বাঁক বদলকারী সাহিত্যস্রষ্টা মানিক

রাহুল দাশগুপ্ত

‘মানুষের মধ্যে যতখানি মানুষের নাগালের বাইরে, প্রেম তারই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট’। লিখেছিলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। মানুষের সুস্থতা ও অপ্রকৃতিস্থতার যে সীমারেখাটি বারবার গুলিয়ে যায়, নিজেকে সুস্থ ভেবে মানুষ অপ্রকৃতিস্থের মতো আচরণ শুরু করে আর অপ্রকৃতিস্থতার ভেতরও আশ্চর্যভাবে সুস্থতার লক্ষণগুলিকে প্রকাশ করে চলে, মানিক সেই সীমারেখাটিকেই বারবার স্পর্শ করতে চেয়েছেন। সুস্থতা ও অপ্রকৃতিস্থতার ভেতর অদৃশ্য হয়ে থাকা এই অত্যন্ত স্পর্শকাতর, দুর্বোধ্য, গোলমেলে সীমান্তটিকে বুঝতে চাওয়াই ছিল তাঁর সারা জীবনের সাধনা। ফেদেরিকো ফেল্লিনির ‘অ্যামোরকরড’ সিনেমার সেই প্রসিদ্ধ উক্তি এ প্রসঙ্গে মনে পড়তে পারে, ‘সাম ডে’জ হি ইজ নর্মাল, সাম ডে’জ হি ইজ নট, জাস্ট লাইক অল অফ আস!’ মানিকের সমস্ত আখ্যান যেন এই উক্তির সমর্থনেই লেখা। প্রেমেন্দ্র মিত্র স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে লিখেছেন, ‘তাঁর রচনায় যেটুকু অসুস্থতার ছায়া তা আমাদেরই রুগ্নতার প্রতিবিম্ব। কোনো দিকেই মাঝারি হবার সৌভাগ্য নিয়ে তিনি আসেননি। চূড়াও যেমন তাঁর মেঘ-লোক ছাড়ানো, খাদও তেমনই অতল গভীর। তাই মানিয়ে নেবার মানুষ তিনি নন। মাঝারি মানুষের তৈরি জগতে পায়ে পায়ে হোঁচট খেয়ে দরজায় দরজায় মাথা ঠুকে নিরবোধ আত্মতৃপ্তির সঙ্গে অবিরাম যুঝে ক্ষতবিক্ষত হয়ে অকালে তাই তাঁকে বিদায় নিতে হয়।’

আরও পড়ুন: উনিশে মে, রক্তস্নাত মাতৃভাষা

১৯২৪ সালে মানিকের মায়ের অকালমৃত্যু হয়। তখন তাঁর বয়স ষোলো বছর। এই ঘটনা তাঁর জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। ‘জননী’ উপন্যাসে চিনে নেওয়া যায় সেই হারিয়ে যাওয়া মা-কে। জীবনে ঝুঁকি নিতে ভালোবাসতেন মানিক। নৌকার মাঝিমাল্লাদের সঙ্গে এখানে-ওখানে চলে যেতেন। বন্ধুদের সঙ্গে ভরা বরষার নদীতে বাইচ খেলতে যেতেন। কুস্তি শিখতেন। গাড়োয়ানদের সঙ্গে গল্প করতে ভালোবাসতেন। চমত্কার গান গাইতেন। বাঁশি বাজাতেন। আর ভালোবাসতেন বই পড়তে। লিখেছিলেন, ‘বই কেন ভালোবাসি? মানুষকে ভালোবাসি বলে। বইয়ের মধ্যে মানুষের সঙ্গ পাই’। খুব মন দিয়ে পড়েছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র এবং রবীন্দ্রনাথ, বিশেষ করে ‘বিষবৃক্ষ’ এবং ‘গোরা’। মানিক লিখেছেন, ‘একখানা বই পড়তাম আর তার ধাক্কা সামলাতে তিন-চারদিন মাঠে ঘাটে, নৌকায় নৌকায়, হাটবাজারে মেলায় ঘুরে তবে সামলে উঠতাম’।

আরও পড়ুন: দেবেশ রায়ের ‘মফস্বলি বৃত্তান্ত’

শরৎচন্দ্র ছিলেন তাঁর প্রিয় লেখক। স্কুলজীবনেই বেশ কয়েকবার ‘শ্রীকান্ত’ পড়ে ফেলেন। যৌন-অবদমিত এক সমাজের মুখোশ খুলে দিয়েছিলেন শরত্চন্দ্র। এই ব্যাপারটাই আকৃষ্ট করেছিল মানিককে। বিশেষ করে ‘চরিত্রহীন’ পাঠ করে তিনি অভিভূত আর বিচলিত বোধ করেছিলেন। লিখেছিলেন, ‘বোধহয় আট-দশবার বইখানা পড়েছিলাম তন্ন তন্ন করে। বাংলা সাহিত্যের কত দৃঢ়মূল সংস্কার আর গোঁড়ামি যে চুরমার হয়ে গিয়েছিল এই উপন্যাসে’। মানিকের জীবনের শ্রেষ্ঠ উপন্যাসগুলিতে তাই বারবার বিষয় হিসাবে এসেছে ‘যৌনতা’। তিনি লিখেছিলেন, ‘সমাজজীবন যৌনজীবনকে নিয়ন্ত্রিত করে। সমাজজীবন অসুস্থ হলে যৌনজীবনও অসুস্থ হতে বাধ্য। অসংখ্য গলদ-ভরা সমাজে মানুষ বঞ্চিত ও বিকৃত জীবনযাপন করে। দেহমনের পূরণতা বা স্বাস্থ্য সে কোথায় পাবে?’ এই বিকৃতির কথাই অন্যভাবে বলেছিলেন ফরাসি দার্শনিক প্যাসকেল, ‘মেন আর সো নেসেসারিলি ম্যাড, দ্যাট নট টু বি ম্যাড উড অ্যামাউন্ট টু অ্যানাদার ফরম অফ ম্যাডনেস’।

এর পাশাপাশি মানিক আঘাত করতে শুরু করেন ভদ্রজীবনকে। তিনি লেখেন, ‘ভদ্রজীবনের বিরোধ, ভণ্ডামি, হীনতা, স্বার্থপরতা, অবিচার, অনাচার, বিকারগ্রস্ততা, সংস্কারপ্রিয়তা, যান্ত্রিকতা ইত্যাদি তুচ্ছ হয়ে এ মিথ্যা কেন প্রশ্রয় পায় যে ভদ্রজীবন শুধু সুন্দর ও মহৎ? ভদ্রসমাজের বিকার ও কৃত্রিমতা থেকে মুক্ত চাষি-মজুর-মাঝি-মাল্লা-হাড়ি-বাগদিদের বিচিত্র, অবহেলিত জীবন নিয়ে তিনি লিখতে শুরু করেন, এই ‘বিরাট মানবতা’কে তুলে আনতে চান সাহিত্যের পৃষ্ঠায়। বেপরোয়া জেদের সঙ্গেই লেখক হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মানিক। বারবার নিজের লেখাকে কাটাকুটি করতে ভালোবাসতেন। তাঁকে দেখে অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত লিখেছেন, ‘প্রখর একটা ক্ষিপ্রতা তাঁর মুখে, যেন বুদ্ধির সন্দীপ্তি’। প্রথম উপন্যাস লেখার আগেই তিনি পড়ে ফেলেছিলেন, ফ্রয়েড এবং হ্যাভলক এলিস।

আরও পড়ুন: প্রতিহিংসাপরায়ণতা কি সুচতুর চাল!

‘দিবারাত্রির কাব্য’র ভূমিকাতেই মানিক লিখেছিলেন, ‘বইখানা খাপছাড়া, অস্বাভাবিক, রূপকের এ একটা নূতন রূপ, চরিত্রগুলি কেউ মানুষ নয়’। সারাজীবন ধরেই একের পর এক রূপক লিখে গেছেন মানিক। এই অসামান্য প্রেমের কাহিনির কেন্দ্রে রয়েছে শেকসপিয়র-শেলি-কিটস পড়া হেরম্ব, এক ‘সৃষ্টিছাড়া’ পুরুষ। যে নারী তাকে ভালোবাসে, তাকেই সইতে হয় অসহনীয় যন্ত্রণা। সুপ্রিয়ার অন্যত্র বিয়ে হয়ে যায়, যদিও তার স্বামী অশোককে সে কোনোদিনই ভালোবাসতে পারে না। উমা তাকে বিয়ে করেছিল, কিন্তু গলায় দড়ি দিয়ে শেষপর্যন্ত সে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়। দু’বছরের মা-মরা মেয়ের প্রতিও সম্পূর্ণ নিরাসক্ত হেরম্ব, প্রেমে পড়ে আঠারো বছরের আনন্দের। আনন্দ কিন্তু জানে, প্রেম ক্ষণস্থায়ী। হেরম্বকে যেদিন সে পাবে সেদিনই তার প্রেমকে সে হারাতে শুরু করবে। এই একই বিষয় নিয়ে লেখা অঁদ্রে জিদের বিরল প্রেমের আখ্যান ‘স্ট্রেইট ইজ দ্য গেট’-এ প্রসঙ্গে মনে পড়তে পারে। মা-বাবার প্রেমের ট্র্যাজেডিকে চোখের সামনে দেখেছে আনন্দ, দেখেছে সুপ্রিয়ার জীবনের করুণ পরিণতিকেও। যে জীবনে প্রেম নেই, সেই জীবন সইতে পারবে না আনন্দ। তাই নাচতে নাচতে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে আগুনে ঝাঁপ দেয় সে। এভাবেই হেরম্বের মধ্যে সে রেখে যায় প্রেম ও কামনা তৃপ্ত না হওয়ার অনিঃশেষ জ্বালা।

আরও পড়ুন: মৃণাল সেনের ‘ইন্টারভিউ’: মধ্যবিত্তের সংকট

রোলাঁ বার্তের অনেক আগেই ‘চতুষ্কোণ’ উপন্যাসে মানিক লিখে গিয়েছিলেন, ‘শব্দের মানে তারাই ঠিক করে, যে বলে আর যে শোনে’। তাঁর প্রতিটি উপন্যাসই যেন এর প্রমাণ। ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত মানিক যেন ভূতগ্রস্তের মতোই লিখে গেছেন। ১৯৩৬ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর দু’টি অমর সৃষ্টি, ‘পদ্মানদীর মাঝি’ এবং ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’। পরিবারের সঙ্গে বিচ্ছেদের ফলে এ সময়ে মানিকের খুবই অর্থাভাব ছিল। শুধু মুড়ি খেয়েও কখনো কাটাতে হয়েছে। আলাদা কোনো ঘর বা লেখার নিজস্ব চেয়ার-টেবিল ছিল না। তবু কঠোর তপস্যা তিনি চালিয়ে গেছেন। গভীরভাবে পড়াশোনা করেছিলেন মনস্তত্ত্ব ও যৌনবিজ্ঞান নিয়ে। নিজের স্বাস্থ্যকে দিনের পর দিন অবহেলা করার ফলে ১৯৩৫ সালেই তিনি প্রথম মৃগীরোগে আক্রান্ত হন। অত্যাধিক শারীরিক-মানসিক পরিশ্রম এবং অতিরিক্ত উত্তেজনাই ছিল এর কারণ। তবু এই অবস্থায় তাঁকে লিখে যেতে হয়েছে, কারণ, ‘আজ এখন ওষুধ খেয়ে ঘুমোলে কাল হাঁড়ি চড়বে না’। ‘অতসীমামী’ ছাপা হতেই, তাঁর নিজেরই ভাষায়, ‘সব ওলোট পালট হয়ে গেল। সব ছেড়ে দিয়ে আরম্ভ করলাম লেখা’।

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (১ম অংশ)

‘পদ্মানদীর মাঝি’র ফ্রেমটা আঞ্চলিক উপন্যাসের, কিন্তু আসলে এটি একটি অস্তিত্ববাদী উপন্যাস। কাহিনির গোড়াতেই কুবের খবর পায় তার একটি পুত্রসন্তান হয়েছে, কিন্তু আলব্যের কাম্যুর ‘দি আউটসাইডার’-এর নায়কের মতোই কুবের পুরোপুরি নিরাসক্ত বোধ করে আর ঝাঁঝিয়ে উঠে বলে, ‘পোলা দিয়া করুম কী, নিজগোর খাওন জোটে না, পোলা!’ পঙ্গু স্ত্রী মালা, বৃদ্ধা পিসি আর বড় মেয়ে গোপি ও দুই ছেলে লখা-চণ্ডীকে নিয়ে যে সংসার, কুবের তার প্রতি কোনও আসক্তি বোধ করে না, আকূষ্ট হয় মালার ছোট বোন কপিলার প্রতি। বিবাহিত এই দুই নারী-পুরুষ পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট হয়, আর সেই আকর্ষণ নানা রকমের ছলনার মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ করে। আপস না করে তারা খুঁজে নিতে চায় বিকল্প পথ, যে পথে গেলে তারা তাদের প্রেম ও যৌনতার স্বাধীনতাকে চরিতার্থ করতে পারবে। এই বিকল্প পথেরই সন্ধান নিয়ে আসে রহস্যময় হোসেন মিয়া, গড়ে তুলতে চায় ‘ময়নাদ্বীপ’ নামে এক নতুন উপনিবেশ, রাষ্ট্র-সমাজের অনুশাসন যেখানে খাটে না, শ্রেণি-ধরম নিরবিশেষে সব মানুষকেই সমান চোখে দেখা হয়।

আরও পড়ুন: মরণোত্তর দেহদান আন্দোলনের প্রাণ ব্রজ রায়

‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ উপন্যাসে শশী যেন হয়ে ওঠে ঔপনিবেশিক নিষ্ক্রিয়তার প্রতীক। চিকিত্সক হয়েও একটি মৃতদেহ নিয়ে সে গ্রামে ঢোকে এবং ক্রমে সেই মৃতদেহের জড়তাই যেন গ্রাস করতে থাকে তার গোটা অস্তিত্বকে। তার বিলেত যাওয়ার ও কলকাতায় চিকিত্সক হিসাবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার স্বপ্ন, সর্বোপরি বিবাহিত কুসুমের প্রতি অবদমিত প্রেম ও যৌনতা, কোনোকিছুই সফল হয় না। বাবার অর্থ ছিল, গ্রামের বন্ধনে জোর ছিল না, তবু শশী চিরকালের মতো গ্রামেই থেকে যায়। অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যায় কুসুম, শশীর সমস্ত বড় বড় স্বপ্ন আর কল্পনা ঝলসে যায় খালের ধারে বাজ-পড়া গাছটার মতো। অদ্ভুত সব ‘এনিগমা’ তৈরি হতে থাকে এই আখ্যানে, যা তুলে ধরতে থাকে জীবনের গূঢ় সত্যগুলিকে। যাদব চেয়েছিল লোকের চোখে মহাপুরুষ হয়ে উঠতে, তাই স্বেচ্ছামৃত্যুর কিংবদন্তি ছড়িয়ে দেয় সে। আত্মহত্যা করে সে মিথ হয়ে যায়, একটি মিথ্যা লোকের চোখে প্রতিষ্ঠা পায় সত্য হিসাবে, আর এইভাবে মহত্বের লোভে একজন মানুষ নিজেই নিজেকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়, মৃত্যুর বিনিময়ে অর্জন করে নিতে চায় মহৎ হওয়ার গৌরব।

আরও পড়ুন: ‘চোখের বালি’ই বাংলা সাহিত্যে ঘটিয়েছিল যুগান্তকারী ঘটনা

‘যৌনতা’ দিয়ে সামাজিক আচরণকে বুঝে নেওয়ার এই প্রক্রিয়া চলতে থাকে তাঁর পরবর্তী দু’টি মহৎ সৃষ্টিতেও। ‘চতুষ্কোণ’ উপন্যাসে রাজকুমার একজন ‘চিন্তাগ্রস্ত নিউরোটিক’, যৌনতা নিয়ে সমাজের কোনো ভণ্ডামি ও অনুশাসনকে সে মানতে রাজি নয়। সে নিজে নিরাসক্ত হলেও নারী-হৃদয়ে অনায়াসে কামনা জাগাতে পারে, প্রতিক্রিয়া করতে তাদের বাধ্য করে। মালতী তাকে প্রথমে প্রশ্রয় দেয়, পরে ভয় পেয়ে তাকে এড়িয়ে চলতে শুরু করে। রিনিকে সে নগ্ন অবস্থায় দেখতে চায়, কিন্তু প্রকৃতস্থ রিনি তাকে প্রত্যাখ্যান করে। পরে রিনি উন্মাদ হয়ে যায়, সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়ে, বিকারগ্রস্ত অবস্থায় সে টের পায়, মানুষ হিসাবে রাজকুমার আসলে কতটা খাঁটি, যৌনতা নিয়ে কোনও ভণ্ডামিতে যে বিশ্বাস করে না এবং নিজের অবচেতনকে কোনো আড়াল না রেখে প্রকাশ করতে পারে! অনায়াসে নগ্ন হয়ে সে রাজকুমারের খোঁজ করতে থাকে এবং এই বিপন্ন মেয়েটির প্রতি রাজকুমার বোধ করে করুণা ও সমবেদনা! একমাত্র সরসীই স্বেচ্ছায় নগ্ন হয়ে তাকে দেখিয়ে দেয়, নারী শরীর দেখতে কেমন হয়! রাজকুমার এই মেয়েটির প্রতি কোনও কামনা বোধ করে না, বরং সে মেয়েটিকে প্রণাম করতে চায়। মানিক দেখাতে চেয়েছেন, নারী শরীরের প্রতি পুরুষের আকর্ষণ স্বাভাবিক। কোনো পুরুষ এই স্বাভাবিক ইচ্ছাকে নিরাসক্তভাবে, শুধু জ্ঞানারজনের জন্যও প্রকাশ করলে এক একজন নারী এক একভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়। এই প্রতিক্রিয়াগুলি নির্ভর করে তাদের বেড়ে ও গড়ে ওঠার ওপরে। এই প্রতিক্রিয়াগুলিই বুঝিয়ে দেয়, একটা স্বাভাবিক ব্যাপার সমাজের চাপে কীভাবে বিকূত ও অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে। নিজেকে বাঁচাতে সমাজ একটি অকপট মানুষকে বিকৃতমনস্ক বলে প্রতিপন্ন করতে চায়!

আরও পড়ুন: রবীন্দ্রনাথ ও শিক্ষা

‘অহিংসা’ উপন্যাসে ধর্ম নিয়ে সদানন্দের কোনও মাথাব্যথা নেই, তাই সাধু হিসেবে নিজের ভাবমূর্তি নিষ্ঠার সঙ্গে গড়ে তুললেও মাঝেমাঝেই তার নানা দুর্বলতা ও পাগলামি প্রকাশ পেয়ে যায়, যা আসলে, ‘শক্তির প্রতিক্রিয়া’ এবং ‘অতিরিক্ত জ্ঞানের অভিব্যক্তি’। সদানন্দের এই প্রচণ্ড জীবনীশক্তি ও জ্ঞানই মাধবীলতার প্রতি এক অদম্য যৌনতার জন্ম দেয় তার মনে, আর মাধবীলতা নিজেকে নানা ছলনায় ভুলিয়ে রাখতে চাইলেও ভেতরে ভেতরে সেই যৌনতার অমোঘ আকরষণকেই বহন করে চলে। মাধবীলতার মধ্য দিয়ে একটি নারীর অন্তঃকরণকে অসাধারণ দক্ষতায় ফুটিয়ে তুলেছেন মানিক। এই মেয়েটি প্রথমে সদানন্দকে সমীহ করত, তারপর প্রশ্রয় দিত, পরে সদানন্দের শক্তি ও দুর্বলতা একইসঙ্গে টের পেয়ে সে তাকে তাচ্ছিল্য করতে শুরু করে। সদানন্দ তাকে অধিকার করতে চাইলে মাধবীলতা তাকে এড়িয়ে যেতে শুরু করে, অন্য পুরুষকে বিয়ে করে, এমনকী সদানন্দের বিরোধিতা পর্যন্ত করে। স্বামীর মৃত্যুর পর সে অনুভব করে, আসলে সে ভেতরে ভেতরে চিরকাল সদানন্দকেই চেয়ে এসেছে। সদানন্দই পরোক্ষে তার স্বামীর হত্যাকারী জেনেও তার কাছেই শেষপর্যন্ত সে আত্মসমরপণ করে। আর রয়েছে মহেশ চৌধুরীর মতো এক খাঁটি হৃদয়ের মানুষ, সদানন্দের প্রতি ভক্তিতে যেমন সে খাঁটি, তেমনই পরে তাকে চিনে নেওয়ার ব্যাপারেও সে অভ্রান্ত। দস্তয়েভস্কির মতোই অতিরঞ্জন ও অতিনাটকীয়তার মধ্য দিয়েই মানিকের মানুষের সত্তার একদম শাঁসটিকে বুঝে নেওয়ার তীব্র অন্তর্ভেদী ও অতলস্পর্শী ক্ষমতা টের পাওয়া যায়।

আরও পড়ুন: সুখের সন্ধানে

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছিল অনমনীয় আত্মমর্যাদাবোধ। তিনি লিখেছিলেন, ‘আমি এ জগতে কারো স্তাবক নই। সংসারে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্তাবকতার কমবেশি ভেজাল থাকাটাই সাধারণ নিয়ম। আমার শ্রদ্ধা তাই অনেক শ্রদ্ধেয় ব্যক্তির কাছে সুমিষ্ট লাগে না’। ভয়ানক দারিদ্র্যের মধ্যেও এই আত্মমর্যাদাবোধ তিনি বজায় রেখেছিলেন। একবার চাকরির আবেদন করেও তিনি আবেদনপত্র প্রত্যাহার করে নেন, কারণ জানতে পারেন, অন্য একজনের সেই চাকরির প্রয়োজন ছিল আরও বেশি। অর্থের অভাবে তখন নিজের চিকিত্সা পর্যন্ত ঠিকমতো করতে পারছেন না তিনি। বিয়ে করেছেন, আর তার কিছুদিনের মধ্যেই চাকরিতে ইস্তফা দিয়েছেন। কর্মক্ষেত্রের অন্যায় ও বৈষম্যকে সহ্য করতে পারেননি। তিনি বেহিসেবির মতো বাজার করতেন এবং লোকজনকে খাওয়াতে ভালোবাসতেন। একবার একটি ছাপাখানা ও প্রকাশনা সংস্থা চালাতে শুরু করেন। কিন্তু এই চেষ্টাও ব্যর্থ হয়। প্রকাশনা সংস্থাটি উঠে যাবার পর একমাত্র লেখার ওপরই তাঁর জীবিকা নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ১৯৪৩ সালের গোড়ায় তিনি ‘ফ্যাসিস্ট বিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘ’-এ যোগ দেন। সংঘের বুধবারের বৈঠকগুলিতে যখন তিনি গল্পপাঠ করতেন, চিন্মোহন সেহানবীশের ভাষায়, ‘সে সব দিনে শ্রোতাদের ভিড় আমাদের অফিস ছাপিয়ে সিঁড়ি অবধি পৌঁছত’।

আরও পড়ুন: ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিত ও বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা

দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছিলেন, ‘মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ক্লাসিক। তাই সাধারণ পাঠক তাঁর বই পড়ে না। ভদ্রলোকের শেষ জীবন অর্থকষ্ট আর অসুখে দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। বিনা চিকিত্সায় তিনি মারা যান’। সাধারণ মানুষের সঙ্গে তিনি মিশতে ভালোবাসতেন। ছাত্রদের সঙ্গে রাস্তায় বসে গল্প করতেন। ১৯৪৬ সালে সৈন্যরা একবার তাঁকে ধরে এনে রাস্তা সাফ করানোর চেষ্টা করে। তিনি প্রতিবাদ করলে তাঁকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়। পৈতৃক বাড়ি বিক্রির পর মানিক যে আট হাজার টাকা পেয়েছিলেন, তার পুরোটাই পার্টির দুঃসময়ে দান করে দিয়েছিলেন, অথচ তাঁর নিজেরই ওই টাকার প্রয়োজন ছিল। তাঁর শেষজীবন কাটে ভাড়াবাড়িতে। সেখানে মৃত সন্তান প্রসব করে তাঁর স্ত্রীর অসুস্থতা, তাঁর আশ্রয়ে থাকা বৃদ্ধ পিতার নানা দায়দায়িত্ব ক্রমেই তাঁর উদ্বেগকে বাড়িয়ে তোলে। পিতার সময় থেকে নিজেদের পারিবারিক কাহিনি নিয়ে একটি উপন্যাস লিখতে চেয়েছিলেন, যা শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠেনি। নানা সরকারি আমন্ত্রণ, এমনকী চাকরির প্রস্তাব তিনি সেইসময় প্রত্যাখ্যান করেন। নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাসকে কোনো সরকারি সুযোগ-সুবিধার জন্য বর্জন করা বা লুকিয়ে রাখা তাঁর প্রকৃতিবিরুদ্ধ ছিল।

আরও পড়ুন: প্রসঙ্গ: সত্যজিৎ রায়ের দু’টি সিনেমা

অথচ টাকার চিন্তায় বারবার অস্থির হয়ে উঠেছেন তিনি, চূড়ান্ত অসুস্থতার মধ্যেও সেই চিন্তা থেকে রেহাই পাননি। তিনি জানতেন, একদিন কাজ করতে না পারলে তাঁর সংসার চলবে না। প্রকাশকদের দরজায় দরজায় ঘুরেছেন, তবু পাওনা টাকাও আদায় করতে পারেননি। এই টাকা জোগাড় করতে গিয়ে বহু সময় ও শক্তি তাঁর নষ্ট হয়েছে। ন্যায্য টাকা নিয়ম মেনে, সঠিক সময়ে পেলে হয়তো এতটা আর্থিক দুর্ভাবনায় তাঁকে পড়তে হত না। লংক্লথের পাঞ্জাবি, ধুতি আর চটি, এই ছিল তাঁর পোশাক। বাড়িতে লুঙ্গি আর খড়ম পরতেন। সস্তা একজোড়া টেবিল-চেয়ারে বসে লিখতেন। সেই টেবিল ভরা থাকত বইপত্রে, পাণ্ডুলিপির এলোমেলো পাতায়। বইয়ের পাশাপাশি ছিল বিস্তর ছেঁড়াখোঁড়া পুরেনো মাসিকপত্র। ১৯৫৫ সালের ২০ আগস্ট মানিককে লুম্বিনী মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে সঞ্জয় ভট্টাচার্যকে দেখে তাঁর মনে হয়েছিল, ‘কী বিশ্রী চেহারা। একেবারে উন্মাদ হয়ে গেছে।’ ফিরে আসার পরও মাঝেমাঝেই অসুস্থ হয়েছেন। মৃত্যুর আগে যখন তিনি প্রায় সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন, তখনও তাঁর ডানহাতটি বারবার শূন্যে সঞ্চালিত হয়েছে লেখার চেষ্টায়। মানিক লিখেছিলেন, ‘দুঃখকে ভয় করো না। দুঃখ মানুষের দুর্লভতম সম্পদ!’ নিজের গোটা জীবন দিয়ে এ-কথারই যেন প্রমাণ দিয়ে গিয়েছিলেন তিনি।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *