ব্রিস্টল শহরবাসীদের ধন্ধে ফেলেছিলেন ‘রহস্যময়ী রাজকুমারী’ মেরি বেকার

অনিন্দ্য বর্মন

মানুষ কতই না গল্প সৃষ্টি করে। নতুন চরিত্র, নতুন ভাষা এবং বিকাশের মাধ্যমে সমাজকে আমোদিত করার প্রচেষ্টা। কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডের আলমন্ডসবেরি গ্রামে যে রহস্যময়ী মহিলার আবির্ভাব হয়, তার পেছনের কাহিনি ছিল দীর্ঘ এবং অভিনব। এই মহিলা এক অদ্ভুত ভাষায় কথা বলতেন। গ্রামের মানুষ প্রথমে তাঁকে ভিখারিনি বলেই ভেবেছিল। কিন্তু এক দোভাষীর সাহায্যে সত্য উদ্‌ঘাটিত হলে জানা যায়, তিনি এক রাজকুমারী! ৩ এপ্রিল ১৮১৭-তে ইংল্যান্ডের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত ব্রিস্টল শহর থেকে কয়েক মাইল দূরে আলমন্ডসবেরি গ্রামে হঠাৎই রহস্যজনকভাবে আবির্ভূত হন এক মহিলা। কেউ জানত না তিনি কে অথবা কোথা থেকে এসেছেন। পরনে নোংরা কালো পোশাক এবং শাল, মাথায় পাগড়ি— মহিলাকে দেখে মনে হয় যে, তিনি খুবই ক্লান্ত। সম্ভবত এক দীর্ঘ যাত্রার পর এই গ্রামে এসে পৌঁছেছিলেন। হাতে একটা ছোট পুটলি, তাতে দৈনন্দিন নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী যেমন সাবান এবং অন্যান্য। সবথেকে আশ্চর্যের, তিনি সম্পূর্ণ অচেনা বিজাতীয় ভাষায় কথা বলছিলেন। গ্রামের মানুষ স্বাভাবিকভাবেই আশ্চর্য এবং কৌতূহলী হয়ে উঠেছিল তাঁর প্রতি।

আরও পড়ুন: জন্মদিনে রমেশচন্দ্র মজুমদার: দেবী ক্লিওর বরপুত্র

প্রিন্সেস কারাবু। এডওয়ার্ড বার্ডের আঁকা, ১৮১৭

গ্রামের মানুষ তাকে ভিখারিনি ভেবে গ্রামের গরিবখানার অধিকর্তার কাছে নিয়ে যায়। অধিকর্তা মহিলাকে ভালোভাবে জরিপ করেন, কারণ তখন ইংল্যান্ডের সঙ্গে নেপোলিয়নের (ফ্রান্সের সম্রাট) যুদ্ধ চলছে। মহিলা হয়তো বিদেশিনী, এই সন্দেহে অধিকর্তা তাঁকে স্থানীয় ম্যাজিস্ট্রেট স্যামুয়েল ওয়ারেলের কাছে সমর্পণ করেন। ম্যাজিস্ট্রেটের নোল হাউস নামক প্রাসাদে মহিলাকে নিয়ে যাওয়া হয়। সমগ্র ঘটনা শুনে, ম্যাজিস্ট্রেট তাঁর এক বিশ্বস্ত গ্রিক চাকরকে ডেকে পাঠান। এই গ্রিক চাকরটি ইউরোপের আরও অনেক ভাষা জানতেন। কিন্তু তিনিও বুঝে উঠতে পারলেন না যে, মহিলা কোন ভাষায় কথা বলছেন। অনেকভাবে হাত-পা নেড়ে, ইশারা করে যখন তার কাছে পরিচিতি পত্র চাওয়া হল, মহিলা পুটলি থেকে কয়েকটি পয়সা বের করে দেখাতে থাকেন।

ম্যাজিস্ট্রেট ওয়ারেলের মনে অনেক রকম সন্দেহ হয়েছিল, কিন্তু তাঁর স্ত্রী এই মহিলাকে নিয়ে ভীত হওয়ার বদলে অত্যন্ত উৎসুক হয়ে ওঠেন। মিসেস ওয়ারেলের অনুরোধেই মহিলাকে কাছের এক সরাইখানায় রাত্রিবাসের অনুমতি দেওয়া হয়। সময়ের সঙ্গেই মহিলার ব্যবহার আরও বেশি রহস্যময় হয়ে ওঠে। তিনি খাবার প্রত্যাখ্যান করে শুধু চা খান এবং তার আগে নিজের চোখে হাতচাপা দিয়ে এক অদ্ভুত প্রার্থনাও করেন। সরাইখানার দেওয়ালে আনারসের ছবি দেখে তিনি চিনতে পারেন। মানুষের ধারণা হয় যে, তিনি বহু দূরের কোনও দেশ থেকে এসেছেন, যা সম্ভবত গ্রীষ্মপ্রধান দেশ। যখন তাঁকে শোয়ার ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়, তিনি অবাক হয়ে খাটের দিকে চেয়ে থাকেন এবং শেষমেশ মাটিতে শুয়েই ঘুমিয়ে পড়েন।

আরও পড়ুন: কৃষকরা যা যা পেরিয়ে আসছেন

সরাইয়ের কর্মচারীদের জন্য সেই রাত ছিল বিস্ময়ের। পরদিন সকালে মিসেস ওয়ারেল মহিলাকে আবার নোল হাউসে নিয়ে যান। ততক্ষণে মহিলা বারবার নিজের দিকে আঙুল দেখিয়ে এবং অদ্ভুত উচ্চারণে জানিয়েছেন যে, তাঁর নাম কারাবু। কিন্তু মিঃ ওয়ারেল ধৈর্য হারিয়েছেন। তিনি মহিলাকে ভিখারিনি আখ্যা দিয়ে শহরের মানুষকে উত্ত্যক্ত করার অপরাধে ভবঘুরেদের সঙ্গে রাখার আদেশ দেন। কারাবুকে বহুদিন সেইন্ট পিটার’স হাসপাতালে অন্য ভবঘুরেদের সঙ্গে রাখা হয়। তারপর মিসেস ওয়ারেলের অনুরোধে তাঁকে আবার ওয়ারেল অফিসে ফিরিয়ে আনা হয়। ততদিনে গ্রামে-শহরে আলমন্ডসবেরির এই রহস্যময় মহিলার কথা ছড়িয়ে পড়েছে। সবাই তাঁকে দেখতে উৎসুক, বিশেষ করে বিভিন্ন ভাষার মানুষ এসে ভিড় করতে থাকেন। সবাই চেষ্টা করত যদি কোনওভাবে মহিলার পরিচয় জানা যায়। কিন্তু দশ দিন ধরে অনেক চেষ্টার পরও মহিলার বলা একটি কথাও কারও বোধগম্য হয়নি।

বহু মানুষের সঙ্গেই, এই রহস্যময়ী মহিলার কথা শুনে ম্যানুয়েল এয়েনেসো নামক এক পর্তুগিজ নাবিক ওয়ারেল অফিসে আসেন। ম্যানুয়েল সুদূর পূর্ব থেকে পশ্চিম, অনেক দেশ ঘুরেছিলেন এবং সেই সময় তাঁর জাহাজ ব্রিস্টল বন্দরে নোঙর করেছিল। তিনি বিভিন্ন ভাষা জানতেন। মহিলার সঙ্গে অল্পক্ষণ কথা বলেই তিনি জানালেন যে, মহিলা সুমাত্রার ভাষায় কথা বলছেন এবং মহিলার কথা অনুবাদ করতে আরম্ভ করলেন। ম্যানুয়েলের কথায় জানা যায় যে, কারাবু ভিখারিনি নন। তিনি ভারত মহাসাগরে অবস্থিত জাভাসু দ্বীপের রাজকুমারী। সামুদ্রিক লুটেরারা তাঁকে অপহরণ করে নিয়ে যাচ্ছিল, ব্রিস্টল চ্যানেলের কাছে এসে জাহাজ থেকে সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে পালাতে সক্ষম হয়েন তিনি। তার ৬ সপ্তাহ পর ঘরতে ঘুরতে তিনি আলমন্ডসবেরি এসে উপস্থিত হন।

আরও পড়ুন: প্লাজমা-পোয়েম-প্রেয়ার একসূত্রে গেঁথেছে জগদীশ-রবি ঠাকুর-স্বামীজিকে

বেকার জাভসুর লেখা

গল্পটি ছিল অসাধারণ এবং মিসেস ওয়ারেল যা জানতে চেয়েছিলেন, তাও হল। কারাবুর মতো রাজকুমারী নোল হাউসে থাকছেন, এটা ছিল তাঁর কাছে গর্বের ব্যাপার। পরের ১০ সপ্তাহ কারাবু-র সম্মানে বিভিন্ন অনুষ্ঠান, আমোদ-প্রমোদের আয়োজন করা হয়। বহু জ্ঞানী-গুণী মানুষ তাঁকে নিয়ে বহু আলোচনা এবং বিশ্লেষণ করেন। সবাই অবাক যে যাঁকে ভিখারিনি ভাবা হয়েছিল, তিনি আসলে রাজকুমারী। ড. উইলকিনসন বলে এক বিশিষ্ট ব্যক্তি তৎকালীন সময় লিখেছিলেন যে, কারাবুকে সন্দেহ করার মতো কিছু ছিল না। সবাই তাঁকে রাজকুমারী হিসেবেই মেনে নিয়েছিলেন। তবে কারাবু-রহস্যের তখনও নিষ্পত্তি হয়নি।

কারাবু-র কথা খবরের কাগজ অবধি পৌঁছয় এবং তার বর্ণনা দিয়ে কয়েক সপ্তাহ পর ‘ব্রিস্টল জার্নালে’ একটি লেখা প্রকাশিত হয়। এই পত্রিকাটি প্রকাশের পর মিসেস নিইল নামক এক মহিলার হাতে পৌঁছয়। তিনি লোকজনের থাকার জন্য বোর্ডিং হাউস ভাড়া দিতেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গেই কারাবুকে চিনতে পারেন, তবে জাভাসুর রাজকুমারী হিসেবে নয়, বরং কারাবুকে তিনি তাঁরই বোর্ডিং হাউসের প্রাক্তন ভাড়াটে মেরি বেকার বলে দাবি করেন। মেরি উইদরিজ নামক গ্রামের এক মুচির মেয়ে যা ব্রিস্টল থেকে ৭০ মাইল দূরে। মিসেস নেইল-এর মতে, রাজকুমারী কারাবুর গল্প ছিল পুরোটাই ধাপ্পা।

এই খবর লোকমুখে ছড়াতে ছড়াতে মিসেস ওয়ারেলের কানে পৌঁছয়। প্রথমে বিশ্বাস না করলেও মিসেস ওয়ারেল ঠিক করেন যে, একবার ব্রিস্টল গিয়ে খোঁজ নেবেন। সেইমতো কারাবুকে জানান যে, তাঁরা ব্রিস্টল যাবেন এবং সেখানে কারাবুর একটি প্রতিকৃতি আঁকানো হবে। এই ছুতোয় মিসেস ওয়ারেলে ব্রিস্টল গিয়ে মিসেস নেইল-এর সঙ্গে দেখা করেন। তাঁর সঙ্গে কথা বলে মিসেস ওয়ারেল বুঝতে পারেন যে, কারাবু আসলেই মেরি বেকার। সব ধাপ্পাবাজির অবসান ঘটিয়ে তিনি মেরিকে চেপে ধরেন এবং চোখের জলে ভেসে মেরি সব স্বীকার করতে বাধ্য হন।

ছবি সৌজন্য হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় উইকিমিডিয়া

গল্পের মধ্যেও গল্প থাকে। রাজকুমারী কারাবুর গল্পের পেছনে ছিল গরিব মেরি বেকারের জীবনকাহিনি। ১৭৯১-তে ডেভন গ্রামে মেরির জন্ম। বাবা-মায়ের সঙ্গে ঝগড়ার ফলস্বরূপ মেরি খুব অল্প বয়সেই বাড়ি ছেড়ে চলে যান। তারপর দক্ষিণ ইংল্যান্ডের অনেক জায়গাতেই তিনি জীবিকার জন্য কাজ করতে থাকেন। ভাগ্য সহায় না হওয়ায় মেরি ভিখারিনি বৃত্তি করতে শুরু করেন এবং ১৮১০-এ ব্রিস্টলে এসে পৌঁছয়। এই সময় তিনি দেখেন যে, বিদেশিনি ভিখারিনি হিসেবে মানুষের সহানুভূতি এবং টাকা— দুইই বেশি পাওয়া যায়। মিসেস নেইল-এর কাছে ভাড়া থাকার সময় মেরি বাচ্চাদের সঙ্গে মজার ছলে এক অদ্ভুত ভাষা তৈরি করে এবং সেইসঙ্গে রাজকুমারী কারাবুর চরিত্রটিও দাঁড় করায়। সেই ভাষা রাজকুমারীর জবানিতে প্রয়োগ করে এবং সেই দিয়ে মিসেস ওয়ারেল এবং সমগ্র শহরবাসীকে মাসের পর মাস বোকা বানিয়েছেন। জাভাসু দ্বীপের এখানে কোনও অস্তিত্বই ছিল না।

মেরির এই গল্পটি প্রকাশ্যে আসতেই খবরের কাগজের লোক ঝাঁপিয়ে পড়েন। কিন্তু বিরুদ্ধে লেখার বদলে তাঁরা লিখলেন যে, কীভাবে এক শ্রমিক শ্রেণির মেয়ে, বড়লোক অভিজাতদের বোকা বানিয়ে ছেড়েছেন। মেরি বেকার প্রায় নায়িকাদের মতো জনপ্রিয়তা পান। পড়াশোনা জানেন না, গরিব মেয়ে নিজের বুদ্ধি এবং সাহস দিয়ে অভিজাত সমাজের ভেতরে ঢুকে তাদের বোকা বানিয়েছে এবং তাদের মিথ্যে অহংকার ভেঙে দিয়েছেন, এই নিয়ে বহু আলোচনা এবং লেখালিখি হয়। মিসেস ওয়ারেলও মেরির ভূয়সী প্রশংসা করেন। প্রথমে রেগে গেলেও মিসেস ওয়ারেল মেরির আসল জীবনের প্রতিও একইরকম সহানুভূতিশীল ছিলেন। তিনি নিজে দায়িত্ব নিয়ে টাকার ব্যবস্থা করেন এবং মেরিকে ১৮১৭-তে ফিলাডেলফিয়ায় পাঠান, যাতে সে নতুন করে তাঁর জীবন শুরু করতে পারেন। আমেরিকায়, মেরি নিজের দক্ষতায় রাজকুমারী কারাবুর চরিত্রটি মঞ্চে অভিনয় করতে শুরু করেন। কয়েক বছর পর, তিনি ইংল্যান্ডে ফিরে এসে চরিত্রটি পুনরায় মঞ্চস্থ করেন। কিন্তু ততদিনে মানুষ কারাবুর ঘটনাটি ভুলতে বসেছে। মেরি ব্যবসায়িক দিক থেকে লাভবান হতে পারেননি।

মেরি ১৮২০-র পর ব্রিস্টলেই থাকতে শুরু করেন। তাঁর পরিচিতি তখন বিধবা মেরি বার্গেস। কাছের হাসপাতালগুলিতে চিকিৎসার জন্য জোঁক বিক্রি করতেন এবং ৩০ বছর ধরে মেরি এই কাজই করতেন। ১৮৬৪-তে তাঁর মৃত্যুর সঙ্গেই রাজকুমারী কারাবুর চরিত্রটিও শেষ হয়। অজানা, স্বল্প-পরিচিতা এক রহস্যময়ী মহিলা হিসেবেই মেরির নাম ইতিহাসে পাতায় থেকে গিয়েছে।

কিন্তু সেই পর্তুগিজ নাবিক কী করে মেরির ভাষা বুঝেছিলেন এটা আজও অজানা; যদি না তিনি নিজেও প্রতারক হয়ে থাকেন।

Facebook Twitter Email Whatsapp

2 comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *