স্মৃতির সফরে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’

প্রণব বিশ্বাস

ছেলেবেলার স্মৃতির একটা বড় অংশ জুড়ে আছে দুর্গা প্রতিমা নির্মাণের বিস্ময়। যে-পাড়ায় থাকতুম, সেখানে দু’টি ক্লাবে প্রতিমা বানানো হত। রথযাত্রার মেলা, পাঁপড়ভাজার হাতছানির চেয়েও আমি বলব আমার বড় আকর্ষণ ছিল প্রতিমার কাঠামো নির্মাণের অনুষ্ঠানে। শাস্ত্রীয় কিংবা আচারগত নিয়ম মেনে টুকরো বাঁশের খুঁটি জুড়ে জুড়ে কাঠামো তৈরি হত। শাস্ত্রীয় বা আচারগত নিয়মের যেকথা বলছিলুম সেটা নিশ্চয়ই কিছু পুজোপাঠের ব‍্যাপার হবে। কিন্তু সেদিকে আমাদের তেমন নজর থাকত না। আজকের খুঁটিপুজোর মহামারির সঙ্গে তার কোনও যোগসূত্র খোঁজার চেষ্টা নিতান্তই বৃথা সময় অপচয়।

আমাদের সেই অতি অল্পবয়সে অমসৃণ বাঁশের খুঁটি জুড়ে জুড়ে অসুন্দর এক কাঠামো বাঁধাও কম কিছু দেখার ছিল না। এরপর তালতাল মাটি, মাটি ছানা, এবড়ো-খেবড়ো করে কাঠামোর শরীরে বসিয়ে দেওয়া। প্রথম উপমায় মনে আসত দেওয়ালে ঘুঁটে দেওয়ার কথা। তারপর একটু একটু করে অবয়ব পাওয়া। চাপচাপ মাটির তাল থেকে নিখুঁত এক মূর্তির নির্মাণের বিস্ময়ে ভরে থাকত গোটা বছর। এরপর রং পড়বে। প্রথমে শাদা, পরে অন্য রং। অদ্ভুত এই উজ্জ্বলতার আসল শক্তি নাকি গর্জন তেল, এরকমই শুনতাম। এরপর মহালয়ার দিনে চোখ আঁকা, সেটা দেখার জন‍্যে থাকত দুর্মর আকাঙ্ক্ষা। চোখ ফুটলে পুতুল কী অনায়াসে প্রতিমা হয়ে যেত। দেখে দেখে চোখের আশ মিটত না। তারপরেও আসত অস্ত্রশস্ত্র, সিংহের কেশর হত, ময়ূরের পালক। তখন গানটা জানতাম না, এখন স্মৃতির সফরে বেরিয়ে মনে গুনগুন করে উঠছে গানের কয়েকটা কলি— ‘কোথা সে তোর দরিদ্র বেশ, কোথা সে তোর মলিন হাসি— / আকাশে আজ ছড়িয়ে গেল ওই চরণের দীপ্তিরাশি !/ ওগো মা, তোমার কী মুরতি আজি দেখি রে!/ তোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে।।/ আজি  দুখের রাতে সুখের স্রোতে ভাসাও ধরণী— / তোমার অভয় বাজে হৃদয়মাঝে হৃদয়হরণী! / ওগো  মা, তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফিরে!/ তোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে।।”

মহালয়া এলেই মনে হত পুজো এসে গেল, সারাবছরের প্রতীক্ষা শেষ। থিম শব্দটা তখন দূরতম স্বপ্নেও ছিল না। ‘স্টেটসম‍্যান হাউজ’ কিংবা ‘ফতেপুর সিক্রি’র আদলে প‍্যান্ডেল তৈরির কথা তখন ভাবাও যেত না। প্রতিমা তৈরি হচ্ছে একদিকে, অন‍্যদিকে সেলাই করে করে নকশা তৈরি হচ্ছে কাপড়ে। কত বৈচিত্র্য তার, হাতের কাজের আশ্চর্য নিদর্শন। রংবেরঙের কাপড়ের জুড়িতে আশ্চর্য সব নকশায় ঝলমল করত প‍্যান্ডেলের শ্রী। সন্ধ্যার আলোও ছিল রূপময়ী, মায়াবী, কিন্তু মৃদু তার উদ্ভাস।

মহালয়া তখন বেতারের এক অনুষ্ঠানের আশ্চর্য টানে অন‍্যমাত্রা পেত। বাড়ির বড়দের ব‍্যস্ততা থাকত রেডিয়ো যন্ত্রটিকে ঠিকমতো টিউনিং করে রাখায়। ঘড়িতে অ্যালার্ম বাজত। ঠিক সময়ে উঠে ‘মহালয়া’ শোনার তোড়জোড় চলত। একটি নয়, প্রতিটি বাড়ির রেডিয়ো গমগম করে বেজে উঠত একসঙ্গে। গোটা পাড়ায় উৎসবের পরিবেশ। তখন তো পাড়া ব‍্যাপারটা ছিল, বেশ বেশি রকমেরই ছিল। ফলে অনুষ্ঠান শেষে, জানালায় জানালায় কিংবা বারান্দায় বারান্দায় কথা চালাচালি, এমনকী গরম চায়ের আদানপ্রদান। উষ্ণায়ন কথাটা তখনও চালু হয়নি, শরৎসকালে শিশিরভেজা অনুভূতিতে শীতের অল্প আভাসও থাকত। পাড়ার দাদারা পাড়া কাঁপিয়ে চায়ের দোকানের পথ ধরত। মেয়েদের ছিল শিউলি কুড়োনোর ধুম। কত যে গাঁথা হত বিনি সুতোর শিউলি ফুলের মালা। আকাশে বাতাসে ছুটির আমেজ। বীরেন্দ্রকৃষ্ণের সঙ্গে গলা মিলিয়ে সবাই যেন বলতেন— ‘আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জির, ধরণীর বহিরাকাশে অন্তর্হিত মেঘমালা, প্রকৃতির অন্তরাকাশে জাগরিত জ‍্যোতির্ময়ী জগন্মাতার আগমনবার্তা…।’ ‘মহালয়া’র ভোরে বেতারতরঙ্গে প্রচারিত এই অতি জনপ্রিয় অনুষ্ঠানের নাম ‘মহিষাসুরমর্দিনী’। মহিষাসুর বধের পোরাণিক কাহিনির সঙ্গে ‘মহালয়া’র কোনও যুক্তিগ্রাহ্য সম্পর্ক নেই। তবু প্রায় শতবর্ষ ধরে (৮৮ বছর) ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ গীতি-আলেখ‍্যর নাম লোকের মুখে মুখে হয়ে উঠেছে ‘মহালয়া’।

ছবি ইন্টারনেট

‘মহালয়া’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ ‘হিন্দুদের পিতৃতর্পণের জন্য নির্দিষ্ট শারদীয় দুর্গাপূজার অব‍্যবহিত পূর্ববর্তী অমাবস্যা তিথি।’ ‘পুরোহিত দর্পণে’ তর্পণের নানান বিধি ও রীতির উল্লেখ থাকলেও ‘মহালয়া’ শব্দটি আমার চোখে পড়েনি। চিন্তাহরণ চক্রবর্তীর ‘হিন্দুর আচার-অনুষ্ঠান’ বইয়ে বলা হয়েছে— ‘আশ্বিন মাসের অমাবস্যা সাধারণত এই নামে পরিচিত। এইদিন পিতৃপুরুষের পার্বণ শ্রাদ্ধ বা তর্পণ করিবার রীতি প্রচলিত আছে।… যমলোক পরিত্যাগ করিয়া মর্ত‍্যে অবতীর্ণ পিতৃপুরুষদের প্রত‍্যাবর্তনের পথ প্রদর্শনের জন্য এই সময় আকাশে উল্কা দানেরও ব‍্যবস্থা ছিল। এই মহালয় শব্দ হইতেই মহালয়া শব্দের উদ্ভব হইয়াছে। গিরিশচন্দ্র বিদ‍্যারত্নের শব্দসার প্রভৃতি দু-একখানি আধুনিক অভিধান ছাড়া অন‍্যত্র এই শব্দ পাওয়া যায় না।’

ছবি ইন্টারনেট

হিন্দুপুরাণ বা ধর্মবিশ্বাস বলে জীবিত ব‍্যক্তির ঊর্ধ্বতন তিনপুরুষ মৃত্যু-পরবর্তী সময়ে পিতৃলোকে বাস করেন। স্বর্গ ও মর্ত‍্যের মাঝামাঝি কোনও জায়গায় এই পিতৃলোকের অবস্থান। এই লোক তত্ত্বাবধান করেন স্বয়ং মৃত্যুদেবতা যম। পরবর্তী প্রজন্মের কেউ মারা গেলে পূর্ববর্তী প্রজন্মের জ‍্যেষ্ঠ মানুষটি পিতৃলোক ছেড়ে স্বর্গে যাবার অধিকার পান আর পরমাত্মায় লীন হয়ে যান। ঠিক চাকুরিস্থলে স্বাভাবিক পদোন্নতিরই মতো। জীবিতদের ঊর্ধ্বতন তিনপুরুষের তর্পণ করার কথা, আর এই তর্পণের প্রশস্ত সময় হল পিতৃপক্ষ। পিতৃপক্ষের শেষদিন অমাবস্যা তিথিতেই বেশিসংখ্যক মানুষ  তর্পণ করে থাকেন,আর এই দিনটিকেই আমরা ‘মহালয়া’ রূপে চিহ্নিত করেছি। পিতৃপক্ষের অবসানে দেবীপক্ষের সূচনা। দেবীপক্ষের ষষ্ঠদিনে দেবীর বোধনে দুর্গাপূজার শুরু।

আত্মিক বা আচারগত কোনও দিক থেকেই বেতারের প্রভাতী সংগীতালেখ‍্য ‘মহিষাসুরমর্দিনী’র সঙ্গে মহালয়ার কোনও সংযোগ নেই। অথচ বছরের পর বছর ধরে জনাদৃত এই অনুষ্ঠান ‘মহালয়া’ নামেই চিহ্নিত। ইদানীং তো প্রলম্বিত শারদীয়া উৎসবের সূচনাও হচ্ছে  ‘মহালয়ার পুণ‍্যতিথি’তে। জনাদর এমনি এক শক্তিশালী মাধ্যম। শেকসপিয়র সাহেব যার ধরন খানিকটা ধরতে পেরেছিলেন, এই যা।

১৯২৭। বেসরকারি রেডিয়ো ক্লাবের উদযোগে বেতার সম্প্রচার শুরু হল। আর ১৯৩৬-এ বিদেশি সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ‘অল ইন্ডিয়া রেডিয়োর কার্যক্রম শুরু করলেন। রেডিয়ো বলতে কবিতায় ব‍্যক্ত এক মজার অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ল। সেও ওই সাতাশ আঠাশ সালের কথাই হবে।

‘সন্ধেবেলা একদিন বাপুরে,
মহকুমা হাকিমের কুঠিতে কী ভিড়—
রেডিও শোনাবে এস্-ডি-ওর জামাই।
সকলেই আমন্ত্রিত;
এসেছে সবাই।

এদিকে সময় যায় বয়ে।
তার-আনো আনো-তার, এ-কল, সে-কল
এ ছুঁই, তা ছুঁই
গলদঘর্ম এস ডি ওর জামাই বেচারি:
হয় নাকো কিছুতে কিছুই।
শেষকালে শব্দ এল অবিকল
— হ‍্যাঁ, হ‍্যাঁ, একেবারে অবিকল—
কী কাণ্ড, সমানে ডাকছে একগাদা কুকুর-বেড়াল।
এস্-ডি-ওর থোঁতা মুখ ভোঁতা হতে দেখে
একদল কী খুশি!
এস্-ডি-ওর বরাবরে উকিলরা দিল
সরকারকে দুয়ো।
আরেকজন বলল, ঐ জামাতাটি ভুষি।
শেষের দলটি বলল, এ থেকেই বোঝা যায়
রেডিও ব‍্যাপারটাই ভুয়ো।’

কিন্তু সত্যি তো আর রেডিয়ো ব‍্যাপারটা ভুয়ো নয়। রেডিয়োর সম্প্রচার জনজীবনে ভিন্ন সাংস্কৃতিক বোধ এনে দিতে পারল। বিভিন্ন গুণী মানুষ এসে যোগ দিলেন এই প্রচার তরঙ্গের সঙ্গে। নানান ভাবনা-চিন্তায় সমৃদ্ধ হতে থাকল রেডিয়োর দিনানুদৈনিক কাজ। তিনজন গুণী মানুষের কথা এখানে বলি, যাঁরা অল্প আগে-পরে এসে বেতারে নতুন প্রাণ সঞ্চার করতে পেরেছিলেন। তাঁদের মধ্যে প্রথম নামটি বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের (১৯০৫–১৯৯১), মধ‍্যবর্তী বাণীকুমার বা বৈদ‍্যনাথ ভট্টাচার্যের (১৯০৮–১৯৭৪) আর শেষ নাম পঙ্কজকুমার মল্লিকের (১৯০৫–১৯৭৮)। ওঁরা তিনজন অল্পদিনেই অন্তরঙ্গ হয়ে ওঠেন। আর এই অন্তরঙ্গতার ফসলে বাঙালি সংস্কৃতি ক্রমেই সমৃদ্ধ হতে থাকে। এঁদের কাছে বাংলা সংস্কৃতির ঋণের শেষ নেই।

সদ‍্য গড়ে ওঠা বেতারকেন্দ্র তখনও সরকারি আপিসের নিয়মের নিগড়ে বাঁধা পড়েনি। নতুন এক সাংস্কৃতিক মাধ‍্যমকে ঘিরে বহু সৃষ্টিশীল গুণী মানুষের অশেষ ঔৎসুক‍্য। বেতারকেন্দ্রের আড্ডা থেকেই নানান অনুষ্ঠানের ভাবনা আসে। সমবেত প্রয়াসে সেই ভাবনা বাণীমূর্তি পায়। এরকমই এক বৈকালিক আড্ডায় ‘মহাস্থবির জাতক’-এর লেখক প্রেমাঙ্কুর আতর্থীর প্রস্তাবে উৎসাহিত হয়ে বাণীকুমার একটি আলেখ্য রচনা করেন। সংগীত পরিচালনার দায়িত্ব বর্তায় রাইচাঁদ বড়ালের ওপর। সংস্কৃত স্তোত্র পাঠ করেন বাণীকুমার নিজে আর সংলাপ পাঠের দায়িত্ব নেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ। সেটা ১৯৩২ সাল। বাসন্তীপূজার অষ্টমী তিথি বা অন্নপূর্ণা পূজার দিনে ‘বসন্তেশ্বরী’ নামে অনুষ্ঠানটি সম্প্রচারিত হয়। শ্রোতাদের মধ্যে প্রবল সাড়া ফেলে এই ‘বসন্তেশ্বরী’র প্রযোজনা। এই সাফল্য তাঁদের উৎসাহিত করে অন্য একটি অনুষ্ঠানের পরিকল্পনায়। দ্রুত স্থির হয় দুর্গাষষ্ঠীর দিনে আরেকটি অনুষ্ঠান সম্প্রচারের। বাণীকুমারের ওপরই দায়িত্ব পড়ে আলেখ‍্য রচনার। মার্কেণ্ডীয়চণ্ডী অবলম্বনে তিনি দেবীমাহাত্ম‍্যের বিবরণ দিয়ে একটি স্ক্রিপ্ট তৈরি করেন। সুর রচনার দায়িত্ব নিতে হয় পঙ্কজকুমার মল্লিককে আর স্তোত্র ও ভাষ‍্যপাঠের দায়িত্ব সামলাতে হয় বীরেন্দ্রকৃষ্ণকে। এই অনুষ্ঠানটিও প্রবল জনপ্রিয়তা পেল। পরের বছর মহালয়ার সকালে ‘প্রত‍্যুষ প্রোগ্রাম’ হিসেবে কথিত এই অনুষ্ঠানের নাম রাখা হয়েছিল ‘মহিষাসুরবধ, শারদবন্দনা’। ১৯৩৬ সালে অনুষ্ঠানটি আবার মহাষষ্ঠীর দিনে স্থানান্তরিত হলেও ১৯৩৭ থেকে এই অনুষ্ঠান সম্প্রচারিত হতে থাকে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ নামে আর মহালয়ার ভোরেই। ‘মহিষাসুরমর্দিনী’র প্রধান ভরকেন্দ্র ‘দুর্গাসপ্তসতী’। মূল কাঠামো অক্ষুণ্ণ রেখেও তখন নানান রকম পরিবর্তন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, গান ও শিল্পীর অদলবদলে প্রতিবারের অনুষ্ঠানেই শ্রোতারা পেতেন নতুনত্বের আস্বাদ। ফলে যতদিন গিয়েছে মহালয়ার এই প্রভাতী সম্প্রচার ততই জনসমাদর পেয়েছে, হয়ে উঠেছে বাঙালির সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের অন‍্যতম অবলম্বন।

এই অনুষ্ঠানের মহড়া চলত মাসাধিককাল ধরে। এই মহড়ায় প্রতিটি শিল্পী গায়ক বাদকের উপস্থিতি ছিল বাধ‍্যতামূলক। আইনের বাধ‍্যতা একসময় অন্তরের বাধ‍্যতায় রূপান্তরিত হল। দীর্ঘ-রিহার্সালে সমবেত গান অন‍্যমাত্রা পেল। প্রতিটি শিল্পীই তাঁর শ্রেষ্ঠটুকু উজাড় করে দিতে অভ‍্যস্ত ছিলেন এই অনুষ্ঠানে। পঙ্কজকুমার মল্লিকের অনুপস্থিতিতে দু’বার যিনি সংগীতাংশ পরিচালনা করেছেন, যাঁর গলায় ‘জাগো দুর্গা দশপ্রহরণধারিণী’ গানটি আলাদা করে জনপ্রিয় হয়েছিল সেই হেমন্ত মুখোপাধ‍্যায়কেও বম্বে প্রবাসকালে ‘৫১ সালে নিয়মিত মহড়ায় উপস্থিত থাকতে না-পারার কারণে শিল্পী তালিকা থেকে বাদ পড়তে হয়। পরে গানটি গাইতেন দ্বিজেন মুখোপাধ‍্যায়।

মহালয়ার ভোরে স্নান সেরে শুদ্ধাচারে ধূপধুনো জ্বালিয়ে অনুষ্ঠান করার একটি রেওয়াজ তৈরি হয়েছিল। অন‍্যদিকে, কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজ থেকে প্রশ্নও উঠেছিল কায়স্থর ছেলে কেমন করে চণ্ডীপাঠ করেন? অনুষ্ঠানের জনপ্রিয়তা এতটাই ছিল যে, এই অর্বাচীন প্রশ্ন ধোপে টেঁকেনি। আর এই অনুষ্ঠানের যন্ত্রসংগীত শিল্পীদের অনেকেই ছিলেন মুসলিম ধর্মাবলম্বী। ফলে আমাদের জড়সমাজে এই অনুষ্ঠান ছিল নীরব এক বিপ্লব। কিন্তু লাইভ সম্প্রচারের ব‍্যবস্থা একদিন বন্ধ হল। রেকর্ডেড অনুষ্ঠান প্রচার শুরু হওয়ায় সেই শুদ্ধাচারের বালাইয়েরও ইতি ঘটল। ১৯৬৬ সাল থেকে নতুন করে রেকর্ডিংও বন্ধ হয়ে গেল। বছরের পর বছর সেই পুরনো রেকর্ডিংয়ের পুনরাবৃত্তি। নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা নেই, গান বা শিল্পীর অদলবদল নেই।একই অনুষ্ঠান প্রতিবছর নির্দিষ্ট দিনে নিয়ম করে বেজে চলেছে। জনপ্রিয়তা এমনই শিখরস্পর্শী যে শ্রোতাদের দিক থেকে কোনও প্রশ্নই নেই। যদিও পঙ্কজকুমার, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ তখনও সৃষ্টিশীল, কর্মতৎপর।

১৯৭৫-এ দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয়েছে‌। দেশের মানুষ স্বৈরতান্ত্রিক এই প্রবণতাকে মন থেকে মানতে পারেননি। সবকিছু ঠিকঠাক চললেও মনের গভীরে বাসা বেঁধেছিল ক্ষোভ, বিরুদ্ধতা। ১৯৭৬, আকাশবাণীর কর্তৃপক্ষ স্থির করলেন মহালয়ার প্রভাতী অনুষ্ঠানের পরিবর্তন ঘটানো হবে। সরকারি আদেশ কার্যকরী হল। অল্পদিনের প্রস্তুতিতে নতুন এক স্ক্রিপ্ট লিখলেন ধ‍্যানেশনারায়ণ চক্রবর্তী। গান লেখার দায়িত্ব পড়ল শ‍্যামল গুপ্তের ওপর। সংগীত পরিচালনা হেমন্ত মুখোপাধ‍্যায়ের। সারা ভারতের শ্রেষ্ঠ শিল্পী সমন্বয়ে অনুষ্ঠান করার পরিকল্পনা। ভাষ‍্যপাঠে বসন্ত চৌধুরী, পার্থ ঘোষ, ছন্দা সেন। সংস্কৃত স্তোত্রপাঠে গোবিন্দগোপাল মুখোপাধ‍্যায়। তার ওপর কর্তৃপক্ষ একটা বড় চমকের কথাও ভাবলেন। উত্তম কুমারের মতো জনপ্রিয় চিত্রতারকাকেও যুক্ত করে নেওয়া হল ভাষ‍্যপাঠে। সংবাদমাধ্যমে তার প্রচার থাকল অবিরত। মূল অনুষ্ঠানে উত্তমবাবুর জন‍্যে বরাদ্দ ছিল মাত্র এক/দেড় মিনিটের পাঠ। তিনি আকাশবাণীতে এসে নিজের অংশ রেকর্ড করে গেলেন। সেসব খবরও খবরের কাগজে বেরোতে থাকল। জনসাধারণের মনে গগনচুম্বী এক প্রত‍্যাশা তৈরি হল। প্রত‍্যাশার কেন্দ্রে স্বয়ং উত্তম। সমস্ত ব‍্যস্ত সংগীতশিল্পীদের অনুষ্ঠানে যুক্ত করা হয়েছে। অথচ হাতে সময় নামমাত্র। ফলে কোনও সমবেত মহড়ার আয়োজন সম্ভব হল না। প্রত‍্যেকেই নিজের নিজের অংশ আলাদা আলাদাভাবে রেকর্ড করলেন। এদিকে প্রবীণ ও শ্রদ্ধেয় পঙ্কজকুমার বা বীরেন্দ্রকৃষ্ণকে, যাঁদের হাতে বলতে গেলে বেতার প্রাণ পেয়েছে তাঁদের এই সংবাদটুকু জানানোর সৌজন‍্যও আমলাতন্ত্রের মনে হয়নি। প্রবীণ শিল্পীদের মানসিক আঘাতের সংবাদও কাগজে বেরোতে থাকল।

১৯৭৬-এর ২৩ সেপ্টেম্বরে প্রচারিত অনুষ্ঠান ‘দেবীং দুর্গতিহারিণীম্’ জনসাধারণের প্রত‍্যাশা পূর্ণ করতে পারল না। আকাশবাণীতে জনবিক্ষোভ হল, কাগজে কাগজে বিরূপ সমালোচনা। অনেকগুলো সূত্রের যোগফলে ধূমায়িত বিক্ষোভ ফেটে পড়ল। ‘জরুরি অবস্থা’জনিত চাপা ক্ষোভ এই বিরুদ্ধতায় নিঃশব্দে যুক্ত হয়ে ছিল। অনুষ্ঠান সফল না হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উত্তম কুমার বিবৃতি দিয়ে জানালেন ‘ঠাকুরঘরকে ড্রয়িংরুম বানালে যা হয়, তাই হয়েছে।’ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণে সম্মতি জানানো, নীরবে এসে নিজের অংশ রেকর্ড করে যাওয়ার সময় তাঁর কিন্তু একথা মনে হয়নি। হলে তো তাঁর রেকর্ডটি না করারই কথা। অনুষ্ঠানটি ঘিরে এত বিতর্ক, এত বিক্ষোভ অথচ অনুষ্ঠানটির নিরপেক্ষ আলোচনা অদ‍্যাবধি করা সম্ভব হল না। গোবিন্দগোপাল মুখোপাধ‍্যায়, মাধুরী মুখোপাধ‍্যায় সংস্কৃত স্তোত্র পাঠ করলে সেটা কোন শিখর স্পর্শ করতে পারে, কতটা অর্থবহ হয় বা বসন্ত চৌধুরীর পাঠ কোন মাত্রা সংযোজন করতে পারে, সেসব আলোচনা মুলতবি রইল। এ ধরনের অনুষ্ঠানে উত্তম কুমারের উপস্থিতি কর্তৃপক্ষের কেন অনিবার্য মনে হয়েছিল, তা আজও বুঝতে পারিনি। কখনও এ প্রশ্ন জোরালো হয়ে উঠল না যে, প্রস্তুতির জন‍্যে যে সময়টা থাকা জরুরি ছিল তা কেন থাকল না, এ ধরনের চটজলদি পরিবর্তন আর চমক কেন জরুরি হয়ে পড়ল? বহু অর্থব‍্যয়ে তৈরি অনুষ্ঠানটি শেষপর্যন্ত ভাঁড়ার ঘরের সামগ্রী হয়ে রয়ে গেল।

অন‍্যদিকে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ বহুকাল দীর্ঘবাদন রেকর্ডে, পরে সিডি-তে ধৃত। এখন ইউটিউবেও সহজলভ্য। সারাবছর ধরে নানা কারণে এই রেকর্ড বাজিয়ে বাজিয়ে অনুষ্ঠানটির গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য দু’টোকেই শূন্যে নামিয়ে আনা হয়েছে। এখন রাস্তার মোড়ে মোড়ে ট্রাফিক গার্ডে মহালয়ার দিন পনেরো আগে থেকে রেকর্ডটি বাজতে থাকে।

যেসব গান শুনে একসময় শিহরিত হতে হত এখন সেসব গান মনে আর তেমন করে কোনও দাগ কাটে না। অতি ও অপব্যবহার যে কতটা মারাত্মক হতে পারে, তা এই সংগীত আলেখ‍্যর পরিণতি দেখে সহজে বোঝা যায়। অথচ স্মৃতির সফরে এখনও উদ্বেল করে দেয় সুপ্রীতি ঘোষের গলায় ‘বাজলো তোমার আলোর বেণু’ , মানবেন্দ্রকণ্ঠে ‘তব অচিন্ত‍্য’, শ‍্যামল মিত্র— আরতি মুখোপাধ‍্যায়ের দ্বৈত কণ্ঠে গীত ‘শুভ্র শঙ্খ রবে’ বা সন্ধ্যা মুখোপাধ‍্যায়ের গাওয়া ‘বিমানে বিমানে আলোকের গানে’, শিপ্রা বসুর ‘ওগো আমার আগমনী আলো’ বা বিমলভূষণের ‘নমো চণ্ডী, নমো চণ্ডী’ আর সব সমবেত গান।

এই ‘মহিষাসুরমর্দিনী’র দৌলতেই একসময় জেনে গিয়েছিলাম ব্রহ্মার বরে মহিষাসুর পুরুষের অবধ‍্য। আর তাই দেবতাদের মিলিত তেজে সৃষ্টি হয়েছিল লাবণ‍্যে পূর্ণ প্রাণ এই দেবী মূর্তির। জেনেছিলাম দেবতারাই জুগিয়েছিলেন তাঁকে আয়ুধ। মহাদেবের ত্রিশূল, বিষ্ণুর চক্র, অগ্নির শক্তি, ইন্দ্রের বজ্র, বরুণের শঙ্খ, বায়ুর ধনুক, যমের কালদণ্ড, ব্রহ্মার কমণ্ডলু, সূর্যের রশ্মিতে দশপ্রহরণধারিণী হলেন দুর্গতিনাশিনী। হিমালয় তাঁকে বহন করার জন‍্য দিলেন সিংহকে। আর মহাশক্তিধর মহিষাসুরের তিনবারের জন্মই দুর্গার আঘাতে মৃত‍্যুতে লীন হল। তাই তো তিনি ‘মহিষাসুরমর্দিনী’।

ছেলেবেলা পেরিয়ে এসেছি কোনও দূর অতীতে। কিন্তু ছেলেবেলা এখনও আমাকে ছেড়ে যায়নি, গভীর মমতায় বেষ্টন করে আছে, কখনও জানান দিয়ে, বেশিরভাগ সময় জানান না দিয়ে। মহালয়ার প্রভাতী অনুষ্ঠানের গভীর উন্মাদনার দিন ফুরিয়েছে সেই কবে, তবু অভ‍্যেস ছেড়ে যায়নি। তাই মহালয়া আসছে জানলে রেডিয়োর দোকানে খদ্দের বাড়ে, বাড়ির পুরনো ট্রানজিস্টরে ব‍্যাটারি ভরে টিউনিং করতে হয়। আধো ঘুমে আধো জাগরণে সূচি মেনে অনুষ্ঠানের সময়কাল শেষ হলে কোনওক্রমে উঠে রেডিয়োর নব ঘুরিয়ে দিই। সবই অভ‍্যেসে, অন্তরের টানে নয়। যেমন ডালে আটখানা লঙ্কা দিই সব্বাই দেয় বলে তেমনি আর কী। একসময়ের কালজয়ী অনুষ্ঠান সংস্কারের অভাবে, জমা পলি তুলে না নেওয়ায়, মমতায় ধরে না রাখায় এখন রসবিহীন, মরা সোঁতা। তবু তাতেই আমরা মজে আছি অভ‍্যেসে।

অলংকরণ জয়িতা ভৌমিক

Facebook Twitter Email Whatsapp

3 comments

  • Goutam Chattopadhyay

    ছয় দশকের স্মৃতি জেগে ওঠে। দেবী দুর্গতিহারিণীং নিয়ে নিরপেক্ষ আলোচনা সত্যিই দরকার। লেখাটি মনোজ্ঞ।

  • piali Bhowmik

    Aii kotha gulo protiti dhrubo sotti kotha……asole somoi, poristhiti, porasona, kajer chape jibone aii choto choto imotion guloke niye vabte vule ge6i kintu tobuo kothao giye aii mahaloya r dinta amader ka6e sesob choto belar smriti gulo k aro akbar firiye dai mone koriye dai mone koriye dai chotobalar muhurto gulo k…..

  • Daroooon lagey mahalaya just mind blowing

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *