‘মুখোশ’ নিঃসন্দেহে সুনির্মিত একটি রিমেক ছবি

অরিন্দম পাত্র

২০২০ সালের মাঝামাঝি জানতে পারি ওই বছরের জনপ্রিয় মালায়ালাম হিট ক্রাইম থ্রিলার ফিল্ম ‘আঞ্জাম পাথিরা’র বাংলা রিমেক হতে চলেছে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘সাইকো’। কালেক্রমে সেই ফিল্মের নাম পালটে ‘মুখোশ’ রাখা হয়। যাঁরা অরিজিনাল ফিল্মটি দেখেছেন, তাঁরা বুঝবেন যে নামটি যথোপযুক্তই বটে। শ্রেষ্ঠাংশে অনির্বাণ ভট্টাচার্যকে নিয়ে সন্দেহ ছিল না, কিন্তু যাবতীয় সংশয় দানা বেঁধেছিল পরিচালকের নাম দেখে। কিন্তু আজ ‘মুখোশ’ দেখার পরে আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি যে, এটি নিঃসন্দেহে সুনির্মিত একটি রিমেক ছবি। আসল ছবির নিরিখে তুলনায় না গেলে খুব খারাপ লাগবে না।

আরও পড়ুন: ‘বিনিসুতোয়’ দেখে ফিরে

এ ছবির গল্প নিয়ে কথা বাড়িয়ে সময় নষ্ট করব না। বরং সরাসরি দু’টি ছবির তুলনামূলক কিছু আলোচনায় আসা যাক। ক্রিমিনাল সাইকোলজিস্টের মুখ্য ভূমিকায় অনির্বাণ ভট্টাচার্য খুব ভালো অভিনয় করেছেন, তবে মূল ফিল্মের প্রোটাগনিস্ট-এর ভূমিকায় কোঞ্চাকু বোবানের অভিনয়কে আমি এগিয়ে রাখব। বোবানের অনুচ্চারিত আন্ডার অ্যাক্টিং ভোলবার নয়। অনির্বাণ নিঃসন্দেহে ব্রিলিয়ান্ট অ্যাক্টর এবং তিনি নিজের মতো করেই সাফল্যের সঙ্গে এই চরিত্রের রূপদান করেছেন। ক্রাইম ডিটেকশন করতে গিয়ে অনির্বাণকে কখনোই ব্যোমকেশের ছায়ায় আচ্ছন্ন বলে মনে হয়নি, এটাই সবচেয়ে বড় কথা, যা হবার প্রবল সম্ভাবনা হয়তো ছিল। পুলিশের বড় কর্তার ভূমিকায় উন্নিমায়া প্রসাদ ও চান্দ্রেয়ী ঘোষ তুল্যমূল্য কাজের নমুনা প্রদর্শন করেছেন। মূল ছবির হ্যাকার চরিত্রে শ্রীনাথ ভাসির উজ্জ্বল উপস্থিতি এই রিমেক ছবিতে অনুপস্থিত। স্বাভাবিকভাবেই বোবান-শ্রীনাথের সেই কেমিস্ট্রি বাংলা ছবিতে দেখতে পাবেন না দর্শক। বাংলা ছবিতে এসিপি অদ্রীশের চরিত্রে অনির্বাণ চক্রবর্তী ওরফে ‘একেনবাবু’কে একটু মিসকাস্ট মনে হল। মূল ছবিতে এই চরিত্রে জিনু যোশেফকে দুর্দান্ত মানিয়েছিল। ছোট্ট চরিত্রে কৌশিক সেন বেশ ভালো।

সবশেষে আসি এই ছবির অর্থাৎ মুখোশের সারপ্রাইজ প্যাকেজের কথায়। টোটা রায়চৌধুরির কথা বলছি। পুরো ছবির প্রচারপর্ব জুড়েই গোটা টিম অত্যন্ত সুদক্ষভাবে তাঁর উপস্থিতি গোপন করে এসেছেন। ঠিক এই জায়গাতেই মুখোশ কিছুটা আলাদা আঞ্জাম পাথিরা’র থেকে। আসল ছবিতে এই চরিত্রটি করেছিলেন শারাফ ইউ ধিন। কিন্তু গোটা ছবিতে তাঁর স্ক্রিন প্রেজেন্স খুব কম ছিল। টোটাকে দারুণভাবে ব্যাবহার করেছেন পরিচালক আর টোটা সেই সুবর্ণ সুযোগের সদ্‌ব্যবহারও করেছেন খুব ভালোভাবেই। অনির্বাণের সঙ্গে মুখোমুখি অভিনয়ের দৃশ্যগুলিতে কিছু কিছু জায়গায় টোটাকে এগিয়ে রাখব আমি। কাস্টের কথা বলতে গেলে ছবির একদম শেষে দর্শকদের জন্য একটা চমক রয়েছে, সেটা আপনারা নিজেরা দেখলেই ভালো।

আরও পড়ুন: আশা ৮৮

এবারে আসি ছবির চিত্রনাট্যের ব্যাপারে দু’চার কথা বলতে। আঞ্জাম পাথিরা’র ফ্রেম টু ফ্রেম কপি নয় মুখোশ। এটা দেখে ভালোই লেগেছে। বেশ কিছু ছোট ছোট পরিবর্তন এনেছেন বিরসা; যেমন নেকড়ের জায়গায় ভেড়ার মুখোশ, আইনের দেবীর মূর্তির বদলে যিশু খ্রিস্টের ক্রস, বাইবেলের ভার্স ইত্যাদি, যা একদমই বেমানান মনে হয়নি। তবে বেশ কিছু দৃশ্য বা সিন ছেঁটে বাদ দেওয়ার ফলে আসল ছবির তুলনায় থ্রিল ফ্যাক্টর যে বেশ কমে গেছে, তাতে সন্দেহ নেই। আবার অন্যদিকে এর ফলে মুখোশ কিছুটা স্লিক আর স্লিমও হয়ে উঠেছে। আরেকটা কথা না বললেই নয়! সেটা হল মূল ছবিতে প্রোটাগনিস্ট ও অ্যান্টাগনিস্ট-এর মধ্যে কোনও ইমোশনাল কানেক্টের ব্যাপার ছিল না। কিন্তু মুখোশের পরিচালক এই ব্যাপারে যে মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন, তা বলতেই হবে! ফলত ছবিটি উপভোগ্য হয়ে উঠেছে বেশ।

ক্যামেরার কাজ বেশ ভালো লেগেছে। তিলোত্তমা কলকাতা এবং উত্তরবঙ্গকে খুব সুন্দর করে দেখিয়েছেন ডিওপি। তবে আসল ছবির মূল টিউনটি ধরে রাখলেও ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক অতটা দুর্ধর্ষ হয়ে উঠতে পারেনি।

আরও পড়ুন: নতুন ফরম্যাটে প্রয়াসের অ্যাবসার্ড থিয়েটার

শেষ কথা হিসেবে বলব যে, এই ছবিটি সবচেয়ে উপভোগ করবেন তাঁরাই, যাঁরা আসল ছবিটি আগে দেখেননি। তবে যাঁরা দেখেছেন তাদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া হওয়া অস্বাভাবিক নয়। রিমেক করা কোনও অপরাধ নয়। কিন্তু ইউটিউবে বা টিভি চ্যানেলে বহুবার প্রদর্শিত হিন্দি ডাবড সাউথ ফিল্মের অর্থহীন রিমেক না করে এইরকম অনেক মানুষের না দেখা কোয়ালিটি কিছু ফিল্মের রিমেক স্বত্ব কিনে রিমেক বানানোটাতে আমি অন্তত আপত্তি করব না!

এই ফিল্মে একটা ব্যাপার খুব মজার লাগল, যেটা না শেয়ার করে পারছি না! ফেলুদা জটায়ুকে খুন করতে উদ্যত হয়েছেন আর জটায়ুকে বাঁচাতে গিয়ে ফেলুদার হাতে বেধড়ক মার খাচ্ছেন ব্যোমকেশ। আর ফেলুদাকে সাহায্য করছেন কে জানেন? সত্যবতী! কিছু বুঝলেন? এর মধ্যেই পুরো গল্পটা লুকিয়ে আছে। অত না বোঝার চেষ্টা করে বরং দেখেই ফেলুন ‘মুখোশ’।

মুখোশ (২০২১)
পরিচালক: বিরসা দাশগুপ্ত
স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম: হৈ চৈ

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *