মাহি মার রাহা হ্যায়!

MS Dhoni

বিশ্বদীপ দে

স্মৃতি জিনিসটা ভীষণ খামখেয়ালি। কখন সখনও তাকে বাগে পাওয়া যায়। তখন সে বেশ মসৃণ। আবার কখনও পুরোপুরি তাকে মুঠোয় পাওয়া যায় না। যা আসে তা খণ্ডচিত্র। এবড়ো খেবড়ো। শনিবাসরীয় সন্ধ্যায় আচমকাই ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে একটা পোস্ট চোখে পড়ার পর থেকেই মনটা সেই মসৃণ ও অসমান স্মৃতির ভিতরে ঘোরাফেরা করছে। অবসর নিলেন মহেন্দ্র সিংহ ধোনি। এইটুকুই তো লেখা ছিল‌। আঙুলের সামান্য ঠেলায় সেই খবর নিমেষে সরেও গেল। কিন্তু মনের মধ্যে একটা আলতো মোচড় অনুভব করলাম যেন। আলতো। আলগোছে যেন মনের পর্দায় কেউ খুব কোমল ভাবে একটা টোকা দিল। থমকালাম। ঠিক পড়ছি তো? এবার আরও একটা-দু’টো পোস্ট। তার মধ্যে একটা কোনও ওয়েব পোর্টালের লিঙ্ক। সুতরাং খবর পাকা। আর তৎক্ষণাৎ আমার মনে পড়ল একটা ফুটপাতের কথা। কাচে ঘেরা শোরুমের ভিতরে থাকা পেল্লাই টিভি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে অসংখ্য মানুষ। তার মধ্যে গরিব-গুর্বো, সুটকেস-টাই, পাঞ্জাবি-পাজামা নানা রকম উপস্থিতি। কোথায় গিয়েছিলাম মনে নেই। সঙ্গে ছিল এক বন্ধু। নিশ্চিত করে ভেবে উঠতে পারছি না কোন বন্ধু। কিন্তু এটা মনে আছে, টিভির পর্দায় এক নবাগতর ব্যাটিং তাণ্ডব। প্রতিপক্ষ শ্রীলঙ্কা।

আরও পড়ুন: জীবনযুদ্ধে হেরে গেলেন চেতন চৌহান

Five things about MS Dhoni on his Birthday - Karvaan India

ধোনি সেদিন ১৮৩ রান করেছিলেন। ৩০০-র মতো রান তাড়া করেছিল ভারত। কার্যত একা হাতে জিতিয়েছিলেন বছরখানেক আগে দলে আসা মাহি। জেতানো বলে জেতানো! ছক্কার পর ছক্কা। এলোপাথাড়ি চার। সাঁই সাঁই হেলিকপ্টার শট। কিছুক্ষণ কাজ ভুলে সেই ভিড়ের মধ্যে আমরাও স্তব্ধবাক। বাকিরাও কথা ভুলে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে ‘উফ’, ‘এটা কী মারল রে’ জাতীয় এলোমেলো কথাবার্তা। আসলে সব মিলিয়ে একটাই কথা, ‘মাহি মার রাহা হ্যায়।’ পরে ধোনির বায়োপিক থেকে জেনেছি এই মোক্ষম সংলাপের স্মৃতি।
যাই হোক। জীবন গিয়েছে চলে… যেমন যায় আর কী। ভাস্কর চক্রবর্তী লিখেছিলেন, ‘এখন জীবন যায়, আস্তে চলে যায়।’ ঠিক সেরকমই যেন। ঘড়ির দু’টো কাঁটা নিজেদের মতো করে ঘুরপাক খেতে খেতে আমাকে টেনে হিঁচড়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল টিভির সামনে। থার্ডম্যানের উপর দিয়ে মারা ছক্কার পরের বলেই মরিয়া দ্বিতীয় রানের জন্য দৌড় থমকে দিল মহেন্দ্র সিংহ ধোনিকে। ২০১৯ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে হওয়া সেই রানআউটই তাহলে ধোনির আন্তর্জাতিক কেরিয়ারের যতিচিহ্ন হয়ে দাঁড়াল! মাঝখানে কতগুলো বছর! স্মৃতির পেন্ডুলাম দুলতে থাকে।

Young MS Dhoni sitting on a bike with short hair - Cricket Country

মহেন্দ্র সিংহ ধোনি। সংক্ষেপে মাহি। তিনি অবসরে। যদিও আইপিএলে দেখা মিলবে। তবু… শচীন তেন্ডুলকরের বাইশ গজ ছেড়ে চলে যাওয়াটা এমন একটা শূন্যস্থান তৈরি করে দিয়েছে তার সঙ্গে কোনও কিছুরই তুলনা হয় না। কিন্তু ধোনির চলে যাওয়াটা এক অন্যতর শূন্যতা। আসলে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে ১৮৩ করার আগেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সেই দুরন্ত ১৪৮-এ বেজে উঠেছিল ধোনির আগমন ধ্বনি— কাড়া-নাকাড়া। কিন্তু তখনও মনে হয়েছিল, অনেকেই তো আসেন সম্ভাবনা নিয়ে। কিন্তু ধারাবাহিকতার চাপ সবার জন্য নয়। কিন্তু শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে খেলা সেই ইনিংসটা দেখে মনের মধ্যে একটা অদ্ভুত আমেজ এসে গিয়েছিল। এক ঝিনচ্যাক এন্টারটেনমেন্টের জৌলুস চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছিল। সেই জৌলুসকে ছাপিয়েও জেগে থাকা এক অদম্য বিক্রম। বুঝেছিলাম এই লোকটা থাকবে।

আরও পড়ুন: ১৬ বছরের পুরনো ৫০০০ মিটারের বিশ্বরেকর্ড ভাঙলেন উগান্ডার চ্যাপ্টেগেই

Is Dhoni India's David Beckham?

যেহেতু এই লেখায় ধরতে চাইছি ব্যক্তিগত অনুভব, তাই ‘আমি’ কথাটা যতই খটাং করে বেজে উঠুক, এক্ষেত্রে হয়তো অনিবার্য। আসলে শচীন ছিলেন আমার ছোটবে‌লার নায়ক। আমি একটু একটু করে বেড়ে উঠেছি আর আমার জীবনের সমান্তরালে ব্যাট করে গিয়েছেন শচীন। যেমনটা তিনি কোটি কোটি মানুষের ক্ষেত্রে করেছেন। কিন্তু ধোনির আগমন আমার যৌবনে। আমরা সমবয়সি। মাস কয়েকের ফারাক কেবল। সেই সময় আমি বেকার। কেবল টিউশনি করি। আর ধোনি ভারতীয় দলের নবাগত তারকা হয়ে উঠছেন। তাই সেদিনের ছক্কাগুলো আমার মনের ভিতরে একটু একটু করে নকশা বুনে দিচ্ছিল। যে নকশার নাম আত্মবিশ্বাস।

indianhistorypics on Twitter: "1994 :: Young Cricketer Mahendra ...

মতি নন্দী একটি লেখায় লিখেছিলেন, ‘আমার কাছে ক্রিকেটের প্রতিটি বল এক একটি বিযুক্ত ঘটনা। সেজন্য প্রতিটি বল ধরে খেলাটির আলোচনা করা যায়। ইতিহাসের সারিবদ্ধ ঘটনার মতো মনে রাখাও যায়।’ ক্রিকেট খেলার সামান্য দর্শক হিসেবে বুঝতে পারি, কথাটা কত অমোঘ। সেই ছোটবেলা থেকে চুপ করে একটার পর একটা ওভার হতে দেখার রোমাঞ্চের কাছে ফিরতে ইচ্ছে করে। ওল্ড স্কুল তো, তাই টি২০-র হুটোপাটি পোষায় না। সাদা পোশাক, লাল বল, বলে ছ’টা সে‌লাই। টেস্ট ক্রিকেট। বড়জোর পঞ্চাশ ওভার। পরপর দু’টো বল অফস্টাম্পের বাইরে। একটা হঠাৎ গোঁত্তা খেয়ে ভিতরে…! পরেরটা কি স্লোয়ার? ভাবতে ভাবতে আচমকাই নড়েচড়ে বসি।

A photograph of young # MS Dhoni from his old days. #captaincool ...

এভাবেই দেখতে অভ্যস্ত। যেমন একবার রাত জেগে দেখেছিলাম স্টিভ ওয়ার ব্যাটিং। তখন স্টিভের কেরিয়ার রীতিমতো সংশয়ে। লোকটা ব্যাট করে যাচ্ছিল জীবন বাজি রেখে। ভারতের খেলা নয়। তবুও রাত জেগে আমি সেই খেলা দেখেছিলাম। আর বুঝেছিলাম, জীবন কত বিচিত্র প্রশ্নপত্র তৈরি করে রাখতে পারে!

MS Dhoni- 13 Rare pics of MS Dhoni Early life. - video dailymotion

এমন উদাহরণ যে কত! আমার কাছে এটাই ক্রিকেট। ফলাফল, কাপ জেতা, সিরিজ জয়, রেকর্ড— সে সব তো আছেই থাকবেই। কিন্তু ক্রিকেট মাঝে মাঝে এমন সব মুহূর্তের জন্ম দেয়, তা যেন এক অনন্ত ক্যালাইডোস্কোপের চকিত তৈরি করা ছবি। একবারই হচ্ছে। আর হবে না। এমন মুহূর্ত আমি জমিয়ে রাখি। তেমনই কিছু মুহূর্তের মালিক মহেন্দ্র সিংহ ধোনি। তাঁর কোনও কোনও ইনিংস এভাবেই আগ্রহ ভরে দেখেছি। টেকনিক চরম কিছু নয়। মাঝে মাঝে বিচিত্র শট সিলেকশন। আসলে একদা ‘খেপ’ খেলার অভ্যেস। সেসব পরে জেনেছি। কিন্তু এটুকু বুঝতাম আসল খেলাটা লোকটা খেলছে হৃদয় দিয়ে। নাহলে বারবার ওভাবে শেষ ওভারে মসিহা হয়ে ওঠা যায় না। মনে পড়ছে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সেই ম্যাচ। মাহি উইকেটের পিছনে। তিন বলে দু’রান বাকি। পরপর দু’টো উইকেট গেল। শেষ বল। দু’রানই বাকি। ধোনি গ্লাভস খুলে ফেললেন। কেবল ভিতরের পাতলা গ্লাভস পরা। ব্যাটসম্যান ফসকাতেই বলটা ধরে দৌড়ে এসে উইকেট ভেঙে দিলেন। ম্যাচ ভারত জিতল এক রানে। সেই দৌড়টা মনে পড়ে। স্থিতপ্রজ্ঞ। অনিবার্য। বয়স বাড়ছে। চল্লিশ পেরোয়নি। ফলে চোখে সেই অর্থে চালসেও পড়েনি। কিন্তু জীবনের ব্যস্ততা এখন অন্য মোড়ে। দায়দায়িত্বের নাজেহাল ওঠাপড়ায় ফুটপাতের ভিড়ে অলস সময় যাপন আর হবে না। তবে মনের মধ্যে চাইলেই ইনিংসটা ভাবতে পারি। কঠিন সময়ে। যেমন ভাবি শচীনের সেঞ্চুরিয়নের ছক্কাটা। শেন ওয়ার্নের বলে গ্যাটিংয়ের বোল্ড হওয়া। টনটনে সৌরভের বাপি বাড়ি যা। ব্রেট লির বাউন্সারে কান দিয়ে রক্ত পড়া দেখেও হাস্যমুখ দ্রাবিড়। বিপুল বিস্ফোরণের সম্ভাবনা সহ শোয়েব আখতারের ছন্দবদ্ধ দৌড়।

MS Dhoni Rare and Unseen Photos: Pictures of Former India Captain ...

সেভাবেই ২০১১ বিশ্বকাপের ফাইনাল। ধোনির উইনিং স্ট্রোক। কোটি কোটি ভারতীয় আজও ইউটিউবে একঝলক দেখে নেন সেই জাদু-মুহূর্ত। সব সময় ইউটিউবও লাগে না। ব্যক্তিগত পরাজয়ে একবার জেদ করে ছক্কা মেরে মনে মনে ব্যাট ঘুরিয়ে নিই আমরা। আজ পারলাম না। কিন্তু একদিন ওভাবেই আমিও… জীবনের ক্রিজে আমাদের সেই পদচারণা কখনও ‘জনৈক’ মাহির অবসরে শেষ হয়ে যায় না। রেকর্ড বইতে যাঁর নাম লেখা, তিন-তিনটে আইসিসি ট্রফি যাঁর মুঠোয় তিনি অন্য লোক। কিন্তু টিভির পর্দা বা গ্যালারি থেকে দেখা ‘লিলিপুট’ অস্তিত্বের যে জলছাপ মনের মধ্যে পড়ে রয়েছে সে আমার লোক। আমার জন্য থেলে। যেমন করে একটা শচীন, একটা রাহুল দ্রাবিড়, একটা সেহওয়াগ, একটা লারা, একটা আক্রম… দাঁড়ান দাঁড়ান তালিকা এত সহজে শেষ হওয়ার নয়।

Do you agree with the people who say that Dhoni can't hit sixes ...

আমার সেই প্রথম যৌবনের দূতকে সেলাম। মনের মধ্যে একটা ফুটপাথে ভিড় জমে ওঠে। মাহি মার রাহা হ্যায়।

পেশা সাংবাদিকতা। নেশায় সাহিত্য। মূলত গদ্যকার। প্রকাশিত গ্রন্থ তিনটি। ছোটগল্প, মুক্তগদ্য লেখেন। পাশাপাশি অনুবাদও করেছেন। সমুদ্রে যেতে, আনমনে ভিড়ের মধ্যে হেঁটে বেড়াতে এবং কাছের মানুষদের সঙ্গে পুরনো দিনের গল্প করতে ভালাবাসেন।

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *