মধ্যপ্রদেশ বৃত্তান্ত (৭) – পাঁচমারি

অঙ্কিতা

পাঁচমারি নামটা এসেছে পঞ্চমার্‌হি থেকে। পঞ্চ অর্থাৎ পাঁচ এবং মার্‌হি শব্দটির অর্থ গুহা। এখানে পাণ্ডবদের বাসস্থান হিসাবে একটা ছোট টিলার গায়ে পাঁচটি গুহাকন্দর আছে।

পাঁচমারিতে আমাদের ঘুম ভেঙে গেল বেশ সকালে। ছোট একটা শহর। পাশেই মিলিটারি ক্যান্টনমেন্ট। অবশ্য শহর থেকে সেটা চোখে পড়ে না, পাহাড় আড়াল করে রেখেছে। পাঁচমারিকে মধ্যপ্রদেশের কাশ্মীর বলা হয়। খুব ভুল কিছু নয়, পাঁচমারির ‘ধূপগড়’ সাতপুরা পর্বতশ্রেণির সর্বোচ্চ শিখর। ভোপাল থেকে গাড়ি বা বাস ছাড়াও ট্রেনে করে পাঁচমারিতে আসা যায়। তার জন্য নামতে হয় পাহাড়ের পাদদেশে পিপারিয়া স্টেশনে। পিপারিয়া থেকে পাঁচমারি প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার।

আরও পড়ুন: মধ্যপ্রদেশ বৃত্তান্ত (ষষ্ঠ পর্ব) – ভোপাল ভীমবেঠকা

পাণ্ডব গুহার সামনে

পাঁচমারির ঘুরে দেখার জন্যও আমাদের একটিমাত্র দিন বরাদ্দ। যথারীতি সাইট সিয়িং-এ কিছু আপস করতেই হল। প্রথমেই আমরা চললাম পাণ্ডব উদ্যান আর পাণ্ডব গুহা দেখতে। বাগানটা বেশ সুন্দর। প্রচুর ফুল ফুটে আছে। কেয়ারি করা। মধ্যে মধ্যে বিশাল বিশাল ক্যাকটাস লাগানো। দ্রৌপদীর আমলেও এই টিলার সামনের অংশে পত্নীপ্রেমী ভীম বাগান করে দিয়েছিল কিনা কে জানে। বাগানের একধারে উঁচু পাথরের টিলা। টিলার ধার ধরে পাথরের সিঁড়ি। টিলার গায়ে ছোট ছোট গুহার মতো। একতলা, দোতলা, তার উপরে চ্যাপটা ছাদ। একতলা পর্যন্ত উঠতেই ফোঁস ফোঁস করতে থাকলাম। প্রাচীনকালে মানুষের হাঁটুতে ব্যথা হত না, ফুসফুস অনেক সবল ছিল। সন্তু দোতলা পর্যন্ত উঠল। ছাত অবধি কারোর আর ওঠা হল না। ওখান থেকে আশপাশের সুন্দর ভিউ পাওয়া যায়। তিন নম্বর গুহার দরজায় ছোট ছোট মূর্তি, অলংকরণ আর লিপি খোদাই করা আছে। লিপিটার অর্থ জানলাম ‘উৎকর্ণঃ ভাগবকেন’। ভাগবক নামে কোনও এক বৌদ্ধসন্ন্যাসী এই গুহায় সাধনা করতেন, তিনিই এই মূর্তি, অলংকরণ ইত্যাদি খোদাই করেছেন। ঐতিহাসিকদের মতে অলংকরণগুলি গুপ্ত যুগের। প্রাকৃতিক গুহাগুলি সত্যিই মানুষের বাসস্থান হিসাবে সুন্দর। ঠিক যেমন ভীমবেঠকাতে ছিল। আমরা গুহা ছেড়ে পরবর্তী গন্তব্যের দিকে এগোলাম।

আরও পড়ুন: মধ্যপ্রদেশ বৃত্তান্ত (৫) – মাহেশ্বর ওমকারেশ্বর

পাণ্ডব উদ্যান

বাইসন লজ। এটা একটা ছোট মিউজিয়াম এবং সংলগ্ন এলাকায় পার্ক, উদ্যান ইত্যাদি। এই সাতপুরা জঙ্গলে যত ধরনের জন্তু-জানোয়ার, পশুপাখি, গাছ-লতা ইত্যাদি দেখা যায় অথবা আগে ছিল এখন বিলুপ্ত অথবা লুপ্তপ্রায় পর্যায়ের, তার একটা সার্বিক নিদর্শন ধরা আছে এই মিউজিয়ামটিতে। স্কাল্পটিং অথবা ফোটোগ্রাফি। মিউজিয়ামটা মন্দ লাগল না।

মিউজিয়ামের পরবর্তী গন্তব্য ঝরনা। খুব সম্ভবত ওটা ছিল বি-ফলস্‌। পাঁচমরিতে এই একটাই ঝরনা দেখেছিলাম আমরা। বর্ষাকালে এই ঝরনা হয়তো জলপ্রপাতের রূপ নেয়। কিন্তু ডিসেম্বরের শেষে ক্ষীণকায় ঝরনাটাকে দেখতে তেমন কিছু লাগল না। অবশ্য প্রচুর লোক ঝরনা দেখতে এসেছে। এমনকী লোকজন হাঁড়ি-ডেকচি নিয়ে এসে পিকনিকও করছে। ঝরনার উপরের তলায় যেখান দিয়ে নদী বয়ে যাচ্ছে সেখানে আমরা অনেকক্ষণ বসে রইলাম। জলের গতিবেগ বেশি নয়। শীতের রোদে পিঠ দিয়ে ঠান্ডা জলে পা ডুবিয়ে বসে থাকতে বেশ ভালোই লাগছিল।

আরও পড়ুন: মধ্যপ্রদেশ বৃত্তান্ত: মান্ডু

বি-ফলস্’এর সামনে

কিছুক্ষণ বসে থাকার পরেই চমকে উঠলাম। পায়ে কী যেন সুড়সুড়ি দিয়ে গেল। সাপখোপ নয় তো! ভয়ের চোটে লাফিয়ে উঠেছিলাম প্রায়। তারপরে দেখি, ছোট ছোট মাছ। তারা দিব্যি এসে পদচুম্বন করে যাচ্ছে। মাঝেমাঝে দু-একটা বড় মাছ যে আসছে না, তা নয়। সন্তুর পায়ের কড়ে আঙুলদু’টো একটা বড় মাছের খুবই পছন্দ হয়েছিল। ওটার জ্বালায় সন্তু বেশিক্ষণ ফুট ম্যাসাজ নিতেই পারল না। শপিং মলে খরচা করে আজকাল একধরনের ফুট ম্যাসাজের খুব চল দেখা যায়। জলের মধ্যে পা ডুবিয়ে বসে থাক, মাছের ঝাঁক এসে চুমকুড়ি খেয়ে পা ফরসা করে দেবে। পাঁচমারির এই ঝরনাতে প্রকৃতি নিজে হাতেই সেই সব ব্যবস্থা করে রেখেছে। কিছুক্ষণ আলোচনার পরে আমরা এই সিদ্ধান্তে এলাম, দ্রৌপদী ওই গুহায় থাকত আর এখানে নির্ঘাত স্নান করতে আসত। ন্যাচারাল ম্যাসাজ, ন্যাচারাল বাথটাব। মাছেদের সঙ্গে মজা করতে করতে সুয্যিঠাকুর মাথার উপরে উঠে গেল।

আরও পড়ুন: মধ্যপ্রদেশ বৃত্তান্ত: উজ্জয়িনী

ভল্লুক গুহার প্রবেশপথে

লাঞ্চ সেরে আমরা দেখতে গেলাম রিচগড় আর ইকো পয়েন্ট। এই জায়গাটা আমার সত্যিই ভালো লাগছিল। একটা জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে বেশ অনেকটা রাস্তা হেঁটে গিয়ে একটা অদ্ভুত পাহাড়ের গুহা, লোকে বলে ভল্লুকের আড্ডাখানা। একটা ছোট জায়গাকে এমনভাবে ঘিরে রেখেছে খাড়াই পাথরের শৃঙ্গ যে আসা যাওয়ার রাস্তা দু’টো বন্ধ করে দিলে কোনওভাবেই ভিতরে ঢোকা সম্ভব নয়। নির্ভেজাল প্রাকৃতিক দুর্গ। এখানেও ছোট ছোট মানুষের বসবাসের গুহা আছে। সে গুহার এমনই অবস্থান, ভরদুপুরেও নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। এরকম জমাট অন্ধকার আমি কখনও দেখিনি। টর্চের আলোও সে অন্ধকার ভেদ করে বেশিদূর যাচ্ছে না। আমরা এদিক-ওদিক ঘুরে ঘুরে দেখলাম।

আরও পড়ুন: মধ্যপ্রদেশ বৃত্তান্ত: ইন্দোর

ভল্লুক গুহার অভ্যন্তরে

গুহা থেকে ফেরার পথে সাতপুরা জঙ্গল আমাদের তার সেরা উপহারটি দিল। এমনিই ফিরছিলাম, হেলতে দুলতে, বুটের ঠোক্করে লাল ধুলো উড়িয়ে উড়িয়ে, জঙ্গল আর আকাশ দেখতে দেখতে; আচমকা চোখে পরল গাছের ডালে কী যেন একটা দোল খাচ্ছে। ভালো করে দেখি একটা ইয়াব্বড় কাঠবিড়ালি, সাধারণ কাঠবিড়ালির থেকে প্রায় আড়াই-তিন গুণ বড়, লালচে রঙের। কি রূপ, কি বাহার! রোগাপটকা একটা গাছের ডালে বসে বসে দোল খাচ্ছে। আমার চোখের উপরেই কাঠবিড়ালিটা উড়াল দিল সামনের গাছ লক্ষ্য করে। চার হাত পা ছড়িয়ে, প্যারাস্যুটের মতো। ক্যামেরায় লংলেন্স বসানোর আগেই সে এ-গাছ ও-গাছ উড়ালঝাঁপি খেলতে খেলতে হাওয়া হয়ে গেল দূর জঙ্গলে। মনটা ভরে গেল। পাঁচমারি আমাদের নিরাশ করেনি।

আরও পড়ুন: মধ্যপ্রদেশ বৃত্তান্ত: গৌরচন্দ্রিকা

সাতপুরার পর্বতশিরা

ভল্লুকের গুহা দেখার পর আমাদের তালিকার শেষ গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা দিলাম। পাহাড়ের ভাঁজে সূর্যাস্ত। রাস্তাটা অতি মনোরম। ঢেউয়ের মতো পর্বতরাজি, সাতপুরার পর্বতশিরা। পাহাড় ঘুরে ঘুরে উঠতে লাগলাম উপরে। মধ্যপ্রদেশ সত্যিই প্রকৃতির বিভিন্ন সম্ভারে পরিপূর্ণ। এই খাঁ-খাঁ রুক্ষ প্রান্তর, প্রায় মরুভূমির মতো প্রকৃতি আবার তার মাঝ দিয়েই বয়ে গেছে পুণ্যসলিলা নর্মদা। নীল জলে ঢেউ তুলে ওমকারেশ্বর-মাহেশ্বরের ফাঁকে ফাঁকে এই সাতপুরা পর্বতের গায়ে গায়ে ছুটে চলে। আবার এই সাতপুরা পর্বত ভীমবেঠকার প্রাচীন গুহা, পাঁচমারির পাহাড় জঙ্গলের নীলাভ সবুজ বর্ণালী। একই অঙ্গে কত রূপ। আগামী দিনে প্রকৃতি আরও কত রূপ আঁচলে বেঁধে বসে রেখেছে কে জানে।

ধুপগড় উপত্যকা

পাঁচমারিতে দেখার স্থান অনেক। এদের মধ্যে বি-ফলস, ধুপগড়, চৌরাগড়, পনরপানি, জটাশঙ্কর গুহামন্দির ইত্যাদি বেশ বিখ্যাত। নর্মদা নদীকে ‘শিবের বাসস্থান’ বলা হয়। গল্প শুনেছি নর্মদা নদীর বিভিন্ন ঘূর্ণাবর্তে প্রতিদিন নাকি হাজারে হাজারে শিবলিঙ্গ তৈরি হয়। নর্মদা তীরে শিব মন্দিরের সংখ্যা অসংখ্য। জটাশঙ্কর তার মধ্যে খ্যাতনামা। জটাশংকর আমাদের দেখা হয়নি। শুনেছি, ছবিতে দেখেছি জল পড়ে পড়ে সে গুহা আকৃতি অপরূপ। দেখা হয়নি ডাচেস ফলস, চৌরাগড়, হান্ডিখো, প্রিয়দর্শিনী ভিউ পয়েন্ট, মহাদেও ও গুপ্তমহাদেও, রাজেন্দ্রগিরি, পাঁচমারি লেক, ক্যাথলিক চার্চ ইত্যাদিও।

ঘণ্টাখানেক পাহাড় জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে ঝড়ের বেগে গাড়ি চালিয়ে সন্ধের দোরগোড়ায় ড্রাইভার আমাদের পৌঁছে দিল ধুপগড়। পড়ন্ত বিকেলে পাহাড়ের পিছনের উপত্যকাটায় এক অদ্ভুত সুন্দর নীলচে রং, তার মধ্যে কুয়াশা গুঁড়ি মেরে ক্রমে ঢেকে দিচ্ছে উপত্যকা। ঠান্ডা বাড়ছে। আমরা বেশ কিছুক্ষণ বসে রইলাম সূর্যাস্তের অপেক্ষায়। কিন্তু হালকা মেঘের আনাগোনায় শেষ অবধি প্রকৃতিমাতা আর আমাদের কৃপা করলে না। ওই পাহাড়ের উপরে ছোট একটা মিউজিয়াম মতো আছে। সেখানেই কিছুক্ষণ ঘুরে দেখলাম। গুঁড়ো গুঁড়ো অন্ধকার ঢেকে দিল পাহাড়-বন-জঙ্গল-উপত্যকা। শতাধিক গাড়ির সঙ্গে আমাদের গাড়িও লাইন করে নেমে চলল পাহাড় থেকে। পাঁচমরি ঘোরা সাঙ্গ হল আমাদের। আগামী দিন আমরা ছুটব কান্‌হার উদ্দেশে।

ক্রমশ…

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *