ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে মুর্শিদাবাদ

সাইদুর রহমান

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে মুর্শিদাবাদ জেলার এক ‘গৌরবগাথা’ আছে। ১৯৭১ সাল ছিল মুক্তিযুদ্ধের এক চূড়ান্ত বছর। ওই বছরের ১০ ডিসেম্বর থেকে ১৫ ডিসেম্বর— পাঁচ দিনে পাকিস্তানি বাহিনী রাজাকার, আল বদর বাহিনীর সহায়তায় অধ্যাপক, সাংবাদিক, শিল্পী, লেখক-সহ ১৮ জন বুদ্ধিজীবীদের নির্মমভাবে গণহত্যা চালায়। হত্যা করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, অধ্যাপক আনোয়ার পাশা, অধ্যাপক গিয়াসউদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক সিরাজুল হক খান, ড. মহম্মদ মুর্তজা, ড. আবুল খায়ের, ড. ফয়জুল মহিউদ্দিন, অধ্যাপক রাশিদুল হাসান, অধ্যাপক সন্তোষ ভট্টাচার্য, অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, দৈনিক ইত্তেকাফ-এর কার্যনির্বাহী সম্পাদক সিরাজুদ্দীন হোসেন, পিপিআইয়ের প্রতিবেদক সৈয়দ নাজমুল হক, প্রতিবেদক এ এন এম গোলাম মোস্তফা, বিবিসির সাংবাদিক নিজাম উদ্দিন আহমেদ, শিলালিপির সম্পাদক সেলিনা পারভীন, দৈনিক সংবাদ-এর যুগ্ম সম্পাদক শহীদুল্লা কায়সার, কার্ডিওলজির অধ্যাপক ফজলে রাব্বী ও চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. আলীম চৌধুরীকে। এঁদের মধ্যে অধ্যাপক আনোয়ার পাশা সহ কয়েকজনের মরদেহ মিরপুর বধ্যভূমিতে পাওয়া যায়।

আরও পড়ুন: শ্রমিকের সামান্য ‘পান্তা ভাতে’ একটু লবণের ব্যবস্থার হোক

১৪ ডিসেম্বর, ১৯৭১, বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের ওপর মেহেরপুরে নির্মিত একটি ভাস্কর্য

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম শহিদ অধ্যাপক আনোয়ার পাশার নামের সঙ্গে মুর্শিদাবাদ জেলার নাম অনিবার্যভাবে জড়িয়ে আছে। ১৯২৮ সালের ১৫ এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুর মহকুমার রাঙ্গামাটি চাঁদপাড়া ইউনিয়নের ডবকাই গ্রামে আনোয়ার পাশা জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন হাজী মকরম আলি। মা সাবেরা খাতুন। তিনি ১৯৪৬ সালে মুর্শিদাবাদ জেলার ভাবতা আজিজিয়া উচ্চ মাদ্রাসা থেকে মাদ্রাসা পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে পাশ করেন। ১৯৪৮ সালে আইএ পাশ করেন বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে। এই কলেজে বসেই ১৯৪৬ সালে কলেজের পত্রিকায় তিনি লিখেছিলেন তাঁর ‘আকাঙ্খা’ কবিতাটি:

‘শান্ত প্রাতের নব অরুণের নীরব হাসির মতো—

ওষ্ঠে আমার ফুটিবে যে কবে হাসির লহরি যত?

শেফালীবৃন্তে যে মাধুরী ফোটে

ফাগুন পবনে যে সুরভি ছোটে—

লীলায়িত সুরে যে মাধুরী কবে পশিবে হৃদয়ে হায়?’ (সূত্র: ঝড়, আলোকপাত, ২০১৭)

এরপর তিনি চলে যান ওপার বাংলায় (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে)। সেখানে তিনি বাংলা নিয়ে রাজশাহী কলেজে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে ১৯৫১ সালে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক হন। দেশবিভাজন আনোয়ার পাশা মনেপ্রাণে মেনে নিতে পারছিলেন না। এরপর তিনি কলকাতা চলে আসেন এবং ১৯৫৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যেই স্নাতকোত্তর হন। আনোয়ার পাশার কর্মজীবন শুরুও হয় মুর্শিদাবাদে, মুর্শিদাবাদ জেলার মানিকচক হাই মাদ্রাসায় সুপারিন্টেনডেন্ট পদে যোগদানের মধ্য দিয়ে (সম্ভবত, ১৯৫৩ সালে)। পরের বছর ১৯৫৪ সালে নিজের বিদ্যালয় ভাবতা আজিজিয়া হাই মাদ্রাসায় শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। পরে ১৯৫৭ সালে মুর্শিদাবাদ জেলার জলঙ্গি থানার সাদিখান দিয়ার বহুমুখী উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। পরের বছর পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে অধ্যাপনার চাকরি নিয়ে ওপার বাংলা (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) চলে যান। সেখানে শিক্ষকতা করেন ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত। এরপর তিনি আর পেছনের দিকে ফিরে তাকাননি। ১৯৬৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অস্থায়ী প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। পরে ১৯৬৯ সালে অধ্যক্ষ অধ্যাপক মুনীর চৌধুরীর হাত ধরে তিনি স্থায়ী প্রভাষক পদে উন্নীত হন। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত অধ্যাপক পাশা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই কর্মরত ছিলেন।

আরও পড়ুন: জনঅরণ্যে সম্প্রীতির বার্তা

আনোয়ার পাশা

আনোয়ার পাশা স্বপ্ন দেখতেন স্বাধীন বাংলাদেশের। ১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিফৌজের আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ পেতে থাকে। পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী এই সময় চরম হিংস্র হয়ে ওঠে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে শুরু হয় বুদ্ধিজীবী নিধন, যা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে পরিচিত। এই সময় বেঁচে যান অধ্যাপক পাশা। সেদিনের চোখের সামনে ঘটে যাওয়া ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর ঘটে যাওয়া ঘটনাকে নিয়ে তিনি রচনা করেন ‘রাইফেল-রোটি-আওরাত’ উপন্যাস। জাহানারা ইমাম তাঁর ‘একাত্তরের দিনগুলি’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘‘আমি স্তম্ভিত হয়ে শুনলাম, হাসিন জাহান কাঁদতে বলছে, ‘খালাম্মা আমাদের বিল্ডিংয়ে আর্মি ঢুকে মেরে ধরে সব একাকার করছে, মনিরুজ্জামান স্যার মরে গেছেন, জ্যোতির্ময় স্যার গুরুতর জখম—’ অধ্যাপক আনোয়ার পাশা ও তার পরিবার লুকিয়ে কোনওরকমে সে যাত্রা রেহাই পান। এরপর আত্মগোপন করেন।’’ একাত্তরের ডিসেম্বরের দিকে মুক্তিযুদ্ধের অবস্থা মুক্তিযোদ্ধাদের কিছুটা অনুকূলে আসে। ১৩ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী কিছুক্ষণের জন্য কারফিউ প্রত্যাহৃত করে। এই সময়েই অধ্যাপক পাশা বাসা বদল করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসায় উঠে আসেন। পরের দিন ১৪ ডিসেম্বর ‘আল বদর’দের সহযোগিতায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কাদামাখা একটি লাল স্টেট বাসে চেপে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসা থেকে অধ্যাপক আনোয়ার পাশাকে চোখ বেঁধে ধরে নিয়ে যায় এবং মিরপুর বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধের কাছে হত্যা করে। পরে সেখান থেকে তাঁর পচাগলা দেহ উদ্ধার করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জামে মসজিদের পাশে সমাহিত করা হয়। আনোয়ার পাশা কেবল অধ্যাপক ছিলেন না। তিনি ছিলেন কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক। বহু পত্রপত্রিকায় তাঁর রচনা প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর রচনাবলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে: ‘নদী নিঃশেষিত হলে’, ‘নীড় সন্ধানী’, ‘নিশুতি রাতের গাথা’,  ‘নিরুপায় হরিণী’, ‘রাইফেল-রোটি-আওরাত’, ‘সমুদ্র শঙ্খলতা উজ্জয়িনী ও অন্যান্য কবিতা’ ইত্যাদি।

আরও পড়ুন: রাজ্যের প্রথম গ্রন্থমেলাও হয় এই মুর্শিদাবাদ জেলায়

রাইফেল, রোটি, আওরাত: মুক্তিযুদ্ধের প্রথম উপন্যাস

মুক্তিযুদ্ধের আর এক সেনানী, শত ‘শহিদের জননী’ জাহানারা ইমামের নামের সঙ্গেও মুর্শিদাবাদ জেলার নাম জড়িয়ে আছে। জাহানারা ইমাম ১৯২৯ সালের ৩ মে অবিভক্ত বাংলার মুর্শিদাবাদ জেলার সুন্দরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা সৈয়দ আব্দুল আলি ছিলেন সাব-ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। মা সৈয়দা হামিদা বেগম। সাত ভাই-বোনের মধ্যে জাহানারা ছিলেন জ্যেষ্ঠ। বাবার চাকরির সুবাদে জাহানারা ইমামের  স্কুলজীবন বিভিন্ন জায়গায় কেটেছে। লালমনিরহাট স্কুল থেকে ১৯৪২ সালে ম্যাট্রিক পাশ করেন জাহানারা ইমাম। ওই সময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছিল। তাই এই সময়ে ম্যাট্রিক পরীক্ষা শেষে জাহানারা ইমাম পরিবারের সঙ্গে মুর্শিদাবাদের সুন্দরপুরে ফিরে আসেন। এরপরেই তাঁর বাবা রংপুরে বদলি হন। ফলে মুর্শিদাবাদের সুন্দরপুর গ্রামে বেশ কয়েক মাস থাকার পর বাবার সঙ্গে তিনি রংপুর চলে যান এবং সেখানে কারমাইকেল কলেজে তাঁকে ভর্তি করানো হয়। পরে তিনি ১৯৪৫ সালে কলকাতার লেডি ব্রেবোর্ন কলেজে ভর্তি হন এবং ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা ও দেশবিভাগের সময় ওই কলেজ থেকেই স্নাতক হন। দেশবিভাগের ফলে এরপর তিনি রংপুরে বাবার কাছে চলে যান। এরপর তিনি আর কলকাতায় ফেরেননি।

জাহানার ইমামের ছেলে শাফি ইমাম রুমি ছিলেন একজন সক্রিয় মুক্তিযোদ্ধা। জাহানার ইমাম নিজের হাতে ছেলে রুমি ও তাঁর সহ-মুক্তিযোদ্ধাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ সহ সহযোগিতা করতেন। ১৯৭১ সালের ২৯ আগস্ট, নিজের বাড়িতেই বেশকিছু গেরিলা মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে রুমি পাক হানাদার বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। এরপর রুমিকে আর দেখা যায়নি। মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত থাকার অপরাধে তাঁর স্বামী শরিফ ইমামকেও হত্যা করা হয়। রুমির হত্যার পর জাহানারা ইমাম বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ‘শহিদের জননী’ মর্যাদায় ভূষিত হন।

আরও পড়ুন: আঁকা-লেখা

শহিদ জননী জাহানারা ইমাম

১৯৭১ সালের ১৫ অক্টোবর থেকে ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাঙ্গাল দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রায় ৩৮ জন সদস্য বাংলাদেশ থেকে দিল্লি পর্যন্ত ‘বিশ্ব বিবেক জাগরণ পদযাত্রা’র আয়োজন করেন৷ উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ভারত সরকারের কাছ থেকে স্বীকৃতি আদায়, মুজিবের মুক্তির দাবিতে বিভিন্ন দূতাবাসে স্মারকলিপি প্রদান, পাকিস্তানি সেনা দ্বারা গণহত্যা ও হত্যাযজ্ঞের বর্ণনা তুলে ধরে স্বাধীনতার পক্ষে ভারতীয় জনমত গড়ে তোলা। পদযাত্রীরা বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে জনসভা করতেন৷ গণহত্যা সম্পর্কে নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে আহ্বান জানাতেন বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়ানোর৷  এই পদযাত্রা ১৯৭১-এর ১৪ অক্টোবর মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুরের কাশীশ্বরী বালিকা বিদ্যালয়ে পৌঁছয়। এখানে রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্র সেনের সভাপতিত্বে তাঁদের অভ্যর্থনা জানানো হয়। বক্তব্য রাখেন লেখক রেজাইল করিম, মহম্মদ একরামুল, শ্রী দেশাই, আবদুল খালেকের মতো ব্যক্তিত্বরা৷ পরেরদিন বাংলাদেশের পতাকা, ফেস্টুন ও ব্যানারসহ বহরমপুর থেকে গোকর্ণর দিকে যাত্রা করে সেই পদযাত্রা৷ এরপর ‘বিশ্ব বিবেক জাগরণ পদযাত্রা’ মুর্শিদাবাদ থেকে সাইথিয়া, শিউড়ি, শান্তিনিকেতন, দুর্গাপুর, আসানসোল, বিহার, পটনা, লখনউ হয়ে দিল্লির দিকে এগিয়ে যায়। কথা ছিল, ৩০ জানুয়ারি মহাত্মা গান্ধির মৃত্যুদিবসে দিল্লির রাজঘাটে গান্ধির সমাধিতে গিয়ে পদযাত্রা শেষ হবে। কিন্তু তার আগেই বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করায় ১৭ ডিসেম্বর আগ্রার কাছে এসে পদযাত্রাটি শেষ হয়৷

আরও পড়ুন: নোটস ফ্রম দ্য ডেড হাউস (৩য় অংশ)

স্বাধীনতার জন্য ১৪০০ মাইল পদযাত্রা

‘ভাষা আন্দোলন’কে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সূতিকাগার বলা হয়। বিশ্বের সকল বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে ভাষা আন্দোলন এক আবেগের নাম। এই আন্দোলনের অন্যতম শহিদ বরকতের নামের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে মুর্শিদাবাদের নাম। ১৯২৭ সালের ১৩ জুন (মতাঃ ১৬ জুন) মুর্শিদাবাদ জেলার ভরতপুর অঞ্চলের বাবলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন বরকত। তাঁর পিতার নাম শামসুদ্দিন, মাতা হাসিনা বেগম। বরকত শিক্ষা জীবন শুরু করেন বাবলা গ্রামের বাবলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ১৯৪৫ সালে তালিবপুর হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক ও ১৯৪৭ সালে বহরমপুর  কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে তিনি উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন। ’৪৭ সালে ভারত ভাগের পর তাঁর পরিবারের সঙ্গে তিনি ওপার বাংলা (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) চলে যান। সেখানে ১৯৫১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক হন তিনি। কিন্তু এই সময়ে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে গোটা পূর্ব বাংলা জুড়ে আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সামনের রাস্তায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। আন্দোলনরত ছাত্র যুবরা ১৪৪ ধারা ভেঙে সামনে এগিয়ে চলেন। বিক্ষোভরত ছাত্র-জনতার উপর পাকিস্তানি পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়। হস্টেলের বারান্দায় গুলিবিদ্ধ হন বরকত। ২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২, আজিমপুর কবরস্থানে সমাহিত করা হয় বরকতকে। বরকতের সঙ্গে শহিদ হন আবদুস সালাম, রফিক, জব্বার, শফিউর রহমান প্রমুখ।

আরও পড়ুন: স্মৃতিতে সুন্দরলাল

১৯৭২ সালে বাংলাদেশের প্রথম শহিদ অনুষ্ঠানে ভাষা আন্দোলনের অন্যতম শহিদ বরকতের মা হাসিনা বেগমকে মুর্শিদাবাদ থেকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। তখন তাঁর বয়স ছিল ৮২ বছর। ১৯৭২-এর ২১ ফেব্রুয়ারি আজিমপুর কবরস্থানে ছেলের কবরে প্রথম ফুল দেন তিনি। ছেলের কবরে ফুল দেওয়ার আবেগঘন সেই মুহূর্তকে পরের দিন ২৩ ফেব্রুয়ারি ‘দৈনিক বাংলা’য় তুলে ধরা হয় এইভাবে, ‘প্রথম ফুল। একুশের প্রথম ফুল। আজিমপুরের মাজারে। তখন গভীর রাত। শিশির ঝরছে। ভীষণ শীত। আজিমপুর গোরস্তান। এখানে ভাষা আন্দোলনের বীর শহিদদের কবর। রাত বারোটা বেজে গেছে। রাজধানীর প্রত্যন্ত প্রান্তর থেকে নগ্নপায়ে আসতে শুরু হয়েছে একুশের মিছিল। ঠিক তখন তিনি এলেন। হাতে বিরাট একটা পুষ্পস্তবক। অন্যের কাঁধে ভর দিয়ে এগুলেন নিঃশব্দে কবরের দিকে। তিনি আবুল বরকতের মা। বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন আজ। কাঁপা কাঁপা হাতে তুলে দিলেন ফুলের স্তবক প্রিয় ছেলের কবরে। চারদিক নিঃশব্দ। দূর থেকে অনেকে দেখছেন এই দৃশ্য। সবার চোখ ছলছল করছে। কোন কথা বলতে পারলেন না তিনি। মৃদু উচ্চারণে অস্পষ্ট শব্দে কবরের গায়ে হাত বুলোতে থাকলেন কিছুক্ষণ। তাঁর চোখে অশ্রু নেই। সবাই চোখ মুছল তখন। প্রথম ফুল রাখলেন কবরে। একুশের প্রথম প্রহরে। তিনি আবুল বরকতের মা।’ (সূত্র: প্রথম আলো, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২১)  

আর বাইরের মুক্ত পরিবেশে তখন প্রথমবারের মতো বাজছিল বাংলাদেশের অমর সংগীত, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি।’ 

ক্রমশ…

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *