বিপণন ও পোকেমন: কার্ড ও গেমিং

অনিন্দ্য বর্মন

ভারতের সঙ্গে অন্যান্য দেশের সবথেকে বড় তফাত হল প্ল্যানিং (পরিকল্পনা) এবং মার্কেটিং (বিপণন)। বিদেশে যখন একটি প্রোডাক্ট লঞ্চ করা হয়, তখন এমনভাবেই প্ল্যানিং করা হয় যাতে সেই প্রোডাক্টটি অন্তত বেশ কিছু বছর বাজারে চালানো যেতে পারে। শুনতে অবাক লাগলেও জাপান এবং অন্যান্য দেশে পোকেমন অথবা যেকোনও কার্টুন শো-ই একটি প্রোডাক্ট রূপে বিবেচিত হয়। তিনটে উদাহরণ দিই। এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবথেকে বৃহৎ তিনটি কার্টুন অথবা নির্মাতা কোম্পানি হল ডিজনি, ডিসি এবং মার্ভেল। ডিজনির প্রোডাক্ট হল মিকি মাউস, ডোনাল্ড ডাক, ডিসির প্রোডাক্ট হল ব্যাটম্যান, সুপারম্যান এবং মার্ভেলের প্রোডাক্ট হল এক্স মেন, অ্যাভেঞ্জার্স। এই প্রত্যেকটা ফ্রাঞ্চাইজির নিজস্ব বিপণন সংস্থা আছে যেখানে এই প্রোডাক্টগুলিকে মার্কেটিং করা হয়। সফট টয়েস, টি-শার্ট, হিরো মডেল টয়, কমিক্সের বই, কার্টুন শো, সিনেমা, ভিডিয়ো গেম— প্রায় সবরকমভাবেই এই প্রোডাক্টগুলোকে মার্কেটিং করা হয়। এমনকী ডিসি এবং মার্ভেল তাদের হিরোদের অস্ত্রশস্ত্রের রেপ্লিকাও বিক্রি করে থাকে। এর সবথেকে বড় দিক হল এই কোম্পানিগুলোর ব্যাপ্তি। আজ ডিজনি প্রায় ৯০ বছর পরও সমানভাবে জনপ্রিয়। ডিসি অথবা মার্ভেলের হিরো চরিত্রগুলিও বিগত ৬০-৭০ বছর ধরে একই জনপ্রিয়তা পেয়ে আসছে।

আরও পড়ুন: পোকেমনের দুনিয়ায় আপনাকে স্বাগত

ডিসি এবং মার্ভেলের মার্চেনডাইস

সমস্যা হল, ভারতে এইরকম কোনও প্ল্যানিং নেই। ভারতের প্রথম পূর্ণ দৈর্ঘ্যের কার্টুন হল মোগলি। ’৯০-এর দশকে ‘জঙ্গল বুক’-এর কার্টুনটি তৈরি করতে খরচ হয়েছিল আনুমানিক ২৬ কোটি টাকা। কিন্তু টিভি সম্প্রচার বাদ দিলে মোগলিকে সেভাবে মার্কেটিং করা হয়নি। যার ফলে মাত্র ৩০ বছরেই ‘জঙ্গল বুক’-এর জনপ্রিয়তা অনেকটাই ফিকে হয়েছে। পোগো চ্যানেলে ভীষণই জনপ্রিয় হয়েছিল ছোটা ভীম। কিন্তু এখানেও সেই পরিকল্পনার অভাব। জনপ্রিয় হয়েও বাজারে কোনও নির্দিষ্ট মার্চেনডাইস (ব্যবসার উপকরণ) না থাকার কারণে ছোটা ভীমও কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে। বর্তমানে ভারতে অনেক কার্টুন তৈরি হয়, লোকাল চ্যানেলে সম্প্রচারিতও হয়। কিন্তু বিশ্বব্যাপী বিপণন বাজারে ভারত বাকি দেশের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। সবথেকে খারাপ লাগার বিষয় হল, গত দুই দশকের রেটিংয়ে পৃথিবীর সবথেকে জনপ্রিয় কার্টুনের তালিকায় একটিও ভারতীয় কার্টুনের নাম নেই।

আরও পড়ুন: অভিন্ন হৃদয় বন্ধু: অ্যাশ, ব্রক, মিস্টি এবং পোকেমন

ছোটা ভীম

আর ঠিক এই জায়গায় অনেকটাই এগিয়ে আছে পোকেমন। ১৯৯৫ পরবর্তী সময়ে যখন পোকেমন কার্টুনটি জনপ্রিয় হতে শুরু করে, সাতোশি তাজিরিও পিছিয়ে থাকেননি। প্রথমেই বাজারে আনা হয় পোকেমন কমিক্স। প্রথমে জাপানি এবং তারপর ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত হতে থাকে এই কমিক্স। এর পাশাপাশি বাজারে চলে আসে পোকেমন সফট টয়েস, পোকেমন টিশার্ট, পোকেবল, পোকেডেক্সের রেপ্লিকা। হু-হু করে বাড়তে থাকে পোকেমনের জনপ্রিয়তা। পোকেমন কার্টুনটিকেও ইংরেজি ভাষায় ডাব করা হয়। জাপানি ভাষায় প্রধান চরিত্রের নামকরণ হয়েছিল স্রষ্টা সাতোশির নামে। ইংরেজিতে প্রধান চরিত্রের নাম রাখা হয় অ্যাশ কেচাম। শুনলে অবাকই লাগে যখন পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেখা যায় যে, জনপ্রিয়তার নিরিখে ২০০৩ থেকে ২০০৯-এর সময়ে পোকেমন ডিজনি, ডিসি এবং মার্ভেলের কার্টুনগুলির থেকে অনেক এগিয়ে ছিল।

আরও পড়ুন: মাদেইরার আগুন, রোজারিওর বৃষ্টি

বিভিন্ন ধরনের পোকেমন মার্চেনডাইস

আরেকটি বিষয় যা পোকেমনকে তুমুল জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছে, তা হল পোকেমন গেমিং কার্ড। বিদেশে কার্ড গেমিং খুব জনপ্রিয়। খেলাটা অনেকটাই তাসের মতো। তবে ইস্কাপন, হরতনের বদলে এখানে থাকে বিভিন্ন চরিত্র। যার কাছে যত শক্তিশালী কার্ড, সেই দান জিতবে। ধরা যাক, ওয়াটার পোকেমন রক পোকেমনের বিরুদ্ধে শক্তিশালী। যদি কার্ড গেমিংয়ে রক এবং ওয়াটার পোকেমনের মধ্যে ম্যাচ হয়, তাহলে জয়ী হবে ওয়াটার পোকেমন কার্ড। ভারতে ক্রিকেট গেমিং কার্ডের ভালো জনপ্রিয়তা আছে। ইউএসএতে ডব্লিউডব্লিউই-র কার্ড তুমুল জনপ্রিয়। ডিসি এবং মার্ভেলেরও নিজস্ব গেমিং কার্ড আছে। যদিও ভারতে পোকেমন কার্ড সেরকমভাবে জনপ্রিয়তা লাভ করেনি।

আরও পড়ুন: নোটস ফ্রম দ্য ডেড হাউস (৪র্থ অংশ)

পোকেমন গেমিং কার্ড

পোকেমন কার্ড গেমিং ছাড়াও বিপণনের জন্য আছে পোকেমন কার্ড কালেকশন। পোকেমন কার্টুনে অলিখিতভাবে পোকেমনদের তিনভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। কমন অথবা এপিসোডিক পোকেমন (যে পোকেমনদের আমরা সাধারণত কোনও একটি বিশেষ এপিসোডে দেখে থাকি, কিন্তু পরবর্তীতে তাদের সেরকম উল্লেখ পাওয়া যায় না), ক্যাপচার্ড অথবা ওনড পোকেমন (অ্যাশ, তার বন্ধু, জিম লিডার, পোকেমন মাস্টারদের কাছে থাকা পোকেমন) এবং রেয়ার অথবা লেজেন্ডারি পোকেমন। বিপণন বাজারে এই প্রত্যেকটি কালেক্টরস কার্ডের আলাদা দাম আছে। এর মধ্যে অবশ্যই ব্রক, মিস্টি এবং  অ্যাশের পোকেমনদের এবং রেয়ার, লেজেন্ডারি পোকেমনদের কার্ডের দাম সবথেকে বেশি।

আরও পড়ুন: অতিমারির একাকিত্বে প্রুফ্রকের সঙ্গলাভ

পোকেমন কালেক্টর্স কার্ড

ইউএসএ-র বাসিন্দা গ্যারি হাস ১৯৯৮ সাল থেকে পোকেমন কার্ড সংগ্রহ করছেন। এটা তার একরকমের নেশাই বলা যায়। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ পোকেমন কার্ড কালেকশনের মালিক হলেন এই গ্যারি। তাঁর সংগ্রহের আনুমানিক দাম ১০ মিলিয়ন ডলার। ভারতীয় মুদ্রায় যার বাজার দর আনুমানিক ৭.২ কোটি টাকা। এই বিপুল অর্থের কালেক্টরস কার্ড নিলামে উঠলে তার কত দাম হতে পারে, তা সত্যিই ধারণার বাইরে। গ্যারি নিজের কালেকশনে থাকা একটি চারিজার্ড কার্ড সম্প্রতি ১৫০,০০০ ইউএস ডলারে বিক্রি করেছেন। ভারতীয় মুদ্রায় যার দাম প্রায় ২০ লক্ষ টাকা। কার্ডটির এত দাম হওয়ার কারণ প্রথম যে দশটি চারিজার্ড কার্ড বাজারে ছাড়া হয়েছিল, এটি তার মধ্যে একটি। এছাড়াও ১৯৯৭-তে বাজারে আসা একটি পিকাচু ট্রফি কার্ড সম্প্রতি দুবাইতে ৩,৫০,০০০ ইউএস ডলারে বিক্রি হয়েছে।

আরও পড়ুন: এক সমুদ্রকন্যা ও তার সমুদ্র-সুতো তৈরির গল্প

গ্যারি হাস-এর পোকেমন সংগ্রহ

পোকেমন বিপণির আরেকটি দিক হল পোকেমন গেমিং অ্যাপ। এটা মোবাইল, ট্যাবলেট অথবা ল্যাপটপ থেকে খেলা যায়। ১৯৯৮ থেকে শুরু করে প্রায় ৫০ রকমের পোকেমন গেম বাজারে লঞ্চ করা হয়েছে। প্রথমে এই গেমগুলি ভিডিয়ো গেমের আকারে বাজারে আনা হয়। ২০১০ পরবর্তী সময়ে যখন স্মার্টফোন এবং ট্যাবলেটের ব্যবহার বাড়ে, তখন লঞ্চ করা হয় পোকেমন গেমিং অ্যাপ। পোকেমন ভিডিয়ো গেমের মধ্যে সবথেকে জনপ্রিয় গেমগুলি হল পোকেমন রেড অ্যান্ড ব্ল্যু, পোকেমন গোল্ড অ্যান্ড সিলভার, পোকেমন ব্যাটেল রেভ্যুলিউশন, পোকেমন প্ল্যাটিনাম, পোকেডেক্স থ্রিডি ইত্যাদি। এর মধ্যে বেশিরভাগই পোকেমন টিভি এপিসোড অথবা সিরিজের ওপর তৈরি। পোকেমন ভিডিয়ো গেম বিদেশে বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এছাড়াও আছে পোকেমন গেমিং অ্যাপ।

আরও পড়ুন: জেরুসালেম

পোকেমন ভিডিয়ো গেম

পোকেমন গেমিং অ্যাপের মধ্যে সবথেকে জনপ্রিয় হয়েছে পোকেমন গো। এখানে খেলোয়াড় নিজেই একজন পোকেমন ট্রেনার। টিভিতে যা দেখানো হয়, পোকেমনদের ধরা, ট্রেন করা, জিম ব্যাটেল করা, পোকেমন লিগ খেলা— এই সবই এই অ্যাপের মাধ্যমে করা যায়। পোকেমন গেমিংয়ের মধ্যে সবথেকে আধুনিক সিমিউলেশন (প্রযুক্তির সঙ্গে বাস্তবতার মিশেল) পাওয়া যায় এই পোকেমন গো খেলাটিতে। তবে, এই অ্যাপটি বারবার বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। অ্যাপটি যখন প্রথম বাজারে আসে, তখন দেখা যায় মানুষ, বিশেষ করে টিনএজাররা এই গেমটি মোবাইল অথবা ট্যাবে খেলতে এতই মত্ত হয়ে উঠেছে যে, তারা বাস্তবকেই ভুলে যাচ্ছে। গেম খেলতে খেলতেই রাস্তা দিয়ে হাঁটা, বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়া, পার্কে হারিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে প্রায়শই। এছাড়াও অনেকেই দুর্ঘটনার শিকারও হয়েছে। এর ফলে বাজারে আনার এক বছরের মধ্যেই নির্মাতা সংস্থা এই অ্যাপটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। অনেক দেশেই অ্যাপটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সতর্কবার্তা দিয়ে কিছুদিন পর অ্যাপটি পুনরায় বাজারে আনা হয়। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে সিমিউলেশনও কমানো হয়, যাতে খেলা এবং বাস্তব জগৎকে আলাদা রাখা যায়। তা সত্ত্বেও পোকেমন গো অ্যাপ নিয়ে বিতর্ক বন্ধ হয়নি।

আরও পড়ুন: অতিমারি: স্পর্শ, বৌদ্ধিক মুদ্রা ও শ্রুশ্রূষা

পোকেমন গো

সিনেমার দিক থেকেও পোকেমন ডিজনি, ডিসি অথবা মার্ভেলের থেকে পিছিয়ে নেই। তবে এক্ষেত্রে পোকেমন ডিজনির রাস্তাতেই হেটেছে। ডিজনি সবসময়েই নিজেদের অ্যানিমেশন মুভি এবং রিয়েল লাইফ মুভিকে আলাদা রেখেছে। ডিসি অথবা মার্ভেলের মতো কার্টুন থেকে রিয়েল লাইফ মুভি করেনি। পোকেমনও অ্যানিমেশন মুভিতেই জোর দিয়েছে বেশি। ২০১৯ সালে একটিমাত্র রিয়েল লাইফ মুভি পোকেমন নিয়ে হয়েছিল— ডিটেক্টিভ পিকাচু।

ক্রমশ…

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *