাম’ নাকি একুশ শতকে আবার ফিরে আসতে পারে? তেমনই আশঙ্কা করছেন অনেকে। আমেরিকার মহাকাশ বিজ্ঞান সংস্থা (The National Aeronautics and Space Administration, NASA) বিপদেরই ইঙ্গিত দিয়ে বলছেন, বর্তমান বছর থেকেই (২০২০) সূর্যের ক্রিয়াশীলতা কমতে শুরু করছে। আমরা ‘আইস এজ’-এর দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।

কোন্‌ প্রমাণের ভিত্তিতে বলছেন? ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির (ESA) উপগ্রহে ধরা পড়েছে কিছু ছবি। সেগুলোর বিশ্লেষণে বিজ্ঞানীরা বলছেন, পৃথিবীর চুম্বক মেরু আগের স্থান থেকে সরে যাচ্ছে এবং বেশ দ্রুতই। পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের উত্তর মেরু ছিল কানাডার দিকে। কিন্তু বিজ্ঞানীদের নজরে ধরা পড়ল, উত্তর মেরু কানাডার দিক থেকে অনেকটাই সরে গিয়েছে। তার অবস্থান সাইবেরিয়ায়। আর সরে যাওয়াই নয়, ক্রমশ শক্তি হারাচ্ছে আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার মাঝামাঝি জায়গার চৌম্বক ক্ষেত্র (সাউথ আটলান্টিক অ্যানোমালি)।

ভূ-চৌম্বক ক্ষেত্র সৌরঝ​ড় ও মহাজাগতিক ক্ষতিকর বিকিরণ থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করে। তাই পৃথিবীর চুম্বক ক্ষেত্র দুর্বল হ​য়ে প​ড়লে অনেক বিপর্যয়ের সম্ভাবনা। প্রভাব পড়বে টেলিকমিউনিকেশন, বিমান চলাচলে। কৃত্রিম উপগ্রহগুলির ক্রিয়াকলাপ বিঘ্নিত হবে। অনেক ধরনের পাখি, সামুদ্রিক প্রাণী দিক নির্ণ​য়ে সমস্যায় পড়বে (www.timesnownews.com)।

নাসার বিজ্ঞানীদের আরও এক আশঙ্কা। সোলার মিনিমাম-এর মতো প্রভাব, আগে যেমন ঘটেছিল পৃথিবীতে (১৭৯০ থেকে ১৮৩০), আবার আসতে পারে বর্তমান সময়ে (২০২০ সালের পরে)।  

তার মানে সূর্যের লকডাউন? কী অবস্থা হবে তখন সৌরকরোজ্জ্বল ধরিত্রীর? যোগাযোগ ব্যবস্থার বিপর্যয় তো ঘটবেই। আগে বলা হয়েছে। এছাড়াও বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, পৃথিবীর অনেক জায়গায় ঠান্ডার পরিমাণ বাড়বে। হতে পারে ভূমিকম্প, খরা। এমনকী অগ্নুৎপাত। চাষবাসের উপরও সম্ভবত বিরূপ প্রভাব পড়বে।

তবে ভিন্ন মতও আছে। অনেক বিজ্ঞানীর অভিমত, উষ্ণায়নের পৃথিবীতে তেমন কোনও প্রভাব ফেলতে পারবে না আসন্ন ‘সোলার মিনিমাম’। সূর্যের তথাকথিত লকডাউনে পৃথিবীর যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হবার সম্ভাবনা আছে ঠিকই। কিন্তু কী ঘটবে, এখনই তার পূর্বাভাস দেওয়া যাবে না। গবেষণা চলছে। নাসার পার্কার সোলার প্রোব (Parkar solar probe, 2019) সূর্যের অনেক কাছে পৌঁছে বিষয়টির অনুসন্ধান শুরু করেছে (২০১৯)। অনেক তথ্য হাতে এসেছে। তবে অজানা এখনও বহু কিছু। সঠিক অবস্থা জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।   

সে কারণে প্রচার মাধ্যমের খবরে, ‘সূর্যের লকডাউন’, ‘পৃথিবীতে আসন্ন হিমযুগ’ বিভ্রান্ত না হয়ে আরও কয়েকটি বছর অপেক্ষা করতে হবে আমাদের।

লেখক ভূতপূর্ব বিভাগীয় প্রধান ও এমেরিটাস মেডিক্যাল সায়েন্টিস্ট, চিত্তরঞ্জন জাতীয় কর্কট রোগ গবেষণা সংস্থান, কলকাতা

Facebook Twitter Email Whatsapp

এই সংক্রান্ত আরও খবর:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *