আম চাষ: ইতিহাস-বৃক্ষ ঘেঁটে

মনাঞ্জলি বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কল্যাণ চক্রবর্তী

চতুর্বেদে (খ্রিস্টপূর্ব ৩৭০০-২০০০) নির্দিষ্টভাবে আমের উল্লেখ পাওয়া যায় না। তবে বৃহদারণ্যক-উপনিষদ (খ্রিঃপূঃ ১০০০)-এ এবং ‘শতপথ ব্রাহ্মণ’-এ আমের বিশেষ প্রশংসা আছে। আমের টুকরো দিয়ে মাংস রাঁধার কথা আছে মহাভারতে।

কোনো এক রামায়ণে রয়েছে রাবণ শ্রীলঙ্কা থেকে ভারতে আম নিয়ে এসেছিলেন; উদ্ভিদ বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলে Plant Introduction. হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈনদের অতি পবিত্র ফল যে আম তা মন্দির-স্থাপত্য থেকে জানা যায়। হিন্দুদের বিশ্বাস, প্রজাপতি ব্রহ্মার থেকেই আমের উৎপত্তি; তাই আম্র-পল্লব পাঁচটি পবিত্র পাতার অন্যতম। আম্র-মঞ্জরীকে কামের দেবতা মদনদেবের পুষ্প-বাণের অন্যতম বলা হয়েছে।

আরও পড়ুন: ইসরাইল-প্যালেস্তাইন সংঘাত, একপেশে মিডিয়া

আমগাছের ছায়ায় বিশ্রামরত শিব এবং তাঁর পরিবার। ভিক্টোরিয়া এবং অ্যালবার্ট যাদুঘরে সংরক্ষিত

কাঞ্চিতে রয়েছে একাম্ব্রেশ্বর মন্দির। এখানে প্রাচীন আমগাছে (সাড়ে তিন হাজার বছরের পুরনো বলে কথিত) রয়েছে শিব-পার্বতীর অবস্থান, এমনই বিশ্বাস স্থানীয় মানুষের। এই প্রাচীন বৃক্ষের চারটি প্রধান শাখায় চারটি বিভিন্ন জাতের আম ফলে। এটা সম্ভব হতে পারে টপ-ওয়ার্কিং বা ‘মুণ্ড কলম’ করে। অথবা চারটি পৃথক জাতের পরশাখী বা ‘সায়ন’ এনে চারটি বিভিন্ন এলাগাছে বা রুটস্টকে জুড়ে তাদেরকে পাশাপাশি লাগানো হয়েছিল। কালের গর্ভে তাদের গুঁড়ি পরস্পর জুড়ে গিয়ে একটি সাধারণ গুঁড়িতে পর্যবসিত হয় এবং পরবর্তীতে তারই সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে ফলছে আলাদা জাতের আম।

ভগবান বুদ্ধ যে আমগাছের তলায় বিশ্রাম নিতেন এবং ধর্মপ্রচার করতেন, সেটিই পরে বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের কাছে পবিত্র বৃক্ষের মান্যতা পায়। বৌদ্ধ জাতকে উল্লেখ আছে আমের ফলন বাড়াতে আমগাছে দুগ্ধ-সেচ দেবার প্রচলন ছিল। জাতকে আরও উল্লেখ আছে, আমের রস প্রস্তুতির প্রসঙ্গ। জৈন ধর্মগ্রন্থে বিশেষ করে ভগবান মহাবীর-পরবর্তী-গ্রন্থে আমের বিশেষ উল্লেখ রয়েছে। অন্তত এক হাজারটি আমগাছ দিয়ে রচিত হয়েছিল পবিত্র জৈন-বনখণ্ড। খ্রিঃপূঃ ৫০০ থেকে ৫০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রচিত জৈনধর্মগ্রন্থ বৃহৎকল্প ও ভাষ্যে আম পাকানোর চারটি পদ্ধতি উল্লেখ আছে।

আরও পড়ুন: তিরিশ বছর পরে: সেদিনের সেই অভিশপ্ত রাত

আমগাছের নীচে প্রথমবার গৌতম বুদ্ধ ধর্মপ্রচার প্রচার করছেন। ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ বাস্তু সংগ্রহালয়ে সংরক্ষিত

প্রাচীন আয়ুর্বেদ-বিশারদ চরক আমের বিবিধ ভেষজগুণ লক্ষ করেছিলেন। তিনি পাকা আমের ফল থেকে তৈরি ‘সহকার সুরা’ নামে একটি মদের উল্লেখ করেছিলেন। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে রয়েছে দারুকার্যে ব্যবহৃত আমের প্রসঙ্গ। কৌটিল্য আম-আঁটির শাঁস থেকে প্রস্তুত তেলের প্রসঙ্গও উপস্থাপন করেছেন, যদিও তার ব্যবহার বিধির উল্লেখ পাওয়া যায় না। জানা যায়, সম্রাট অশোক আমগাছ লাগানোর ব্যাপারে জনসাধারণকে যথেষ্ট উৎসাহিত করতেন।

কালিদাস থেকে শুরু করে বহু প্রাচীন কবি তাদের লেখায় উল্লেখ করেছেন কামের দেবতা মদনদেবের অন্যতম ‘শর’ আম্র-মঞ্জরির কথা। পরবর্তীকালে লোকসংগীতে আমের বোলের কথা বলা হয়েছে, যার সুবাস ভালোবাসাকীর্ণ হৃদয় জারিত করেছিল। কালিদাসের মেঘদূত কাব্যে দেখা যায় বনের মাঝে পেকে থাকা আমের ফল। ভূমিক্ষয় নিবারণে আমগাছের যে যথেষ্ট কদর ছিল, তার উল্লেখ পাওয়া যায় বরাহমিহিরের ‘বৃহৎসংহিতা’ গ্রন্থে। বলা হয়েছে পুকুর বা জলাশয়ের পাড়ে আমগাছ লাগাতে হবে, তাতে জল থাকবে শীতল, বাষ্পীভবনের হার কমবে, আর পুকুর-বাঁধের মাটি-ক্ষয় নিবারণ করা সম্ভব হবে। আমের কাঠ দিয়ে সেকালে বিগ্রহ তৈরি হত। বরাহমিহির জোড়কলম বাঁধার প্রকৌশলের কথা উল্লেখ করলেও আমের ক্ষেত্রে তা প্রচলিত ছিল কিনা জানা যায় না।

আরও পড়ুন: বন্যালাগা গাঁয়ে…

চিনা পর্যটক হিউয়েন সাঙ মথুরা সন্নিহিত অঞ্চলের বিবরণ দিয়েছেন যেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন আবাস সন্নিহিত বাগিচায় আমগাছ রোপণের কথা। তিনি দু’ধরণের আমের কথা লিখেছেন। প্রথম, ছোট্ট আম যা পাকলে হলুদবর্ণ ধারণ করে; দ্বিতীয়, বৃহৎ আম যা পাকলেও সবুজই থাকে। এই বিবরণীটিই সম্ভবত আমের ফলের প্রকারভেদ সংক্রান্ত প্রথম প্রামাণ্য দলিল। আজকের যা ল্যাংড়া আম যেটা মথুরাতেও চাষ হয়, তা পাকলে সবুজ থাকে। তিনি সম্ভবত ল্যাংড়া আমের কথাই বলেছেন।

মধ্যযুগে ওড়িশায় (৬০০-৯০০ খ্রিঃ) রাজ্যের সমস্ত আমবাগান ও আমগাছের উপর রাজার একছত্র অধিকার প্রতিষ্ঠিত ছিল। এছাড়াও সমগ্র পতিত জমি, সমুদয় জলবাহী, মৎস্য-শিকার ও প্রাণীপালনের উপরেও রাজার নিরঙ্কুশ অধিকার প্রতিষ্ঠিত ছিল।

সুরপালা (১০০০ খ্রিঃ)-র বৃক্ষায়ুর্বেদে আমগাছ বেড়ে ওঠার কথা জানা যায়। উল্লেখ আছে যে, বা যিনি পাঁচ থেকে ছয়টি আমগাছ রোপণ করেন তিনি মৃত্যুর পর স্বর্গলোকে ঠাঁই পান এবং দেবতাদের মতোই সুখে বসবাস করেন। বলা হয়েছে, যেকোনো সাধারণ জমিতেই বীজ থেকে আমগাছ উৎপত্তি হতে পারে এবং গাছ লাগাতে হবে ভাদ্র মাসে অর্থাৎ বর্ষার শেষ লগ্নে সুরপালা পরামর্শ দিয়েছেন, জলের সঙ্গে আঙ্কোলার পাকা ফল (Alagium lamarchiii Thw.), ঘি, মধু এবং শূকরের মজ্জা মিশিয়ে আম গাছে সিঞ্চন করলে গাছের বৃদ্ধিও ভালো হয় এবং গাছ বৃহৎ সুমিষ্ট আমে ভরে ওঠে।

আরও পড়ুন: রাজ্যের প্রথম গ্রন্থমেলাও হয় এই মুর্শিদাবাদ জেলায়

সুরপালা লিখছেন, একটি সাধারণ মানের আম গাছই উত্তম মানের আমগাছে পরিণত হবে এবং তার সুগন্ধি বোল মৌমাছিকে বেশি আকর্ষণ করবে যদি গাছে জাম, প্রবাল এবং খস, Vetiveria zizanioides (L.)Nash)-এর শিকড়ের ক্বাথ জলে মিশিয়ে সিঞ্চন করা যায়। সুরপালা আমগাছে জৈবসার প্রয়োগের পরামর্শ দিয়েছেন, যেমন শূকরের মজ্জা, জাম ও প্রবালের ঘন মলম যা ফলের উৎপাদন বৃদ্ধির সহায়ক বলে মনে করেছেন। যেহেতু তিনি মৌমাছি আকর্ষণের বিষয়টি ভেবেছেন, তাই মনে করা হয় তিনি আমের পর-পরাগমিলন সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পোষণ করতেন।

চালুক্যরাজ সোমেশ্বর দেব ছিলেন পণ্ডিত ব্যক্তি। তিনি সংস্কৃত ভাষায় একটি এনসাইক্লোপিডিয়া (Abhilashitarthachintamani) রচনা করেন যা ‘মানসোল্লাস’ নামেও খ্যাত। ওই গ্রন্থের একটি পরিচ্ছেদের কিছু মন্ত্রে আমের বীজ ব্যবস্থাপনার (Seed treatment) উল্লেখ দেখা যায়। পাকা আমে বীজ শোধন ও প্রায়োগিক ব্যবস্থাপনা করে বুনলে তা থেকে শীঘ্রই চারা বেড়ে ওঠে ও দ্রুত ফল দেয় বলে লেখা আছে। এজন্য পাকা বীজ ৭ দিন ধরে মাছ ও শূকরের মজ্জা, তেল, ঘি, দুধ এবং বৃহতি (Solanum indicum L.), তিল এবং কাঁড়া (শীতলপাটি বা আখ গাছের ছাই) মিশিয়ে প্রস্তুত জৈবদ্রবণে রেখে দেওয়া হয়। এই সুপারিশ উত্তম চারাগাছ নির্গমনের সহায়ক হলেও তার প্রয়োগে জলদি ফলনের দাবি কষ্টকল্পিত।

ক্রমশ…

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *