মধ্যপ্রদেশ বৃত্তান্ত: ইন্দোর

অঙ্কিতা

এক যে ছিল চাষার মেয়ে। সেই অন্ধকার যুগেও অষ্টমবর্ষীয়া বালিকা বাবার কাছে লিখতে পড়তে শেখে। গ্রামের মন্দিরে যায় সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বালাতে। এমনই এক গোধূলিলগ্নে কনে দেখা আলোয় সেই বালিকাকে পুত্রবধূরূপে পছন্দ করে ফেললেন এক শাসনকর্তা। তিনি যে সে শাসনকর্তা নন, মালবের সম্পূর্ণ শাসনভার যাঁর হাতে সেই রাজা মলহর রাও হোলকার। ছোটবেলায় মলহর রাও নিজেও ছিলেন অত্যন্ত গরিব। তরুণ বয়সে সামান্য সৈনিক হিসাবে যোগ দেন পেশোয়া বাজিরাও-এর সেনাদলে। ক্রমে সেই তরুণের বীরত্ব আর সাহসে মুগ্ধ হয়ে পেশোয়া বাজিরাও তাঁকে মালবের শাসনকর্তা হিসাবে নিয়োগ করেন। রাজা মলহর রাও-এর মানুষ চেনার ক্ষমতা ছিল অতুলনীয়। তিনি সেই চাষার মেয়ের মাঝেই দেখেছিলেন এক রানির দীপ্তি।

আরও পড়ুন: মধ্যপ্রদেশ বৃত্তান্ত: গৌরচন্দ্রিকা

রানি অহল্যা বাঈ

বালিকার বিয়ে হল। কয়েক বছর বাদে, মেয়ে কোলে দুই শিশু রেখে যুদ্ধ করতে গিয়ে মারা গেলেন তাঁর স্বামী, খন্ডে রাও হোলকার। আজন্ম সংস্কারী ধার্মিক মেয়ে সহমরণে যেতে চাইলেন। বুড়ো রাজা কেঁদে ভাসান। বধূমাতার আর সহমরণে যাওয়া হল না।

মলহর রাও পুত্রবধূকে শেখাতে শুরু করেন রাজকার্য। ওইটুকু মেয়ের বুদ্ধি, স্থৈর্যে, রাজনীতিতে, এমনকী যুদ্ধনীতিতেও বৃদ্ধ রাজা নিজেই চমকে যান মাঝেমাঝে। ক্রমে দিন কেটে যায়। মেয়ে যখন বছর চল্লিশের, তখন বুড়ো রাজা চোখ বোজেন। রাজা হয় বধূমাতার পুত্র। কিন্তু মেয়ের ভাগ্য এখানেও খারাপ। অত ধার্মিক প্রজাবৎসল মেয়ের একমাত্র পুত্র অত্যাচারী, নৃশংস।

আরও পড়ুন: সুন্দরবনে কংক্রিট নদীবাঁধ নাকি প্রাকৃতিক বাঁধ, জোর চর্চা

রানি অহল্যাবাঈ-এর আরাধ্য দেবতা

সিংহাসনে বসার পর থেকেই ক্রমেই রাজাবাবুর অত্যাচার বাড়তে লাগল। সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে লাগল প্রজা অসন্তোষ। রাজমাতা নিজের সমস্ত বুদ্ধি দিয়ে রাজ্যে সুশাসন বজায় রাখার চেষ্টা করেন। মাত্র ন-মাস। তারপরেই একজনকে হত্যা করে রাজার মানসিক বিকৃতি দেখা দেয়। কিছুদিন পরে রাজা মারা যায়। শুরু হয় রাজ্য জুড়ে প্রজাবিদ্রোহ। প্রজারা চায় তাদের মনোনীত কোনও লোক রাজা হোক, আর রাজমাতা চান রাজ্যশাসন তাঁরই হাতে থাকুক। মহারাজ মলহর রাওয়ের শিক্ষায় সুশিক্ষিত রানি সৈন্যবাহিনী নিয়ে নিজে যুদ্ধক্ষেত্রে যান এবং দক্ষতার সঙ্গে বিদ্রোহ দমন করেন। মালব রাজ্যের সিংহাসনে বসলেন স্বামীপুত্রহীনা এক দরিদ্র পরিবারের মেয়ে, রানি অহল্যাবাঈ হোলকার।

আরও পড়ুন: জেরুসালেম

রানি অহল্যাবাঈ-এর তৈরি রেবাঘাট। অঙ্কিত চিত্র

আমরা ইন্দোর স্টেশনে নামলাম তখন রাত প্রায় দু’টো। শিপ্রা এক্সপ্রেসের কল্যাণে রাত্রি দু’টোর সময়েও ইন্দোর স্টেশনে দিব্যি অটোওলাদের ভিড় দেখা গেল। দরাদরি করতে একশো টাকার বিনিময়ে একজন অটোওলা আমাদের নির্দিষ্ট হোটেলে পৌঁছে দিল। হোটেলটা মোটেও ভালো ছিল না। ইন্টারনেটে ছবি একরকম, আর হোটেল একরকম। যাত্রার শুরুতেই হোটেলটা বাজে হয়ে গিয়ে, নিজের বানানো প্ল্যানের ব্যাপারে বেশ মনঃক্ষুণ্ণ হলাম। আড়াইটে নাগাদ সন্তুও এসে হাজির। রেলযাত্রার ক্লান্তিতে ঘুম আসতেও দেরি হল না।

আরও পড়ুন: জীবনের গাছপালা, জীবনের ডালপালা

ইন্দোর শহরে এক মসজিদ

বর্তমান ইন্দোর শহরের রূপরেখা পুরোটাই রানি অহলাবাঈ-এর হাতে গড়া। সকাল আটটায় ড্রাইভারের ফোনে আমাদের ঘুম ভাঙল। ভ্রমণের দিন হাতেগোনা, ফলে আজকে আমাদের প্যাকড শিডিউল। চটজলদি তৈরি হয়ে আমরা ইন্দোর শহর ঘুরতে বেরোলাম। গাড়িতে বসতেই ড্রাইভার প্রথমেই আমাদের নিয়ে গেল, জুনা রাজোয়াড়া। শহরের ঠিক মধ্যিখানে পুরনো রাজপ্রাসাদ। মারাঠি ভাষায় ‘জুনা’ শব্দের অর্থই পুরনো। রাস্তা থেকে প্রাসাদটা দেখা গেল, কিন্তু রাজোয়াড়ারর প্রধান দ্বার সমেত সম্পূর্ণ সামনের মহলটা তখন সংস্কার করা হচ্ছিল। রাজবাড়িটা অন্য সময় নিশ্চয়ই দেখতে সুন্দর লাগে, কিন্তু সেই সময় সামনে থেকে ফোটো তোলার মতো সৌন্দর্য কিছুই প্রায় অবশিষ্ট ছিল না।

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (৪র্থ অংশ)

জুনা রাজোয়াড়ার পার্শ্বদ্বার

রাজবাড়ির পাশের একটা গেট দিয়ে ভিতরের মহলে আমরা ঢুকলাম। ভিতরে হোলকার রাজাদের ইতিহাস আর ব্যবহৃত জিনিসের মিউজিয়াম। জিনিসগুলো খুব উজ্জ্বল নয়। মহিমাময়ী রানি অহল্যাবাঈ যে কী-রকম সাত্ত্বিক, ধার্মিক ও অনাড়ম্বর জীবনযাপন করতেন, তা এই মিউজিয়াম দেখলেই বোঝা যায়।

মিউজিয়ামে রানির ব্যবহৃত কিছু পাত্র। চতুর্দোলা

ট্রেনে আসার সময় আলাপ হয়েছিল এক জৈন দম্পতির সঙ্গে। তিনি আমাদের বারংবার বলে দিয়েছিলেন ইন্দোরের কাচ-মন্দির দেখার জন্য। কাচ-মন্দির সকাল দশটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত খোলা থাকে। জুনা রাজোয়াড়া দেখতে দেখতে দশটা বেজে গিয়েছিল। আমরা এসে কাচ-মন্দির খোলা পেলাম।

অফিস টাইমের ব্যস্ত ঘিঞ্জি রাস্তা। ড্রাইভার কোনওমতে আমাদের নামিয়ে দিয়ে বলল, মন্দির দেখা শেষ হলে ফোন করে নিতে। গাড়ি নিয়ে চলে যাওয়ার পর এদিক-ওদিক তাকিয়ে মন্দির আর খুঁজে পাই না। শেষপর্যন্ত একটা মিষ্টির দোকানে জিজ্ঞেস করতে দোকানদার অদ্ভুতভাবে তাকালেন আমাদের দিকে। তারপর আঙুল তুলে রাস্তার উলটোদিকে দেখালেন।

কাচ-মন্দির

বড় বড় বাড়ির মাঝে মন্দিরটাকে আলাদাভাবে চেনাই যায় না। মনে হয় ওটাও একটা সাধারণ বাড়ি। বাইরে থেকে তেমন কিছু মনে না হলেও ভিতরে ঢুকে চমকে যেতে হয়। ছোট ছোট ভাঙা রঙিন কাচের টুকরো, পাথর দিয়ে চমৎকার দেওয়ালগিরি, ছাত, এমনকী মেঝেও। বড় বড় ঝাড়লণ্ঠন ঝুলছে উপর থেকে। এদিক-ওদিক কয়েকটা মোমবাতি প্রদীপ জ্বালা। সেই আলোতেই কাচের টুকরোগুলো ঝিলিক দিয়ে উঠছে মাঝে মাঝে। অদ্ভুত এক জমকালো পরিবেশ।

কাচের টুকরো বসানো মেঝেতে জুতো মোজা ছাড়া সামান্য সাবধানেই হাঁটতে হয়। সামনের দরজা দিয়ে ঢুকে প্রথমে ছোট একটা ঘর, তারপরের বড়ঘরে তিনটি মূর্তি। কাচের বক্সের মধ্যে রুপোর সিংহাসন। তাতে বসে আছেন তিনজন তীর্থংকর। একটি কষ্টিপাথরের, দু’টো শ্বেতপাথরের। চন্দ্রপ্রভু, শান্তিনাথ ও আদিনাথ। মন্দিরের ভিতরে ছবি তোলা মানা। কিছুক্ষণ ঘুরে দেখে আমরা বেড়িয়ে এলাম।

কাচমন্দিরের পাশে সুদৃশ্য বিশাল অট্টালিকা

এবারে আমাদের গন্তব্য লালবাগ প্যালেস। আধুনিক ইউরোপিয়ান আর্কিটেকচারের এই রাজপ্রাসাদটি তৈরি হয়েছিল উনিশ শতকের শেষের দিকে। জুনা রাজোয়াড়া দেখলে যেমন রানি অহল্যাবাঈ-এর সাধারণ জীবনযাপনের ছাপ পাওয়া যায়, তেমনি লালবাগ প্যালেসে দেখা যায় পরবর্তীকালের হোলকার সাম্রাজ্যের ঐশ্বর্য সম্ভার। ইতালিয়ান মার্বেলের স্তম্ভ, পার্সিয়ান কার্পেট, বিশাল বিশাল ঝাড়বাতি, প্রাসাদের চারধারে বিশাল গোলাপ বাগান; সবই মুগ্ধ হয়ে দেখার মতো।

লালবাগ প্যালেসের সামনে

প্রাসাদের ভিতরে ঢুকতে গেলে টিকিট কাটতে হয়। জমা রাখতে হয় ক্যামেরা, মোবাইল ফোন, ব্যাগ সমস্ত কিছু। ভিতরে স্থাপত্য, চিত্রকলা, একের পর এক চোখ ঝলসানো আসবাবে সাজানো ঘর। দরবার কক্ষ, নাচঘর, শোবার ঘর, জমায়েত ঘর, খানাকক্ষ; কোনও শেষ নেই তার। এছাড়াও রাজাদের শিকার করা ট্রফিতে সাজানো দালান, ভিতর-বারান্দা। একটা চিতার ভঙ্গিমা এতই জীবন্ত যে চমকে উঠতে হয়।

ঘুরে ঘুরে দোতলাটা সবে দেখে শেষ করেছি এমন সময় শুনি কোলাহল। নিচে উঁকি মেরে দেখলাম একই রঙের জামা পরা অজস্র কচিকাঁচা লাইন দিয়ে ঢুকছে হলঘরে। একটা গোটা স্কুল এসেছে আজ লালবাগ প্যালেস দেখতে। ওদের পিছনে একবার পরে গেলে আমাদের আর উজ্জয়িনী যাওয়া হবে না। আমরা ঝটপট বাকি কক্ষগুলো আর ট্রফি ও ছবি গ্যালারি দেখা শেষ করলাম।

রাস্তা

এই তিনটে বিখ্যাত স্থান ছাড়াও ইন্দোরে আরও কিছু দ্রষ্টব্য স্থান আছে। যেমন, হোলকারদের ছত্তীশ। হোলকার রাজা-রানিদের শ্মশান ও স্মৃতিমন্দির। এখন এটা একটা পার্কের মতন করে সাজানো। এছাড়াও ইন্দোর মিউজিয়াম, রয়্যাল মিউজিয়াম, হোয়াইট চার্চ, পিপলিয়া পালা পার্ক ও লেক ইত্যাদি। আমরা একদিনেই তাড়াহুড়ো করে ইন্দোর এবং উজ্জয়িনী ঘুরেছিলাম। তবে আমার মতে ইন্দোর এবং উজ্জয়িনীর জন্যে দু-দিন আলাদা রাখলেই সবথেকে ভালো।

প্রাসাদ দেখে এসে গাড়িতে চড়লাম। তখন প্রায় সাড়ে বারোটা বেজে গেছে। সকাল থেকে ঠিক করে খাওয়া-দাওয়া হয়নি। কলকাতা থেকে বেঁধে আনা বাপুজি কেক আর চায়ের উপরেই ভরসা করে ছুটে চলছি। ড্রাইভার জানাল উজ্জয়িনীতে গিয়ে মধ্যাহ্নভোজন করলে সে একটা ভালো হোটেলের সন্ধান দিতে পারে। তো, চালাও পানসি উজ্জয়িনী…

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *