‘মধু’ গন্ধে ভরা

সমীরণ মণ্ডল (লাহিড়ীপুর, গোসাবা)

মধুর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান না থাকলে আপনি যে মধু কিনছেন, তা খাঁটি না ভেজাল বুঝতে পারবেন না। তাই মধুর বৈশিষ্ট্য জানা খুবই জরুরি। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, একেক ফুলের মধুর একেক রকম বৈশিষ্ট্য থাকে। স্বাদ, গন্ধ, রং ও ঘনত্বের।

কালো জিরা মধুর বৈশিষ্ট্য  আপনারা অনেকেই খেজুরের গুড় খেয়েছেন আশা করি। এই কথাটি বলার কারণ হল, আপনি যদি কালোজিরা ফুলের মধু খান তাহলে বলবেন যে, গুড় এবং এই মধুর মাঝে কোনও পার্থক্য নেই। অর্থাৎ কালোজিরা ফুলের মধুর স্বাদ একদম খেজুরের গুড়ের মতো। তবে ভুলে গেলে চলবে না, মধু তো মধুই। সেটা কখনোই গুড় নয়। এরস্বাদ অনেকটা গুড়ের মতো, তবে গন্ধ কিন্তু গুড়ের মতো নয়। বেশ আকর্ষণীয় এবং মনোমুগ্ধকর। আর একটি জিনিস মনে রাখতে হবে, মধু চিনির থেকে ২৫ গুণ বেশি মিষ্টি। কালোজিরা ফুলের মধুর স্বাদ প্রায় গুড়ের মতো এবং দেখতেও কিন্তু গুড়ের মতোই প্রায়। কালো কালো টাইপের।

আরও পড়ুন: বাংলার প্রাচীন বৈকুণ্ঠ চতুর্দশী

মধুর ঘনত্ব নির্ভর করে পারিপার্শ্বিক আবহাওয়া, তাপমাত্রা, মধু পরিপক্ব কি না এবং মৌচাষির উপরে। তবে আমাদের দেশে যে মধু বিক্রি হয় তাতে সাধারণত ১৮% থেকে ২৫% জলীয় উপাদান থাকে। অনেক সময় কিছু কম বেশি হয়। জলীয় উপাদান যত কম হবে, মধু তত ঘন হবে।

সরিষা ফুলের মধুর বৈশিষ্ট্য  এই মধু খুবই মিষ্টি। রং হবে হালকা হলুদ বর্ণের। তবে এই মধুর সবচেয়ে বড় যে বৈশিষ্ট্য, তা আমাদের অনেকের জানা নেই। তা হল— সরিষা ফুলের মধু শীতকালে অল্প কিছু দিনের মধ্যেই জমে যায়, আর গরমের সময় জমতে একটু দেরি হয়, কয়েক সপ্তাহ বা ২/৩ মাস বা এর চেয়ে একটু বেশি সময় লেগে যেতে পারে। তবে জমবেই। যদি না জমে, তবে বুঝতে হবে মধুতে সমস্যা আছে। বোতলে রাখা সরিষা ফুলের মধুর পুরোটাই জমে যেতে পারে অথবা বেশিরভাগ অংশ বা আংশিক জমে যাবে। সরিষা ফুলের মধু জমে অনেকটা ঘিয়ের রূপ ধারণ করে। জমে যাওয়া মধু মোলায়েম, নরম, ছোট ছোট দানাদার হবে।

আরও পড়ুন: গোলপাতা চাষ ও গোল গুড় উৎপাদন হতে পারে সুন্দরবন উপকূলের বিকল্প কর্মসংস্থান

লিচু ফুলের মধুর বৈশিষ্ট্য  লিচু ফুলের মধু তেতো হয়ে যায়। শুনতে অবাক লাগলেও এটাই বাস্তব। আমরা তো সব সময় জেনে এসেছি মধু অত্যন্ত মিষ্টি। একটি বইতে পড়েছিলাম, মধু চিনির থেকে ২৫ গুণ বেশি মিষ্টি। তাই মধু আবার তেতো হবে এ কথা শুনতে একটু অবাকই লাগে।

লিচু ফুলের মধুর ক্ষেত্রে যেটা দেখা যায়, লিচু ফুলের মধু প্রাকৃতিকভাবে স্বাভাবিক কারণেই হালকা তেতো হয়ে যায়। কিন্তু এটা বুঝতে হবে কখন তেতো হয়? কত সময় পরে তেতো হয়? কারণ আমরা যেটা দেখি, মধু মাঠ থেকে সংগ্রহ করার পরে তো তেতো থাকে না। মধু তেতো হয় অনেকদিন পরে। সেটা কত সময় পরে? এবং কোন গ্রেডের মধু বেশি তেতো হয়?  

আরও পড়ুন: আলু নিয়ে আলুথালু

লিচু ফুলের মধু যদি ‘সি’ গ্রেডের হয় কিংবা ‘বি’ গ্রেডের হয়, তাহলে প্রায় দুই থেকে চার মাসের মধ্যেই তেতো ভাব চলে আসে। আর যদি মধু অনেক বেস্ট ‘এ’ গ্রেডের হয়, সেক্ষেত্রে এরকম তেতো ভাব না আসতেও পারে। আর যদি আসে তাহলে সেটা অনেক বেশি সময় লাগবে এবং তার পরিমাণটা খুবই সামান্য থাকবে, তবে কিছুটা তেতো অনুভূত হবে। মধু অবশ্যই মিষ্টি থাকবে, তবে মধু খাওয়ার শেষের দিকে আপনার গলায় তেতো তেতো অনুভূতি হবে। খুবই সামান্য একটা অনুভূতি।

খলিশা ফুলের মধুর বৈশিষ্ট্য  খলিশা ফুলের মধু নিয়ে আমাদের সবার ধারণা পরিষ্কার নয়। এই মধুকে আমরা অন্য সব মধুর সঙ্গেই গুলিয়ে ফেলি। শুধু খলিশা কেন, প্রকৃতপক্ষে প্রত্যেকটা ফুলের মধুর বৈশিষ্ট্য আলাদা। খলিশার সঙ্গে সরিষা ফুলের কিংবা সরিষা ফুলের সঙ্গে লিচু ফুলের মধুর বৈশিষ্ট্য কখনও এক হবে না।

খলিশা ফুল হল এক বিশেষ প্রজাতির ফুল, যা কেবল সুন্দরবনেই হয়৷ সুন্দরবন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল। সুন্দরবনের বাতাসের আর্দ্রতা আমাদের সাধারণ এলাকা থেকে বেশি। আমাদের সাধারণ বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ ২০-২১ শতাংশ হয়। কিন্তু সুন্দরবনের ক্ষেত্রে তা ২৭-২৮ শতাংশ হয়৷ যে কারণে সুন্দরবনের খলিশা ফুলের মধু সাধারণ আবহাওয়ার মধুর চেয়ে অপেক্ষাকৃত কম ঘন বা পাতলা হয়।

খলিশা ফুলের মধুর সুন্দর একটা গন্ধ আছে। বেস্ট খলিশা ফুলের মধুটা পাওয়া যায় মার্চের শেষে, এপ্রিলের শুরুতে। এবং এই খলিশা ফুলের মধুর রং লাইট হবে। খয়েরি, ইট রঙের হবে না। জুন-জুলাইয়ে কাটা মধুর রং ডিপ হবে।

খলিশা ফুলের মধুর বোতল ঝাঁকালে সাদা ফেনা তৈরি হবে। আবার কিছু সময় পার হলে মধুর আকারে ফিরে যাবে।

খলিশা ফুলের মধু এয়ার টাইট বোতলে মুখ বন্ধ করে রাখলে গ্যাস তৈরি হবে। যদি গ্যাস না হয়, তবে সেটা খাঁটি নয়। এবং খলিশা মধুর উপরে সবসময়ই একটা সাদা গাদ জমে থাকে। এটা পিওরিটির লক্ষণ। সেজন্য খলিশা ফুলের মধু সম্পর্কে না জেনে মধু কিনলে আসল মধুও ভেজাল মনে হতে পারে আবার ভেজাল মধুও আসল মনে হতে পারে। তাই মধু কেনার আগে মধু সম্পর্কে জানুন। জানার চেয়ে বড় স্মার্টনেস আর কিছুই নেই।

মধু হাজার বছরেও নষ্ট হয় না কেন?

১) অম্লীয় পরিবেশ

অধিকাংশ ব্যাকটেরিয়ার বেঁচে থাকার পিএইচ হল ৬.৫ থেকে ৭.০ এর মধ্যে কিন্তু মধুর পিএইচ ৩.৯ থেকে ৬.১-এর মধ্যে। তবে গড়পড়তায় ৩.৯, অর্থাৎ বেশ অম্লীয় বলা চলে। এই পরিবেশ অনেকগুলো ব্যাকটেরিয়া, যেমন Corynebacterium diphtheriae, Escherichia coli, Streptococcus, Salmonella ইত্যাদি ব্যাকটেরিয়ার জন্য প্রতিকূল পরিবেশের তৈরি করে থাকে। ফলে এগুলো মধুর মধ্যে গিয়ে বেঁচে থাকতে পারে না।

২) জলের পরিমাণ বা ময়েসচর কম, চিনি বেশি

মধুতে চিনির পরিমাণ ৮০ শতাংশের উপর, অন্যদিকে জল থাকতে পারে ১৭-১৮ শতাংশ। ব্যাকটেরিয়াকে টিকে থাকতে হলে ফারমেন্টেশন করতে হবে কিন্তু মধুর ঘন দ্রবণে অল্প জল থাকায়, তা ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করতে পারে না। ফলস্বরূপ ফারমেন্টেশন ব্যাহত হয়।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে, তা হল অভিস্রবণ। চিনির পরিমাণ অনেক বেশি থাকাতে মধুর অভিস্রবণিক চাপ অনেক বেশি। মধুর মধ্যে যখন কোন ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করে তখন মধুর অত্যধিক অভিস্রবণিক চাপের জন্য ব্যাকটেরিয়ার শরীর থেকে জল বের হয়ে যায়, ব্যাকটেরিয়ার মারা যায়।

৩) কিছু অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল এজেন্ট

মৌমাছির পেটে প্রসেসিং হবার সময় মধুর সঙ্গে গ্লুকোজ অক্সিডেজ নামক এনজাইম মিশে যায়। গ্লুকোজ অক্সিডেজ চিনিকে ভেঙে তৈরি করে হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড ও গ্লুকোনিক অ্যাসিড, গ্লুকোনিক অ্যাসিড অম্লীয় পরিবেশ তৈরিতে বেশ সহায়ক। হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড তীব্র ক্ষয়কারক হওয়াতে ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি আটকে দেয়।

এছাড়াও মধুর মধ্যে পলিফেনলস, ফ্ল্যাভিনয়েডস, মিথাইলগ্লাইওক্সাল, কিছু পেপটাইডসহ অন্যান্য কিছু রাসায়নিক বস্তু পাওয়া যায় যেগুলো অণুজীবের টিকে থাকার জন্য বিরূপ পরিবেশ তৈরি করতে পারে।

৪) অত্যধিক ঘনমাত্রা

মধু অধিক ঘন হওয়াতে অক্সিজেন সহজে মিশতে পারে না। ফলস্বরূপ অনেক ব্যাকটেরিয়ার দৈহিক বৃদ্ধি কিংবা সংখ্যা বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। বায়ুশূন্য পাত্রে আটকে, শুকনো ঠান্ডা পরিবেশে রাখলে খাঁটি মধু নষ্ট হবার কোনও সম্ভাবনা নেই।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *