মা টেরেসা ও তাঁর সন্তানেরা (প্রথম পর্ব)

১৯১০ সালের ২৬ আগস্ট জন্মেছিলেন মাদার টেরেসা। এই পুণ্যাত্মা ইহলোকের মায়া ত্যাগ করেন ১৯৯৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর। তাই ২৬ আগস্ট থেকে ৫ সেপ্টেম্বর, ‘মাদার-পক্ষে’ Mysepik তুলে ধরল মাদার টেরেসা সম্পর্কে একটি ধারাবাহিক। লিখছেন অনিন্দ্য বর্মন

ভাষা এক খরস্রোতা নদীর। দেশ, কাল, সমাজের গণ্ডি ভেঙে বয়ে চলেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী। একই শব্দ, বিভিন্ন প্রদেশে পালটে গেছে চলতি নিয়মে। সংযুক্ত করেছে একাধিক ভাষ্য। যেমন ভারতীয় রীতিতে সংস্কৃত ভাষায় ‘সৎ’ শব্দের প্রথমায় বহুবচন সন্তঃ। প্রচলিত বাংলায় ‘সন্ত’ শব্দটি ব্যবহার হয়। ভারতবর্ষে এই শব্দটির ব্যবহার শুরু হয়েছে আনুমানিক ষোড়শ শতাব্দীর প্রথমভাগে। আবার এই একই শব্দ পাওয়া যায় ইউরোপীয় ভাষ্যে। গ্রিক শব্দ ‘হ্যাগিওস’ অর্থাৎ ‘হোলি বা পবিত্র’ শব্দটির লাতিন অনুকরণে একটি শব্দ তৈরি হয়— ‘স্যাঙ্কটাস’। পরবর্তীতে ফরাসি ভাষ্যে এই শব্দটি হয়ে যায় ‘সেইন্ট’। এই শব্দটিই ছড়িয়ে পড়ে সারা পৃথিবীতে। সেইন্ট অর্থে যা কিছু সৎ এবং পবিত্র। ভারতবর্ষেও এই সেইন্ট শব্দটি চলতি ভাষ্যে সন্ত হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে বোঝানো হয় সাধুপুরুষ। পৃথিবীর দুই প্রাচীন ভাষা— সংস্কৃত এবং লাতিন— সব গণ্ডি পেরিয়ে অদ্ভুতভাবেই মিশে গেছে একে-অপরের সঙ্গে।

এত কথা লেখার কারণ আজ যাঁকে নিয়ে লিখছি, তিনি মৃত্যু পরবর্তী সময়ে সেইন্ট বা সন্ত আখ্যা পেয়েছেন। ভাটিকানের প্রধান যাজক পোপ ফ্রান্সিস ২০১৬ সালের ৪ সেপ্টেম্বর তাঁকে মরণোত্তর সেইন্টহুড প্রদান করেন। সেই মানুষটিকে আমরা একডাকে মাদার টেরেসা বলে চিনি। ১৯৪০ পরবর্তীতে কলকাতার রাস্তায় দেখা যেত এক তরুণীকে। দুস্থের সেবায়, আর্তের সহায় ছিলেন সেই তরুণী। ’৩০এর দশকে এন্টালির লোরেটো স্কুলের শিক্ষিকা আগনেস রোসবাড বেরনাই (আসলে, অ্যাঙশিয়ু গউঙ্গে বুজুয়ো) হয়ে উঠেছিলেন সিস্টার টেরেসা। এরপর তাঁর কাজ, মিশনারিজ অফ চ্যারিটির প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে আমরা সকলেই অবহিত। মাদার তাঁর জীবনে ভূষিত হয়েছে র‍্যামন ম্যাগসেইসেই পুরস্কার (১৯৬২), নোবেল শান্তি পুরস্কার (১৯৭৯) এবং ভারতরত্ন (১৯৮০) পুরস্কারে। এই লেখায় মাদার সম্পর্কে কিছু অজানা তথ্য তুলে ধরাই প্রধান লক্ষ্য।

Mother Teresa Quotes (@mteresaquotes) | Twitter

মাদার টেরেসা

২০০৭ সালে মাদারে অপ্রকাশিত লেখা এবং চিঠিপত্রের একটি সংকলন প্রকাশিত হয়। নাম ‘কাম বি মাই লাইট’। পরবর্তীতে প্রকাশিত হয় দ্বিতীয় সংকলন ‘আ কল টু মার্সি’। দু’টি বই-ই সম্পাদনা করেছিলেন মিশনারিজ অফ চ্যারিটির এক কানাডিয়ান সদস্য ফাদার ব্রায়ান কোলদিজুক। বই প্রসঙ্গে তিনি একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন— “যিশুকে ধন্যবাদ যে কিছু মানুষ মাদারের এই লেখা এবং অন্যান্য জিনিস বাঁচিয়ে রাখার কথা ভেবেছিল। এর বেশিরভাগই হচ্ছে ফাদার ভ্যান আক্সেমের দান। কলকাতায় তিনিই ছিলেন এক অনামা তরুণীকে মাদার টেরেসায় পরিবর্তিত করার প্রধান কাণ্ডারি। তাঁরই ছত্রছায়া এবং পরামর্শে মাদার এক অতিমানবী হয়ে উঠেছেন। এছাড়াও আমি আরও কিছু মানুষের নাম করব। যেমন— আর্কবিশপ পেরিয়ার (তৎকালীন কলকাতার প্রধান পাদ্রি), ফাদার (পরবর্তীতে কার্ডিনাল) পিকাচি এবং ফাদার নিউনার। এনাদের স্পর্শেই মাদার অন্যভাবে অনুপ্রাণিত হন। আমরা যিশুর ভালোবাসা এবং কোমলতার এক অকল্পনীয় রূপ মাদারের মধ্যে দেওখতে পাই।”

Mother Teresa wasn't a saintly person – she was a shrewd operator ...

“মূল কথা হল, মাদারের এই লেখাগুলি সংরক্ষিত হয়েছিল। সংকলনের কাজ শুরু করার পর বুঝতে পারি যে, প্রায় ৭০ বছর ধরে সংরক্ষিত এই সব লেখা কতটা মূল্যবান। কলকাতার বিভিন্ন জায়গায়, এমনকী আর্কবিশপের বাড়িতে খুঁজে শেষমেশ এই সমস্ত লেখা সংগৃহীত হয়। এই সংকলনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল— আজ থেকে ৫০ বছর পরও সবাই জানতে পারবেন যে, মাদার সর্বসাধারণের জন্য কী করে গেছেন। তাঁর জীবন, দীক্ষা এবং তাঁর সহকর্মী যেমন আমাদের তথা বিশ্বে যে কী প্রভাব বিস্তার করেছে, তা বলে বোঝানো যায় না। অনেকেই চেয়েছিলেন যে, মাদারের এই লেখাগুলি প্রকাশিত হোক। কিছু টুকরো লেখা এর আগে প্রকাশিত হয়েছিল। ফাদার নিউনারও কিছু প্রকাশ করেন। কিন্তু ‘কাম বি মাই লাইট’-এর মতো এতো ব্যপ্তি তাতে ছিল না। অন্ধকার থেকে আলোয় উৎসরিত হওয়ার পথ দেখিয়ে গিয়েছিলেন মাদার।”

Amazon.in: Buy Come Be My Light: The Private Writings of the ...

যিনি ফাদার ব্রায়ান কোলদিজুকের এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন, সেই জেমস মার্টিনও পরবর্তীতে একটি প্রবন্ধে এই কথা লেখেন। তিনি এও বলেন যে, ১৯৪৬ সালে মাদার ট্রেনে করে দার্জিলিং যান। সাধারণ ছুটি কাটাতেই গিয়েছিলেন। কিন্তু ফেরেন এক স্বর্গীয় অনুভূতির সাক্ষী হয়ে। যেন নিজের অন্তরে উপলব্ধি করেছিলেন স্বয়ং যিশুর বাণী। যা তাকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। যেন স্বয়ং যিশু তাঁকে বলছেন— যাও, সমাজে যাঁরা গরিব, পীড়িত, নিপীড়িত; তাঁদের পাশে গিয়ে দাঁড়াও। যেন যিশু তাঁকে প্রশ্ন করেন— তুমি করবে তো? নাকি তারা সারাজীবন নিপীড়িত পরাজিতের গ্লানি বয়ে বেড়াবে? মাদার সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে, নিজের সমস্ত ত্যাগ করে, লোরেটো ত্যাগ করে রাজপথে নামেন এবং এক নতুন যাত্রা শুরু করেন। স্থাপিত হয় মিশনারিজ অফ চ্যারিটি।

No, That Is NOT a Picture of Mother Teresa as a Teenager

মার্টিনের মতে, এই ছিল মাদারের অন্ধকার থেকে আলোর উদ্দেশ্যে যাত্রার শুরু। ধার্মিক মতে যাঁরা দীন, আর্তের সেবা করে থাকেন, তাঁরা ভক্তিভরে যিশুকে স্মরণ করেন। আর মাদারের ক্ষেত্রে তাঁকে স্বয়ং যিশুই যেন করে তুলেছিলেন দয়া এবং মানবিকতার অবতার। কীভাবে নিজের সর্বস্ব ত্যাগ করেও যিশুর দেখানো পথে মাদার জীবনের সমস্ত আনন্দ, জয় এবং ভালোবাসার পথ খুঁজে নিলেন, তা হয়তো মাদার নিজেও সেইসময় বুঝে উঠতে পারেননি। তিনি কলকাতার রাজপথে, অলি-গলি কানাঘুঁজিতে চিনে নিয়েছিলেন অন্ধকারের সূত্র এবং নিপীড়নের উৎস। সঙ্গী ছিল যিশুর প্রতি একাত্ম প্রার্থনা এবং মানসিক জেদ। তিনি যিশুর আদেশ পালন করবেন। যিশুর বাণী সফল করবেন।

Let us Love One Another- by: Mother Teresa | Mother teresa, Mother ...

১৯৫১-তে তিনি লিখেছিলেন যে, তাঁর পানপাত্র যিশুর দেওয়া ব্যথা এবং যন্ত্রণায় ভরপুর। এই পানীয়ই তাঁকে এগিয়ে চলার ইন্ধন জুগিয়ে চলেছে সর্বক্ষণ। আর এই টুকরো টুকরো লেখা জুড়েই সৃষ্টি হয়েছে ‘কাম বি মাই লাইট’। যার থেকে নিজের সন্ন্যাসিনী জীবনে নামের সার্থকতা পেয়েছিলেন, সেই টেরেসা অফ অ্যাভিলা-র মতোই তার ওষ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল— প্রার্থনার উত্তর পেলে যন্ত্রণা হয়। উত্তর না পেলে যন্ত্রণার সঙ্গে চোখে জল জমে ওঠে। নির্বাক প্রার্থনায় সেই জল স্রোতের আকার নেয়। যাতে শুধুই লেখা থাকে নিপীড়িতের আর্তি।

Mother Teresa – Yousuf Karsh

চলবে…

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *