মেধাকাল

তমোঘ্ন মুখোপাধ্যায়


যক্ষ শ্রোণিচক্র পেরিয়ে গেল। সরোবর প্রাণময় ক্বাথ;
অদূরে ভ্রাতৃলাশগুলি প্রশ্ন করছে, ‘আমরা কারা?’… আমি এত
সহজ প্রশ্নে স্তনাগ্র রাখতে রাখতে পাঁজর অবধি বিদ্যুৎ পেলাম।
যেন ভ্রম; যেন যা মৃত কিংবা পাথর, সমস্ত তরলে তরলে
প্রতিসরণ; যক্ষ শ্রোণিমূলে প্রশ্ন করছে, ‘আশ্চর্য কী?’
আমি জিভে জাগ্রত হাড় টের পেতে পেতে মুখের গলন
দেখলাম, যেন সহোদর অনৃত; আদপে ছায়া, ছায়া ও ছায়া।
এরপর বৃষ্টি। ঊর্ধ্বের অরণ্য থেকে জলের কুড়ুল খসে পড়ছে।
লাশ পাহারা দিচ্ছি এবং লাশ আমায় পাহারা দিচ্ছে। কে মৃত?


সংগীত মূলত নরক দর্পণ পর্যন্ত আনতে পারঙ্গম। এরপর
পরিধি টানতে থাকলে মা আর কোমল থাকে না। আমরা দুনিয়া
থেকে সরে যেতে যেতে প্রত্যেকে একটি গহ্বর হয়ে মহাশূন্যে
তস্কর জাগাব। একটি করে উল্কা লোপাট হয়ে যাওয়ার ধ্বনি
নবসংগীত ভেবে জগৎ পূর্বতন ঈশ্বরের বাকল উপড়ে নেবে।
নরক দর্পণ অবধি এগিয়ে আসছে। কাচ কালো হয়, শরম এমন।
আমরা মুখ দেখার বিদ্যা থেকে উঠে যাচ্ছি হাত ও নখের দিকে।
নখ ধাতু আঁচড়াতে আঁচড়াতে সুর চাইছে। কিন্তু পরবর্তী কয়েক যুগ
মধ্যম তীব্র। ধৈবত থেকে ঋষভ অবধি মিড়ে গ্রীবা জ্বলে যায়।
চিৎকারের গাছ হয়ে জেগে আছে গান। লক্ষ লক্ষ বেহালা ঝুলছে।
ছড় যত ওঠে নামে, পাতা তত কাঠ হয়ে যায়।

আরও পড়ুন: দাম্পত্য বিষয়ক খত


‘আমি কী?’ থেকে জাত। ‘আমি কেন?’ বুঝে শেষ।
ঠিকুজি কানু দিল না। পথ শকুন ভেবে গাভী নিয়ে ঘরে তলিয়ে
যাচ্ছি; ঘর পথের বৃত্তি— এই সত্য যতক্ষণে প্রবিষ্ট হল করোটির
কৃপায়, ততক্ষণে গাভী-মুখ ভেঙে কালসাপ বেরিয়ে আসা শুরু…
‘আমি কী?’ আদপে সর্বনাশ। শাঁখ গর্জন করছিল জন্মক্ষণে।
শ্রুতি শুরু ও শেষ অবধি জীবাশ্ম, আমরা উদ্ধার করে
দাগ মিলিয়ে মিলিয়ে ‘আমি কেন?’ আবিষ্কারের প্রয়াসে আবার
প্রেত হব। ঠিকুজি কানু দিল না। গোপীদেহে কাঁচুলি চৌচির
হওয়ার শব্দ শুনতে শুনতে কালসাপের মাথায় ঠোঁট পাতলাম।
এরপর একটি কামড় আমার সহস্র দরজা খুলে দেবে।
গাভীর জাবরে নাড়ি চূর্ণ হওয়ার শব্দ পাচ্ছি। সুখ এই।


কন্যা-কামনায় হংসীগমন। পালক দাউদাউ করে জ্বলে
যাচ্ছে মৈথুনের ধাক্কায়। অতঃপর একটি মাংসপক্ষী আমার
বীজ ধারণ করল; মাংসকাঠামোর কুহরে আর-এক মাংস
আমার জরাপ্রত্ন নিয়ে বেড়ে বেড়ে পালক উদ্ধার করবে,
পিতা ডাকবে, জমি হাতড়ানোর সময় শস্য হয়ে খিলখিল হাসবে;
আমি আর ভাবতে পারি না। কোনও জন্ম সনাতন নয়।
কন্যা-কামনায় আমার কর্ণকপাটে কীর্তন ঝলসে উঠছে।
আমি ভক্তির ভিতর সহস্র শিয়াল দেখে অঘোরী। কন্যা
এই জান্তব উপাসনার তল পাবে না। ভয়ে ভয়ে দূরে সরে যাবে।
হংসী মাংসপক্ষী হয়েও রতি অন্তে প্রণাম ভোলেনি।
চঞ্চু পা ছুঁচ্ছে। পায়েই হারিয়ে যাচ্ছে। জল পা ডাকছে। যাই…

আরও পড়ুন: কবি কলম কথা


যেন একটি নৌকা সরল নিমজ্জন মেনে নেবে—
ধর্ম বিষয়ে আমরা এমনই সহজ বিশ্বাস পরম্পরায় রাখি।
রাক্ষসসোহাগের দেশ। তুমি মৃত কিংবা অমর। মধ্যবর্তী
কিছু নেই। ছৌ-নৃত্যে আমরা চলাচল সীমিত করতে করতে
শুধু মুখোশের মধ্যেই গমন বেঁধে ফেলব, অর্চনার লক্ষ্য এমন।
অতএব নৃত্য সাংকেতিক ও নৈর্ব্যক্তিক। পীত আকাশের সাড়ে বারো
হাত নীচে নৃত্যের শ্মশান নির্মিত। ব-দ্বীপের মতো।
একদিকে পূর্বপুরুষদের হাড়ের উদ্যান। বাকি দু’দিক তরল।
সেই তরলের কোমরে আমরা সমবেত হয়ে নৌকা
ডোবাতে এলাম। নৌকা ডুবল। আবার তরল ঠেলে উঠে এলো।
এই দৃশ্যে গোষ্ঠী ফেটে যায়। ধর্ম কিন্তু তবুও সহজ।


উত্তর ঠুকে ঠুকে যক্ষ-র মুখ ভাঙছি। একটি ক’রে ভাই
প্রাণ ফিরে পাচ্ছে। ‘আমরা কারা?’ থেকে ‘আমি কে?’ অবধি
তাদের দাঁত হামা দিতে দিতে এগিয়ে গেল। রণাঙ্গন
যত দূর, তত দূর ব্রহ্মদর্শন নয়। শ্রোণিচক্রে গাভী-মুখ ভেঙে
বেরিয়ে আসা কালসর্প যক্ষের গ্রীবা পেঁচিয়ে ধরছে।
প্রশ্ন নিভে গেল। আশীর্বাদের তুল্য রাজনীতি নেই— এই দৃশ্যে
সহজে বুঝেছি। বুঝেছি অন্ত বালিঘড়ির উপুড় হওয়ার
মুহূর্তেই জিয়ল, বাকি ক্ষণে তার স্থানাঙ্কে শূন্য অধিষ্ঠিত।
উত্তর ঠুকে ঠুকে যক্ষের মেরু ভাঙছি। ন্যায় স্থাপনে এই পাপ
সমীচীন। মাংসপক্ষীর বিনাশ সমীচীন। কন্যার হনন সমীচীন।
মুখ দিয়ে গাছ উগড়ে মরে যাব শেষে। চরাচর জানতেও পারবে না।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *