‘মহিষাসুরমর্দিনী’ সমস্ত ধর্মের মানুষকে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে

গৌতম দে

বাংলা ভাষাভাষী মানুষের হৃদয়ে ও মননে এই ‘থ্রি মাস্কেটিয়ার্স’ পাকাপাকিভাবে জায়গা করে নিয়েছেন। আগামী দিনেও থাকবেন। এটা হলফ করে বলা যেতে পারে। এই থ্রি মাস্কেটিয়ার্স হলেন, বাণীকুমার, পঙ্কজকুমার মল্লিক এবং বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। এও সবার জানা। আর এটাও ঠিক, কাউকে বাদ দিয়ে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ নামক আখ্যানটির কথা ভাবা যায় না।

বাণীকুমাররা কোনও দিন ভেবেছিলেন, যে এই কাব্যসংগীতটি ‘ইতিহাস’ হয়ে যাবে আপামর বাঙালির জীবনযাপনের অন্তরমহলে। ভারতের বেতার ইতিহাসে দীর্ঘকাল ধরে চলে আসছে মহিষাসুরমর্দিনী আখ্যানটি। তার কারণ, আজও এর জনপ্রিয়তা আকাশছোঁয়া। অনায়াসে বলা যেতে পারে, এটা একটা রেকর্ড! মাইলফলক। এত দীর্ঘতম সম্প্রচার ভারতের বেতার কেন্দ্রের ইতিহাসে প্রথম।

আরও পড়ুন: হতভাগ্য স্বামীর বিলাপ

একটু পিছন ফিরে তাকানো যাক। ১৯৩২ সালে এর শুরুয়াত। প্রথম দিকে অন্য নামে বেতারে সরাসরি সম্প্রচার হত, এই দেড় ঘণ্টার অনুষ্ঠানটি। অসম্ভব জনপ্রিয়তার ফলে ১৯৬৬ সাল থেকে রেকর্ড করা ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ বেতারে সম্প্রচার করা হয়। যা আজও জনপ্রিয়তার নিরিখে আপামর বাঙালির মননে বীজ পুঁতে দিয়ে গেছে। সেই পরম্পরা এখনও চলছে। আজকের ছেলেমেয়েরা বাংলা সাহিত্যে আকৃষ্ট না হলেও এই মহান আখ্যানটির জন্য মুখিয়ে থাকে। ভোর চারটায় কান পাতে থাকে রেডিয়োতে নতুবা চলভাষের বিভিন্ন চ্যানেলে।

কর্পোরেট জগতের মাতব্বররাও জানে, এই আখ্যানের জনপ্রিয়তা। তারাও বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে তাদের পসার নিয়ে। এ তো গেল বাণিজ্যিক চিন্তাভাবনা।

আমার যেখানে বাস করি, সেখানে আজও শুনতে পাই মহালয়ার দিন প্রথম প্রহর থেকে সাইকেলের ঘণ্টি বাজিয়ে দলে দলে মানুষ ছুটছেন তর্পণের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন গঙ্গার ঘাটে। কাছেই দক্ষিণেশ্বর মায়ের মন্দির। গঙ্গার ঘাট। ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই অবস্থা।

এ তো গেল একটা দিক। ক্রমে ক্রমে ভোর হয়। গাছ থেকে ঝরে পড়া শিউলি ফুল কুড়াতে কুড়াতে কোনও এক মেয়ে ভাবে আজ থেকেই বুঝি দুর্গা মায়ের আরাধনা শুরু হয়ে গেল! মেয়েটির মনের কথা শুনে ফেলে সুদূর মাঠ আর ঝোপেঝাড়ে বেড়ে ওঠা কাশফুল বন। সাড়া দেয়। হ্যাঁ গো হ্যাঁ, ঠিক বলেছ কন্যে…!

মেয়েটি প্রাণভরে গন্ধ শোকে। তার আঁজলা ভরা শিউলির সুবাস বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। অমনি নবীন ছেলেটি কাছে আসে। মেয়েটির বুকের ভিতর ঢাকের বাদ্যি বাজে। সেই বাজনার তাললয় ছড়িয়ে পড়ে ছেলেটির মনেপ্রাণেও। এবার ঠাকুর দেখার প্রস্তুতি চলবে। নতুন জামা। নতুন কাপড়। চারদিকে পুজো পুজো ভাব। নীলে রঙে ডোবা আকাশে শরতের ছন্নছাড়া মেঘের ধীরলয়ের অজানা যাত্রা। গাছেদের পাতায় পাতায় উছলে ওঠা আনন্দ! বুঝতে পারে কন্যে। বুঝতে পারে ফুলের মতো সুন্দর মেয়েটি। সে মিটিমিটি হাসে। তার ঠোঁটে ছড়িয়ে পড়ে শিউলি ফুলের ডাঁটির মনভোলানো রং। দুগ্গা মায়ের আগমনীতে সে যেন দুগ্গা মায়ের মতো অসুরদলনি হতে চায়! তখন তার কানে বাজে অব্যক্ত গম্ভীর কণ্ঠ আশ্বিনের শারদ প্রাতে…

আরও পড়ুন: ‘গুলিনদা’র জন্ম শতবর্ষ

যদি ১৯৩২ সাল থেকে ধরি, তাহলে দেবী মা চণ্ডীর মহিষাসুর দলন গাঁথা কাব্যসংগীতটির বয়স আজ ঊননব্বই বছর। বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনের ঐতিহ্য। মহালয়া শুরুর পর থেকেই বাঙালি জীবনের প্রধান উৎসবের দিকে দিকে আয়োজন। এখানে বলে রাখা ভালো এই উৎসবে শামিল হন, সব ধর্মের মানুষ। মহালয়ার শুরু থেকে এর গতি পায়। তাই খুব সহজেই বলা যেতে পারে, আজকের এই দীর্ণ পৃথিবীতে বাণীকুমারের সৃষ্ট আখ্যানটি সমস্ত ধর্মের মানুষকে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে। এটা গর্বের সঙ্গে বলা যেতে পারে। তাই আজও দলমত নির্বিশেষে সমস্ত মানুষ এই উৎসবে আনন্দে মেতে ওঠেন বিভিন্ন পুজোমণ্ডপে। কলকাতার রাজপথে। গ্রামেগঞ্জে। এবং বিভিন্ন দেশেও।

এখনও স্মরণে আছে, এই জনপ্রিয় অনুষ্ঠানটিকে ১৯৭৬ সনে মুলতবি করে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ নাম বদলে ‘দেবীং দুর্গতিহারিণীম’ নামে আখ্যানটি রচনা করেন শ্রদ্ধেয় ধ্যানেশনারায়ণ চক্রবর্তী মহাশয়। ভাষ্যপাঠ করেছিলেন মহানায়ক উত্তমকুমার। গানের কথা লিখেছিলেন শ্যামল গুপ্ত। তাতে সুর দিয়েছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। সেকালের নামিদামি শিল্পীরা গান গেয়েছিলেন। বিভিন্ন মিডিয়ার ঢক্কানিনাদে আপামর বাঙালিরা কান পেতেছিলেন রেডিয়োতে। সুপার ফ্লপ হয়েছিল। চারদিকে তীব্র প্রতিবাদ উঠেছিল আকাশবাণীর বিরুদ্ধে। কাগজে কাগজে বিশিষ্টজনদের নিন্দামন্দের ঝড়। আকাশবাণী ভবনের সামনে প্রবল বিক্ষোভ। ফিরিয়ে আনো আমাদের প্রিয় ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ কাব্যসংগীতটি। ফিরিয়ে আনো জলদ গম্ভীর গলার বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের স্তোত্রপাঠ। আশ্বিনের শারদ প্রাতে…।

হতে পারেন তিনি মহানায়ক। মহান অভিনেতা। বাঙালির আইকন। সেই অনুষ্ঠানে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কাছে দশ গোল খেয়ে মাঠ ছেড়েছিলেন। তারপর অনেক দূর জল গড়িয়েছিল। সেই বছর ষষ্ঠীর ভোরে নির্দিষ্ট সময়ে অর্থাৎ ভোর চারটেয় পুনরায় বেতারে সম্প্রচার করা হয়েছিল ‘মহিষাসুরমর্দিনী’। খুশি সমস্ত প্রান্তের বাংলা ভাষাভাষী মানুষজন। যেন প্রকৃত উৎসব শুরু হল! এখানে অনায়াসে বলা যেতে পারে, বিসমিল্লার ‘সানাইবাদন’ আর ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ এই যুগপৎ চিন্তন সমস্ত অবিশ্বাসকে দলন করে একে অপরকে কাছে টেনে নেয়। যা আজও চিরন্তন। চিরনতুন।

আরও পড়ুন: জয়া মিত্রের ‘যাত্রাপুস্তক’

নিজস্ব চিত্র

আজ ২০২১-এও দেখি বিভিন্ন ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ায় দেবী চণ্ডীর আখ্যান নিয়ে চিত্রায়ণ হয়। দেশের তাবড় তাবড় নায়িকারা তাতে অংশ নেন। ক’জনে দেখেন জানি না।

কিন্তু আজও এই দিনটিতে কাকভোরে শিউলির সুবাস নিয়ে হিম হিম বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে জাগো, তুমি জাগো, জাগো দুর্গা…

কিংবা আশ্বিনের শারদ প্রাতে…

এইভাবেই বেঁচে থাকবেন বাঙালির মানস জীবনে থ্রি মাস্কেটিয়ার্স। এবং তাঁদের সৃষ্টি ‘মহিষাসুরমর্দিনী’।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *