মা টেরেসা ও তাঁর সন্তানেরা (অন্তিম পর্ব)

১৯১০ সালের ২৬ আগস্ট জন্মেছিলেন মাদার টেরেসা। এই পুণ্যাত্মা ইহলোকের মায়া ত্যাগ করেন ১৯৯৭ সালের আজকের দিনে, ৫ সেপ্টেম্বর। ২৬ আগস্ট থেকে ৫ সেপ্টেম্বর, ‘মাদার-পক্ষে’ Mysepik তুলে ধরল মাদার টেরেসা সম্পর্কে একটি ধারাবাহিক। আজ তৃতীয় তথা পর্ব। লিখছেন অনিন্দ্য বর্মন

সত্যিই। মাদারের ক্ষেত্রে আমরা কতটুকুই বা জানি! বাঙালি সারাজীবন মাদার টেরেসাকে একজন মহান পুণ্যাত্মা, মানুষের কল্যাণরূপী নারী— ইত্যাদি পরিচয়েই চিনে এসেছে। কিন্তু তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আলোচনা বা চর্চা প্রায় কিছুই নেই। সেই সূত্রেই ফিরে যাব প্রথম পর্বে বর্ণিত ফাদার ব্রায়ান কোলদিজুক-এর সাক্ষাৎকারের আলোচনায়। জেমস মার্টিন-এর সঙ্গে আলচনায় ফাদার ব্রায়ান মাদারের চিঠিপত্রের উল্লেখ করে তুলে ধরেছিলেন মাদার সম্পর্কিত আরও অনেক অজানা তথ্য। একটি চিঠিতে মাদার লিখেছিলেন যে, শহরের রাজপথে মাদার বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে যিশুর সঙ্গে তাঁর আলাপচারিতার কথা তুলে ধরেছেন। আলোর দিশারি হয়ে মাদারকে কলকাতার রাজপথের ক্ষুদ্র যিশুদের চিনতে সাহায্য করেছিলেন ভগবান যিশু। ঠিক অস্কার ও্যাইল্ড-এর লেখা সেলফিশ জায়েন্ট গল্পটির মতোই কলকাতার নিপীড়িত শিশুদের মধ্যে ভগবানের একাংশকে খুঁজে নিয়েছিলেন মাদার। মনে জাগা প্রতিটি দ্বিধা-দ্বন্দ্বের ব্যাখ্যার জন্য আশ্রয় করেছিলেন প্রভু যিশুর আদেশবাণী।

আরও পড়ুন: মা টেরেসা ও তাঁর সন্তানেরা (প্রথম পর্ব)

অনেকেই একটা সময় প্রশ্ন করেছিলেন যে, মাদারের কষ্টের সময় কোনও খ্রিস্টান গির্জা তাঁকে সাহায্য করেননি কেন? মুশকিল হল, মাদার ব্যক্তিগতভাবে কোনও গির্জার অধীনে ছিলেন না। তিনি কাজ করতেন স্বতন্ত্রভাবেই। কিন্তু আড়ালে থেকে বহু মানুষই তাঁকে সাহায্য করেছেন, অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। যেমন ফাদার নিউনার। ১৯৬১ সালে ফাদার নিউনার মাদারকে পরামর্শ দেন যে তিঁনি যা করছেন তার সামাজিক এবং আত্মিক – দু’টো দিকই সমান বিদ্যমান। এই ঘটনার পর মাদার এক অন্য চেতনার স্রোত তৈরি করতে সক্ষম হন। তিঁনি বলতেন যে প্রভু যিশু ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার থেকেও বেশি যাতনা পেয়েছিলেন স্বর্গে। কারণ মানুষের দৈনন্দিন যন্ত্রণার সঙ্গী না হতে পারা, বা তাঁর মতাদর্শকে সম্বল করে বেঁচে থাকা মানুষের পীড়া দূর করতে না পারাটাই প্রভু যিশুর সবথেকে বড় কষ্টের কারণ।

আরও পড়ুন: মা টেরেসা ও তাঁর সন্তানেরা (দ্বিতীয় পর্ব)

ফাদার ব্রায়ান যখন মাদারের সঙ্গে কাজ করতেন, তিনি উপলব্ধি করেছেন টেরেসা হওয়া কোনও সহজ কাজ নয়। কাছে আশা প্রত্যেকটি মানুষের বিভিন্নরকম প্রত্যাশা এবং চাহিদার ভারবহন করা এক দুঃসাধ্য ব্যাপার। একইসঙ্গে বিভিন্ন মানুষকে স্বহস্তাক্ষর, আশীর্বাদ, উপদেশ অথবা পরামর্শ দেওয়ার অতো কঠিন কাজ অক্লেশে হাসিমুখে একমাত্র মাদার টেরেসাই করতে পারতেন। এই প্রতিটা মুহূর্ত মাদার যেন ভীষণ উপভোগ করতেন। ফাদার ব্রায়ান মনে করেন, যেন প্রত্যেক প্রাতে প্রভু যিশুর আদেশ সম্বল করে মাদার কাজে নামতেন এবং প্রতি রাতে তাঁর সকল দুঃখ, ক্লান্তি, ক্লেদ সংগ্রহ করে প্রভু যিশু তাঁকে অনাবিল আনন্দে ভরিয়ে তুলতেন, অনুপ্রাণিত করতেন। আজকের যুগে দাঁড়িয়ে এই উপলব্ধি সহজ নয়। কিন্তু কলকাতার মিশনারিজ অফ চ্যারিটির বাড়িটিতে যাঁরা মাদারের সঙ্গে কাজ করেছেন, একসঙ্গে থেকেছেন, তাঁদের পক্ষে এই উপলব্ধি যেমন সহজ, তেমনই দুর্লভ।

7 facts about Mother Teresa and why she won the Nobel Peace Prize -  Education Today News

উক্ত বিষয়টি বোঝাতে ফাদার ব্রায়ান মাদারের সঙ্গে তাঁর পরিচিতির ২০টা বছরকে উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তাঁর চোখে মাদার একজন স্নিগ্ধ নারী। কাজের ক্ষেত্রে মাদার ছিলেন প্রচণ্ড কড়া, তাঁর অধীনে থাকা সিস্টাররা সবসময় তাঁর আদেশ পালনে ছিলেন তৎপর। আবার মাতৃসম ভালোবাসায় তাঁদের প্রত্যেকের খেয়াল রাখতেন মাদার। তিনি ছিলেন সবার মাদার, ছোট থেকে বড়, শিশুদের কাছে, তাঁর সিস্টারদের কাছে, সহকর্মীদের কাছে, এমনকী তাঁর সমবয়সি বৃদ্ধরাও তাঁকে সসম্মানে ‘মাদার’ বলেই ডাকতেন। ওনার এই ব্যক্তিত্ব এবং উপস্থিতি সম্ভ্রম ছাড়া আর কিছুই দাবি করে না। আবার অন্যদিকে মাদার ছিলেন অত্যন্ত সাধারণ এক মানুষ। প্রত্যেকটি খুঁটিনাটির প্রতি তাঁর ছিল বিশেষ নজর। হোলি ওয়াটার (খ্রিস্ট ধর্মের হিসেবে পবিত্র শান্তির জল) বহন করা থেকে শুরু করে প্রত্যেকটি কাজ তিনি করতেন অত্যন্ত সুচারুভাবে। অহংকার বা দাম্ভিকতার লেশমাত্রও ছিল না তাঁর আচরণে। তাঁর পর্যবেক্ষণ ছিল খুবই ভালো, কোনও কাজ তাঁর দৃষ্টি এড়াতো না। বাচ্চারা অথবা সিস্টাররা কী করছে, কী খাচ্ছে, কী পড়ছে; সেইদিকে মাদার বিশেষ নজর রাখতেন।

Thugs Assault Mother Teresa's Nuns in Argentina, Just Days Before Her  Canonization

১৯৬১-তে ফাদার নিউনারের থেকে পরামর্শ নেওয়ার পর মাদারের জীবনে যে পরিবর্তনগুলো এসেছিল, তা তাঁর লেখনীতে তুলে ধরেছেন জেমস মার্টিন। সেই পরামর্শ মাদারকে দু’টো জিনিস চিনতে সাহায্য করেছিল— প্রথমত ক্রশবিদ্ধ, রক্তাক্ত এবং একলা যিশুকে বুঝতে পেরেছিলেন মাদার। এবং সেই পথে হেঁটেই সমাজ থেকে কার্যত ছেঁটে ফেলা, অবৈধ বা অপরিষ্কার গরিবগুর্বোদেরকে চেনার বা তাঁদের জন্য কিছু করার প্রয়োজনটা আত্মিকভাবে মাদার উপলব্ধি করেছিলেন। সেইসময়ের একটা লেখা— ‘আই হ্যাভ কাম টু লাভ দ্য ডার্কনেস’-এ মাদার ব্যাখ্যা করেছিলেন যে, সঠিক দিশা না পেয়ে তিনি কেমনভাবে পথভ্রষ্ট হয়েছিলেন এবং সামান্য কিছু উপদেশ আবারও কীভাবে তাঁকে অনুপ্রাণিত করে। এইক্ষেত্রে ফাদার নিউনারের পরামর্শের সার্থকতা উপলব্ধি করেছিল হাজার হাজার দুস্থ, নিপীড়িত শিশু। তবুও তারপরেও মাদার স্বীকার করেছেন যে তিনি আবার পথভ্রষ্ট হয়েছেন। ১৯৬৭-তে ফাদার নিউনারকে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন— ‘ফাদার আমি আওনাকে জানাতে চাই যে, কতটা যন্ত্রণায় আছি। আমার আত্মা প্রভুর জন্য কাঁদছে— তাঁকে ছাড়া এই যে যন্ত্রণা, তা আমি ব্যক্ত করতে পারছি না।’

গবেষক শুভ্রাংশু রায়ের সংগ্রহ থেকে

মাদার জানতেন তাঁর অবস্থান— একদিকে বিশ্ব তাঁকে সাধু, সন্ত, সেইন্ট রূপে দেখে, সম্মান করে আর অন্যদিকে তিনি নিজস্ব বিশ্বাস এবং আবেগে জর্জরিত। কখনও ভেবেছেন যে দ্বিচারিতা করছেন, আবার কখনঅও ভেবেছেন যে সবার সামনে এই কথাগুলি বলবেন। প্রতিদিন, নিজের মতামত, সিদ্ধান্ত এবং বিশ্বাসকে প্রশ্ন করেছেন। নিজের লেখা প্রতিটা চিঠিতেই ব্যক্ত করেছেন এই দ্বিধার কথা। মাদারের এই সমস্ত লেখা হারিয়ে গেলে পৃথিবীর মানুষ জানতেই পারত না যে মাদার নিজে ঠিক কতটা ব্যথিত ছিলেন। এর একটা কারণ হয়তো এই যে মাদার সর্বপ্রথম একজন মানুষ। চঞ্চল চিত্ত, অস্থির মতির একজন সাধারণ মানুষ। ১৯৪৮-এ মাদার কলকাতার আর্ক বিশপকে চিঠিতে লিখেছিলেন যে, তিনি আর অপেক্ষা করতে রাজি নন— তিনি সত্বর রোমে যেতে চান। আর নিজের লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে পরবর্তী ৩০ বছরে তিনি বন্দিত হয়েছেন সারাবিশ্বে। পেয়েছেন নোবেল শান্তি পুরস্কার। ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষ থেকে হয়ে উঠেছেন প্রথমে মাদার এবং পরে সেইন্ট টেরেসা।

গবেষক শুভ্রাংশু রায়ের সংগ্রহ থেকে

১৯৯৭-এর ৫ সেপ্টেম্বর, ৮৭ বছর বয়সে প্রয়াত মাদার। কিন্তু তার আগে, আরও অনেক কাজের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন তিনি। ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ অবধি ঘুরেছেন বহু দেশ এবং মহাদেশ। ইউরোপ, উত্তর এবং দক্ষিণ আমেরিকার অনুন্নত দেশগুলিতেও কাজ করেছেন মাদার। তবে ১৯৯০ পরবর্তী সময়ে তাঁর শরীর ভাঙতে শুরু করে। একের পর এক হার্ট অ্যাটাক, নিউমোনিয়া, ম্যালেরিয়া এবং অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হন। বাধ্য হয়েই ১৩ মার্চ ১৯৯৭-তে মিশনারিজ অফ চ্যারিটির সমস্ত কাজ থেকেই স্বেচ্ছাবসর নেন। সেই সময় তাঁর সঙ্গে কাজ করছিলেন প্রায় ৪০০০ সিস্টার, যাঁদের ছিল পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে কাজ করবার অভিজ্ঞতা। পৃথিবীর ১২৩টি দেশে মোট ৬১০টি শাখা ছিল মিশনারিজ অফ চ্যারিটির। বিভিন্ন সামাজিক কাজের মধ্যে ছিল এইচআইভি, কুষ্ঠ এবং যক্ষ্মায় আক্রান্তদের জন্য বাসস্থান নির্মাণ, খাদ্য পরিবেশন, শিশু-পরিবার মানসিক কাউন্সেলিং, অনাথাশ্রম এবং বিদ্যালয় নির্মাণ। মৃত্যু পরবর্তীতে মাদারের দেহ ৭ দিন সংরক্ষিত হয়েছিল কলকাতার সেইন্ট টমাস চার্চে। মাদারের অন্তিমক্রিয়া সম্পন্ন করেছিলেন পোপ জন পল (দ্বিতীয়) প্রেরিত প্রতিনিধি কার্ডিনাল সেক্রেটারি অফ স্টেট অ্যাঞ্জেলো সোদানু। তৎকালীন রাষ্ট্রসংঘ (ইউনাইটেড নেশন্স)-এর সেক্রেটারি জেনারেল জেভিয়ার পেরেজ দ্য কয়লার মাদারের মৃত্যুতে শোকজ্ঞাপন করে বলেছিলেন— মাদার টেরেসা ছিলেন রাষ্ট্রসংঘের প্রতীক এবং উদাহরণ। পৃথিবীতে তিনি ছিলেন শান্তির দেবী।

Mother Teresa's Road to Sainthood

বিভিন্ন অনলাইন জার্নালে প্রকাশিত জেমস মার্টিন, ফাদার ব্রায়ান-এর লেখা এবং অন্যান্য তথ্য সংগৃহীত করে তিনটি পর্বে ‘মা টেরেসা ও তাঁর সন্তানেরা’ লেখাটি রচিত হয়েছে।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *