মুঘল দরবারে আম

মনাঞ্জলি বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কল্যাণ চক্রবর্তী

মহারাষ্ট্রের বেদ-বিরোধী সাধক ও ‘মহানুভপন্থা’ নামক হিন্দু-গোষ্ঠীর প্রবর্তক চক্রধর স্বামী (১১৯৪-১২৭৪) ছিলেন ‘দত্তাত্রেয়’ নামক রূপক দেবতার উপাসক, যা আদতে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরের একত্রিত, একদেহী দেব-মূর্তি। চক্রধর স্বামী ও তাঁর অনুগামী ভক্তেরা হাজার হাজার আমগাছ লাগিয়েছিলেন এবং মহারাষ্ট্রের বিদর্ভ ও মারাথওয়ারা অঞ্চলে ‘দত্তাত্রেয়’র অজস্র মন্দির নির্মাণ করেন। এই রকম প্রাচীন কোনো কোনো আমগাছের সন্ধান আজও মেলে, যেমন— ফুলাম্ব্রি (আওরঙ্গাবাদ), নেকনুর (জেলা: বিদ), ভাশি (জেলা: ওসমানাবাদ)। ফুলাম্ব্রিতে আমবাগানে ১৯৩৬ সালে প্রাপ্ত আমগাছের সংখ্যা প্রায় ১.৩৫ লক্ষ, যা আকবর প্রবর্তিত ‘লাখবাগ’ আমবাগানের চাইতেও বেশি (৩০০ বছর বাদে প্রতিষ্ঠিত এবং গাছের সংখ্যা ১ লক্ষ)।

আরও পড়ুন: আম চাষ: ইতিহাস-বৃক্ষ ঘেঁটে

১৫৯০ সালের আগ্রাতে আমগাছ এবং ময়ূর দম্পতি সহ সচিত্র ‘বাবরনামা’র নামকরণ হয়, যেটি এখন ডাবলিনের চেস্টার বিটি লাইব্রেরিতে আছে। ছবিটিতে উজ্জ্বল সবুজ রঙের আমগাছ পাকা আম ভরে আছে এবং কাঠবিড়ালি ওই গাছের ডালে রয়েছেন। গাছের নীচে বিভিন্ন রকমের পাখি ও ময়ূর-ময়ূরী ধীরেসুস্থে ইতস্তত পায়চারি করছে।

মরক্কোর পর্যটক ইবন বতুতা (১৩২৫-৫৪ খ্রি.) আম সংক্রান্ত তথ্য দিয়েছেন। তিনি লিখছেন, “The shade which it gives is the densest of any, but it is oppressive and if one sleeps beneath it he becomes enervated”. আমগাছ প্রগাঢ়তম ছায়াদান করলেও সে ছায়া মানুষকে যেন গভীরভাবে আচ্ছন্ন করে। যদি কোনো ব্যক্তি আমগাছের ছায়ায় ঘুমিয়ে পড়েন, তিনি ক্রমেই স্নায়ুবিকভাবে আচ্ছন্ন হয়ে শক্তিহীন হয়ে পড়বেন। ইবন বতুতা আরো লিখছেন, বর্ষায় আম পাকলে ফল হলুদ হয় এবং দেশবাসী তা আপেলের মতোই খায়— ছুরিতে কেটে, কেউ কেবলই চুষে। আমের ফল মিষ্টি, তার মিষ্টত্বের মধ্যে সামান্য অম্লত্ব যেন মিশে আছে। আমের আচ্ছন্নকারী ছায়া সম্পর্কে ইবন বতুতার অনুভূতি প্রকাশের পাশাপাশি আমরা স্মরণ করতে পারি আমের ছায়াতলে ধ্যানমগ্ন বুদ্ধের প্রশান্তি রূপ।

আরও পড়ুন: জয়ী

বাবরনামা থেকে একটি আমের গাছের চিত্র

ভারতের আম বাবরকে ভারত আক্রমণে উৎসাহিত করেছিল। ‘বাবরনামা’য় আছে, দৌলত খান লোধির আমন্ত্রণে বাবর দিল্লির সুলতান ইব্রাহিম লোধির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে চললেন। এরই মধ্যে যুদ্ধের প্রাক্কালে একদিন সকালের প্রার্থনার পর তিনি যেন এক শুভলক্ষণ সূচক পূর্বাভাস পেলেন: আম পান আর সুফলা ভারতবর্ষ যেন তাঁর কাছে অতি মহান এক ঐশ্বরিক আশীর্বাদ রূপে উপস্থিত হয়েছে। হয়তো ইতিপূর্বেই দৌলতখান প্রেরিত মধু-রক্ষিত পাকা আমের সুস্বাদ তিনি পেয়েছেন। সুস্বাদু ফলের আস্বাদন ও প্রার্থনার সমন্বিত উপলব্ধি মিলেমিশেই যেন বাবরকে ভারতবর্ষ বিজয়ের প্রতি আকৃষ্ট করেছে।

১৫২৬ সালে সংঘটিত পানিপথের যুদ্ধের পূর্বেই হয়তো বাবর শুনেছিলেন ভারতের অসাধারণ এক ফল আমের সম্পর্কে নানান গুণকীর্তন। হিন্দুস্থানের সবচাইতে সুন্দর ফল আম তার বাগিচাকেও অতুলনীয় করে তোলে। কবি আমীর খসরুর লেখায় আম (ফার্সি ভাষায় ‘নাঘজাক’) প্রসঙ্গ রয়েছে, “Naghzak-i ma naghz-kun-ibustan/ Naghzatarin newa-i-Hindustan.” বাবর-নামায় উল্লেখ আছে, আমের ফল অতি উত্তম কিন্তু তার মাত্র কয়েকটি জাতই মাত্র অতুলনীয়। পরিপুষ্ট অবস্থায় কাঁচা থাকতে ফল চয়ন করা হয় এবং গৃহাভ্যন্তরে তা পাকানো হয়। কাঁচা আম এক অনন্য মশলা (condiment) হিসাবে ভারতবাসী ব্যবহার করে। এমনকী সিরাপ প্রস্তুত করেও সংরক্ষণ করা যায়। আম দু’ভাবে খাওয়া চলে— ফলের নীচে একটি ফুটো করে শাঁস মুচড়িয়ে তার রস চুষে আর ফলের খোসা ছাড়িয়ে। বাবর কোথাও ইবন বতুতার মতো ছুরি ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেননি। তাচাড়াও সম্রাট জাহাঙ্গির ইরানের ‘শাহ’কে স্বাগত জানিয়েছেন আম দিয়ে। এমনও দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (৩য় অংশ)

ইরানের সম্রাটকে আম দিয়ে স্বাগত জানিয়েছিলেন মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গির। মাটিতে রাখা রয়েছে আম।

আকবর কৃষিতে উৎসাহ দিয়েছিলেন বলে জানা যায়। তিনি ব্যাপকহারে আমগাছ রোপণে সমর্থন জুগিয়েছিলেন। তিনি বিহারের দ্বারভাঙায় লক্ষ আমগাছ সমন্বিত ‘লাখ বাগ’ রচনা করেন। এক আদেশনামায় গুজরাত প্রদেশে অসংখ্য আমগাছের সমন্বয়ে আম-বাগিচা তৈরির নির্দেশ দেন। সেজন্য বিহার ও বাংলা থেকে উচ্চ গুণমান সম্পন্ন আমের আঁটি পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। তাঁর অভিজাত রাজকর্মচারী মুবারক খান একটি বৃহৎ জলাশয়কে আশ্রিত করে একটি সুন্দর আম-বাগিচা রচনা করেন। জাহাঙ্গিরের শাসনকালে মুকারাব খান সারা ভারতবর্ষ খুঁজে চমৎকার সব ফলের গাছ সংগ্রহ করেন। বর্তমান উত্তরপ্রদেশের মুজফ্‌ফরনগরের কৈরানা বাগিচার আমের খ্যাতি দিল্লিতেও পৌঁছেছিল।

আরও পড়ুন: প্যানকেকগুলি

‘আইন-ই-আকবরি’-তে রয়েছে, বর্ণে-গন্ধে-স্বাদে এই ফল অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তুরান ও ইরানের পানাসক্তদের অনেকেই এই ফলটিকে গুণমানে ফুটি আর আঙুরের উপরে স্থান দিয়েছিলেন। লেখা হচ্ছে, ফলের আকার অনেকটা কুইনস্ কিংবা এপ্রিকট কিংবা ন্যাসপাতির কাছাকাছি। বড় হলে কখনো-বা তরমুজের মতো। এর ওজন কখনো এক সের ছাড়িয়ে যায়। আমের রং সবুজ, হলুদ, লাল কিংবা নানান বর্ণে ছোপানো; কখনো মিষ্টি, কখনো মৃদু আম্লিক। ছোট আমগাছ দেখতে ভারি সুন্দর। পূর্ণবয়স্ক গাছ আখরোট বা ওয়ালনাটের চেয়েও বিস্তৃত। এর পাতাগুলো উইলো গাছের পাতার মতো, তবে একটু বড়। শরৎকালে পুরনো পাতা ঝরে গিয়ে খানিক বর্ণময় নতুন পাতা গজায়— সবুজ, হলুদ, কমলা, পিচ-রঙা কিংবা উজ্জ্বল লাল। বসন্ত সমাগমে আম্র-মুকুল যেন খানিকটা দ্রাক্ষা-পুষ্পের মতই, তাতে পরম সুগন্ধি আর অনাঘ্রাত কৌতুহল। এর কাঁচা ফল অম্ল, আচার-চাটনি করে সংরক্ষণ করা যায়। পরিপূর্ণ অথচ কাঁচা অবস্থায় ফল নামানো হয়, তা পাকানোর জন্য নেওয়া হয় নির্দিষ্ট পদ্ধতি। এভাবে পাকালে গাছে পাকার চাইতেও তা হয়ে ওঠে অনবদ্য সুন্দর। গ্রীষ্মের মাড থেকে ফল পাকতে শুরু হয় আর বর্ষা পর্যন্ত চলে সেই ভোজনবিলাস। ‘ভাদিয়্যা’র মতো কিছু জাত পাকে শীতের শুরুতে। কিছু জাত অবশ্য বছর-ভর ফুল-ফল দেয়, কিন্তু সংখ্যায় তা নগণ্য। কিছু আম পাকলেও বাইরে থেকে বোঝা যায় না, কেন-না বাইরেটা সবুজই থাকে। আম পেকেছে বুঝতে পারলে গাছ থেকে জলদি পেড়ে নিতে হবে, অন্যথায় ফলের সুমিষ্টতায় পোকার জন্ম নেয়। ভারতের প্রায় সর্বত্র আম জন্মে; বিশেষত বাংলা, গুজরাত, মালওয়া, খান্দেশ এবং দাক্ষিণাত্যে। পঞ্জাবে আমগাছের স্বল্পতা চোখে পড়লেও ইদানীং চাষ বাড়ছে। ‘আইন-ই-আকবরি’-তে লেখা হয়েছে, “A young tree will bear fruit after four years. They put milk and treacle round about the tree, which makes the fruits sweeter. Some trees yield in one year a rich harvest, and less in the next one; others yield for one year no fruit at all. When many mangoes are eaten, digestion is assisted by drinking milk with the kernels of the mango stones. The kernels of old stones are subacid, and taste well; when two or three years old they are used as medicine. If a half-ripe mango, together with its stalk to a length of about two fingers, be taken from the tree, and the broken end of its stalk be closed with warm wax, and kept in butter, or honey, the fruit will retain its taste for two or three months, whilst the colour will remain even for a year.”

ক্রমশ…

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *