মা টেরেসা ও তাঁর সন্তানেরা (দ্বিতীয় পর্ব)

১৯১০ সালের ২৬ আগস্ট জন্মেছিলেন মাদার টেরেসা। এই পুণ্যাত্মা ইহলোকের মায়া ত্যাগ করেন ১৯৯৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর। তাই ২৬ আগস্ট থেকে ৫ সেপ্টেম্বর, ‘মাদার-পক্ষে’ Mysepik তুলে ধরল মাদার টেরেসা সম্পর্কে একটি ধারাবাহিক। আজ দ্বিতীয় পর্ব। লিখছেন অনিন্দ্য বর্মন

সাধু, সন্ত, সৎপুরুষ অথবা সেইন্ট আসলে কে বা কারা? তাঁরা কি সবসময়েই ভগবানের খুব কাছের মানুষ? ভগবান কি সবসময়েই তাঁদের ভেতরে আছেন? নাকি তাঁদের দৈনন্দিন জীবন, লড়াই, নিপীড়িতের স্বার্থে নিজেকে উৎসর্গ করার মাধ্যমকেই তাঁরা ভগবানের কাছে পৌঁছনোর মার্গ হিসেবে চয়ন করেছেন? বিল ম্যাককরমিক তাঁর একটি লেখায় এই প্রশ্নগুলি উত্থাপন করেছেন। তাঁর মতে, এই প্রশ্নের মধ্যেই লুকিয়ে আছে মাদারের অন্ধকারকে জয় করার চাবিকাঠি। মাদারের কথা থেকেই জানা যায় যে, অনেক সময়েই তাঁর মনে হয়েছে তিনি ঈশ্বরের সান্নিধ্যে নেই; কিন্তু তারপরও হাসিমুখে কলকাতার গরিব এবং পীড়িত শিশুদের জন্য কাজ করেছেন নিরন্তর। তাঁর এই ত্যাগ বন্দিত হয়েছে সারাবিশ্বে।

আরও পড়ুন: রক্তাক্ত ভাষ্য বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা

Mother Teresa: Model to Us All | CRS

অনেকেই বর্তমান সময়ে ধর্মকে চিহ্নিত করেছেন একটি ‘খালি বাক্স’ হিসেবে। অন্তত, ২০১৬ পরবর্তী যে রাজনীতি দেখা যায়, সেই ক্ষেত্রে ধর্মের যথার্থতা ব্যাখ্যা করা সত্যিই কঠিন। পৃথিবীর সর্বত্রই এই একই ছবি চোখে পড়ে। সব জায়গাতেই রাষ্ট্রপ্রধানরা আত্মরক্ষার সেরা হাতিয়ার হিসেবে ধর্মকে ব্যবহার করে থাকেন। আর যে সময়ে মাদার কলকাতার পথে নেমেছিলেন, সেই সময়টা কেমন ছিল? একের পর এক মন্বন্তর, দেশভাগ, মহামারি, কু-শিক্ষায় ছেয়ে গিয়েছিল দেশ। সেই অন্ধকারে ধর্মকেই হাতিয়ার করেছিলেন মাদার। মুখে সরল হাসি, বুকে প্রভু যিশুর নাম এবং কোমল একটি হৃদয় ছুঁয়েছিল শত শত নিপীড়িতকে। ধর্ম নামক একটি ‘খালি বাক্স’ দিয়েই মানুষের কাছে পৌঁছেছিলেন টেরেসা।

আরও পড়ুন: প্রণববাবুকে যেমন দেখেছি

এক্ষেত্রে অর্থনীতির প্রভাবও ছিল মারাত্মক। ’৫০-এর দশকে কলকাতায় ট্রামের ভাড়া ছিল ৩ পয়সা। আর পথশিশুদের কাছে সেই সামান্য মূল্যের অর্থও ছিল কোটি টাকার সম্পদ। এটা ঠিকই যে, আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সেই সময়ের পয়সার হিসাব করা মুশকিল। কিন্তু সেই সমস্ত মানুষ এতটাই হতদরিদ্র ছিলেন যে, পথেই তাদের দিন গুজরান হত। যাদের কথা ভেবে মাদার রাস্তায় নেমেছিলেন, তাদের একটা গোটা দিনের রোজকার ছিল সামান্য সিকি বা আধলা, যার মূল্য ছিল ১ পয়সার থেকেও কম। সেই বেহাল অর্থনৈতিক অবস্থায়, যখন মানুষ খেতে পাচ্ছে না, একের পর এক দাঙ্গা হচ্ছে, আগুন জ্বলছে কলকাতার রাস্তায় রাস্তায়— সেই সময় সামান্য কিছু অর্থ সম্বল করে মাদার বেরিয়ে পড়েছিলেন ভগবানের আদেশ পালনের উদ্দেশ্যে। তিনি মনে করতেন, যেন ভগবানের আদেশ অমান্য করে প্রভু যিশুকে অপমান করছেন— বেদনা দিচ্ছেন। তাঁর জেদের কাছে হার মেনেছিল খিদের আগুন। সমস্ত অন্ধকারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন, জয় করেছিলেন নিজের কর্ম এবং ত্যাগকে হাতিয়ার করে। যারা ভুল পথে চালিত হতে পারত, তাদের ফিরিয়ে এনেছিলেন জীবনের সৎ পথে।

আরও পড়ুন: খাদ্য-আন্দোলন: শহিদ দিবস

How beliefs have shaped her identity - 2B Religion: Mother Teresa

প্রথম পর্বের প্রসঙ্গেই ফেরা যাক। আলোচিত হয়েছিল মাদারকে নিয়ে লেখা বই ‘কাম বি মাই লাইট’। খ্রিস্টধর্মে মানুষের ৭টি পাপের কথা বলা আছে। The Seven Deadly Sins তথা Lust (কাম), Gluttony (পেটুক), Greed (লোভ), Sloth (আলস্য), Wrath (ক্রোধ), Envy (ঈর্ষা) এবং Pride (অহংকার)। এটা অনেকটাই হিন্দু ধর্মের ষড়রিপু অর্থাৎ কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ এবং মাৎসর্য-এর মতো। মাদারও তাঁর কাজের ক্ষেত্রে এরকমই ৭টি দোষ অথবা শত্রুর নাম বিভিন্ন সময়ে উল্লেখ করেছেন। এগুলি ছিল তাঁর চোখে evil বা শয়তান। তিনি বলতেন, তাঁর লড়াই ছিল against Seven D’s বা ৭টি পাপের বিরুদ্ধে। মাদারের এই Seven D’s হল যথাক্রমে— Darkness (অন্ধকার), Dryness (শুষ্কতা), Desolation (একাকীত্ব), Doubt (সন্দেহ), Disbelief (অবিশ্বাস), Depression (বিষন্নতা) এবং Despair (হতাশা)।

Mother Teresa to be made a saint in September | News | The Guardian

এহেন মাদারকেও অনেকেই নাস্তিক বলেছেন। ভগবানের প্রতি তার চিন্তা-ভাবনার দিকে প্রশ্ন তুলেছেন। ক্রিস্টোফার হিচিন্স রচিত বই ‘গড ইস নট গ্রেট’ নাস্তিকতারই উদাহরণ। তাই তাঁর বইয়ে মাদারের প্রতি যে প্রশ্নচিহ্ন, তাকে অযৌক্তিক বলা যায় না। কিন্তু ভগবান-নিবেদিত প্রাণ অনেক মানুষ মাদারের দিকে যে প্রশ্নবাণ নিক্ষেপ করেছেন, তা সত্যিই আশ্চর্যের। তাঁর মাদারের উদেশ্যে প্রশ্ন করেছেন, যে মাদার যদি মনে করেই থাকেন যে ভগবান তাঁর অন্তরে নেই, তাহলে তিনি কি আদৌ যিশুর প্রতি বিশ্বাসী ছিলেন! তাহলে তিনি একজন যাজক কীভাবে হলেন! একবার মাদার নিজেকেই দোষারোপ করে লিখেছিলেন— ‘আই হ্যাভ নো ফেইথ’। সেই ক্ষেত্রেও ধর্ম এবং যিশুর প্রতি তাঁর নৈকট্য এবং বিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এর থেকেই প্রমাণিত হয় যে, কিছু মানুষ সবসময়েই নিন্দা করার সুযোগ খুঁজতেই পছন্দ করেন। আর অন্যদিকে অটল মাদার নিজের কাজ করে গেছেন। মানুষের নিন্দা, প্রশ্ন, অবিশ্বাস— কোনও কিছুই তাঁকে টলাতে পারেনি, তিনি নিজের লক্ষ্যে সর্বদাই অবিচল থেকেছেন। মনের অবিশ্বাস এবং অন্ধকারকে জয় করে এগিয়ে গেছেন ঈশ্বর নির্দেশিত পথে।

0000171692-002 | Mother teresa, Mother theresa, Mother teresa quotes

নিজেকে প্রশ্ন করাটা সকল মানুষেরই প্রয়োজন। মাদারও নিজেকেই প্রশ্নবানে বিদ্ধ করেছেন। আসলে আমরা সকলেই তো সন্দেহ প্রকাশ করে থাকি। মাদারও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। প্রথমে তারও সন্দেহ হয়েছিল যে, তিনি পারবেন তো ভগবানের আদেশ পালন করত? আসলে ভগবান তো তাঁকে আদেশ করেছিলেন অনুরোধের সুরে। যে অনুরোধ মাদার ফেলতে পারেননি। কলকাতার রাজপথে বারবার বিভিন্ন যন্ত্রণায় বিদ্ধ হয়েছেন। নিজেকে সন্দেহ করেছেন, নিজের কর্মক্ষমতাকে সন্দেহ করেছেন। ভগবান তাকে ত্যাগ করেছেন— এই সন্দেহে চোখের জল ফেলেছেন, হাহাকার করেছেন। এবং নিজের সকল শক্তি, জেদ একত্রিত করে কর্মপূরণের মাধ্যমে প্রভু যিশুকে হৃদয়ে আকঁড়ে, আগলে রেখেছেন।

মাদারের মধ্যে যে দ্বিধাবোধ ছিল, সেটা বর্তমানে আমাদের সকলের মধ্যেই আছে। এই ২০২০-তে দাঁড়িয়ে আমরা অনেকেই ভগবানের ওপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছি। প্রযুক্তির উন্নতি আমাদের ঠেলে দিয়েছে অন্য এক বিলুপ্তির পথে। আমাদের সব কিছুই গ্রাস করেছে বস্তুবাদী এবং প্রযুক্তিগত জীবন। ভগবান বা ধর্মের থেকে অনেক বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে অন্তর্জালের ধারাবাহিক চিত্র। আমরা হারিয়ে ফেলেছি শান্তি, একাত্মতা এবং জীবনের সমস্ত দীনতা। যেভাবে আমরা দৈনন্দিন প্রশ্ন করছি নিজেদের বেঁচে থাকাকে, নিজেদের অস্তিত্বকে; ঠিক একইভাবে মাদার প্রশ্ন করেছিলেন নিজের ঈশ্বরকে। প্রভু যিশুর উত্তরে কোনও এক অনামি আগনেস রোসবাড উত্তীর্ণ হয়েছিলেন মাদার টেরেসা রূপে।

তৃতীয় এবং অন্তিম পর্ব ৫ সেপ্টেম্বর…

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

  • Dr. Subhransu Roy

    খুবই প্রাসঙ্গিক লেখা। পরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *