মনবীর সিং: একটি ট্যুইট, দু’টি গোল এবং ক’টি প্রশ্ন

শুভ্রাংশু রায়

মনবীর সকালে ট্যুইট করলেন, ‘নো ফার্মার্স, নো ফুড’। সন্ধ্যায় দু’টো গোল। সোশ্যাল মিডিয়ায় চর্চার চরমে। পরের দিনের কাগজে হেডলাইনে। তবু মনবীর কি শচীন হতে পারবেন? মনে হয় আরও বড় প্রশ্ন এটাই হওয়া উচিত, আদৌ মনবীর কি শচীনকে ফলো করতে চান?

আরও পড়ুন: কৃষকদের পাশে এটিকে মোহনবাগানের মানবীর সিং

আসলে মনবীর দেখালেন কলিজার জোর থাকা দরকার। শচীনের মতো অনেক ক্রিকেটারই অবসরপ্রাপ্ত, তবু নানাভাবে আইপিএলের সঙ্গে যুক্ত। মনবীর আইএসএলের নিয়মিত খেলোয়াড়। ভাইরাল হওয়া ভিডিয়ো ক্লিপিংয়ের মাধ্যমে দুনিয়া জেনে গিয়েছে বাংলা টিভি চ্যালেনের সেলেব ঘোষিকার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কিঞ্চিৎ অবাধ্য অধ্যাপকের মুখের ওপর ছুড়ে দেওয়া চেতাবনি মার্কা উক্তি― ‘‘আম্বানির চ্যালেনে বসে আপনি বারবার এইভাবে আম্বানির নাম গ্রহণ করতে পারেন না।’’ এই ঘোষিকার, থুড়ি সাংবাদিকের এই উক্তি যদি সাধারণ নিয়ম হয়ে থাকে (বিষয়টি নিয়ে খুব বেশি প্রতিবাদ বা সমালোচনামূলক পোস্ট বা লেখা চোখে পড়েনি। সেই কারণে মনে হয় একটা বড় অংশ মনে হয় এটাই মেনে নিয়েছেন।) তাহলে তো মনবীর মহা অপরাধ অথবা প্রবল দুঃসাহসের পরিচয় দিয়েছেন। আম্বানির লিগে খেলতে খেলতে কৃষক আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন।

কে ঠিক বা কার স্ট্যান্ড ঠিক তা আগামী আগত সময় বলবে। কিন্তু প্রশ্ন দু’টি করতেই হয়। প্রথমত, কৃষকদের আন্দোলন কি কেবলমাত্র পঞ্জাব হরিয়ানার কৃষকদের স্বার্থ রক্ষা করতে? যদি এই প্রশ্নটির উত্তর নেতিবাচক হয়, তাহলে বাংলার যে অসংখ্য প্রাক্তন ক্রীড়াবিদ আছেন যাঁদের ধর্মঘট ভূমিকম্প আমফান আরও কত কি বিষয়ে হামেশাই চ্যানেলগুলিতে মত ব্যক্ত করতে দেখা যায়। তাঁরা এখন কোথায়? পুরো প্রজাতিটি কি কর্পূরের মতো গায়েব হয়ে গেলেন?

পেশাদার হিসেবে যে ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড়ের চুক্তি রয়েছে, তাঁদের কিছু বিধিনিষেধ মেনে চলতে খেলোয়াড়টি বাধ্য। কিন্তু পেশাদার চুক্তি মান্য করার দায় কি একা খেলোয়াড়ের? চুক্তি তো খেলোয়াড় সত্তার সঙ্গে। তার বাইরে প্রশ্নাতীত আনুগত্য দাবি করা কি যুক্তি সংগত? তাছাড়া আরেকটি বড় প্রশ্ন আছে। দেশের নাগরিক হিসেবে সম্পূর্ণ দায় কি পেশাদারিত্বের অজুহাতে এড়িয়ে যাওয়া যায়? নাহ আপনাকে কৃষি আইনের বিরোধিতা করতেই হবে, এমন কোনও দায় নেই। শচীন সরাসরি কৃষি আইনের সমর্থন করেননি। তিনি আরও কিছু তারকার মতো ট্যুইট করে যে কথাগুলো বলেছেন, তার মর্মার্থ হল― যে ইস্যুটি একান্তই ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। আপনার শচীনদের এই মত ভালো নাও লাগতেই পারে। আপনি তাঁদের সমালোচনা করতেই পারেন। কিন্তু শচীন অ্যান্ড কোম্পানি তবু কিছু মতামত জানিয়েছেন। আবার মনবীর তাঁর মতো করে কৃষক আন্দোলন নিয়ে ‘বেডর’ হয়ে ট্যুইট করেছেন। তবে প্রায় সর্ব ব্যাপারে যেসব ময়দানি প্রাক্তনীরা মত দেন, তাঁরা যখন নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকেন কোথাও যেন সুবিধাবাদের লকলকে জিভটা বাইরে বেরিয়ে পড়ে।

সময় বিশেষে সুবিধাবাদী অবস্থান নেওয়াটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার হয়তো একটি অনাকাঙ্ক্ষিত অঙ্গ। হয়তো ঠিক সকলের পক্ষে মহম্মদ আলি হওয়া সম্ভব নয়। বা কেউ হয়তো ববি ফিশার নয়। রাষ্ট্রশক্তির রক্তচক্ষুকে সামলানো সবার কম্ম নয় (প্লিজ ইস্যুটাকে কোনও পার্টির কর্মসূচি ভেবে গুলিয়ে ফেলবেন না)। কিন্তু পরিষ্কার অবস্থান নেওয়ায় সমস্যাটি কোথায়? কিন্তু ওই যে, বললাম পাশ কাটিয়ে যাওয়ার প্রবণতা এক শেষ এবং মৌলিক প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয় সেক্ষেত্রে মানবিকতার কী হবে? সুবিধাবাদের সামনে আমরা কি সেটিকে বিসর্জন দেব? গায়ক কবির গানের লাইন ধরে বলতে হয়, ‘প্রশ্নগুলো সহজ আর উত্তরও তো জানা।’ এই জানা উত্তরই আমাদের মনে হয় খুঁজে দেখা দরকার। বহু রক্ত, আত্মত্যাগ করে যে মানুষগুলি আমাদের স্বাধীন দেশ উপহার দিয়েছেন, তাঁদের এই গৌরবময় ইতিহাস আমাদের থেকে এই উত্তর খোঁজার প্রয়াসটি আশা করে।

লেখক সোনারপুর মহাবিদ্যালয়ের ইতিহাসের অ্যাসিসট্যান্ট প্রফেসর

এই সংক্রান্ত আরও খবর:

Facebook Twitter Email Whatsapp

4 comments

  • আবু নাসিম

    সত্যি বলতে কি খুব জন ক্রীড়াবিদ আছেন যারা মনবীর এর মত সত্যি কথা সাহসের সঙ্গে বলতে পারেন। আশাকরি খুব শীঘ্রই খেলোয়াডরাও এই আন্দোলন কে হ্রাদিক সমর্থন জানাবেন।

  • Debashis Majumder

    Darun. Byatikromi drishtanto.

  • Malyaban Chattopadhyay

    প্রাসঙ্গিক আলোকপাত

  • Debraj Howlader

    মানবী যেমন ব্যতিক্রমী। তেমনি ব্যতিক্রমী গবেষক শুভ্রাংশু রায় এর মানবীকে দেখার এই দৃষ্টিভঙ্গি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *