ম্যান অব দ্য সিরিজ

দীপ্তেন্দু জানা

হারবক্স স্টেডিয়াম। নয়াদিল্লি। দর্শক গমগম করছে। তারিখটা ১৭ নভেম্বর। ইন্ডিয়া টসে জিতে ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড। ইতিমধ্যেই শচীনের ঝুলিতে দু’টি উইকেট। ২৫ রানে প্যাভিলিয়নে ফিরিয়ে দিয়েছে হেন্ড্রিক সোয়ানপলকে আর মাত্র ৮ রানের মাথায় ফেরত পাঠিয়েছে ব্রিনলে রেনল্ডসকে। এরপর ব্যাট করতে নেমেছে ডেভ অ্যাঙ্কার।  বোলিংয়ে আবার শচীন। শচীন বলল, ‘রেডি?’ শূন্য রানে দাঁড়িয়ে থাকা ডেভ বলল, ‘ইয়েস।’  শচীন বলল, ‘প্লে।’ বল ঝুনঝুন শব্দ করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছে। ব্যাট হাতে ডেভ তৈরি হচ্ছে শট নেওয়ার জন্য। কিন্তু ডেভের টাইমিংয়ে ভুল হল। আর বল সোজা গিয়ে ধাক্কা দিল স্ট্যাম্পে। উল্লাস করে উঠল উইকেটের পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল কুমার। দৌড়ে আসে বাকি টিমমেটরা। জড়িয়ে ধরে শচীনকে। শচীনের অনবদ্য বোলিংয়ের সৌজন্যে মাত্র ৮৭ রানে গুটিয়ে যায় ইংল্যান্ডের ইনিংস। আর রান চেজ করতে নেমে সতেরো ওভার দু’বল খেলেই ভারত তুলে নেয় ৮৯ রান ওয়ার্ল্ড কাপের লিগ  পর্যায়ের প্রথম ম্যাচে। কোনো উইকেট না হারিয়েই। আর  ৮ ওভারে ১৯ রানের বিনিময়ে ৩ উইকেট তুলে নেওয়ার সুবাদে ম্যান অব দ্য ম্যাচের খেতাব ওঠে অন্ধ শচীনের হাতে। হ্যাঁ, অন্ধ শচীন। একুশ বছরের যুবকটিকে শচীন বলেই ডাকত টিমমেটরা।

আরও পড়ুন: মুঘল দরবারে আম

লিগ পর্যায়ের দ্বিতীয় ম্যাচ ছিল ১৮ তারিখ। ঠিক একদিন পরেই। নয়াদিল্লির রোশানারা ক্লাব ময়দানে নভেম্বরের হিমেল হাওয়ায় উড়ছে ইন্ডিয়া আর শ্রীলঙ্কার জাতীয় পতাকা। টসে জিতে ইন্ডিয়া এদিন ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু ওপেনার মহেশ কুমার দুর্ভাগ্যবশত এক রানে আউট হয়ে যায়। প্রতাপ সিং ২৯, মানভেন্দর সিং ২৪ রান করলেও বড় রানের পার্টনারশিপ গড়তে তারা ব্যর্থ হয়।  সুশীল গাউরও  মাত্র ৫ রানে আউট হয়ে যায়। ক্রিজে তখন একা লড়ছে ক্যাপ্টেন আনন্দ শর্মা। সুশীল গাউর আউটের পর ছয় নম্বরে ব্যাট করতে নামে অন্ধ যুবকটি। এই তো সুযোগ, দলের প্রয়োজনে নিজের প্রতিভাকে মেলে ধরবার। অধিনায়ক আনন্দ শর্মাকে যোগ্য সঙ্গত দেওয়ার জন্য একটা লম্বা ইনিংসের প্রস্তুতি নিতে থাকে অন্ধ যুবক। কিন্তু আনন্দ শর্মা চল্লিশে রান আউট হতেই দল আরও চাপে পড়ে যায়। কিন্তু অন্ধ যুবক বুঝতে পারে তার ক্রিজে টিকে থাকা এখন কতটা জরুরি। নির্মল কুমারের সঙ্গে ধীরে ধীরে দলকে ভরাডুবির হাত থেকে টেনে তুলতে থাকে অন্ধ যুবকটি। অন্ধকার চিরে এগিয়ে আসতে থাকে একেকটি ডেলিভারি। সম্বল বলতে দু’টি কান। কান দু’টি সজাগ। সতর্ক। শুধুমাত্র বলের ঝুনঝুন শব্দ হিসেব করেই একের পর এক সুইপ শট। আর বল ছুঁয়ে যাচ্ছে বাউন্ডারি। টিমমেটস আর মাঠে উপস্থিত দর্শকদের হাততালি আর অভিবাদনে অন্ধ যুবক বুঝতে পারে তার হাফ সেঞ্চুরি পূর্ণ হয়েছে। আকাশের দিকে ঘাড় তুলে তাকায় অন্ধ যুবক। নির্মল কুমারও ততক্ষণে ব্যাটিংয়ে ঝড় তুলেছে। নির্মল কুমার আর অন্ধ যুবকটির কাঁধে চড়ে এদিন ভারতীয় ইনিংস শেষ হয় ২৫৫ রানে।

আরও পড়ুন: প্যানকেকগুলি

দর্শকদের জন্য আসল ম্যাজিক তো অপেক্ষা করছিল এরপর। শ্রীলঙ্কা ব্যাট করতে নামতেই অন্ধ যুবকটি জাদু দেখাতে শুরু করে। বল হাতে অন্ধ যুবকটি আর  ব্যাট হাতে শ্রীলঙ্কার ওপেনার মনোজকে বান্দারা। অন্ধকার ভেদ করে বল ছুটে যাচ্ছে। লক্ষ্য তিনটি উইকেট। ব্যক্তিগত ৮ রানের মাথায় স্টেপ আউট করে বান্দারা। কিন্তু বান্দারা ভুল করে বসল আর বল উইকেট-কিপার বিশাল কুমারের হাতে যেতেই দুরন্ত স্টাম্পিং। সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার। আউটের আপিল। দলকে প্রথম ব্রেক-থ্রু এনে দিল অন্ধ যুবক। আরেক ওপেনার বসন্ত জয়াবর্ধনেকেও মাত্র ৭ রানের মাথায় প্যাভিলিয়নে ফেরত পাঠায় সে। ওপেনিং জুটি আউটের পর ফের রান আউট কুমুদ লাল সমরসিংঘে। বল হাতে আবার অন্ধ যুবক। ব্যাটিংয়ে শ্রীলঙ্কার ক্যাপ্টেন চন্দনা কুমারা। উইকেট টু উইকেট বোলিং অন্ধ যুবকের। চন্দনা কুমারা ব্যর্থ হল টাইমিং করতে। বল প্যাডে লাগতেই আবার চিৎকার।এবার এলবিডব্লিউয়ের আবেদন।  চন্দনা কুমারাকে আউট করে শ্রীলঙ্কার ব্যাটিংয়ের কোমর ভেঙে দেয় অন্ধ যুবক। আজও ভারতের জয়। ২১১ রানে। অন্ধ শচীনকে জড়িয়ে ধরে টিমমেটদের উল্লাস। ব্যাটিংয়ে ৫৩। আর আট ওভার বল করে বারো রান দিয়ে তিন উইকেট। সে ছাড়া আর কে হবে ম্যান অব দ্য ম্যাচ? 

আরও পড়ুন: জয়ী

ইদার থেকে বাড়ি ফিরছিল দামোর। বালাজি দামোর। তার বাড়ি আরাবল্লি পর্বতের কোলে পিপরানা গ্রামে। বাড়ি বলতে স্ত্রী অণু ও ছোট্ট সতীশকে নিয়ে এক কামরার সংসার। বেলা পড়ে এলো। অণু কি ক্ষেত থেকে ফিরেছে? নিজে এত অসহায় যে  ক্ষেতমজুরের কাজেও যেতে পারে না। অগত্যা নিজের এক ছটাক জমিতে চাষের কাজ দেখতে হয় অণুকেই। সংসারের যা হাল!  লোকের জমিতেও ক্ষেতমজুরের কাজ করতে হয় অণুকে। ইদারে মাঝেমধ্যেই যায় দামোর। ওখানে একটা  স্কুল আছে। খুব সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে সেই স্কুলেই ছাত্রদের কোচিং করাতে যায় সে। তারও তো পেট আছে!  সেই পেটে খাবার না দিলে দাউদাউ করে আগুন জ্বলে! হাঁটতে হাঁটতে দীর্ঘশ্বাস ঝরে পড়ে দামোরের। সত্যিই বড্ড খিদে লেগেছে। বাড়ি গিয়েই পেটে কিছু দিতে হবে। যতটা সম্ভব তাড়াতাড়ি পা চালাতে থাকে দামোর। রাস্তাঘাট তার খুবই চেনা। তবুও হোঁচট খেলো সে। মোষের পিঠের কুঁজের মতো উঠেছিল একটা পাথর— সে বুঝতেই পারেনি।  পায়ের বুড়ো আঙুলের নখটা প্রায় ছেড়ে গেছে চামড়া থেকে। বুড়ো আঙুল থেকে রক্ত ঝরছে।  বেশ কনকন করছে  যন্ত্রণায়। দামোর বুঝতে পারে ডাক্তারের কাছে না গেলেই নয়। এই রাস্তা ধরে  আর একটু এগোলেই বাঁ-হাতি একটা হাতুড়ে ডাক্তারের চেম্বার। দাঁতে দাঁত চেপে দামোর এগিয়ে গেল  ডাক্তারখানার দিকে।

ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে ওষুধ লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিল হাতুড়ে ডাক্তার। খাওয়ার জন্যও খামে ভরে দু’রকমের ওষুধ দিল। ‘‘এখন একটা একটা খেয়ে নাও। কাল থেকে দিনে দু’বার করে সকালে বিকেলে তিন দিন ওষুধগুলো খেও। এই লিখে দিলাম।” ডাক্তারের কথা শুনে দামোর ইতস্তত করতে করতে বলে উঠল, ‘ওষুধ লাগবে না ডাক্তারবাবু। ওগুলো রেখে দিন।’

—সেকি? কেন? ওষুধ না খেলে সারবে না তো।

—আমার কাছে তো ওষুধ কেনার টাকা নেই।

যদিও আজ কোচিং করানো বাবদ মাইনের দেড় হাজার টাকা পেয়েছে। দামোর পকেটে হাত ঢুকিয়ে নোটগুলোকে মুঠোর  মধ্যে জাপটে ধরে সপাটে  মিথ্যে কথাটা বলল। তারপর আরো বললো, ‘ধার দেবেন কি?’ ডাক্তার এবার খেঁকিয়ে উঠল, ‘ধার চাইতে লজ্জা করে না? এটা কি মুদির দোকান?’ হাতে গোনা মাত্র দেড় হাজার টাকা থেকে ওষুধের পেছনে এতটা খরচ হয়ে গেলে সারামাস সংসার চলবে কী করে? মুখ বুজে এই অপমান গায়ে মেখে নিল দামোর। তারপর ওষুধ না নিয়েই খানিকটা খোঁড়াতে খোঁড়াতে নেমে এলো রাস্তায়।

বাড়ি ফিরতেই চাপাটি আর জল নিয়ে হাজির হল অণু। চাপাটি খেতে খেতে দামোর বলল, ‘সতীশ কোথায় ওকে দেখছি না? সতীশ? সতীশ?’ বাবার হাঁক শুনে কাকার বাড়ি থেকে ছুট্টে এলো সতীশ। দাওয়ায় বাবাকে খেতে দেখে বাবার গলা জড়িয়ে ধরল সে। তারপর বাবাকে বললো, ‘বাবা তুমি কোথায় গিয়েছিলে?’ দামোর উত্তর দিল, ‘ইদার।’ ফের প্রশ্ন করল সতীশ, ‘ইদারে কেন গিয়েছিলে?’ দামোর ছেলেকে বলল, ‘ক্রিকেট শেখাতে।’ 

—বাবা আমায় তুমি ক্রিকেট শেখাবে? 

—ক্রিকেট!

—হ্যাঁ। ক্রিকেট। বলো না বাবা শেখাবে?

—না। 

—না কেন? আমি ক্রিকেট শিখতে চাই। 

—খবরদার আর কখনো ক্রিকেটের কথা বলবি না! 

—কেন বলব না? আমি যে বড় হয়ে ক্রিকেটার হতে চাই। শচীনের মতো।  বীরেন্দ্র সেহওয়াগের মতো।

ছেলের কথা শুনে মাথায় রক্ত চড়ে যায় দামোরের। এঁটো হাতেই ঠাস করে একটা চড় কষায় সতীশের গালে। সতীশ কাঁদতে কাঁদতে মায়ের আঁচল জড়িয়ে ধরে। ছেলের কান্না শুনে অণু ঝাঁঝিয়ে ওঠে, ‘তুমি ছেলেটাকে অমন করে  মারলে কেন?’ দামোর শুনেও শোনে না অণুর কথা। খাওয়া ফেলে উঠে যেতে ইচ্ছে করলেও দামোর চাপাটি ফেলে উঠে যেতে পারল না। গোগ্রাসে চাপাটি চিবোতে থাকে সে।

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (৩য় অংশ)

লিগের তৃতীয় ম্যাচ ছিল উনিশে নভেম্বর। নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচটিতে ম্যান অব দ্য ম্যাচ না হলেও যথেষ্ট ভালো বোলিং করেছিল অন্ধ যুবকটি। ৮ ওভারে ২৭ রান দিয়ে ৩ উইকেট। মানভেন্দর সিং আর রাম করণ শর্মার ব্যাটিংয়ে ভর করে ভারত জয় ছিনিয়ে নেয়। সাউথ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ম্যাচটিতে ভারতের জয়ে তেমন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে না পারলেও বাইশে  নভেম্বরের ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার ওপেনার পিটার রবিনসনকে ৫ রানে প্যাভিলিয়নে ফেরত পাঠায় অন্ধ যুবকটি। আর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ম্যাচে ২৪ নভেম্বর দলের জন্য ৬২ রান করে ম্যাচ জিতিয়ে মাঠ ছাড়ে সে। যার সুবাদে ভারত উঠে যায় সেমিফাইনালে।

লুঙ্গি আর ফুটো ফুটো হয়ে যাওয়া গেঞ্জি পরে গাছ তলায় বসেছিল দামোর।  সকালের রোদ এসে গায়ে লাগছে তার।  পায়ের বুড়ো আঙুলে এখনো তার ব্যান্ডেজ বাঁধা। দামোর বিড়বিড় করে রোদকে বলে উঠল, ‘তুমি আমার সঙ্গে বঞ্চনা করেছ।’ দামোরের পায়ের কাছে ঠান্ডা হাওয়ায় ঝরে পড়ল একটা কৃষ্ণচূড়া ফুল। দামোর  কৃষ্ণচূড়া ফুলটি কুড়িয়ে নিল হাতে। সে বিড়বিড় করে আবার বলে উঠল, ‘ও হাওয়া, তুমি আমার সাথে বঞ্চনা করেছ। কৃষ্ণচূড়া ফুলটিকেও বলে উঠল, ‘ও  কৃষ্ণচূড়া ফুল, তুমি আমার সাথে বঞ্চনা করেছ।’ মোষগুলো চরছে মাঠে। চরে-চরে ঘাস খাচ্ছে। দামোর মোষ চরাতেই এসেছে। ঘাড় তুলে আকাশের দিকে তাকাল দামোর। বিড়বিড় করে আবার বলল, ‘আরাবল্লি পর্বত সাক্ষী!  তোমরা সবাই আমার সঙ্গে বঞ্চনা করেছ।’ আপন মনে সে আরো বলল, ‘একটা চাকরিই তো  চেয়েছিলাম শুধু!  অথচ আমার ছেলে শচীন হতে চায়! বীরেন্দ্র সেহওয়াগ হতে চায়!’ হঠাৎই নিজের ওপর প্রচণ্ড রাগ হয় দামোরের। অসহায়ের মতো নিজেই নিজের গালে চড়াতে থাকে। চড়াতে চড়াতে  দামোর কাশতে শুরু করে। কাশির দমকে বুকের ভেতর থেকে উঠে আসে একদলা কফ।  কবেকার পুরনো। যেন দামোরের অজান্তেই  বুকের মধ্যে  বাসা বেঁধেছিল। মোষগুলোর দিকে তাকিয়ে কফ ফেলল দামোর।

২৬ নভেম্বর। হারবক্স স্টেডিয়াম। সেমিফাইনাল ম্যাচ। প্রতিপক্ষ সাউথ আফ্রিকা। এই মাঠেই তারা সাউথ আফ্রিকাকে হারিয়েছিল লিগের চতুর্থ ম্যাচে। তাই মনস্তাত্ত্বিক দিক দিয়ে এগিয়ে ভারত। আর আজ জিততে পারলেই তো ফাইনাল। তাই চাপা উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটছে গোটা ইন্ডিয়ান স্কোয়াড। টসে জিতে ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয় সাউথ আফ্রিকা। ইন্ডিয়ান টিম তাদের লক্ষ্য স্থির করে নেয়। জিততে গেলে চাই বড় রান। কিন্তু ভারতীয় ব্যাটিং  শুরুতেই হোঁচট খায় ওপেনার রাম করণ শর্মা এক রানে আর প্রতাপ সিং পাঁচ রানে পরপর আউট হওয়ায়। কিন্তু  মানভেন্দর সিং (৫৪) আর বিশাল কুমার (১৩৮) ম্যাচের লাগাম নিজেদের হাতে নিয়ে নেয় অচিরেই। এদিনও ছয় নম্বরে ব্যাট হাতে নামে সেই অন্ধ যুবক। স্লগ ওভারে তার ঝকঝকে ৭৮ রানের অপরাজিত ইনিংসের দৌলতে নির্ধারিত ৪০ ওভারে ভারত খাড়া করে ৩৩৫ রানের বিশাল পাহাড়। দর্শকরা অভিভূত। ভারতীয় দল উচ্ছ্বসিত। আর স্বভাবতই চাপে সাউথ আফ্রিকা। তাদের করতে হবে ৪০ ওভারে ৩৩৬। অর্থাৎ ২৪০ বলে ৩৩৬ রান। ওভারপিছু আস্কিং রেট আটের ওপর।

বিরতির পর ব্যাট করতে নামে দক্ষিণ আফ্রিকার দুই ওপেনার রুরি ফিল্ড ও স্কট ফিল্ড। বল হাতে আক্রমণে আসে ভারতীয় বোলার সন্তোষ সাহানি।  তারপর বল হাতে অন্ধ শচীন। প্রথম ওভার থেকেই রুরি ফিল্ড মারমুখী ব্যাটিং করতে শুরু করে। স্কট ফিল্ডের ব্যাট থেকেও সমান তালে আগুন ঝরতে থাকে। সাউথ আফ্রিকার ব্যাটিং তাণ্ডবের  সামনে ধারালো ভারতীয় বোলিং লাইনআপ আজ যেন ভোঁতা হয়ে গেছে। অন্ধ যুবক বুঝতে পারে উইকেট চাই… উইকেট। এই ওপেনিং জুটিকে ভাঙতে না পারলে নিস্তার নেই। কিন্তু হায়! সেই অন্ধ যুবকও বল হাতে আজ অসহায়। সুশীল গাউর বা রাজেশ কুমার সিং তারাও উইকেট নিতে ব্যর্থ। নির্মল কুমার আর রাম করণ শর্মার বলে তো বাউন্ডারির পর বাউন্ডারি হাঁকাতে থাকে দুই ব্যাটসম্যান। দুই ব্যাটসম্যান ইতিমধ্যেই নিজের নিজের সেঞ্চুরি পূর্ণ করেছে। যে ম্যাচটাকে একটু আগেও ভারতের পকেটে মনে হচ্ছিল এখন আর তা মনে হচ্ছে না, বরং উল্টোটাই মনে হচ্ছে। দেখতে দেখতে ৩৪ ওভার খেলা শেষ। ছয় ওভার মানে ৩৬ বলে চাই ৫২ রান। মাঠে টানটান উত্তেজনা। ক্রিকেট অনিশ্চয়তার খেলা। এখান থেকেও ম্যাচের রং বদলে যেতে পারে। দরকার পরপর কয়েকটা উইকেট। ভারত অধিনায়ক আনন্দ শর্মা বল তুলে নিল নিজের হাতে। ওভারের প্রথম ডেলিভারি রুরি ফিল্ড ব্যাটে-বলে করতে পারল না। দ্বিতীয় বল। রুরি সুইপ করল সপাটে কিন্তু বল গেল সোজা ফিল্ডারের হাতে। এবারো কোনো রান হল না। আস্কিং রেট বাড়ছে। ৩৪ বলে ৫২ দরকার। আনন্দ শর্মার তৃতীয় বল। সিঙ্গল নিল রুরি। চতুর্থ বল ডিফেন্স করল স্কট ফিল্ড। কোনো রান হল না। পঞ্চম বলে এক রান নিল স্কট। ষষ্ঠ বলে রুরির অনবদ্য কভার ড্রাইভ। বল চলে গেল মাঠের বাইরে। চার রান। ৩৫ ওভার শেষ। কিন্তু কোনো উইকেট তুলতে পারল না অধিনায়ক। আর দরকার ৩০ বলে ৪৬ রান। দেখতে দেখতে ৩৯ ওভার শেষ। ৬ বলে দরকার ৮ রান। বল হাতে আবার অধিনায়ক আনন্দ শর্মা। ব্যাট হাতে স্কট ফিল্ড। প্রথম বল। মিড অনে খেলেছে স্কট। এক  রানই নিচ্ছিল সে। কিন্তু মিড অনের ফিল্ডার মিসফিল্ড করায় আরো একটি রান চুরি করে নিল স্কট। অধিনায়কের দ্বিতীয় বল। দর্শকরা নিস্তব্ধ। কী হয় কী হয় পরিস্থিতি। নাহ। স্কট বলটাকে মিস করল। কোনো রান হল না। চার বলে দরকার ছয় রান। তৃতীয় বল। লেগ সাইডে দুই ফিল্ডারের মাঝের গ্যাপে সপাটে খেলেছে স্কট। বিদ্যুৎ গতিতে বল চলে গেল বাউন্ডারির বাইরে। চাপে অধিনায়ক আনন্দ শর্মা। তিন বলে দরকার মাত্র দুই রান। না আর আশা নেই। পরের বলে আবার বাউন্ডারি। ৩৯ ওভার ৪ বলে ম্যাচ বের করে নিল সাউথ আফ্রিকা। এত ভালো ব্যাটিং করেও শেষরক্ষা করতে পারল না ভারতীয় দল। এখানেই শেষ অন্ধ শচীনের বিশ্বকাপ অভিযান। চোখে জল এসে যাচ্ছিল অন্ধ যুবকটির। ২৮ নভেম্বর পাকিস্তানকে হারিয়ে বিশ্বকাপ জিতে নেয় সাউথ আফ্রিকার ব্লাইন্ড ক্রিকেট টিম। সাউথ আফ্রিকা ওয়ার্ল্ড কাপ ট্রফি ঘরে নিয়ে গেলেও ম্যান অব দ্য সিরিজের খেতাব ওঠে ভারতের সেই  অলরাউন্ডার অন্ধ যুবকটির হাতে। খোদ ভারতের রাষ্ট্রপতি কে. আর. নারায়ানানের হাত থেকে ম্যান অব দ্য সিরিজের পুরস্কারটি গ্রহণ করে বালাজি। বালাজি দামোর।  ভারতের এই প্রতিভাবান অন্ধ ক্রিকেটার একটা চাকরিই তো চেয়েছিল শুধু। কিন্তু কেউ তার প্রতিভাকে মনে রাখেনি। কেউ তাকে দেয়নি একটা চাকরি।  স্লগ ওভারে দলের মুখে হাসি ফোটাত যে দামোর জীবনের স্লগ ওভারে নিজেই হাসতে ভুলে গেছে সে।

মোষ দু’টো মাঠে চরে বেড়াচ্ছে। দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে নিচ্ছে কচি ঘাস। মোষ দু’টোর  দিকেই তাকিয়ে রয়েছে দামোর। কালো কুচকুচে মোষ দু’টো বাস করে হতভাগ্য দামোরের অন্ধ দু’টি চোখের ভেতর।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *