আমি না গেলে মান্নাবাবু গান গাইবেন না, বলেছিলেন প্রবাদপ্রতিম তবলাবাদক রাধাকান্ত নন্দী

গৌতম দে

আপামর বাঙালির প্রিয় গায়ক মান্না দে-র আজ জন্মদিন। ছায়াছবি এবং আধুনিক বাংলা গানে নিঃসন্দেহে তাঁকে সম্রাট বলা যেতে পারে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় নামের পাশাপাশি তাঁর নামও চলে আসবে বাঙালির দুই ঠোঁটে। হেমন্ত-মান্না সুপার জুটি। তাঁদের কণ্ঠে গান। থাকবেই থাকবে ছায়াছবিতে। আর ছিল পুজোয় আধুনিক বাংলা গানের জন্য অপেক্ষা।

এটা ঠিক মান্না দে-র কণ্ঠে আধুনিক বাংলা গান অন্যমাত্রা পেয়েছিল। এমনকী হিন্দি ছবির গানেও। এখনও অনেক গান মানুষ কোনও না কোনও সময় গুনগুন করে গেয়ে ওঠেন অজান্তেই। আজও সুললিত আনন্দ মূর্ছনা জুগিয়ে চলেছে বাংলা এবং হিন্দি গান আপামর জনতাকে।

আক্ষরিক অর্থে সেই ষাট এবং সত্তর দশক ছিল স্বর্ণযুগ। কী সাহিত্যে, কী ছায়াছবিতে, কী গানে কিংবা কী গানের কথায়, কী সুরে…। এককথায় অনবদ্য ছিল ওই দুই দশক।

আরও পড়ুন: আমাদের প্রতিটা দিনই মে দিবস

সেইসঙ্গে বাংলা গানের প্রসঙ্গ আসলেই অনায়াসে চলে আসবে গানের দুই অবিস্মরণীয় কথাকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার ও পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম। চলে আসবে সেইসময়কার নামিদামি বহু সুরকারের নামও। যাঁরা বাংলা এবং হিন্দি গানকে সমৃদ্ধ করেছিলেন। সে প্রসঙ্গে যাচ্ছি না।

আধুনিক বাংলা গানে মান্না দে-র অধিকাংশ গানের কথাকার ছিলেন পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়। যাঁকে আমরা মনে রেখেছি মান্না দে-র গানের সঙ্গে। ‘সে আমার ছোট বোন’ কিংবা ‘কফিহাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই’ এই গানের সঙ্গে তাঁর নামটিও অনায়াসে চলে আসে। সেই কালজয়ী গানের উপস্থাপনা আজও আমাদের মনে দোলা দেয়। আমরা নস্টালজিক হয়ে পড়ি। স্মৃতি রোমন্থন করি।

এই স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে আমার যৌবনের দু’একটা স্মৃতির কথা এখানে সহজেই বলা যেতে পারে। লোভ সামলাতে পারছি না।

আমার বেড়ে ওঠা ছিল টালিগঞ্জের হরিদেবপুর সোদপুর বেহালা কুঁদঘাট অঞ্চলে। তখন আশপাশে অনেক বড় বড় মাঠ, পুকুর, বন্ধ কলকারখানার মাঠ, জলাজমি, ধানিজমি কবরখানা ছিল প্রচুর। জেমস লং সরণির দুই পাশ ছিল শহরের বর্জ্য ফেলার মাঠ। এখনকার মতো অ্যাতো জনবসতি ছিল না তখন। প্রহরে প্রহরে শেয়ালের ডাকে শরীরে কাঁপন ধরাত। আদিগঙ্গাকে মেরে দিয়ে যে মেট্রোরেল এখন ছুটছে, সেই গঙ্গায় জোয়ারের জলে ভেসে উঠত দুই পাড়। অবশ্য ক্ষণিকের জন্য। এঁটেল মাটি, খড়বিচলি আর টালি নিয়ে নৌকা যাতায়াত করত।

এও যেমন দেখেছি, তেমনই সেই সময় বিভিন্ন পাড়ায় পাড়ায় শীতকালে মাঠের ঘেরাটোপে ফাংশন হত। হত উনিশ পয়সার টিকিটে হিন্দি কিংবা বাংলা সিনেমা। মাইকিং হত পাড়ায় পাড়ায়। নামি শিল্পীর ফাংশনের টিকিট বিক্রি হত। হইহই করে বন্ধুদের সঙ্গে দল বেঁধে যেতাম সেসব ফাংশনে।

আরও পড়ুন: সুকুমার রায়ের ‘আবোল তাবোল’: সুখপাঠ্যের অন্তরালে

রাধাকান্ত নন্দী

পুরনো দিনের কত নামিদামি গায়ক-গায়িকাদের নাম মনে পড়ছে এই মুহূর্তে। তাঁরা আজ আর কেউ নেই ইহজগতে। শুধু তাঁদের সৃষ্টিতে আজও আমরা উদ্বেলিত হয়ে উঠি।

তো যা বলছিলাম, সেই কুঁদঘাটে আদিগঙ্গার ধারে এক বিরাট মাঠ ছিল। নিয়মিত ফুটবল-ক্রিকেট খেলা হত সেই মাঠে। এখন সেখানে ব্যাঙ্কারদের প্লট হয়ে গিয়ে সম্ভ্রান্ত এলাকা হয়েছে। সেই মাঠের ঘেরাটোপে টিকিট কেটে একবার বিরাট ফাংশন হয়েছিল। প্রধান উদ্যোক্তা ছিল এলাকার ক্লাব। আর স্টার গায়ক ছিলেন স্বয়ং মান্না দে।

আমাদের বন্ধুবান্ধবদের কারোর কাছে টিকিট ছিল না। ঠিকমতো তিনবেলা খাওয়া জোটে না তো টিকিট! আমরা মাঠের ঘেরাটোপের বাইরে ঘুরঘুর করতাম। আর করগেটেড টিনের ফাঁকফোকরে চোখ রাখতাম। কখনওবা চেনা পরিচিত দাদাদের খোঁজ করতাম। দাঁড়িয়ে থাকতাম গেটের কাছে। দেখতাম লাইন দিয়ে অনেকেই টিকিট হাতে ঢুকছে। ফাংশন অনেক আগেই শুরু হয়ে গেছে। অখিলবন্ধু ঘোষ গাইছেন ‘ও দয়াল বিচার করো’। আহা! সারা মাঠ হাততালি দিয়ে উঠত। এর আগেও ওনার গান শুনেছি অনেকবার। চোখের সামনে ভেসে উঠল ওনার মুখ। বাঁ-চোখে ছোট করে গাইছেন। চোখে পিচুটি। প্রতিটি গানের শেষে উনি রুমাল দিয়ে চোখ মুছছেন।

মাঠে তিলধারণের জায়গা নেই। বাইরে অসম্ভব ভিড়। মাইকে অ্যানাউন্স করা হচ্ছে। এবারের শেষ শিল্পী, যার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন, গাইবেন আপনাদের সবার প্রিয় গায়ক মান্না দে। আরেক প্রস্থ হাততালিতে আকাশ বাতাস কেঁপে উঠল। মাইকে তখন ঘোষণা হচ্ছে রাধাকান্ত নন্দী মহাশয়, আপনি যেখানে থাকুন শিগ্‌গির স্টেজে চলে আসুন। মান্না দে আপনাকে খুঁজছেন…।

গেটের সামনে দাঁড়িয়ে তখন মান্না দে-র প্রিয় তবলাবাদক রাধাকান্ত নন্দী। গেটে দাঁড়িয়ে থাকা টিকিট চেকার দাদাটি আমার মতো রাধাকান্ত নন্দীকে চেনেন না। আবারও মাইকে ঘোষণা। বারবার হতে লাগল। হাতে বড় সাইজের পানের কৌটো নিয়ে রাধাকান্ত নন্দী তখন বলছেন, ‘আমি না গেলে মান্নাবাবু গান গাইবেন না।’

আপনি তাহলে বিখ্যাত রাধাকান্ত নন্দী!

রাধাকান্ত নন্দী হাসতে হাসতে বললেন, ‘জানি না।’

আরও পড়ুন: গতকাল যেভাবে এইসব লিখেছিলাম

তারপর একসময় শ্রোতার চাপে খুলে দেওয়া হল মাঠের ঘেরাটোপ। আমরা হইহই করে মাঠের ভিতর ঢুকলাম। একে তাকে টপকে একেবারে স্টেজের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করতে লাগলাম। মান্না দে তখন গাইছেন ‘কাহারবা নয় দাদরা বাজাও/ উল্টোপাল্টা মারছ চাঁটি/ শশীকান্ত, তুমিই দেখছি আসরটাকে করবে মাটি…।’

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *