দুর্ঘটনায় পা খুইয়েছিলেন, সেখান থেকে প্যারালিম্পিক তিরন্দাজিতে দেশকে পদক জয়ের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন মিরাটের বিবেক চিকারা

Mysepik Webdesk: অলিম্পিকের পর টোকিওয় আগামী ২৪ আগস্ট থেকে শুরু হতে চলেছে প্যারালিম্পিক। এই প্রতিযোগিতায় সকলের নজর থাকবে মিরাটের প্যারা-আর্চার বিবেক চিকারার দিকে। ২৩ আগস্ট তিনি ভারতীয় দলের সঙ্গে টোকিও পৌঁছবেন। কোটি কোটি দেশবাসীর স্বপ্ন এবং আশা পূরণের জন্য বিবেক এখন সাইয়ের সেন্টার সোনিপতে প্যারালিম্পিকের জন্য কঠোর অনুশীলন করছেন। তাঁর সঙ্গে কথা বলেছিলেন সর্বভারতীয় এক প্রথম শ্রেণির সংবাদমাধ্যম ‘দৈনিক ভাস্কর’-এর সাংবাদিক।

আরও পড়ুন: অনন্য অলিম্পিক দর্শন

ব্যাঙ্ককে দলগত বিভাগে ব্রোঞ্জ জেতার পর বিবেকরা…

সংবাদমাধ্যমটির রিপোর্ট অনুযায়ী, বিবেক বলেন— “২০১৭ সালের আগে আমার জীবনও স্বাভাবিক ছিল। এমবিএ করার পর আমি মাহিন্দ্রা কোম্পানিতে কাজ করছিলাম। প্যাকেজটি ভালো ছিল। তবে, ২০১৭-র ১ জানুয়ারি একটা বড়সড় সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। একজন মাতাল ট্রাক ড্রাইভার আমার বাইকে ধাক্কা মারে। আমার জীবন বেঁচে গিয়েছিল। কিন্তু ডাক্তারদের পরামর্শে আমার একটি পা কেটে ফেলতে হয়েছিল। এক মুহূর্তে আমার গোটা জীবনটা বদলে গেল। কৃত্রিম পা প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল বটে, কিন্তু আমার মন সম্পূর্ণ ভেঙে গিয়েছিল। এক বছর ধরে চিকিৎসা চলেছিল। আমার মা-বাবা সহ গোটা পরিবার ভেঙে পড়েছিল। লোকজন এটা নিয়ে গল্প সাজাতে শুরু করল। আমি মনে করতে শুরু করলাম যে, আমার জীবন হয়তো শেষ হয়ে গিয়েছে।”

আরও পড়ুন: টোকিও প্যারালিম্পিকে অংশগ্রহণ বিশ বাঁও জলে: অনিশ্চিত দুই আফগান ক্রীড়াবিদের জীবন

বিবেক আরও বলেন, “আমার গুরু আমাকে নতুন জীবন দিয়েছেন। আমি যখন নিজেকে অসহায় ভাবতে শুরু করেছি, সেই সময় আমার বাবা আমাকে কিছু একটা কাজ করতে বলেছিলেন। কিন্তু আমার ভাবনা আলাদা ছিল। আমি স্থির করেছিলাম আমি ভিন্ন কিছু করব। মানুষকে বোঝাতে হবে যে, আমি অকেজো নই। বাবা আমাকে গুরুকুল প্রভাত আশ্রমে নিয়ে যান এবং আমি সেখানে নতুন এক জীবন ফিরে পাই। আমার কোচ সত্যদেব স্যার আমাকে একটি নতুন দিশা দেখালেন এবং তারপর এক নতুন বিবেকের জন্ম হল।”

এহেন কোচ সত্যদেব বিবেক সম্পর্কে বলেন, “বিবেকের সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাতে আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে, আমার সামনে হীনম্মন্যতা নিয়ে একজন যুবক দাঁড়িয়ে আছে। এই বিক্ষিপ্ত মাটিকে আকৃতি দেওয়াটা একটা চ্যালেঞ্জ ছিল। ও আর্চারির ‘A’ জানত না। প্রথম মাসটা আমি ওর সঙ্গে শুধু কথা বলে কাটিয়েছি। দ্বিতীয় মাসে যখন ট্রেনিং শুরু করি, তখন ওকে বলে দিই, আমি তোমাকে একজন সাধারণ খেলোয়াড়ের মতো অনুশীলন করাব। নিজেকে কখনও প্যারা-প্লেয়ার ভেবো না। তাই প্রশিক্ষণ কিন্তু কঠোর হবে। মনে করো যে তুমি অতনু, প্রবীনদের মতো খেলোয়াড়দের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছ। যদি তুমি তাদের পরাজিত করো, তাহলে তোমাকে একজন খেলোয়াড় বলা হবে।”

আরও পড়ুন: জ্বর নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি নীরজ চোপড়া

সত্যদেব জানান যে, প্রত্যেক গুরুই বিবেকের মতো শিষ্য চান। বিবেককে শারীরিক এবং মানসিক উভয়ের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। কৃত্রিম পায়ের কারণে দাঁড়াতে অসুবিধাও পর্যন্ত হচ্ছিল তাঁর। প্রথমদিকে ব্যালান্স রাখতে না পেরে বারবার পড়েও যাচ্ছিলেন তিনি। তবুও পরাজয় স্বীকার করেননি বিবেক। প্রতিদিন চার ঘণ্টা ধরে অনুশীলন, যোগব্যায়াম, ডায়েট চার্ট বজায় রাখা সহজ ছিল না। কিন্তু বিবেক সমস্ত কিছু করেছেন। দেশবাসীর আশা, টোকিওতে তিনি তাঁর সেরাটা দেবেন। বিবেক কষ্টের সঙ্গে লড়াই করে খুব অল্প সময়ে তিরন্দাজির জগতে জায়গা তৈরি করে নিয়েছেন। যা সত্যিই একটা বড় অর্জন। দু’বছরের মধ্যেই বিবেক নতুন এক পরিচয় পেলেন। তিনি জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে শুরু করলেন। সেখান থেকে প্যারালিম্পিকে নামতে চলেছেন বিবেক। এই যাত্রা সত্যিই রূপকথার মতো।

আরও পড়ুন: প্রকাশিত টি-২০ বিশ্বকাপের সময়সূচি, ২৪ অক্টোবর মুখোমুখি হতে চলেছে ভারত-পাকিস্তান

২০১৯ সালে নেদারল্যান্ডসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব প্যারা-আর্চারি চ্যাম্পিয়নশিপে তিনি প্যারালিম্পিক গেমস ২০২০-র জন্য যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন। এহেন বিবেক থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ২০১৯-এর প্যারা এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে ব্যক্তিগত ইভেন্টে সোনার পদক জিতেছিলেন। এই টুর্নামেন্টের দলগত ইভেন্ট ব্রোঞ্জ পদক অর্জন করেছিলেন তিনি। তাঁর বিশ্ব র‍্যাঙ্কিং এই মুহূর্তে ১৩। দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত ফাজা কাপে প্রথম স্থান অর্জন করেছিলেন বিবেক। তাছাড়াও থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাঙ্ককে এশিয়ান প্যারা আর্চারি চ্যাম্পিয়নশিপেও সোনা জিতেছিলেন তিনি।

Facebook Twitter Email Whatsapp

এই সংক্রান্ত আরও খবর:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *