মধ্যপ্রদেশ বৃত্তান্ত: উজ্জয়িনী

অঙ্কিতা

ছোটবেলায় ইতিহাস বইতে গুপ্তসাম্রাজ্যের রাজধানী পাটলীপুত্র আর উজ্জয়িনী নামদু’টো, বারবার পড়ে পড়ে কেমন একটা ধারণা হয়ে গিয়েছিল দু’টো স্থানই গঙ্গার ধারে। বড় হয়েও সে ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে পারিনি। আর মহাকবি কালিদাসের সেই বিখ্যাত গল্প। উষ্ট-তে ‘র’-ফলা বাদ আর উট্র-তে ‘ষ’ বাদ দিয়ে বেচারা কালিদাসকে বাসরঘর থেকেই বিদায় জানাতে হয়েছিল নতুন বউকে। ছোটবেলায় আমি খালি কল্পনা করতাম। গঙ্গার ধার ধরে হেঁটে চলে উটের সারি। মরুদেশের উট কীভাবে গঙ্গার ধারে হাওয়া খেতে আসতে পারে সে নিয়ে খটকা থাকলেও, তলিয়ে ভাবিনি কোনওদিন।

মধ্যপ্রদেশের ট্যুর প্ল্যান বানানোর সময় উজ্জয়িনী নামটা দেখে চমকেই উঠলাম। অ! তাই বলো, এ যে রাজস্থানের পাশেই। এতদিনে কালিদাসের বাসরঘরে উট্র অথবা উষ্টের একটা সম্মানজনক ব্যাখ্যা মস্তিষ্কের খাঁজে খাঁজে ঢুকল। উজ্জয়িনীতে বাড়ির জানালা দিয়ে শিপ্রা নদীর পারে উটের সারি দেখাটা অবিশ্বাস্য নয়। কালিদাসের কালে তো ছিলই না। এমনকী বর্তমান যুগেও অজস্র উটকে আমি রাস্তার ধার ধরে হেঁটে যেতে দেখেছি।

আরও পড়ুন: মধ্যপ্রদেশ বৃত্তান্ত: ইন্দোর

পথের পাশে পাশে সবুজ বেছানো আছে…

শীতের মিঠে রোদ এতক্ষণে বেশ কড়া হয়ে উঠেছে। আমরা গাড়ি হাঁকিয়ে ছুটে চললাম ইন্দোর থেকে উজ্জয়িনী। বেশিক্ষণ না, ঘণ্টাদেড়েকের রাস্তা। মসৃণ হাইওয়ে। হু-হু করে ছুটে চলা শুধু। রাস্তার পাশে দেখি অনেক গুমটি ছাউনি। আমাদের দেশের চা ঘরের মতো এখানে সব ভুট্টা পোড়া বিক্রি করছে। টোল ট্যাক্স ইত্যাদির পালা চুকিয়ে দেখতে দেখতে ঢুকে পড়লাম উজ্জয়িনীর সিংহদ্বার পেরিয়ে। মিথ্যে বলব না, রাস্তার উপরে সুন্দরভাবে বানানো তোরণ দু’টো বেশ একটা পৌরাণিক অনুভূতি এনে দিচ্ছিল। কিন্তু শহরের মধ্যে ঢুকেই সব অনুভূতি ধাঁ করে পালিয়ে গেল। কোথায় সে কালিদাস আর কোথায়ই-বা পরাক্রমী বিক্রমাদিত্যের রাজসভা! মফস্‌সলী শহর জুড়ে বড় বড় বাড়ি, শপিংমল আর শুধুই মন্দির। আঁকেবাকে অলিগলিতে খালি দেখা যায় পতপতে পতাকা ওড়ানো চূড়া।

আরও পড়ুন: মধ্যপ্রদেশ বৃত্তান্ত: গৌরচন্দ্রিকা

উজ্জয়িনী নগর তোরণ

পেট পুজো সারা হলে আমরা দ্রষ্টব্য স্থান দেখতে বেরোলাম। ড্রাইভারের কথামতো প্রথমেই গেলাম উজ্জয়িনীর সবথেকে বড় আর প্রাচীন তীর্থস্থান। মহাকালেশ্বর মন্দির। গাড়ি বোঁ-বোঁ করে ছুটে এসে থামল একটা চত্বরে। সামনেই দেখি একটা পাঁচতলা বিশাল ভবন। মাথার উপরে হিন্দিতে লেখা আছে ভক্তনিবাস। যে ঠাকুরের ভক্তদের থাকারই এত বিশাল ব্যবস্থা, তাঁর নিজের গৃহখানি কত রাজকীয় দেখার আগ্রহ বাড়ল। তা ব্যবস্থাপনা কিছু কম নেই। মন্দিরের পিছন দিকে গেট আর বেড়া দেওয়া লাইন। জুতো, ব্যাগ আর ক্যামেরা ইত্যাদি রাখার আলাদা স্থান। সন্তু ভিতরে গেল না। আমাদের যাবতীয় জিনিস ওর কাছেই জিম্মা করে আমরা মহাকালেশ্বর দর্শনে ছুটলাম। প্রচুর বেড়া আর শিকল টপকে অচিরেই মন্দিরের ভিতরে চলে এলাম। তেমন ভিড় ছিল না। মন্দিরের ভিতরটা ফাঁকা ফাঁকা। মস্ত উঠান, তাকে ঘিরে প্রাচীন, নবীন আর সংস্কারকার্যের মেলা।

আরও পড়ুন: রঙের গাঁ খোয়াবগাঁ

মহাকালেশ্বর মন্দির ও ভক্তনিবাস

অনেক লাইন দিয়ে, অনেক ঘুরে, অনেকখানি গড়ানে ঢাল বেয়ে এবার পাতাল প্রবেশের উদ্যোগ করলাম। সুন্দর নরম গালিচা পাতা রাস্তা। টিকিটও কেটেছিলাম খুব সম্ভবত একশো টাকা দিয়ে। মন্দিরের পেটের ভিতর একটা বিশাল হলঘর। সারিসারি লাইন গ্যালারিতে খেলা দেখার মতো ধাপে ধাপে সেই হলঘরের মধ্যে দিয়ে চলমান। সম্মুখে বেশ খানিকটা দূরে একটা সোনা বা রুপো বাঁধানো দরজার ওপারে জ্যোতির্লিঙ্গ। পুরোহিত-পাণ্ডারা মহাকালেশ্বর বাবাকে নাওয়াচ্ছেন-ধোয়াচ্ছেন। অতদূর থেকে লিঙ্গরূপ তেমন গোচরে এলো না। অবশ্য তাতে অসুবিধা কিছু নেই, মুখ তুলতেই দেখলাম বিশাল বড় বড় এলসিডি স্ক্রিনে দরজার ওপারের কীর্তিকলাপ দেখিয়ে ভক্তকুলকে ধন্য করার ব্যবস্থা। ঠাকুরের ঘরটিতে এসি ইত্যাদি ফিট করা।

আরও পড়ুন: আঁধার আমার ভালো লাগে

গড়ান বেয়ে বেয়ে ভূগর্ভ ছেড়ে উঠে বাইরে খোলা আকাশের তলায় বেরিয়ে এলাম। নিজের অজান্তেই ফোঁস করে একটা দীর্ঘনিশ্বাস বেরিয়ে এলো। উঠোনের মাঝে একটা প্রাচীন মন্দির। তার একধারে এসে বসলাম। বেচারা মহাকালেশ্বর। একদিন হয়তো বেশ নিরিবিলিতেই বাস করতেন। প্রাচীন মন্দির বক্ষ চিরে মাথা তুলত সতেজ বট-অশত্থ। মন্দিরের পাথরে শুয়ে থাকত বিশালকায় অজগর। কখনও-সখনও মন ভোলাতে কিছু পরমভক্ত এসে দাঁড়াত দ্বারে। আজ লিঙ্গদেবকে দেখে মনে হল ঐশ্বর্যে প্রাচুর্যে, স্প্লিট এসির কনকনে ঠান্ডায়, শত-শত চোখের পাহারাদারিতে ঠাকুর যেন ত্রাহি ত্রাহি রব ছাড়ছেন।

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (৫ম অংশ)

শিপ্রার ঘাট

ঝটপট মহাকালেশ্বর দেখা হয়ে যেতে ড্রাইভার আমাদের নিয়ে এল শিপ্রা নদীর তীরে উজ্জয়িনীর রামঘাটে। শিপ্রার পরিষ্কার টলটলে জল। দু-পারে চওড়া বাঁধানো ঘাট। অবশ্য কুম্ভমেলার লক্ষাধিক পুণ্যার্থীর কল্পনা করলে ঘাটের বিস্তার অপ্রতুল। দু-পারেই ঠাকুর মন্দির, মসজিদ, উঁচু বাড়ির ভিড়। যে রাস্তা দিয়ে ঘাটে এসে উপস্থিত হলাম সেখানে দেখি, বেশ কয়েকজন মহিলা খড় বিক্রি করছে। প্রথমে ব্যাপারটা বুঝিনি। রাস্তা দিয়ে ঘাটের দিকে এগোতে যেতেই একটা পুঁচকে বাছুর পাশ থেকে হাম্বা বলে ডাক দিল। তাকে উপেক্ষা করে এগোতে চাইলে সে এসে শিং বাগিয়ে ঢুঁসো দেবার উপক্রম করল। তখন বুঝলাম এই আমার বৈতরণির দ্বারপাল, আগে এ নন্দীর ছানাকে শান্ত করতে হবে তারপর নদীদর্শন। একগাছি খড় খাইয়ে তাকে শান্ত করা হল। আমরা ঘাট বেয়ে জলের কাছে গেলাম।

আরও পড়ুন: এক সমুদ্রকন্যা ও তার সমুদ্র-সুতো তৈরির গল্প

ওঁ শান্তি ওঁ শান্তি…

কালিদাস প্রিয়া শিপ্রা দেখলাম। কুম্ভস্থল দেখলাম। মা মাথায় জল ছেটাল। সন্তু ছবি তুলল। বাবা বাছুরকে খড়ও খাওয়াল। মানে যা যা করণীয় সবই হল, শুধু মনটা বড়ই বিমর্ষ হয়ে গেল। খড়, গোবরের মিশ্রিত গন্ধ, শিপ্রার উলটোপাড়ের বিশাল মসজিদ থেকে আজানের সুর আর ঘাটের উপরেই শিল্পরুচির লেশমাত্র নেই এক গগনস্পর্শী ত্রিশূল। ইন্দ্রিয়ত্রয়ী বিরোধিতা করল। অশান্ত মন নিয়ে উঠে পড়লাম শিপ্রার ঘাট ছেড়ে। যে উজ্জয়িনীর কথা ছোটবেলা থেকে পড়েছি, সেই ইতিহাসের কণামাত্র কোথাও পেলাম না।

আরও পড়ুন: ত্রাসের‌ ‌কবিতা‌ ‌

রামঘাটের গেট

ফিরে আসতে ড্রাইভার বলল, কালভৈরব যাবেন তো? ইচ্ছা করছিল না কিন্তু ড্রাইভার জানাল, ওটাও নাকি দর্শনীয় স্থান। শিপ্রা পার হয়ে আমরা ছুটে চললাম, কালভৈরব মন্দির দর্শনে। মন্দিরের সামনে এসে দেখি গাড়ি আর বাইকের ভিড়ে একাকার। ড্রাইভার জানাল শনিবার তো তাই একটু ভিড়। এ কী রকম! কালভৈরব হোক কী মহাকালেশ্বর, সবই তো শিবের বিভিন্ন রূপ। শনিবার তো শিবের বার নয়।

আরও পড়ুন: অভিন্ন হৃদয় বন্ধু: অ্যাশ, ব্রক, মিস্টি এবং পোকেমন

কালভৈরবের মন্দির

মহাকালেশ্বরে তাড়াহুড়োয় পুজো দেওয়া হয়নি। এইখানে মা পুজো দেবেই দেবে। অতএব চট করে ডালা কিনে লাইনে দাঁড়ানো হল। মন্দিরটা এমন আহামরি কিছু দেখতে না। শুধু প্রধান দ্বারেই একটু প্রাচীনত্বের চিহ্ন।  বেশ কিছুক্ষণ ধরেই পুজো চড়াতে আসা ভক্তবৃন্দের মধ্যে একটা ব্যাপার লক্ষ করছিলাম। ভালো করে নজর চালাতে দেখলাম, অনেকের ডালাতেই কারণবারি। একেবারে মহাপ্রসাদ। এবার মায়ের হাতের ডালাটাতে নজর করলাম। একটা ছোট নীলচে-সাদা প্লাস্টিকের বোতলে বেশ খানিকটা তরল। যেটাকে দিব্যি গঙ্গা জল বলে চালিয়ে দেওয়া যায়।

আরও পড়ুন: যখন বৃষ্টি নামে

কালভৈরবের মন্দিরের সামনে সহস্র প্রদীপদানি

মাকে ব্যাপারটা জানাতেই মা প্রথমেই তেড়ে এলো আমার দিকে। তোর যত বাজে চিন্তাভাবনা। তারপরে নিজেই ব্যাপারটা নজর করল। মন্দিরের ভিতরে পৌঁছে ভালো করে দেখলাম ব্যবস্থাপনা। বাবার সামনে একটা বালতি রাখা। বোতলের এক-চতুর্থাংশ কী এক-পঞ্চমাংশ বালতিতে চলে যাচ্ছে। বাকিটুকু প্রসাদ হিসাবে ফিরে আসছে ডালায়। বালতিতে যা জমা হচ্ছে, তা দেবভোগ্যই বটে। ওই মিক্সচার সাধারণ মানুষ একটু খেলেই হয়তো উলটে যাবে। পাণ্ডা পুরোহিতদের কি আর সাধারণ বলে চলে? ওঁরাও প্রায় দেবতা।

আরও পড়ুন: ধ্বংসের দোরগোড়ায় সুন্দরবন: ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব ও আজকের বিতর্ক

উজ্জয়িনী শহরের মেলা

কালভৈরব দর্শনান্তে আমরা ফিরে চললাম ইন্দোর। উজ্জয়িনীর পথ ঘাট ছেড়ে। শিপ্রার কোলটা ছেড়ে। ভরভরন্ত শিপ্রা দেখলাম, ঐশ্বর্যবান ঠাকুর দেখলাম, সুরা রসিকের মন্দিরও দেখলাম; কিন্তু উজ্জয়িনী আমার দেখা হল না। কালিদাসের কাব্যের সঙ্গে এ উজ্জয়িনীর কোনও মিল নেই। ছোটবেলা থেকে স্বপ্ন দেখে আসা গুপ্তসাম্রাজ্যের রাজধানীর সে সোনার দিন আজকের উজ্জয়িনীর ধুলোবালিতেও খুঁজে পাওয়া যায় না। পশ্চিমের সূর্যের মতো সেই ইতিহাসও আজ অস্তমিত। পিছনে আধুনিক মফস্‌সলী ম্লান উজ্জয়িনীকে ফেলে রেখে অন্ধকার রাস্তা ধরে আমরা ফিরে চললাম ইন্দোরের দিকে।

আরও পড়ুন: শূর্পণখা: রাক্ষসী নয়, নারী

অস্তমিত সূর্য

ক্রমশ…

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *