মৃণাল সেনের ‘ইন্টারভিউ’: মধ্যবিত্তের সংকট

রাহুল দাশগুপ্ত

ঋত্বিক ঘটক এবং সত্যজিৎ রায়, ভারতীয় সিনেমার সর্বোচ্চ দুই শিখরের পাশাপাশি, একই সময়ে, একের পর এক সিনেমা করে গেছেন মৃণাল সেন। সিনেমার ভাষাশিল্পী হিসাবে তিনি নিশ্চয়ই বাকি দু’জনের সমকক্ষ নন। কিন্তু তবু নিজেকে তিনি নির্ভুলভাবেই চিহ্নিত করে গেছেন। তাঁর পথ একান্তভাবেই তাঁর নিজস্ব, স্বতন্ত্র, মৌলিক। সে পথে ভারতীয় সিনেমায় তাঁর আগে কেউ হাঁটেননি। তিনি তাই করে দেখিয়েছেন, যা একমাত্র তিনিই করতে পারতেন। তিনি অন্য কারো মতো নন। মৃণাল সেন কারো মতো করে সিনেমা করার চেষ্টা করেননি। তিনি নিজের মতো করে পথ তৈরি করে নিতে চেয়েছেন। ঐতিহ্য সৃষ্টি করে যেতে চেয়েছেন। এই ঐতিহ্যেরই এক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টি, ১৯৭১ সালে করা তাঁর ছবি, ‘ইন্টারভিউ’।

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (১ম অংশ)

গোড়া থেকেই মৃণাল সেন সাহসী, অদম্য এবং বেপরোয়া। সত্যজিৎ রায় সারাজীবনই কাহিনিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। একটি নিটোল গল্প থাকে তাঁর সিনেমাগুলিতে। যদিও শেষদিকে কাহিনি-প্রধান আখ্যান থেকে বেরিয়ে এসে তিনি কিছু কিছু ‘ডিসকোর্স’ রচনা করার চেষ্টা করেছেন। ঋত্বিক ঘটকের আখ্যানগুলিতে ফর্ম নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা অনেক বেশি। কিন্তু সেখানেও তিনি একটা প্লটকে অনুসরণ করেছেন। একমাত্র নিজের শেষ সিনেমা ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’য় তিনি পুরোপুরি প্লটকে অস্বীকার করেছেন। মৃণাল সেন কিন্তু প্রায় প্রথম থেকেই প্লটকে পাত্তা দেননি। কোনো নিটোল গল্প বলতে চাননি। বরং নিটোল গল্প বলার কায়দাটিকেই আক্রমণ করতে চেয়েছেন। এ ব্যাপারে জঁ লুক গোদারের সিনেমাগুলির সঙ্গে তাঁর ছবিগুলির তুলনা করা যায়। কিন্তু গোদার তাঁর সিনেমাগুলি করেছেন ফরাসি দেশে। সেই দেশে শিক্ষিত, বোদ্ধা, সংস্কৃতিমান দর্শকের সংখ্যা অনেক বেশি। সাহিত্যে-সিনেমায় সেখানে নিরন্তর নানারকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়ে চলেছে। মৃণাল সেন তাঁর কাজগুলি করেছেন এক উত্তর-ঔপনিবেশিক ভূখণ্ডে, ভারতীয় ও খণ্ডিত বাংলার বাস্তবতায়। দর্শকদের কথা ভেবে নিজের রুচির সঙ্গে, আইডিয়ার সঙ্গে তিনি কোনও আপস করেননি। আঙ্গিককে নিজের ইচ্ছামতো ভেঙেচুরে দিয়েছেন। সিনেমার নির্মাণে তিনি যে সাহস ও উদ্ভাবনী শক্তি দেখিয়েছেন এক অপ্রস্তুত দেশে, অপ্রস্তুত দর্শকদের সামনে, তার থেকেই তাঁর কাজের গুরুত্বকে অনুভব করা যায়।

আরও পড়ুন: একটি লিটল ম্যাগাজিন ও মৃণাল সেন

মৃণাল সেনের সিনেমাগুলি প্রথম থেকেই আইডিয়া-নির্ভর। ঋত্বিক বা সত্যজিতের মতো মানবিক সম্পর্ক সেখানে গুরুত্ব পায়নি। ব্যক্তি, মানুষ, সম্পর্ক, জীবন নয়, কোনো একটা ইউনিক আইডিয়া তাঁকে তাড়িত করেছে। এবং সেই আইডিয়াকেই তিনি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। সেই আইডিয়াকে স্পষ্ট করে তোলার আয়োজনে নিজের সমস্ত উদ্যোগ তিনি ঢেলে দিয়েছেন। তাঁর সিনেমাগুলোয় হয়তো অনেক দুর্বলতা চোখে পড়বে। সেখানে সংলাপ সবসময় সবল নয়, যুক্তি দিয়ে বিচার করতে গেলে ঘটনা-পরম্পরায় অনেক ফাঁকফোকর চোখে পড়তে পারে। কিন্তু এই সবই শেষ পর্যন্ত গৌণ হয়ে ওঠে, মুখ্য হয়ে ওঠে স্রষ্টার নিজস্ব, মৌলিক বক্তব্য। তাঁর আইডিয়া। এই আইডিয়ার মধ্য দিয়ে সমাজের কোনো তীব্র অসংগতির দিকে তিনি দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চান। মৃণাল সেনের শ্রেণিচেতনা অত্যন্ত প্রখর। মানুষকে তিনি শ্রেণির নিরিখে বিচার করতে চান। তার শ্রেণিচরিত্রের বিড়ম্বনাগুলিকে স্পষ্ট করে তুলে ধরতে চান। এদিক থেকেও ঋত্বিক বা সত্যজিতের থেকে তিনি আলাদা। ঋত্বিক এক বিরাট ঐতিহাসিক, ঔপনিবেশিক ট্র্যাজেডিকে ধরতে চেয়েছেন। মানুষ নয়, ইতিহাসই তার মূল চরিত্র। অদ্বৈত মল্লবর্মণের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ যেন তাঁর নিজের সমগ্র চেতনার সারাৎসার, একটি রূপক। একটি জাতির আত্মপরিচয়ের স্বরূপ ও সর্বগ্রাসী ভাঙনের রূপরেখাটিকেই তিনি ধরতে চেয়েছেন।

আরও পড়ুন: মরণোত্তর দেহদান আন্দোলনের প্রাণ ব্রজ রায়

ঋত্বিক যদি মহাকাব্যের স্রষ্টা হন, সত্যজিৎ রায় তবে খণ্ড কবিতার মহৎ স্রষ্টা। তিনি ‘পথের পাঁচালী’র মতো এলিজি যেমন লিখেছেন, তেমনই ‘পরশপাথর’-এর মতো স্যাটায়ারও লিখেছেন। তাঁর চোখে দারিদ্র্যও কাব্যময় হয়ে ওঠে, ক্ষমতা হয়ে ওঠে প্রহসনের বিষয়। সমাজের বিভিন্ন স্তরকে তিনি স্পর্শ করতে চেয়েছেন এবং বৌদ্ধিকভাবে উত্তর-ঔপনিবেশিক পর্বের যুগযন্ত্রণাকেই তুলে ধরতে চেয়েছেন। সত্যজিৎ রায় অত্যন্ত পরিশীলিত, তাঁর সৌন্দর্যবোধের, পরিহাসপ্রিয়তার কোনো তুলনা নেই। ঋত্বিক ঘটকের বেদনা ও প্যাশন অপরিসীম, এডওয়ার্ড মুঙ্কের ‘আর্তস্বর’ (স্ক্রিম) চিত্রটির মতোই তাঁর ছবিগুলির মধ্য থেকেও যেন একটা আর্তস্বর অবিরাম উৎসারিত হতে থাকে। নান্দনিক বিচারে মৃণাল সেনের তুলনায় এই দু’জনের স্থান অনেক উচ্চে। কিন্তু মৃণাল সমাজের যে স্তরে নেমেছেন, যেভাবে শ্রেণিচরিত্র বিশ্লেষণ করেছেন, শ্ৰেণিবৈষম্যকে যেভাবে আক্রমণ করেছেন, উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজের অসংগতিগুলিকে কখনও ক্রোধে, কখনও রসিকতায় যেভাবে তুলে ধরেছেন, আঙ্গিক ও বিষয়ের দিক দিয়ে যে দুঃসাহস, অনমনীয় দায়বদ্ধতা, মৌলিকতা দেখিয়েছেন সেখানে তিনি অতুলনীয়।

আরও পড়ুন: রোগ এবং রোগমুক্তির পথ দেখিয়েছিলেন সত্যজিৎ

তাঁর প্রতিটি ছবিই যেন এক একটি ‘ডিসকোর্স’ হয়ে উঠতে চেয়েছে। তিনি প্রশ্নের পর প্রশ্ন তুলেছেন। ক্ষোভে ফেটে পড়তে চেয়েছেন। নিজের সমস্ত প্রশ্ন ও ক্ষোভ নিয়ে উত্তাল ঝড়ের মতোই আছড়ে পড়তে চেয়েছেন চালু সমাজব্যবস্থার শরীরে, তছনছ করে দিতে চেয়েছেন সমস্ত স্থিতাবস্থাকে। তার সিনেমাগুলিতে তাঁর এই অস্থিরতাকে প্রচণ্ডভাবে টের পাওয়া যায়। ক্রমাগত তিনি আক্রমণ করে গেছেন, অন্তর্ঘাত চালিয়ে গেছেন, বিপর্যস্ত করে দিতে চেয়েছেন সমাজের সাজানো-গোছানো, প্রসাধন-সর্বস্ব, মেকী চেহারাটিকে। বাইরের পালিশ তুলে তুলে ভেতরের ভাঙাচোরা, পূতিগন্ধময়, বিপন্ন নরকের স্বরূপটিকে উদ্‌ঘাটিত করতে চেয়েছেন। সিনেমা তাঁর কাছে অস্ত্রের মতোই হয়ে উঠেছে। এই সমাজকে বাইরে থেকে দেখতে যেমন একটা ড্রয়িংরুমের মতো সাজানো-গোছানো, তেমনই ড্রয়িংরুমের মতো নিটোল কাহিনি-সর্বস্ব, সাজানো-গোছানো সিনেমা তিনি তৈরি করতে চাননি। সিনেমার সাহায্যে তিনি যেন নিজের গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে গেছেন। আর তাই সিনেমার ছকে বাঁধা প্রকরণকে তিনি অনুসরণ করতে চাননি। বরং যুদ্ধের কায়দায় প্রয়োজন ও পরিস্থিতি অনুযায়ী তাকে দিয়ে এমন অদ্ভুত সব কাজ করিয়ে নিয়েছেন, যা এ দেশের সিনেমার ইতিহাসে একদমই অভিনব ও দুর্লভ। সরলরৈখিক, সাবলীল, মসৃণ ন্যারেটিভকে ভেঙেচুরে প্রকরণের এমন এক মৌলিক ও অস্বাভাবিক চেহারা তিনি দিয়েছেন, যা দিয়ে আক্রমণ করা যায়, অন্তর্ঘাত চালানো যায়, যুদ্ধের প্রয়োজনে যাকে ব্যবহার করা যায়। যা কখনোই স্বস্তি দেয় না, বরং অবিরাম অস্বস্তির ধারাবাহিকতা রচনা করে যেতে থাকে, দর্শকদের বিপন্ন ও আর্ত করে তোলে, রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত করে দিতে থাকে। জনপ্রিয়তার সস্তা ফর্মুলাগুলোকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেই নিজের সমান্তরাল আখ্যানগুলিকে রচনা করে গেছেন এই সৎ, দায়বদ্ধ শিল্পী।

আরও পড়ুন: একটি বিশুদ্ধ ইতরামি

‘ইন্টারভিউ’কে এই দৃষ্টিকোণগুলিকে মাথায় রেখেই বিচার করতে হবে। এই সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্র একজন অতি সাধারণ, তুচ্ছ, মামুলি, নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষ। নায়কোচিত কোনো গুণ নেই তার। সে একদম বাস্তব জীবন থেকে উঠে এসেছে। তার বাস্তবতা যেন তার সঙ্গে ছায়ার মতোই লেগে আছে। এই বাস্তবতা থেকে তাকে কখনোই আলাদা করা যায় না। এমনকী সিনেমার খাতিরেও নয়। তাকে যে ক্যামেরা প্রতি মুহূর্তে অনুসরণ করে চলেছে, সেই ক্যামেরাও এই বাস্তবতাকে স্বীকার করে, তাকে জিইয়ে রেখেই নিজের কাজ করে চলে, এই বাস্তবতার সঙ্গে তার কোনো বিরোধ নেই, বরং তাদের মধ্যে যেন একটা গোপন বোঝাপড়াই রয়েছে। এই মানুষটার বাস্তব জীবনে নাম রঞ্জিত মল্লিক, আর সিনেমাতেও সেটাই বজায় রয়েছে। অর্থাৎ সিনেমা ও বাস্তব তার মধ্যে একাকার হয়ে গেছে, তাদের মধ্যে কোনও দূরত্ব তৈরি হয়নি। এই মানুষটি নিজের আর্থিক উন্নতির, বেশি মাইনের চাকরির স্বপ্ন দেখে। কিন্তু সেই চাকরি পেতে গেলে তাকে পোশাক বদলাতে হবে। স্যুট-টাই পরতে হবে, পাক্কা সাহেব হতে হবে। তবেই তার উন্নতি সম্ভব। গোড়া থেকেই এই শর্তটি সে জানে। এবং সেই অনুযায়ী সক্রিয় হয়ে ওঠে।

আরও পড়ুন: প্রসঙ্গ: সত্যজিৎ রায়ের দু’টি সিনেমা

ক্রমেই বোঝা যায়, এই মানুষটি নিছক কোনও ব্যক্তি নয়, বরং একটা শ্রেণির প্রতিনিধি। এই শ্রেণি, উত্তর-ঔপনিবেশিক পর্বের মধ্যবিত্ত শ্রেণি। পোশাকও নিছক পোশাক নয়, বরং একটা অমোঘ প্রতীক। আত্মপরিচয়ের চিহ্ন। আর এখানেই রয়েছে মৃণাল সেনের একটি ইউনিক আইডিয়া। গোটা একটা শ্রেণির আত্মপরিচয়ের সংকটকে তিনি এই ছবিতে তুলে ধরতে চেয়েছেন। পোশাক একটি জাতির আত্মপরিচয়ের অন্যতম শর্ত। রোলাঁ বার্তকে অনুসরণ করে বলা যায়, চিহ্নক, সিগনিফায়ার। পোশাক, খাদ্য, ভাষা ইত্যাদি আত্মপরিচয়ের এরকম অনেক চিহ্নক ছড়িয়ে আছে। নিজের সেই আত্মপরিচয়কে বিসর্জন দিতে হবে। ধুতি-পাঞ্জাবি পরলে চাকরি জুটবে না। ‘আত্ম’কে বিসর্জন দিতে হবে। ‘অপর’কে মেনে নিতে হবে। নিজের বলে ভাবতে হবে। তার শ্রেষ্ঠত্বকে স্বীকার করে নিতে হবে। আন্তনিও গ্রামশ্চি একেই বলেছেন, হেজিমনি। অর্থাৎ শুধুমাত্র ক্ষমতার জোরে, বলপ্রয়োগেই নয়, বৌদ্ধিকভাবেও নিজেদের হীনতায় এবং অপরের উৎকর্ষতায় সম্মত হতে হবে। সেভাবেই গড়ে তোলা হবে গোটা পরিস্থিতি, রাজনৈতিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক। গোটা একটা শ্ৰেণিকে পোশাক বদলাতে বাধ্য করা হচ্ছে। আমূল রূপান্তর ঘটানো হচ্ছে তাদের। কাফকার ‘মেটামরফসিস’ গল্পটি যেন মনে পড়তে পারে। নিজের পোশাকে, অর্থাৎ প্রাক্‌-ঔপনিবেশিক ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয়ের পরিসরে তুমি বিপন্ন, ব্রাত্য, নিষিদ্ধ। মিশেল ফুকো যেমন বলেন, ক্ষমতাব্যবস্থার চোখে বাতিল ও প্রান্তিক, অপসারিত।

আরও পড়ুন­:­ মৃণাল সেনের ‘খণ্ডহর’ ও কালিকাপুর রাজবাড়ি

অতএব টিকে থাকতে গেলে গোটা একটা শ্ৰেণিকে নিজের আত্মপরিচয়কে বিসর্জন দিতে হবে। নিজের চিহ্নকগুলিকে প্রতিস্থাপিত করতে হবে অপরের চিহ্ন দিয়ে। পশ্চিমি কায়দায় হয়ে উঠতে হবে স্যুট-টাই পরা সাহেব। তবেই সে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে। টিকে থাকার যোগ্য বলে বিবেচিত হবে। নয়তো তাকে লুপ্ত হয়ে যেতে হবে। রঞ্জিত এই গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের অনেক চেষ্টা করে। কিন্তু শেষপর্যন্ত ব্যর্থ হয়। স্যুট-টাই জোগাড় করতে না পেরে ধুতি-পাঞ্জাবি পরেই সে ইন্টারভিউ দিতে যায়। কিন্তু এই পোশাক তার কোনও গ্রহণযোগ্যতাই তৈরি করতে পারে না। সে বাতিল হয়ে যায়। উপহাসের পাত্রে পরিণত হয়। আর এই ঘটনাই তার চোখ খুলে দেয়। উত্তর-ঔপনিবেশিকতার এক নারকীয় সত্যকে সে প্রত্যক্ষ করে। সে বুঝতে পারে, স্বাধীনতার নামে, ঔপনিবেশিকতা মোচনের নামে কী প্রকাণ্ড এক ধাপ্পাবাজির শিকার হয়েছে তারা। গোটা একটা শ্ৰেণিকে নিজের আত্মপরিচয়কে বিসর্জন দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। অপরের পরিচয়কে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে আত্মপরিচয়ের ওপর। মুখের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে মুখোশকে। আর সেই মুখোশকেই বেঁচে থাকার একমাত্র শর্ত বলে দাবি করা হচ্ছে। এর চেয়ে বড় প্রতারণা আর মিথ্যাচার আর কী হতে পারে?

গোটা সিনেমায় রঞ্জিতের মুখে বারবার ফিরে ফিরে আসে এক নিষ্পাপ, অমলিন হাসি। প্যাসোলিনির সিনেমাগুলোয় বিভিন্ন চরিত্রের মুখে এই হাসিকে দেখা যায়। এই হাসি নিছক হাসি নয়, প্রতীক, নিষ্পাপ, বিশুদ্ধ, অমলিন আত্মার প্রতীক। কিন্তু সিনেমার শেষে রঞ্জিতের মুখ থেকে সেই হাসি মুছে যায়। তার বদলে সেই মুখে ফুটে ওঠে প্রচণ্ড ক্রোধ। একটি ম্যানিকুইনকে পাথর ছুড়ে ক্রমাগত আক্রমণ করে চলে সে। এই আক্রমণটিও হয়ে ওঠে প্রতীকী। ওই সাজানো-গোছানো পুতুলটি আসলে হয়ে ওঠে এই সাজানো-গোছানো সমাজ-সভ্যতার প্রতীক। এই সমাজ-সভ্যতা আসলে একটা মস্ত ধাপ্পাবাজি ছাড়া আর কিছুই নয়। সেই ধাপ্পাবাজির অন্তরালে মানুষের আত্মা প্রতি মুহূর্তে লাঞ্ছিত হতে থাকে, মানুষের যোগ্যতা কোনও দাম পায় না, সেখানে একমাত্র বিবেচ্য হয়ে ওঠে মিথ্যে, কৃত্রিমতা, মেকী উপস্থাপনা, যার সাহায্যে মানুষ নিজেকে গ্রহণযোগ্য, উপযুক্ত করে তোলে। এক বুর্জোয়া, পুঁজিবাদী, নয়া-ঔপনিবেশিক সমাজ-ব্যবস্থায় গোটা একটা শ্রেণির রূপান্তর ঘটে চলেছে। আর এক রূপান্তরের পেছনে রয়েছে এক ভয়াবহ আপস। নিজেকে অস্বীকার করতে হবে, নিজেকে বিস্মৃত হতে হবে। হয়ে উঠতে হবে অবিকল অপরের মতো। তবেই তুমি একটি মসৃণ জীবনের মালিকানা পাবে। নয়তো তোমার স্থান হবে আস্তাকুঁড়ে।

‘ইন্টারভিউ’ ছবিতে এই আপস করতে চায়নি কেন্দ্রীয় চরিত্র। সে যেন হয়ে উঠেছে এক অস্তিত্ববাদী নায়ক। গোটা একটা যুগের প্রতিনিধি। নিজেকে বিপন্ন করে সে প্রশ্ন করতে চেয়েছে। একটি নকল, মেকী অস্তিত্বকে বহন করতে চায়নি সে। একটি মিথ্যে আত্মপরিচয়কে অস্বীকার করতে চেয়েছে। ফলে তাকেও ক্ষমতা-ব্যবস্থা প্রত্যাখ্যান করেছে। এই প্রত্যাখ্যানের মধ্য দিয়েই চলতি ব্যবস্থার অন্তঃসারশূন্যতা তার চোখে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সে বুঝতে পেরেছে, খাঁটি হয়ে, সত্য হয়ে, ‘আত্ম’কে বহন করে চললে এভাবেই তাকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে যেতে হবে। তাকে মেকী হতে হবে, মিথ্যে হতে হবে, আপস করতে হবে, নকল হতে হবে, আত্মাকে ঢেকে দিতে হবে পোশাক দিয়ে, যোগ্যতার চেয়ে বড় করে তুলতে হবে উপস্থাপনাকে, তবেই তাকে মেনে নেওয়া হবে। একটা প্রকাণ্ড ধাপ্পাবাজি, মিথ্যাচার ও আপস-সমঝোতায় শামিল হতে না পারলে তার রক্ষা নেই, তার আত্মবিলোপ অনিবার্য। রঞ্জিতের আত্মবিলোপের মধ্য দিয়ে আসলে গোটা একটা শ্রেণির আত্মপরিচয়ের সংকট ও সেই সংকটমোচনে নিরন্তর আপসের ছবিটিকেই স্পষ্ট করতে চেয়েছেন মৃণাল সেন।

রঞ্জিত এই আপস করতে চায়নি, বরং আত্মধ্বংসের পথ প্রশস্ত করেছে। সে নিজেই হয়ে উঠেছে একটা জ্বলন্ত প্রশ্ন। স্থিতাবস্থার মুখোশটিকে খুলে দিয়ে ভেতরের তীব্র অস্থিরতার, এক জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির উন্মোচন ঘটাতে চেয়েছে সে। গোটা সমাজের বিবেক হয়ে উঠতে চেয়েছে, দেখাতে চেয়েছে, আপস নয়, মেরুদণ্ড সোজা করে রাখার মধ্য দিয়েই আসতে পারে ঔপনিবেশিকতা-মোচনের খাঁটি সার্থকতা। প্রত্যাখ্যানের বদলে ফিরিয়ে দিতে হবে পাল্টা প্রত্যাখ্যান। স্পর্ধা ও দম্ভের বদলে পাল্টা স্পর্ধা ও দম্ভ। মিথ্যের মোকাবিলা করতে হবে সত্য দিয়েই। প্রশ্ন করতে হবে, অস্বস্তি জাগাতে হবে, লড়াই চালাতে হবে। অস্বীকার করতে হবে পোশাক-বদলের এই ঘৃণ্য রাজনীতিকে। শ্ৰেণিচরিত্রের এই রূপান্তরকে, যা গোটা একটা শ্ৰেণিকে ঠেলে দিচ্ছে মিথ্যে, আপস ও কৃত্রিমতার দিকে, তার বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ চালাতে হবে, প্রতিরোধ করতে হবে এই অবক্ষয়ের। ইন্টারভিউতে সফল না হলেও ছবিটির শেষদিকে রঞ্জিতের দৃঢ়তা, আত্মবিশ্বাস ও বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বরকে তাই এড়ানো যায় না। সে তখন আত্মপ্রত্যয়ে স্থিত। তখন তার চোখ খুলে গেছে। গোটা ছবিতে যে মানুষটিকে ভঙ্গুর মনে হয়, তার রূপান্তরটিও তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পোশাক সে মোটেই বদল করে না, বরং নিজেই বদলে যায়, হয়ে ওঠে এক আত্মসচেতন, দায়বদ্ধ, প্রতিবাদী মানুষ। মধ্যবিত্ত শ্রেণিচরিত্রের বদল কোনদিকে হওয়া উচিত, তারই যেন ইঙ্গিত দিতে চেয়েছেন মৃণাল।

A Sen-sational filmmaker | Deccan Herald

সত্যজিৎ রায় ভারতীয় সিনেমায় নিওরিয়েলিজম এনেছেন। মৃণাল সেন আরও এগিয়ে গেছেন। তিনি এনেছেন নিউ ওয়েভকে। সত্যজিৎ রায় যদি হন ডি সিকার উত্তরাধিকার, মৃণাল সেন তবে জঁ লুক গোদারের। ঋত্বিক ঘটকের জায়গা বোধহয় এর মধ্যবর্তী পরিসরে। সিনেমার ভাষায়, প্রকরণে, আধুনিকতার বিচারে মৃণাল সেন যে সাহস ও জেদ দেখিয়েছেন, তাকে অনুসরণ করা যায়নি পরবর্তীকালে। সাহসের অভাবেই হয়তো। বাংলা সিনেমা আবার নিটোল গল্পে ফিরে গেছে। প্রশ্ন করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। অস্বস্তি দেওয়ার বদলে দর্শককে স্বস্তি দিতে চেয়েছে। সিনেমাকে নিছকই বিনোদনের উপকরণ হিসেবে ভাবতে চেয়েছে। ইতিহাস সৃষ্টি করে গেছেন মৃণাল সেন। সেই ইতিহাসকে বহন করে চলার মতো শক্ত কাঁধ পাওয়া সহজ ছিল না। মধ্যবিত্ত জীবনের ড্রয়িংরুমটিকে ঠিক ড্রয়িংরুম হিসাবে দেখার অভ্যস্ততাই ফিরে এসেছে আবার। ‘ইন্টারভিউ’ ছবিটির গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিকতা তাই আজ অনস্বীকার্য।

লেখক রাহুল দাশগুপ্ত ইউনিভার্সিটি গ্লান্টস কমিশনের স্কলারশিপ নিয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট। পড়িয়েছেন যাদবপুর ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে। বাংলায় প্রথম শ্রেণিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। কর্মসূত্রে যুক্ত ছিলেন সাহিত্য অকাদেমির সঙ্গেও। কলকাতার লিটল ম্যাগাজিন ও গবেষণা কেন্দ্রের ‘তরুণ প্রাবন্ধিক সম্মাননা’র প্রথম প্রাপক। ২০১৭ সালে পেয়েছেন কৃত্তিবাস পুরস্কার। বাংলা উপন্যাসের প্রথম অভিধান ‘উপন্যাসকোশ’ গ্রন্থটির জন্য পান ‘দীপক মজুমদার সম্মাননা’। ২০১৮ সালে পেয়েছেন ‘কবিপত্র’ সম্মান, ‘মানুষ দাশগুপ্ত স্মৃতি সম্মাননা’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেড়শো বছর পূর্তি উপলক্ষে ঢাকায় ভারতীয় কবি হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। মণিপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছেন সাহিত্য অকাদেমির আমন্ত্রণে কবিতা অনুবাদের ওয়ার্কশপে। বিভিন্ন জায়গায় বক্তব্য রাখার জন্য আমন্ত্রিত হয়েছেন। সম্পাদনা করেছেন বেশ কিছু বই। বিভিন্ন দৈনিক পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত লেখেন। এক সময় সম্পাদনা করেছেন ‘এবং সমুদ্র’ পত্রিকা, এখন করেন ‘চিন্তা’ পত্রিকা। পোস্ট ডক্টরেট করছেন গোলপার্ক রামকৃষ্ণ মিশনের ইন্দোলজি বিভাগে। কর্মসূত্রে গার্ডেন হাই স্কুলে শিক্ষক হিসেবে যুক্ত। ভালোবাসেন বই পড়তে, সিনেমা দেখতে এবং মেয়ে উপাসনার সঙ্গে সময় কাটাতে।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *